ডানের ছবিটার ক্যাপশন না দিলেও চলত। মুশফিকুর রহিমকে চেনাতে কি আর ক্যাপশন লাগে! কিন্তু বাঁয়ের ছবিটি? ক্যাপশন তো বলছে, এটাও মুশফিকুর।

হ্যাঁ, দুটিই মুশফিকুর, সংক্ষেপে মুশফিক। একটি ‘ভুল’ মুশফিক, একটি ‘ঠিক’ মুশফিক!

রহস্য মনে হচ্ছে? তা রহস্য একটু আছে বলেই তো পাশাপাশি এই দুই ছবি। রহস্য মোচনের আগে মাহবুব হামিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। ভদ্রলোক মুশফিকুর রহিমের বাবা। যাঁকে ‘তারা’ ডাকনামেই সবাই চেনেন। কারও ‘তারা ভাই’, কারও ‘তারা আংকেল’। এমন ঘটা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বোধ হয় দরকারই ছিল না। টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখে থাকলে তারা ভাইকেও দেখার কথা। মিরপুরে বাংলাদেশের যেকোনো ম্যাচেই যে গ্যালারিতে তাঁর অবধারিত উপস্থিতি। মুশফিক ব্যাটিং করার সময় ক্যামেরাও তাঁকে খুঁজে বের করবেই। বাংলাদেশ দল ট্যুরে যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে মুশফিকের কপালে চুমু খেয়ে তাঁর বিদায় জানানোর ছবিও পত্রপত্রিকার কল্যাণে বিখ্যাত হয়ে গেছে।

সেই তারা ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ফোনে। স্পষ্ট মনে আছে, মাছ বাজারের শোরগোলের মধ্যে ফোনটা এসেছিল। কলটা ঠিক লোকের কাছেই এসেছে নিশ্চিত হওয়ার পর পরিচয় দিলেন, ‘আমি মুশফিকুর রহিমের বাবা বলছি।’

পরিচয় পেয়েই মনে পড়ে গেল, আগের দিন জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে সেঞ্চুরি করেছেন মুশফিকুর রহিম। আমি তাই বললাম, ‘অভিনন্দন। আপনার ছেলে তো কাল সেঞ্চুরি করেছে।’

তারা ভাই বললেন, ‘এ জন্যই আপনাকে ফোন করেছি। আমার একটা স্বপ্ন ছিল, একদিন প্রথম আলোতে ওর ছবি ছাপা হবে।’

ও আচ্ছা, ছবি ছাপা হয়েছে বলে কৃতজ্ঞতা! আমি হালকা সুরে বললাম, ‘আপনার স্বপ্ন তো পূরণ হয়ে গেল। ছেলের ছবি তো ছাপা হয়েছে আজ।’

তারা ভাই বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘ভাই, এটা অন্য কারও ছবি। পেপারে প্রথম ওর ছবি ছাপা হলো আর সেটিই ওর নাম দিয়ে অন্য একজনের। খুব কষ্ট পেয়েছি।’

শুনে তো আমার মাথা খারাপ অবস্থা। এ কি কেলেঙ্কারি! উদীয়মান প্রতিভা হিসেবে তখন মুশফিকুর রহিমের নাম একটু-আধটু শোনা যাচ্ছে। চেহারায় খুব বেশি মানুষ তখনো তাঁকে চেনে না। ঘরোয়া ক্রিকেটেও খুব বড় কোনো কীর্তি নেই। যে কারণে প্রথম আলোর ছবির বিশাল ভান্ডার খুঁজেও তাঁর পোর্ট্রেট খুঁজে পাওয়া যায়নি। যত দূর মনে পড়ে, মুশফিক তখন প্রিমিয়ার লিগে সে সময়কার প্রতাপশালী দল ওল্ড ডিওএইচএসে খেলেন। ওই দলের একটা গ্রুপ ছবি ছিল। সেখান থেকে মুশফিককে খুব ভালো চেনেন দাবি করে তা কেটে বের করে দিয়েছেন আলোকচিত্র সাংবাদিক। এখন তো দেখা যাচ্ছে, ওটা মুশফিক নয়, তাঁর কোনো ওল্ড ডিওএইচএস সতীর্থের। ওপরে বাঁ দিকের ছবিটিই ২০০৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া সেই ‘ভুল’ মুশফিকের ছবি।

মাস তিনেক পর লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে নেমেছি। সেদিনের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার খেলার পাতা খুলতেই দেখি, মুশফিকুর রহিমের বিশাল এক ছবি। নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছেন। সাসেক্সের বিপক্ষে আগের ম্যাচে খেলেছেন ৬৩ রানের এক ইনিংস। বয়স তখনো সতেরোও হয়নি, দেখতে লাগে আরও কম। তাঁর ব্যাটিং ইংল্যান্ডে এমনই আলোড়ন তুলেছে যে, ছবির ক্যাপশনে লেখা: লিটল ওয়ান্ডার!

ইংল্যান্ড থেকে পাঠানো প্রথম লেখাটা শুরুও করেছিলাম এ দিয়ে: মুশফিকুর রহিমের বাবা নিশ্চিত থাকতে পারেন, আর কোনো দিন পত্রিকায় মুশফিকুরের ভুল ছবি ছাপা হবে না। তাঁকে এখন সবাই চেনে।

ইংল্যান্ডের ওই সফরে ‘পর্যটক’ হয়েই থাকার কথা ছিল। টেস্ট সিরিজের পর ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ, প্রায় দুই মাসের সফর, মুশফিকের টেস্ট স্কোয়াডে রাখা হয়েছিল খালেদ মাসুদের বিকল্প উইকেটকিপার হিসেবে। পরপর দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে অমন ব্যাটিংয়ের পর দেখা গেল, লর্ডসে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের একাদশে প্রথম নামটিই লিখতে হয় মুশফিকুর রহিমের।

মাত্র ১৬ বছর ২৬৭ দিন বয়সেই তাই মুশফিকের টেস্ট অভিষেক। লর্ডসে এত কম বয়সে কেউ কখনো টেস্ট খেলেনি। বাংলাদেশের ১০৮ রানের প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ১৯। টেস্ট ক্লাসটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ওতেই। ১৭৭ মিনিট স্থায়ী বাংলাদেশের ইনিংসের প্রায় অর্ধেকটা সময়ই (৮৫ মিনিট) ক্রিজে, আদর্শ ইংলিশ কন্ডিশনে সাপের মতো সুইং করতে থাকা বলে হাবুডুবু খাওয়া বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ লেগেছিল তাঁকেই।

দ্বিতীয় টেস্টেও না খেলার কোনো কারণ ছিল না। খেলতে পারেননি হেরিটেজ টাইপ টিম হোটেলের আদ্যিকালের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পা মচকে ফেলায়। দশ মাস পর বগুড়ায় দ্বিতীয় টেস্ট। ক্রিকেট ইতিহাসে আর কোনো উইকেটকিপার প্রথম দুটি টেস্ট স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেননি। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডটি এক অর্থে তাই কোনো বিস্ময় নয়।

মুশফিককে নিয়ে আসল যে বিস্ময়, সেটি শুরুতেও ছিল, এখনো আছে। ইংল্যান্ডের ওই সফরে তাঁর বয়স নিয়ে যত আলোচনা হয়েছিল, শারীরিক আকৃতি নিয়েও ততটাই। ইংলিশ সংবাদমাধ্যম সেই বিস্ময় মনে না রেখে মুশফিকের কাছে প্রকাশও করেছিল। মুশফিকের জবাবটা ছিল ক্লাসিক, ‘ক্রিকেট তো বয়স বা উচ্চতার খেলা নয়।’

মাথায় ডাবল সেঞ্চুরির দ্বিমুকুটই তো এর বড় প্রমাণ।

(এই লেখাটা মুশফিকুর রহিম টেস্টে দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি করার পর। এরপর তিনি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন আরও একটি)।

আরও পড়ুন...
দুই তরুণের 'স্বপ্নের অভিষেক'
বিজ্ঞাপন বলতে ওই মুশফিকুর রহিমই