পাকিস্তান: ৫০ ওভারে ২৯৫/৭। ভারত: ৪৭.৪ ওভারে ২৫১। ফল: পাকিস্তান ৪৪ রানে জয়ী

থিরু কুমারনের শেষ ওভার থেকে ১৮ রান তুলে নিয়ে পাকিস্তান যখন ২৯৫ রানে পৌঁছে গেল, নিশ্চিতভাবেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে সৌরভ গাঙ্গুলীর কপালে। তারপরও ড্রেসিংরুমে দলকে কী বলেছেন ভারত অধিনায়ক, তা অনুমান করা যায় সহজেই।

‘এই মাঠেই ওদের সঙ্গে শেষ খেলায় আমরা ৩১৪ রান তাড়া করে জিতেছি। তাহলে ২৯৬ করতে পারব না কেন’—সৌরভের এই উজ্জীবনী বাণীর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হতো তাঁর ব্যাটের ভাষা। কিন্তু ’৯৮-এর জানুয়ারিতে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ ফাইনালে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করে ভারতকে জেতানো সৌরভ গাঙ্গুলী (৮) পঞ্চম ওভারেই হয়ে গেলেন দর্শক। ভারতেরও সপ্তম এশিয়া কাপের দর্শক বনে যাওয়ার পথে যাত্রা শুরু তখনই।

ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ ফাইনালের স্মৃতিই শুধু নয়, ঢাকার মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে আধিপত্যের ইতিহাসও ভারতের জন্য অনুপ্রেরণা হওয়ার কথা ছিল। উজ্জীবিত পাকিস্তানের সামনে উড়ে গেছে সেসব ইতিহাস। ৪৪ রানের জয় দিয়ে শ্রীলঙ্কার পর পাকিস্তানও পৌঁছে গেছে ফাইনালে। সেটি লিগ পর্বের এক ম্যাচ বাকি থাকতেই। আগামীকাল পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি এখন ৭ মে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামার আগে শুধুই ফাইনালের ড্রেস রিহার্সেল। এর আগের ছয়টি এশিয়া কাপে চারবার চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দল দেশে ফেরার বিমানে চাপছে আজ সকালেই।

সাঈদ আনোয়ার ও ইমরান নাজিরের ওপেনিং জুটিতে ১২.২ ওভারে ৭৪ রানের ধাক্কা সামলিয়ে ভারতকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছিলেন অনিল কুম্বলে ও অজিত আগারকার। বিনা উইকেটে ৭৪ থেকে ৩ উইকেটে ৭৫—ভারতীয় দল তখন উল্লাস করতেই পারে, ২০তম ওভারে ১০৩ রানে ৪ উইকেট—ভারত আরও বেশি করে হাতে নিল ম্যাচের রাশটা। কিন্তু ইউসুফ ইয়োহানা বলতে গেলে একাই টেনে নিয়ে গেলেন ইনিংসটি। এমনভাবেই টানলেন যে, শেষ ১০ ওভারে পাকিস্তান তুলে ফেলল ৯২ রান। ৮৯ বলে হাফ সেঞ্চুরি করা ইয়োহানা দ্বিতীয় ফিফটি করতে খেললেন মাত্র ২৩ বল। সেঞ্চুরি পেতে ইনিংসের শেষ বলে ছক্কা মারতে হতো তাঁকে, মারলেন তা-ও।

ইউসুফের ব্যাটে চড়েই পাকিস্তান পৌঁছেছিল ২৯৫ রানের পাহাড়ে। ছবি: এএফপি

এমনিতেই ভারতের জয়ের স্বপ্ন ঘুরপাক খায় শচীন টেন্ডুলকার-সৌরভ গাঙ্গুলীর উদ্বোধনী জুটিকে ঘিরে। ২৯৬ টার্গেট দাঁড়িয়ে হওয়ার পর তো বলতে গেলে এই দুজনের ওপরই নির্ভর করছিল ম্যাচের ভাগ্য। কিন্তু তাঁদের উদ্বোধনী জুটি স্থায়ী হলো মাত্র ৪.২ ওভার, ২০ রান উঠতেই ওয়াসিম আকরামের বলে থার্ডম্যানে সৌরভ গাঙ্গুলীর ক্যাচ। এই ওয়াসিম আকরামকে নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তা ছিল ভারতের। কিন্তু এই পাকিস্তান দলের পেস বোলিং অ্যাটাক এমন সব প্রতিভায় ভরা যে, কখন কে নায়ক হয়ে যাবেন, বলা মুশকিল। কাল যেমন হয়ে গেলেন আবদুল রাজ্জাক।

একাদশ ওভারে আক্রমণে আসা রাজ্জাকের ৫ ওভারের স্পেলটিই বলতে গেলে শেষ করে দিয়েছে ভারতের এশিয়া কাপ স্বপ্ন। ৫-০-১৬-৩, এই হলো তাঁর প্রথম স্পেলের বোলিং বিশ্লেষণ এবং এই তিন ব্যাটসম্যানের নাম—রাহুল দ্রাবিড় (২৬), মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন (১) ও শচীন টেন্ডুলকার (২৫)। ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপের এই তিন স্তম্ভকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি মাত্র ৭ বলের মধ্যে। তাঁর দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলে দ্রাবিড়কে এলবিডব্লু করলেন। পরের ওভারের প্রথম বলে ৩৩৪তম ওয়ানডে খেলতে নামা আজহার আনাড়ির মতো ফ্লিক করতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন মিড উইকেটে, শেষ বলে মোক্ষম আঘাত—শচীন টেন্ডুলকারের বিপক্ষে এলবিডব্লুর আবেদনে আঙুল তুলে দিলেন অনেক দিন ঢাকায় ক্লাব ক্রিকেট খেলা শ্রীলঙ্কান আম্পায়ার অশোকা ডি সিলভা।

১৪ ওভার শেষে ভারত ৪ উইকেটে ৭৫—অশোকা ডি সিলভার তর্জনী শুধু শচীন টেন্ডুলকারের মৃত্যুদণ্ডই নয়, বলতে গেলে ঘোষণা করল ম্যাচটির সমাপ্তিও। অজয় জাদেজা ও রবিন সিং গত বিশ্বকাপে ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সুপার সিক্স ম্যাচের স্মৃতি জাগিয়ে জুটি বেঁধেছিলেন এরপর। ৪৯ রানের বেশি কিছু দিতে পারেনি সেই জুটি। বাকি সময়টা হয়েছে শুধু নিয়ম রক্ষারই খেলা। অজয় জাদেজা লড়ে গেছেন এরপরও। দু-তিনবার ক্যাচ হতে হতে শেষ পর্যন্ত শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়েছেন ৯৩ রান করে। ম্যাচটি অবশ্য এর অনেক আগেই রূপ নিয়েছে হাসি-তামাশায়। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে নিয়মিত বোলারদের ওভার বাকি থাকতে ইমরান নাজির বল করেছেন—এই দৃশ্য দেখা গেলে তো এমনি বলতে হয়!

তরুণ নাজির অবশ্য এভাবে বললে ‘মাইন্ড’ করতে পারেন। ‘ভারতীয় ইনিংসের সর্বোচ্চ স্কোরারের উইকেটটি কি আমি পাইনি’—তিনি এই প্রশ্ন করলে জবাবে মাথা ঝোঁকাতেই হচ্ছে। অজয় জাদেজাকে স্টাম্পিংয়ের শিকার করে ইমরান নাজিরের শৌখিন লেগ স্পিনই তো সমাপ্তি টেনেছে ম্যাচের!

আরও পড়ুন:

আজহারের শেষ ম্যাচের নায়ক ইউসুফ ইয়োহানার একান্ত সাক্ষাৎকার