খবরটা পাওয়ার পর হালিম শাহ কী করেছেন, কে জানে! অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দল থেকে যে কোনো কারণেই হোক, সিনিয়র দলে উত্তরণ ঘটাতে না পারা এই ব্যাটসম্যানের কথা বারবার মনে পড়ছে কদিন ধরে। মনে পড়ছে মাস কয়েক আগের সেই বিকেল, যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে নিজের প্র্যাকটিসের ফাঁকে হঠাৎ করেই আজহারউদ্দিন প্রসঙ্গে গলায় তীব্র ঝাঁজ মিশিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এর কিছুই সত্যি নয়। আজহার এমন করতে পারে না।’ দু-তিনদিন আগে কিং কমিশনের সামনে হানসি ক্রনিয়ে বাজিকর মুকেশ গুপ্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ‘কৃতিত্ব’ দিয়েছেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনকে। তারপরও হালিম শাহ তাঁর ‘হিরো’র ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে নারাজ। বরং তাঁর তীব্র প্রতিক্রিয়ার পরস দু-একটা তির্যক মন্তব্য করলেন যাঁরা, তাঁদের দিকে এমনভাবে তাকালেন যে, স্পষ্ট বোঝা গেল, এই একটি জায়গাতে তিনি বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নন। এও বোঝা গেল, তাঁর ‘হিরো’র গায়ে কলঙ্ক ছিটানোর চেষ্টা করলে শারীরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়াবাড়ি কিছু নয়।

যুক্তি-তর্কের নাগাল না পাওয়া এ এক অন্ধ ভালোবাসা, (‘হিরো ওরশিপ’-এর বাংলাটা কি ‘বীরপূজা’ হয়? এ আসলেই বীরপূজা) জানতে ইচ্ছে করছে, আজহার বলতে হালিম শাহ’র চোখে এখনো কি অফ স্টাম্পের বাইরের বল কবজির পেলব মোচড়ে মিড উইকেট বাউন্ডারিতে পাঠানো ব্যাটসম্যানটির ছবি ভাসে, নাকি তার বদলে পথচ্যুত অর্থলোভী এক মানুষের মুখ?

সিবিআই থেকে বেরোচ্ছেন আজহার, সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছেন একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েই, 'কেন আজহার, কেন?' ছবি: এএফপি

**** 

এই প্রথম এমন হলো। পত্রিকার পাতায় আজহার বিষয়ক যেকোনো লেখা, ছাপা হওয়া তাঁর ছবি কেটে সংগ্রহ করে রাখারটা এক ধরনের অবসেশনেই পরিণত হয়েছিল ১৫ বছরের সুদীপ্তর। তার ঘরের চার দেয়ালে শুধুই আজহার—আজহার হাসছেন, আজহার প্যাড পরছেন, আজহার ফ্লিক করছেন, আজহার ক্যাচ নিচ্ছেন…। বাবা-মার চোখে ঘরভর্তি এসব ‘জঞ্জাল’ আগলে রাখতে কম লড়াই করতে হয়নি তাকে। দলে ফিরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বেঙ্গালুরু টেস্টে যখন সেঞ্চুরি করলেন আজহার, সুদীপ্তর আনন্দ দেখে মনে হয়েছিল সেঞ্চুরিটা সে-ই করেছে। আজহার সম্পর্কে কোন পত্রিকা কী লেখে, এটি জানতে বাবার মাথা খেয়ে পরদিন চার-পাঁচটি পেপার কিনতে বাধ্য করেছিল ও। অথচ সেই সুদীপ্ত ৫ ডিসেম্বরের পত্রিকার প্রথম পাতায় আজহারের ছবিসহ খবরটা কেটে রাখার পরিবর্তে পত্রিকা হাতে নিয়েই হাউমাউ করে ভেঙে পড়ল কান্নায়। হায়দরাবাদের বানজারা হিলসের প্রাসাদোপম বাড়িতে বসে সেই কান্না কি শুনতে পেয়েছেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন?

*****
শুনতে পাওয়ার কথা নয়। কারণটা শুধু দূরত্ব নয়। আসল কারণ, এসব আবেগ-অনুভূতির মূল্য দেওয়ার মতো মানসিকতাকে অনেক আগেই গলা টিপে হত্যা করেছেন মোহাম্মদ আজিজউদ্দিন আজহারউদ্দিন। গায়ে মাটির গন্ধ লেগে থাকা সারল্য, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, দাদা ফৈজুদ্দিন তাঁকে কী আদর্শে মানুষ করেছেন কথায় কথায় মনে করিয়ে দেন তা—এক সময় এসবই সত্যি ছিল। কিন্তু এখন পরিষ্কার, বিত্ত-বৈভবের ঝলমলে জগৎ, মার্সিডিজ বেঞ্জের আরামদায়ক উষ্ণতা, আরমানি স্যুট আর দামি সুইস ঘড়ির হাতছানি অনেক দিন আগেই বদলে দিয়েছে সাইকেলে চড়ে প্র্যাকটিসে যাওয়া বা হায়দরাবাদের রঙ চটে যাওয়া চেয়ার-টেবিলে বসে ব্যাংকের হিসাব মেলানোর কাজে ব্যস্ত সেই আজহারকে।

উইকেটে তাঁর কবজির মোচড় অন্যরকমই মনে করাত সবাইকে, কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনও খুবই সাধারণ একজন মানুষ। এত সাধারণ যে, দিনের পর দিন দারিদ্র্যর সঙ্গে লড়েও যেখানে এই পৃথিবীর অনেক মানুষ কিছু ব্যাপারে আপোস করে না, শুধুই আরও পাওয়ার লোভে সেসব বিসর্জন দিতেও কোনো সমস্যা হয়নি তাঁর। ৩৭ বছর বয়সী আজহারের ক্রিকেট থেকে আর কিছু পাওয়ার ছিল না, তাই এক অর্থে আজীবন নিষিদ্ধ হওয়ায় তাঁর কিছু যায়-আসে না। কিন্তু এই যে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি হালিম শাহ-সুদীপ্তর চোখে প্রায় ঈশ্বরতুল্য উচ্চতা থেকে মাটিতে আছড়ে পড়লেন তিনি, এরচেয়ে বড় শাস্তি তো আর হয় না। এসব কী একবারও মনে হয়নি আজহারের?

হয়নি, কারণ লোভ মানুষের দুচোখ শুধু নয়, আন্তরের চোখও অন্ধ করে দেয়, নইলে ৯৯টি টেস্ট ও ৩৩৪টি ওয়ানডে খেলে, এর সঙ্গে অসংখ্যা পণ্যের এনডোর্সমেন্ট করে বৈধ পথেই যে টাকা জমা হয়েছে আজহারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, বাকি জীবন বসে খেলেও তো তাঁর কোনো অভাব হওয়ার কথা নয়। অথচ আরও চাই, আরও চাই করতে করতে একদার সহজ-সরল ধর্মভীরু আজহার কী অবলীলায় নেমে গেলেন পঙ্কিল পথে!

এ কেমন ছবি, এখানে কি মানায় আজহারকে! ছবি: রয়টার্স

১৯৮৪-৮৫-তে ডেভিড গাওয়ারের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পর পর তিন টেস্টে সেঞ্চুরি দিয়ে যখন তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু, তখনকার গল্প শুনেছি ভারতীয় সিনিয়র সাংবাদিকদের মুখে। আজহারের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন, দেখা গেল লুঙ্গি পরে নামাজ পড়ছেন তিনি, নামাজ শেষ করে একটি পান মুখে দিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। কথা আর কি, দু-তিন শব্দের একেকটি বাক্য, যার বেশির ভাগ আবার ‘আল্লাহ দিয়েছেন’ জাতীয়। অথচ ব্যাট হাতে কেমন পাল্টে যেতেন এই লোকটিই! ব্যাটিংকে যদি বিনোদন বলা হয়, তাহলে ফর্মে থাকা মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ব্যাটিং দেখার চেয়ে বড় বিনোদন ক্রিকেট উপহার দিতে পেরেছে কমই। তাঁর ব্যাটিং শুধু ব্যাটিং ছিল না, তা ছিল ব্যাট হাতে মাঠের সবুজ গালিচায় ছবি আঁকা। বলকে যেন আদর করতেন তিনি, কবজির মোচড়ে সেটাকে বাউন্ডারিতে পাঠানোর সময়ও যেন ফিসফিস করে তাঁর ব্যাট বলত—‘আবার এসো, কেমন!’

হায়! এখন থেকে আজহারকে নিয়ে আলোচনায় এ সব কিছুই হয়ে যাবে গৌণ। ব্যাটিং বা অসাধারণ ফিল্ডিংয়ের কোনো দৃশ্য নয়, তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের মনে জেগে উঠবে প্রতারিত হওয়ার ক্ষোভ, ‘অতিমানব’ ভেবে আসা একজনকে নিতান্তই ক্ষুদ্র এক মানুষে পরিণত হতে দেখার দুঃখবোধ।

ভারতীয়দের দুঃখটা অবশ্যই বেশি। সুনীল গাভাস্কার যাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় ক্রিকেটকে ঈশ্বরের দান’, কে জানত, সেই লোকটিই হয়ে যাবেন ভারতীয় ক্রিকেটে এক লজ্জার নাম! মনোজ প্রভাকর-অজয় শর্মা-অজয় জাদেজাও তা-ই। কিন্তু আজহারের পতনে যে আওয়াজটা হয়েছে, এই তিনজন মিলিতভাবেও করতে পারেননি তা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আরও সত্যি। গত কদিন কতজনের সঙ্গেই তো কথা হলো এ নিয়ে। আজহার ছাড়া আর কারও নাম উচ্চারিত হতেও শুনিনি। অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ এ দেশে ক্রিকেটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তার রেটিংয়ে আজহারই ছিলেন নাম্বার ওয়ান।

শচীন টেন্ডুলকার-ওয়াসিম আকরামের ভোট ভারত-পাকিস্তান বৈরিতায় ভাগ হয়ে যায়, কিন্তু আজহারের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় ঘুচে যেত সেই ব্যবধানও। ভারতের সমর্থকেরা তো তাঁকে পছন্দ করবেনই, পাকিস্তানের অনেক সমর্থকের বেলায়ও দেখেছি, এই একটি ক্ষেত্রে আজহারের ‘ভারতীয়’পরিচয় তাঁর ভক্ত হতে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আজহারের ব্যাটিং-ফিল্ডিংই যে কাউকে তাঁর ভক্ত বানিয়ে ফেলতে সক্ষম, তবে কোনো সন্দেহ নেই এ দেশে আজহারের তুমুল এই জনপ্রিয়তার পেছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিরও অবশ্যই বড় ভূমিকা ছিল। আমারই অনেক বন্ধুকে বলতে শুনেছি, ‘ভারতের একজন প্লেয়ারকেই ভালো লাগে, সে হলো আজহারউদ্দিন’। এতে অন্যায় কিছু নেই, তবে অস্বাভাবিকত্বটা হলো সেই বন্ধুরা যেহেতু পারতপক্ষে ক্রিকেটই দেখে না, কাজেই আজহারের ব্যাটিংয়ের চেয়ে অন্য কিছুই তাদের পছন্দকে প্রভাবিত করেছে বলে ভাবা স্বাভাবিক।

ভারতে পোড়ানো হয়েছিল তাঁর কুশপুত্তলিকাও। ছবি: এএফপি

খেলার সঙ্গে এ রকম বাড়তি কোনো মাত্রা যোগ হলে কখনো কখনো বেশ সমস্যা হয়। পেশাদারি দায়িত্ব পালন করতে বেশ কবারই পড়তে হয়েছে তেমন সমস্যায়। এই লেখক আজহারউদ্দিনের ব্যাটিংয়ের অগণ্য ভক্তদের একজন, তারপরও বিভিন্ন সময়ে শুনতে হয়েছে নানা অপমানকর অভিযোগ। আজহারের বিষয়ে এ দেশের মানুষের মাত্রাতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা গত দুই তিন বছরে তাঁর সম্পর্কে যেকোনো লেখার ক্ষেত্রেই দাবি করত বাড়তি সচেতনতা। তারপরও সব সময় ভক্তকুলকে সন্তুষ্ট করা যেত না। মনে আছে, ’৯৭ সালে ভারতের ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপের দল থেকে বাদ পড়ার পর আজহারের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার যৌক্তিক আশঙ্কা নিয়ে একটি লেখা ছাপা হওয়ার পর সুদূর কানাডা থেকে এক পাঠক মাঝে মধ্যেই গালাগালির রূপ নেওয়া তীব্র জ্বালাময়ী ভাষায় লেখা এক চিঠিতে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেছিলেন এই লেখকের।

কিছুদিন আগেই ক্রনিয়ের মুখে আজহারের নাম উচ্চারিত হওয়ার পর যখন প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হচ্ছে এ সংক্রান্ত খবর, এক পাঠক ফোন করে রীতিমতো ‘আজহারবিরোধী’ বানিয়ে ছাড়লেন ‘প্রথম আলো’র ক্রীড়া বিভাগকে। খবরগুলো এজেন্সি পাঠাচ্ছে, আমরা শুধু ছাপছি, তাছাড়া আমাদের লেখা না খেলার ওপর আজহারের  ভাগ্য নির্ভর করছে না, আমরা কি এটুকু না বোঝার মতো নিবোর্ধ—এসব ব্যাখ্যা যেন পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। শুধুই আবেগ আর ভালোবাসায় তৈরি সেই দেয়ালে আজ ফাটল ধরিয়ে দিলেন আজহারউদ্দিন নিজেই।

অবসর সময়ে আজহারের প্রিয় কাজ ছিল ‘কোটেশন’ পড়া। ‘ধৈর্য খুব তিক্ত গাছ কিন্তু ফলটি মধুর’, ‘নিজের কাছে নিজে পরিষ্কার থাকো, একদিন সবাই তোমাকে বুঝবে’—এমন অনেক কোটেশন কাগজে লিখে অনেককে পড়তেও দিয়েছেন তিনি। কী আশ্চার্য! ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’—এই কোটেশনটি কখনো চোখে পড়েনি তাঁর?

আরও পড়ুন:

ঢাকায় যে ম্যাচে শেষ আজহারউদ্দিনের ক্যারিয়ার

আজহারের সাক্ষাৎকার: 'কপালে লেখা ছিল, আমি ৯৯টা টেস্টই খেলব'