খালেদ মাসুদের মনে কী ঝড় বইছে, তা শুধু অনুমানই করা যায়। কারণ মুখে তিনি কিছুই বলছেন না। আসলে বলতে পারছেন না। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের যে মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ নিয়ে তাঁদের যতটা ভাবনা, এর চেয়ে বেশি না হলেও ঠিক ততটাই খেলোয়াড়েরা কখন কোন সাংবাদিককে কী বলে ফেলেন!

প্রথম টেস্টের পর সহকারী কোচ সারোয়ার ইমরানের অপ্রিয় সত্য কথাগুলো স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভালো লাগেনি। কথাগুলো ঠিক কি না, ঠিক হলে কী করা উচিত—এ নিয়ে ভাবার চেয়ে কেন তিনি তা বললেন, এ নিয়েই বেশি উত্তেজিত সবাই। সেই উত্তেজনার আগুনে ঘি ছিটিয়েছে টেস্ট দলে অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে মোহাম্মদ রফিকের যৌক্তিক মন্তব্য। ফলাফল—টিম মিটিংয়ে খেলোয়াড়দের প্রতি কড়া নির্দেশ, মিডিয়া ম্যানেজারের উপস্থিতি ছাড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘হাই-হ্যালো’র বাইরে কোনো কথা বলা যাবে না।

কিছুদিন আগেও যাকে ছাড়া বাংলাদেশ টেস্ট দলকে কল্পনা করা যেত না, সেই খালেদ মাসুদ ক্যারিয়ারে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো টেস্ট দল থেকে বাদ পড়ার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইতেই তাই রীতিমতো আঁতকে উঠলেন। ‘আমি কিছুই বলব না। আমাদের নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে’—মুখে অবশ্য কিছু বলতেও হচ্ছে না। এমনিতে সদা প্রাণচঞ্চল হাস্যমুখ খালেদ মাসুদের চেহারায় গত দু দিন ধরেই বিষণ্নতার ছাপ। বাদ পড়ার খবরটা আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেছেন কাল সকালে, আভাস তো আগেই পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে মোট ৪৭টি, এর মধ্যে মাত্র ৩টিতেই তিনি ছিলেন না। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ে সফর থেকে পা ভেঙে দেশে ফিরতে হওয়ায় একটি। সেটি তো বাদ পড়া নয়। এর আগে বাদ পড়েছিলেন শুধু দুটি টেস্টেই। ২০০৩ বিশ্বকাপ-দুঃস্বপ্নের জের হিসেবে এর পরপরই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে। আলিউল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটির সেই সিদ্ধান্তে অক্রিকেটীয় কারণেরই যে বেশি ভূমিকা ছিল, এর প্রমাণ সেই সিরিজের পরই মাসুদের দলে ফেরা।

তবে এবারের ঘটনা তা নয়। কিপিং নিয়ে এখনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু ব্যাটিং নিয়ে প্রশ্নটা অনেক দিন ধরেই উঠছিল। ওয়ানডে দলে জায়গা হারিয়েছেন এ কারণেই, এবার টেস্ট দলেও ব্যাটসম্যান খালেদ মাসুদের কারণে বলি হতে হলো উইকেটকিপার খালেদ মাসুদকে। সিদ্ধান্তটা যে খুব কঠিন ছিল, সেটি মানছেন কোচ শন উইলিয়ামস ও অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল দুজনই। আশরাফুলের জন্য সবচেয়ে কঠিন। সব খেলোয়াড়ের সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো, তবে বাংলাদেশ দলে খেলা শুরু করার পর থেকেই ‘পাইলট ভাই’-এর সঙ্গটা তাঁর কাছে বিশেষ কিছু। দলের দাবিতে অধিনায়ককে এসব ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়, আশরাফুলও এটি না টেনে ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যাই দিলেন, ‘পাইলট ভাই বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো টেস্ট ম্যাচেই খেলেছেন। তাঁর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে বাইরে রাখাটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। তবে আমাদের ব্যাটিংটাকে আরও শক্তিশালী করতে চেয়েছি বলে সেটিই নিতে হয়েছে।’

লর্ডসে অভিষেক টেস্টে হেলমেটে বল লাগার পরে সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন যিনি, ওয়ানডের মতো টেস্টেও সেই পাইলটের জায়গাই নিয়েছিলেন মুশফিক। ছবি: এএফপি

খালেদ মাসুদের যা ব্যাটিং ফর্ম, তাতে এটিকে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলার উপায় নেই। ২০০৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট লুসিয়ায় ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরিটির পর ৩৫টি ইনিংসে তাঁর মাত্র একটি হাফ সেঞ্চুরি, সেটিও ২৯ ইনিংস আগে (২০০৪ সালের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে)। খালেদ মাসুদ তাই বাদ পড়তেই পারেন, তবে এই সফরে বাংলাদেশের দল নির্বাচনে একটা গোলমেলে ব্যাপার থেকেই যাচ্ছে। যেকোনো সফরে কোচ-অধিনায়ক নিয়ে গড়া ট্যুর নির্বাচক কমিটিরই একাদশ নির্বাচন করার নিয়ম। সফরে নির্বাচকদের কেউ থাকলে তিনিও এই কমিটিতে থাকেন। এখানেও কি তা-ই হচ্ছে? দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ দলে তিনটি পরিবর্তনের পর কোচ শন উইলিয়ামসকে প্রশ্নটা করাও হয়েছিল—একাদশ নির্বাচনে দেশে থাকা প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদের ভূমিকা কতটুকু? ‘আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেব না’—প্রশ্নটাতে তাঁর আপত্তি করার কারণটা রহস্যই হয়ে থাকল।

ওয়ানডে দলে যাঁকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে, টেস্ট দল থেকেও খালেদ মাসুদকে সরিয়ে দিলেন সেই মুশফিকুর রহিমই। এর আগে দুটি টেস্ট খেলেছেন, তবে দুটিই স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে। মুশফিক নিজেই অবশ্য মনে করিয়ে দিলেন, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বগুড়া টেস্টে তিনি ২০-২৫ ওভার কিপিং করেছিলেন। কথাবার্তায় দারুণ সপ্রতিভ, আত্মবিশ্বাসটাও ঠিকরে বেরোয় তা থেকে। পাশে বসে থাকা মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম ও তাজ সমুদ্র হোটেলের তিনতলার লবিতে মুশফিকুরকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেখে থমকে দাঁড়ানো বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার আলী আসিফ খানেরও তা থেকে একটা উপলব্ধি হওয়া উচিত। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় বিধিনিষেধ আরোপ করাটা কোনো সমাধান নয়, ক্রিকেট বোর্ডের উচিত, কী বলা যাবে আর কী বলা যাবে না খেলোয়াড়দের তা শেখানো।

ব্যাটিংয়ে জয়াবর্ধনে, পেছনে মুশফিক। ছবি: এএফপি

মুশফিকুর রহিমের সংবাদ সম্মেলনের কিছু প্রশ্নোত্তর তুলে দিলেই ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে—

প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলের প্রতীক হয়ে থাকা খালেদ মাসুদকে সরিয়ে দলে আসাটা কি বাড়তি চাপ?

মুশফিকুর: আমি কোনো চাপ নিচ্ছি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন যে জায়গায় পৌঁছেছে, তাতে এসব নিয়ে ভাবার অর্থ হয় না।

প্রশ্ন: এখানে প্রস্তুতি ম্যাচে তো আপনি ৩৩ রান করে অপরাজিত ছিলেন। সেটা কি দলে আসায় ভূমিকা রেখেছে?

মুশফিকুর: লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটে ৩৩ কোনো রানই না।

প্রশ্ন: টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে কি আশাবাদী ছিলেন?

মুশফিকুর: অবশ্যই ছিলাম। আমি তো এখানে ঘুরতে আসিনি, খেলতে এসেছি।

নিয়মিত উইকেটকিপার হিসেবে প্রথম টেস্টেই পঞ্চাশ রানের ইনিংসে বুঝিয়েছিলেন, বাড়তি দায়িত্ব তাঁর ব্যাটে মরচে ধরাতে পারবে না। ছবি: এএফপি

আপত্তিকর কিছু নেই, আবার ‘আমি খুব খুশি’ ‘ভালো খেলতে চাই’ জাতীয় গৎবাঁধা কথাও নয়। এই যুগের ক্রিকেটারদের তো এমনই হতে হবে। মুশফিকুর রহিম যে সত্যিই তাঁর প্রতিনিধি, সেই প্রমাণ তিনি আরও দিলেন। স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি টেস্ট খেলে ফেললেও পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, উইকেটকিপার হিসেবে বাংলাদেশ দলে খেলাটাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকের প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিলেন, ‘অন্য অনেক দলেও দেখবেন, দুজন উইকেটকিপার খেলে।’

মূলত ব্যাটিংয়ের জন্যই তাঁর দলভুক্তি, নিজের ব্যাটিং সম্পর্কে ধারণা জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘সবাই আমাকে ব্যাটসম্যান হিসেবে ভালো বলে। ব্যাটিংয়ে ভালো করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, আমি তা করে আসছি।’

দলে এসেছেন উইকেটকিপার হিসেবে, ব্যাটিংয়েও অনেক প্রত্যাশা—চাপটা বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না, মুশফিকুরের সাবলীল জবাব, ‘আমরা পেশাদার। পেশাদারদের এসব ভাবলে চলে না।’

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা হলো শেষে এবং এড়িয়ে যাওয়ার মতো সেই প্রশ্নেই মুশফিকুর একই রকম সপ্রতিভ।

-পাইলটের সঙ্গে কথা হয়েছে?

‘হ্যাঁ’।

-কী কথা?

‘উনি বলেছেন, বেস্ট অব লাক। ভালো খেলো।’

এই ছেলে অনেক দূর না গেলেই অবাক হতে হবে।

আরও পড়ুন:

ভুল মুশফিক, ঠিক মুশফিক!
দুই তরুণের 'স্বপ্নের অভিষেক'

বিজ্ঞাপন বলতে ওই মুশফিকুর রহিমই

বগুড়ার টেস্ট অভিষেকে তো থাকাই উচিত মুশফিকুরের

প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি: ইতিহাসের মুশফিক ইতিহাসে

ডাবল সেঞ্চুরির চেয়েও মুশফিক বেশি তৃপ্তি পেয়েছিলেন যাতে