একজন ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি, অন্যজন টেনেটুনে ৫ ফুট। দুজন পাশাপাশি দাঁড়ালে দেখার মতো একটা দৃশ্য হয় এবং দুজন এখন পাশাপাশিই দাঁড়িয়ে। শাহাদাত হোসেন আর মুশফিকুর রহিম দুজনেরই যে একই সঙ্গে টেস্ট অভিষেক হচ্ছে আজ। লর্ডসে অভিষেক হলে ‘স্বপ্নের মতো লাগবে’— আগেই জানিয়ে দিয়েছেন শাহাদাত। মুশফিকুর রহিমকে ‘স্বপ্ন-টপ্ন’ দিয়েও বোঝানো যাচ্ছে না।

অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন, দেশে ফিরে টেলিভিশনে দেখার কথা ছিল এই সিরিজ। দলে ঢুকে যাওয়ার খবরটা যখন পেলেন, তখন ব্যাপারটা একটু বদলাল। যাক, টেলিভিশনে নয়, মাঠে বসেই খেলা দেখা যাবে। দ্বিতীয় উইকেটকিপার হিসেবে দলে এলেন এবং নিজেই বলছেন, খালেদ মাসুদ অবসর নেওয়ার আগে তাঁর জায়গা নেওয়ার কথা ভাবার সাহসই তাঁর নেই। সেই মুশফিকুরের স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট অভিষেক হচ্ছে, সেটিও আবার লর্ডসে! রূপকথায় এর চেয়ে বেশি আর কী থাকে!

কে বিশ্বাস করবে, এই বাচ্চা ছেলে দুদিন পরই লর্ডসে টেস্ট খেলতে নামবে! ছবি: এএফপি

নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর থেকেই তাঁকে নিয়ে ইংলিশ মিডিয়ায় রীতিমতো মাতামাতি, এখন মাত্র ১৬ বছরে টেস্ট অভিষেক। মুশফিকুর রহিমের ছোট্ট মাথা ঘুরে না গেলেই হয়! উত্তরসূরিকে দেখেশুনে খালেদ মাসুদ নিশ্চিত যে, এ রকম কিছু হবে না। মুশফিকুরকে তাঁর অন্য রকম মনে হচ্ছে। অন্য রকম মনে হচ্ছে ডেভ হোয়াটমোরের কাছেও। মুশফিকুরের শারীরিক আকৃতি আর বয়সের তুলনায় মাথাটা অনেক বেশি পরিণত বলেই তাঁর ধারণা। মুশফিকুরের সঙ্গে কথা বলার পর আপনারও একমত না হয়ে উপায় নেই।

ফুটফুটে চেহারা, মুখে নিষ্পাপ হাসি... এই ছেলেকে হার্মিসন-হগার্ড-জোন্সদের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পেছনে ওই সেঞ্চুরির মতো বয়সের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা পরিণতবোধেরও বড় ভূমিকা। ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি স্টিভ হার্মিসনের সামনে ৫ ফুটের মুশফিকুর রহিম মনে করিয়ে দিচ্ছেন ডেভিড বনাম গোলিয়াথের গল্পটাও। রূপকথার গল্পে ছোট্ট ডেভিডের ছোড়া গুলতিতেই কুপোকাত হয়ে গিয়েছিল গোলিয়াথ নামের দৈত্য। লর্ডসেও এর পুনরাবৃত্তি হলে ‘মুশফিকুরের রূপকথা’টা সম্পূর্ণ হয়।

মুশফিকুর রহিম এসব শুনলে শুধু লাজুক হাসি দিচ্ছেন। শান্তশিষ্ট, সুবোধ বালক বলতে যে চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মুশফিকুর রহিম ঠিক সে রকম। শাহাদাত হোসেন উল্টো। বাংলাদেশ দলে টিমমেটরা যাকে ‘পাগলা’ বলে ডাকে, সেই মাশরাফি বিন মুর্তজা পর্যন্ত শাহাদাতের কথা উঠলেই বলছেন, ‘ও একটা পাগল। কখন কী করে, ঠিক নেই।’ কী করে? মাশরাফি বিস্তারিত জানাতে রাজি নন,পাগলামির দৃষ্টান্ত হিসেবে সম্ভবত সবচেয়ে ভদ্র উদাহরণটাই দিলেন। হঠাৎ করেই শাহাদাত নাকি নাচতে শুরু করে দেন। এই সফরের আগে নেটেই প্রথম শাহাদাতের বোলিং দেখেছেন, এরপর এই সফরেও দেখলেন। দেখার পর বাংলাদেশের সেরা পেসারের সার্টিফিকেট, ‘ও খুব ভালো বোলার’।

অভিষেকের আগে এমনই নির্ভার দেখাচ্ছিল শাহাদাতকে, ছবিটি তোলা হয়েছিল লর্ডসে বাংলাদেশ দলের নেট সেশনে। ছবি: গেটি ইমেজেস

শাহাদাত নিজেও মাশরাফির খুব ভক্ত, তবে একটা জায়গায় এরই মধ্যে হারিয়ে দিয়েছেন মাশরাফিকে। গতি নিয়ে দুজনের মধ্যে অলিখিত একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। ‘আছে’ না বলে ‘ছিল’ বলাই ভালো, কারণ মাশরাফি নিজেই পরাজয় মেনে নিয়ে বলছেন, ‘রাজীব (শাহাদাতের ডাকনাম) আমার চেয়ে জোরে বল করে।’ শাহাদাত অবশ্য একটা টীকা যোগ করে দিচ্ছেন, ‘ইনজুরিতে না পড়লে কৌশিক ভাই (মাশরাফির ডাকনাম) আরও জোরে বল করতে পারতেন।’

এমনিতে শাহাদাতের প্রিয় বোলার স্টিভ হার্মিসন। হার্মিসনের সঙ্গে মিলও আছে। ইংল্যান্ডের বাইরে গেলেই হার্মিসন যেমন হোম সিকনেসে আক্রান্ত হন, শাহাদাতও তা-ই। ‘শুধু খেলার সময়টাই ভালো লাগে। বাকি সময়টায় আমার ফ্যামিলি আর বন্ধু-বান্ধবদের খুব মিস করি। বাংলাদেশের বাইরে কোথাও আমার ভালো লাগে না’— হার্মিসনের কথাই যে তাঁর মুখে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, শাহাদাত কি তা জানেন?

হ্যাঁ, জানেন।

‘হ্যাঁ, এখানে এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার পর উনিই আমাকে বলেছেন, তুমি তো দেখছি একেবারে আমাদের হার্মির মতো’—বলে শাহাদাত হাসলেন। হার্মিসনের সঙ্গে মিলটা যেন এখানেই শেষ না হয়ে যায়, ওই হাসিতে এমন কোনো প্রতিজ্ঞাও কি ছিল?

আরও পড়ুন...
ভুল মুশফিক, ঠিক মুশফিক!
বিজ্ঞাপন বলতে ওই মুশফিকুর রহিমই

বগুড়ার টেস্ট অভিষেকে তো থাকাই উচিত মুশফিকুরের

এবার মুশফিকের আসল টেস্ট অভিষেক

প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি: ইতিহাসের মুশফিক ইতিহাসে

ডাবল সেঞ্চুরির চেয়েও মুশফিক বেশি তৃপ্তি পেয়েছিলেন যাতে