সাদা রঙের শার্টের ওপর ছাইরঙা স্যুট। কথা বলার সময় সেই কাঁধ ঝাঁকানো। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন আগের মতোই আছেন। কিন্তু সব কি আগের মতো আছে?

খেলোয়াড়ি জীবনে অনেকবার ইন্টারভিউ করেছি। কখনো ‘না’ করেননি। একবার তো ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে যখন তাঁর কথাবার্তা বন্ধ, তাঁদের দেখিয়ে দেখিয়ে কলম্বোতে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতিটা অন্যরকম। ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির পর এই প্রথম আজহারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। এমন অস্বস্তিকর সাক্ষাৎকারও আর নিয়েছি বলে মনে পড়ে না। আজহারের সঙ্গে কথা বললে ওই প্রসঙ্গ না তুলে উপায় নেই।

কিন্তু কীভাবে তুলি! দেখামাত্র চিনে ফেলেছেন। পেটে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, মধ্যপ্রদেশ এমন স্ফীত কেন? পাশে বসে থাকা বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খানকে জানিয়েছেন, সর্বশেষ দেখা হওয়ার সময় আমি কেমন শীর্ণকায় ছিলাম! চা-বিরতির সময় দর্শকেরা দেখতে পেয়ে একের পর এক অটোগ্রাফের আবদার করে যাচ্ছেন। এই প্রীতিময় পরিবেশে অপ্রিয় ওই প্রসঙ্গটা কীভাবে তুলি!

তারপরও তুলতেই হলো। তবে সাক্ষাৎকারটা যাতে কেঁচে না যায়, তা নিশ্চিত করতে বল নিয়ে সরাসরি বক্সে ঢোকার বদলে খেলতে হলো উইং দিয়ে। প্রীতিকর সব প্রসঙ্গ শেষ করে ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে প্রশ্ন। ‘অতীতের ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যেতে চাইলেও আজহারের উত্তর থেকে চাইলে কিছু অর্থ তো উদ্ধার করা যায়ই।

উৎপল শুভ্র: আপনার ওপরে নানার প্রভাবের কথা সব সময়ই বলে এসেছেন আপনি। জীবনে এত কিছু দেখার পর এখনো কি তাঁকেই আপনার জীবনে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে ভাবেন?

মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন: এখনো। আমার জীবনে যা হয়েছে, সবই তাঁর জন্য। আমি যা কিছু করেছি, যা পেয়েছি, সবই তাঁর কারণে।

শুভ্র: এত বছর পরও নানাই এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছেন শুনে একটু অবাকই হচ্ছি। যদি জানতে চাই, তাঁর কাছ থেকে আসলে কী শিখেছেন?

আজহার: আমার নানা আমাকে সব সময় বিনয়ী থাকতে বলতেন। বলতেন, জীবনে যত বড়ই হও না কেন, বিনয়ী থাকবে। আর বলতেন, পরিশ্রম করো। পরিশ্রম করে গেলে দেরিতে হলেও ফল তুমি পাবেই। আমার ক্রিকেটার হওয়ার পেছনেও তাঁরই সবচেয়ে বড় অবদান। মাঝেমধ্যে আমার খেলা দেখতেও আসতেন।

শুভ্র: জীবনও তো আপনাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। মূল শিক্ষাটা কী?

আজহার: জীবন আমাকে শিখিয়েছে-বিনয়ী থাকো, ধৈর্য ধরো। এই দুটি গুণ থাকলে সবকিছুই একসময় না একসময় হবে। জীবন আমাকে সীমাহীন ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে।

শুভ্র: আপনার জীবনে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ কী?

আজহার: আমি আমার নানা ও নানির শেষকৃত্যের সময় উপস্থিত থাকতে পারিনি। দুজনেরই খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। দুবারই আমি খেলার জন্য বাড়ির বাইরে ছিলাম। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।

শুভ্র: ক্রিকেটীয় আক্ষেপ?

আজহার: কোনো কিছুই না। ক্রিকেটের কথা বললে কোনো আক্ষেপ নেই। যা পেয়েছি, তাতে খুশি।

শুভ্র: কী বলছেন! ৯৯ টেস্টে শেষ হয়ে গেল আপনার ক্যারিয়ার। ১০০ নম্বর টেস্টটা খেলতে না পারাতেও কোনো দুঃখ নেই?

আজহার: না, কোনো দুঃখ নেই। কোনো অভিযোগ নেই। ভাগ্য অনেক সময় অনেক কিছু ঠিক করে দেয়। আমার কপালে লেখা ছিল, আমি ৯৯টা টেস্ট খেলব। এ কারণেই ১০০টা খেলা হয়নি।

হায়দরাবাদে খোলা গ্যালারিতে বসে চা খেতে খেতে খেলা দেখছেন হায়দরাবাদের মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন

শুভ্র: আপনার ব্যাটিংটা তো ছিল চোখের জন্য প্রশান্তি, দারুণ স্টাইলিশ। আপনার দেখা সেরা পাঁচ স্টাইলিশ ব্যাটসম্যানের নাম বলতে বললে কোন পাঁচজন আসবেন?

আজহার: প্রথমেই ডেভিড গাওয়ার...দারুণ স্টাইলিশ ছিলেন। মার্ক ওয়াহ। জি আর বিশ্বনাথ...খুব স্টাইলিশ। লক্ষ্মণ। লক্ষ্মণও দেখতে খুব ভালো ছিল। আর...আর কে...মনে করতে পারছি না।

শুভ্র: আপনার অলটাইম ফেবারিট ব্যাটসম্যান কে?

আজহার: আমার প্রিয় ব্যাটসম্যান গ্রেগ চ্যাপেল। আর আমার দেখা সেরা ব্যাটসম্যান সুনীল গাভাস্কার।

শুভ্র: কী কারণে?

আজহার: গাভাস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর রান করার ক্ষমতার কারণে। ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে যে ফাস্ট বোলিং খেলেছেন, সে কারণে।

শুভ্র: আর গ্রেগ চ্যাপেল?

আজহার: গ্রেগ চ্যাপেল আমার অলটাইম ফেবারিট ব্যাটসম্যান। হি ওয়াজ অল স্টাইল। ও হ্যাঁ, স্টাইলিশ ব্যাটসম্যানদের ওই তালিকায় গ্রেগ চ্যাপেলের নামটাও রাখুন।

শুভ্র: ক্রিকেটীয় কোন কীর্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গর্ব অনুভব করেন?

আজহার: যখন ভারত জিতেছে আর আমি রান করেছি। নিজে ভালো করার পর দল যখন জেতে, তখন সেটি বিশেষভাবে মনে থাকে।

শুভ্র: ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস?

আজহার: এমন দুই-তিনটা আছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮২ (১৯৯৩ সালে কলকাতায়) আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। ক্যাপ্টেনসি তো বটেই, দলে জায়গাও হারানোর মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছিল আমার। ওই ইনিংসটা তাই স্পেশাল। লর্ডসের সেঞ্চুরিটাও মনে পড়ছে (১৯৯০ সালে)। কলকাতা আমার প্রিয় মাঠ। ওখানে বেশ কটি সেঞ্চুরি করেছি। কলকাতায় করা ৩-৪টি হানড্রেডকেই আমি আমার সেরা হানড্রেডের মধ্যে রাখব।

 ১৯৯৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইডেনে অধিনায়কত্ব-বাঁচানো ১৮২ রানের সেই ইনিংসে সেঞ্চুরি করার পর। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: ১৮২ দিয়ে শুরু করে কলকাতায় আপনার বেশ কটি সেঞ্চুরি আমি দেখেছি। এর মধ্যে আলাদা মনে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৪ বলে সেঞ্চুরিটা। ক্লুজনারকে টানা ৫টি চার মেরেছিলেন...

আজহার: এই যে আপনি মনে রেখেছেন...দর্শক যদি উপভোগ করে থাকে, সেটাই আসল। আমি উপভোগ করেছি কি করিনি, তাতে কিছু আসে যায় না। দর্শক উপভোগ করল কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁরা টাকা দিয়ে খেলা দেখতে আসেন। যখন তাঁরা ফিরে যাবেন, তখন যেন খুশি মনে ফিরতে পারেন।

শুভ্র: আপনার কাছে ব্যাটসম্যানশিপের অর্থ তাহলে বিনোদন?

আজহার: অবশ্যই। বিনোদন এবং রান করা। ক্রিকেট মানেই তো বিনোদন। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং-তিনটাই। ব্যাটসম্যানের কাজ হলো রান করা, বোলারের কাজ উইকেট নেওয়া, ফিল্ডারের কাজ ভালো ফিল্ডিং। সিম্পল। ভেরি সিম্পল।

শুভ্র: ব্যাটিং বিনোদনের কথা বললে তো বীরেন্দর শেবাগের তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার...

আজহার: ভেরি গুড প্লেয়ার। আউটস্ট্যান্ডিং প্লেয়ার। গ্রেট ট্যালেন্ট।

শুভ্র: ক্রিকেট ইতিহাসে সব গ্রেটের সঙ্গে তুলনায় কোথায় রাখবেন শেবাগকে?

আজহার: ও খুব ভালো প্লেয়ার ছিল। দেখুন, ভিন্ন ভিন্ন যুগের খেলোয়াড়দের তুলনা করা খুব কঠিন। এখনকার কথা যদি বলেন, বোলিং অ্যাটাক আর সে রকম ভালো নেই। আমাদের সময়ে বোলিং অনেক কঠিন ছিল। সব দলেই দু-তিনজন বোলার ছিল, যাঁরা ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারত। আর এখন কেউ ১৪০-১৪২-১৪৫ কিলোমিটার গতিতে করলেই সবাই বলে, হি হিজ ভেরি কুইক। তখন অনেক বোলারই ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করত। আপনাদের বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচও তো ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতিতে বোলিং করত। কোর্টনি ওয়ালশ। ওকে খেলা খুব কঠিন ছিল। আমার খেলা সবচেয়ে কঠিন বোলার।

শুভ্র: এরপর এই প্রশ্নটাই করতাম...

আজহার: আমার খেলা কঠিন বোলার? হ্যাঁ, কোর্টনি ওয়ালশ...ওয়াসিম আকরামও।

ইন্টারভিউ শেষ। এবার একটা ছবি তোলাই যায়। পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন একই সাজে মাঠে আসা তিন দর্শক। আজহারের পাশে সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক আকরাম খান

শুভ্র: এই প্রসঙ্গটা যে আসবে, আপনি হয়তো জানতেন। ওই ম্যাচ ফিক্সিং বিতর্ক নিয়ে এত দিন পর কী বলবেন?

আজহার: ওটা অতীতের ব্যাপার। আমি বারো বছর লড়াই করেছি, করে মামলা জিতেছি। এটা তাই এখন অতীতের গর্ভে। যা গেছে, তা তো গেছেই। আমি চাইলেও তা ফিরিয়ে আনতে পারব না। আমি শুধু সামনের দিকেই তাকাতে পারি।

শুভ্র: কিন্তু অতীত তো চাইলেই মুছে ফেলা যায় না। সত্যিটাও শুধু আপনিই জানেন...

আজহার: আমি শুধু বলব, ওটা আমার কপালে ছিল। যা হয়েছে, তা নিয়তি।

শুভ্র: সরাসরি জিজ্ঞেস করি, আপনি দোষী ছিলেন, না নির্দোষ?

আজহার: এটা নিয়ে কথা বলে আর কী হবে? একসময় তো অনেক বলেছি। এরপর আমি মামলায় জিতেছি, সবাই তা জানে। কখনো এমন কিছু হয়, যা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সব সময় আপনি সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করতে পারবেন না।

আমি বাংলাদেশে খেলাটা সব সময়ই উপভোগ করেছি। বাংলাদেশকে নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় স্মৃতি হলো, আমি আমার জীবনের শেষ ওয়ানডে ম্যাচটা ওখানে খেলেছি। আমার জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটাও। এভাবেই আমি বাংলাদেশকে মনে রাখি।

শুভ্র: জীবনে একটা জিনিস বদলানোর সুযোগ থাকলে কী বদলাতে চাইতেন?

আজহার: আমার নানা যদি বেঁচে থাকতেন।

শুভ্র: মানে কী? উনি কি চিরদিন বেঁচে থাকবেন নাকি?

আজহার: না, চিরদিন বেঁচে থাকার কথা বলছি না। বলছি, আমার ওই সময়টাতে যদি উনি বেঁচে থাকতেন।

শুভ্র: কেন, গাইডেন্সের জন্য?

আজহার: ফর এভরিথিং।

শুভ্র: হায়দরাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য এমন উঠেপড়ে লেগেছেন কেন?

আজহার: কারণ খেলাটার জন্য কিছু করতে চাই। হায়দরাবাদ ক্রিকেটের জন্য কিছু করতে চাই। এত প্রতিভা, কিন্তু গত আট-নয় বছর আমরা কোনো খেলোয়াড় তৈরি করতে পারিনি। আমি খেলাটির জন্য ভালো কিছু করতে চাই।

শুভ্র: বাংলাদেশে আপনার অনেক ভক্ত ছিল। অনেকে ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির পর কেঁদেছেও। বাংলাদেশের কি স্মৃতি মনে আছে আপনার?

আজহার: মনে আছে, বাংলাদেশে প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৮৮ সালে। এশিয়া কাপে। একটা ম্যাচে বিশাল একটা ছক্কা মেরেছিলাম। ড্রেসিংরুমের কাছে গিয়ে পড়েছিল। টুর্নামেন্টটা খুব ভালো হয়নি আমার জন্য। ওই ইনিংসটাতেও মাত্র ৩২ করেছিলাম। আমি বাংলাদেশে খেলাটা সব সময়ই উপভোগ করেছি। বাংলাদেশকে নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় স্মৃতি হলো, আমি আমার জীবনের শেষ ওয়ানডে ম্যাচটা ওখানে খেলেছি। আমার জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটাও। এভাবেই আমি বাংলাদেশকে মনে রাখি।