ভূমিকম্পের মতো বিস্ময়মাপক কোনো রিখটার স্কেল থাকলে তাতে ৯-১০ উঠে যাওয়ার মতো ব্যাপারটা! পরদিন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট শুরু, অথচ বাংলাদেশের কোচ-অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনে তিনি অনুপস্থিত! তাঁকে নিয়ে কোনো প্রশ্নই হলো না!

‘তিনি’ মানে মুত্তিয়া মুরালিধরন। তাঁর ঘূর্ণিজাদুতে ৫ টেস্টে ৪৩ উইকেট বিসর্জন দেওয়ার পরও চট্টগ্রামে প্রথম টেস্ট বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মনে এমনই একটা আত্মবিশ্বাস-জাগানিয়া অনুভূতি এনে দিয়েছে যে, মুরালি-ভীতি অনেকটাই উধাও। টেস্ট সিরিজের আগে দলের ব্যাটসম্যানদের ডেভ হোয়াটমোরের দেওয়া মুরালি-তত্ত্বটা ছিল এ রকম: মুরালিকে উইকেট দেব না—এটা ভেবে লাভ নেই। ও এত বেশি বল করবে যে, উইকেট পাবেই। তোমাদের কাজ হোক একটাই, উইকেট পেতে ওকে যেন অনেক ওভার বোলিং করতে হয়।

প্রথম ইনিংসে ৩২ ওভার বোলিং করে ৩ উইকেট—মুরালি বনাম বাংলাদেশ লড়াইয়ে বাংলাদেশই জয়ী।

দ্বিতীয় ইনিংসে ১৯.৫ ওভারে ৬ উইকেট—এখানে জয়ীর নাম মুত্তিয়া মুরালিধরনই। তারপরও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের যদি মনে হয়, মুরালিকে খেলা এমন অসাধ্য কিছু নয়, ভালোই তো!

প্রথম টেস্টের চেয়ে ব্যতিক্রম হয়ে বগুড়ার টেস্ট অভিষেকের আগের দিন শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের আকাশে-বাতাসে অনুরণিত নামটি তাই মুরালিধরন নয়। তবে কাকতালীয়ভাবে আদ্যক্ষরটা একই থাকছে! দ্বিতীয় টেস্টের আগে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামটির আদ্যক্ষরও সেই ‘মু’। চট্টগ্রামে মুরালিধরন, এখানে মুশফিকুর রহিম।

চট্টগ্রাম টেস্টের দল থেকে অলক কাপালিকে বাদ দিয়ে তার জায়গায় মুশফিকুর রহিমের অন্তর্ভুক্তির একটা সুন্দর নাম হয়—লর্ডস থেকে বগুড়া। গত বছর লর্ডসে তার টেস্ট অভিষেক যতটা বিস্ময়ের ছিল, বগুড়ায় একাদশে প্রত্যাবর্তন অবশ্যই তা নয়। ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলেন দ্বিতীয় উইকেটকিপার হিসেবে, দু-একটা সাইড ম্যাচে খালেদ মাসুদকে বিশ্রাম দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো ভূমিকা থাকবে বলে কেউই ভাবেননি। অথচ টেস্ট সিরিজের ঠিক আগে ইংল্যান্ডে পৌঁছে দেখি, ইংলিশ মিডিয়ার কাছে মুশফিকুর রহিমই বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় তারকা! আগের দিনই নর্দাম্পটনশায়ারের সঙ্গে তিন দিনের ম্যাচে দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছেন।

একুশ-বাইশ বছরের কারও জন্যও ‘ইয়াংস্টার’টা যেখানে বড় এক স্বীকৃতি, সেই ইংল্যান্ড ষোলো বছরের পুঁচকে ছেলের বীরত্ব দেখে এমনই অভিভূত যে, টেন্ডুলকার-লারার সঙ্গে তুলনা করার মতো আদিখ্যেতাতেও আক্রান্ত দেখা গেল নামী সব ক্রিকেট লেখকদের!

লর্ডসের দুই ইনিংসে ১৯ ও ৩। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় উইকেটে থাকাটা অবশ্য ওই ১৯ রানকে এর চেয়েও বড় মনে করিয়েছিল। এর জোরেই ডারহামে দ্বিতীয় টেস্টেও খেলতেন, টেস্ট শুরুর আগের দিন হোটেলের সিঁড়িতে পা মচকে না ফেললে মুশফিকুর রহিমের স্ফুটমান টেস্ট ক্যারিয়ারের শিরোনাম আর ‘লর্ডস থেকে বগুড়া’ হয় না।

ছোট্ট এই জেলা শহরের ক্রিকেটীয় পরিচয় তো এই একটিই—মুশফিকুর রহিমের শহর। দইয়ের কারণে বিখ্যাত হতে পারে, অধুনা ‘বাংলা ভাইয়ের শহর’ বলে কুখ্যাতও হতে পারে, তবে ক্রিকেটীয় বিবেচনায় বগুড়ার সুনাম-দুর্নাম কোনোটাই যে ছিল না। শহরের মাটিডালির ছোট্ট ছেলেটির ওপরই যেন দায়িত্ব পড়েছে এই শহরের ক্রিকেট ঐতিহ্য নির্মাণের।

প্রতীকী রূপটাও চোখে পড়তে বাধ্য। বগুড়ার টেস্ট অভিষেক যে মুশফিকুর রহিমকে ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না! ছোট্ট এই জেলা শহরের ক্রিকেটীয় পরিচয় তো এই একটিই—মুশফিকুর রহিমের শহর। সিলেট-রাজশাহীর মতো ক্রিকেটের উর্বরতর ভূমিকে পেছনে ফেলে বগুড়া যে ঢাকা-চট্টগ্রামের পর বাংলাদেশের তৃতীয় টেস্ট নগরী হয়ে গেল, তাতে রাজনৈতিক বিবেচনারই সবচেয়ে বড় ভূমিকা বলে অনেকের বিশ্বাস। সেটিকে শুধুই নিন্দুকদের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়াটাও কঠিন। দইয়ের কারণে বিখ্যাত হতে পারে, অধুনা ‘বাংলা ভাইয়ের শহর’ বলে কুখ্যাতও হতে পারে, তবে ক্রিকেটীয় বিবেচনায় বগুড়ার সুনাম-দুর্নাম কোনোটাই যে ছিল না। শহরের মাটিডালির ছোট্ট ছেলেটির ওপরই যেন দায়িত্ব পড়েছে এই শহরের ক্রিকেট ঐতিহ্য নির্মাণের।

বাংলাদেশ দলের ম্যানেজমেন্ট থেকে অবশ্য বারবারই অস্বীকার করা হলো যে, ‘লোকাল হিরো’কে খেলাতে হবে—মুশফিকুরের দলভুক্তি এমন কোনো ভাবালুতা থেকে নয়। চট্টগ্রামে প্রথম ইনিংসে ২৬ রানে শেষ ৪ উইকেট পড়ে যাওয়াতেই ৬ নম্বরে ধরে খেলার মতো একজন ব্যাটসম্যানের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে এবং ম্যাচ-পূর্ব বিবেচনায় অলকের চেয়ে মুশফিকুরকেই মনে হয়েছে বেশি নির্ভরযোগ্য। ‘মুশফিকুর ইন, অলক আউট’-এর এটাই ব্যাখ্যা।

বগুড়া অবশ্য দুটি ওয়ানডে দিয়েই ঢুকে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। সেই ইতিহাসের কারণেই কাল সকালে শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে প্র্যাকটিসের সময় দু দলের যে অনুভূতিটা হলো, খুব কম মাঠেই হয়েছে এমন। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা যেদিকে তাকাচ্ছেন, খুঁজে পাচ্ছেন জয়ের সুখস্মৃতি। আর শ্রীলঙ্কানদের মনে ফিরে ফিরে আসছে ২২ ফেব্রুয়ারির দুঃস্বপ্ন। এই মাঠে সর্বশেষ ম্যাচটিতেই যে রচিত হয়েছিল শ্রীলঙ্কা-বধ কাব্য।

এই টেস্টের পরও অনুভূতিটা একই রকম থাকবে—এটা হয়তো একটু বেশি আশাই হয়ে যায়। তবে এটা তো সত্যি যে, আর কোনো টেস্টে এমন সুখস্মৃতি নিয়ে খেলতে নামেনি বাংলাদেশ।