সত্তর ও আশির দশকের ক্রিকেটার বললে যাঁদের কথা চট করে মনে পড়ে যায়, বাস্তবিকই তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এ এস এম রকিবুল হাসান। সে সময় হাতেগোনা যে ক'জন ক্রিকেটার আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়েছেন, তার মধ্যে দীপ্তিমান হয়ে আছেন তিনি। তাঁর সময়ের অনেক বিখ্যাত ক্রিকেটার এখন অনেকটাই অনুজ্জ্বল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু স্বমহিমায় ঝিকমিক করে জ্বলছেন 'রাজা'। পারিবারিক আদরের এই নামটি আড়ালে পড়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রমরমা এই সময়েও তিনি তাঁর ক্রিকেটার সত্তা দিয়েই উদ্ভাসিত হয়ে আছেন। এমনটা সম্ভব হয়েছে তাঁর ক্রিকেটীয় মেধা, পাণ্ডিত্য ও সরস ব্যক্তিত্বের কারণে। সর্বোপরি খেলাটার প্রতি তাঁর তীব্র অনুরাগ, আবেগ ও আসক্তির জন্য। ক্রিকেট যেন তাঁর দেহ-মনের রক্তকণিকা। বেঁচে থাকার চালিকাশক্তি। এর সংস্পর্শে না থাকলে তিনি যেন অস্বস্তি বোধ করেন। নানান চড়াই-উতরাই পাড়ি দিলেও তিনি ক্রিকেটীয় পরিমণ্ডল থেকে দূরে সরে থাকেননি। পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য এক অংশে।

রকিবুল হাসান তখন।

কাঁচা বয়সেই রকিবুল ক্রিকেটের প্রেমে পড়েন। কৈশোরিক এই প্রণয়ের কারণে হয়তো জীবনে অনেক টানাপোড়েন এসেছে, তাতে বোধ করি তাঁর ক্রিকেট অনুরাগ আরও গভীর হয়েছে। কে যে কখন কীসের প্রেমে হাবুডুবু খাবে, সেটা তো আর বলা যায় না। তিনি অ্যাথলেট হতে পারতেন, বাস্কেটবল খেলোয়াড় হতে পারতেন, টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হতে পারতেন, বেসবল খেলোয়াড় হতে পারতেন। হতে পারতেন ফুটবলারও। এই খেলাগুলোর সঙ্গেও তো তাঁর টুকরো-টুকরো প্রেম ছিল। কিন্তু আগা-গোড়াই তাঁকে দিওয়ানা করে রাখে ক্রিকেট। কোনো এক মধুর বসন্তে ব্যাট-বলের সুরেলা কূজন তাঁর হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। সেই সম্মোহন এই জীবনে আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অবশ্য তখনকার পারিপার্শ্বিকতাও এর কারণ হতে পারে। সে সময় ক্রিকেট নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা তো আকৃষ্ট করতই, ঢাকার মাঠে টেস্ট ক্রিকেট আয়োজিত হওয়ায় তাঁর আকর্ষণ এড়ানোর সুযোগ ছিল না। পিতার হাত ধরে তিনিও তাতে শামিল হয়েছিলেন। বুক ভরে টেনে নিয়েছিলেন ক্রিকেটীয় সৌরভ। পাকিস্তান আমলেই পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটি অংশের কাছে ক্রিকেট হয়ে ওঠে রোমান্টিকতার অংশ। আর তাতে আত্মিকভাবে জড়িয়ে পড়েন রকিবুল। 

খেলার মাঠে নিজ দেশের তারকাদের নিয়ে উদ্বেলিত হতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। তখন তো বিশ্ব পরিসরে পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদদের তেমন গ্ল্যামার ও রোশনাই ছিল না। ক্রিকেটের জয়জয়কারের মাঝে অলিম্পিক গেমস হকিতে সাফল্য পেলে একে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বাসের ঢেউ বয়ে গেলেও একটা পর্যায়ে তা স্তিমিত হয়ে যায়। তেমন প্রেক্ষাপটে মূলত ক্রিকেটাররাই হয়ে ওঠেন তরুণদের মানসপুত্র। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নজর মোহাম্মদ, আবদুল হাফিজ কারদার, ফজল মাহমুদ, হানিফ মোহাম্মদ, খান মোহাম্মদ, ইমতিয়াজ আহমেদ, ওয়াজির মোহাম্মদ, মাহমুদ হুসেন, ওয়াকার হাসান, সাঈদ আহমেদ, জাভেদ বার্কি, নাসিম-উল-গনি, ইন্তেখাব আলম, আসিফ ইকবাল, মুশতাক মোহাম্মদরা দেশ-বিদেশে ধারাবাহিকভাবে চমকপ্রদ নৈপুণ্য দিয়ে জনজীবনে আন্দোলিত করতে সক্ষম হন। এই ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ছিল বিপুলভাবে সাড়া জাগানো। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর প্রথম সিরিজ থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে স্বাগতিক ভারত, ইংল্যান্ড, সফরকারী নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলকে হারিয়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে পাকিস্তান ক্রিকেট দল।

ঢাকা স্টেডিয়ামে কলিন কাউড্রের সাথে।

দেশের যে কোনো সাফল্যই মোটামুটিভাবে সবাইকে উৎফুল্ল করে। এ কারণে রাজনৈতিক কারণে তীব্র বৈরিতা সত্ত্বেও জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার জন্য প্রায় দেড় হাজার মাইলের ব্যবধানটাও মুখ্য হয়ে ওঠেনি। ক্রিকেট প্রেমেও ভাটা পড়েনি। স্বাভাবিক নিয়মেই অভিন্ন দেশের অধিবাসী হিসেবে পাকিস্তান দলের বিশ্বখ্যাত এই ক্রিকেটারদের মতো হতে চাইতেন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক নবীন ক্রিকেটার। তাঁদের একজন রকিবুল হাসান। তিনি তাঁর প্রিয় ক্রিকেটার 'লিটল মাস্টার' খ্যাত হানিফ মোহাম্মদের স্টাইলে ব্যাট করতেন। দুজনের উচ্চতাও অনেকটা কাছাকাছি। এ কারণে পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার রকিবুলকেও ডাকা হতো 'লিটল মাস্টার' নামে। অবশ্য এই খেতাব তো আর তাঁকে এমনি এমনি দেওয়া হয়নি। ষাট দশকের শেষ দিকেই প্রতিভাবান ক্রিকেটার হিসেবে তিনি তাঁর ঝিলিক দেখান। হয়ে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ক্রিকেটারদের অলিখিত 'মুখপাত্র'। 

সুযোগ-সুবিধা পেলে বাঙালিরাও যে ক্রিকেটে প্রজ্বলিত হতে পারেন, তাঁর ব্যাটে যেন তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। অপেক্ষায় ছিলেন প্রথম বাঙালি হিসেবে টেস্ট ম্যাচ খেলার। কিন্তু পাকিস্তানের হয়ে তাঁর আর খেলা হয়নি। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কবেই তো লিখেছেন, 'বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়'। পাকিস্তানের ক্রিকেটের প্রতি বাঙালিদের যে মোহ গড়ে উঠেছিল, রাজনৈতিক কারণে তা দূরে ঠেলে দিতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ক্রিকেট তো বটেই, পাকিস্তানকে পাকাপাকিভাবে 'খুদা হাফিজ' জানিয়ে দিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। মূলত তার সূত্রপাত ঘটে ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে। 

পুরানো ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল শুধু দেশের সেরা বিদ্যাপীঠই নয়, উদীয়মান খেলোয়াড়দের পরিচর্যার জন্য তার আলাদা একটা পরিচিত ছিল। এই স্কুলের ছাত্র হওয়ার পর খেলাধুলায় আকৃষ্ট হন রকিবুল। স্কুলের আবহ তাঁকে অলরাউন্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রাখে। স্কুলে প্রচলিত সব রকম খেলাই তিনি খেলতেন। তবে ক্রিকেটেই গড়ে ওঠে তাঁর সুদৃঢ় ভিত্তি। সেই বয়সে ক্রিকেট তাঁর বুকের মধ্যে বুনে দেয় যে ভালোবাসার বীজ, তা দিনে দিনে হয়ে ওঠে মহীরূহ। শক্ত গাঁথুনির উপর যেভাবে গড়ে তোলা হয় বহুতল ভবন, তেমনিভাবে বনেদি এই শিক্ষা নিকেতনে অধ্যয়ন ও অনুশাসনের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায় তাঁর ভবিষ্যৎ। মাথা উঁচু করে থাকার যে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন, জীবন চলার পথে ঘটছে তারই প্রতিফলন। ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনেও তা সহায়ক হয়ে ওঠে।

১৯৭০ সালের পূর্ব পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলে রকিবুল (সামনের সারির বাঁ থেকে তৃতীয়)

স্কুলের ছাত্র অবস্থায় আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে ১৯৬৭ সালে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে রকিবুলের অভিষেক হয়। তখন বয়স ১৫। অবশ্য তার আগে এই ক্লাবের হয়েই বছর দুয়েক ব্যাট-বলে মকশো করেন। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি নজর কাড়তে সক্ষম হন। সেই বয়সেই অপরিসীম ধৈর্য আর নিষ্ঠা নিয়ে উইকেটে আঁকড়ে থাকার মানসিক শক্তি অর্জন করেন, সঙ্গে চাতুর্যময় কৌশলী উইকেটকিপিং। যে কারণে পরের বছর আইয়ুব ট্রফিতে ইস্ট পাকিস্তান হোয়াইট দল, কায়েদ-এ-আজম ট্রফি এবং ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে ইস্ট পাকিস্তান দলে খেলেন। ১৯৬৯ সালে সফরকারী ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলে দ্বাদশ ব্যক্তি ছিলেন। মূলত যুব এই টুর্নামেন্টগুলো ছিল পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটার গড়ে তোলার প্রধান পাইপলাইন। ইমরান খান, ওয়াসিম রাজারা এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে উঠে আসেন। এছাড়া ১৯৬৯ সালে সফরকারী নিউজিল্যান্ড টেস্ট দলের বিপক্ষে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট একাদশ এবং একই দলের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে টুয়েলভথম্যান ছিলেন রকিবুল। ১৯৭০-৭১ মৌসুমে তিনি পূর্ব পাকিস্তান দলের অধিনায়কত্ব করেন। এ থেকে প্রতিভাবান একজন ক্রিকেটারের কুঁড়ি থেকে ফুলে পরিস্ফুটিত হওয়া সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায়। 

১৯৭১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল একাদশের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচে 'বিসিসিপি একাদশ'-এর হয়ে রকিবুল খেলেন। 'বিসিসিপি একাদশ' ছিল মূলত পাকিস্তান জাতীয় দল। আজমত রানা ও তিনি ছাড়া দলের সবাই ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটার। রানা অবশ্য পরবর্তীকালে টেস্ট ও ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন। সেই ম্যাচে তাঁর অন্তর্ভুক্তি বাঙালিদের দারুণভাবে গর্বিত করে। রাজনীতির সেই উত্তাল মুহূর্তে তিনি ব্যাটে ‘জয়বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে খেলতে নেমে অসম্ভব সাহসিকতার পরিচয় দেন। সেই সাহস উদ্দীপ্ত করে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের। ম্যাচের শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে ঢাকা স্টেডিয়ামের বিক্ষুব্ধ দর্শকরা খেলা ভণ্ডুল করে দিয়ে কাঁপিয়ে তোলেন রাজপথ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রকিবুল ভারতের কলকাতায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে প্রবাসী ক্রিকেটারদের নিয়ে দল গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হন। এমনকি কলকাতা ক্রিকেট লিগে মোহনবাগান ক্লাবের হয়ে খেলার অনুমতিও পেয়েছিলেন তিনি। তাঁকে নিয়ে কলকাতার পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে নিউজ প্রকাশিত হয়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় তাঁর আর খেলার সুযোগ হয়নি।

শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী, বাসিল ডি'অলিভিয়েরা ও রকিবুল হাসান।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন পথের অভিযাত্রী হয়ে ওঠেন রকিবুল হাসান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এবং জীবিকার তাগিদে যোগ দেন কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু ক্রিকেটকে অযত্ন করেননি। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্রিকেট অভিযাত্রায় তিনি সক্রিয়ভাবে অবদান রাখেন। অবশ্য বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটোত্তর বর্তমান যুগে তাঁর সময়কে নিক্তি দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। বোঝা যাবে না তাঁদের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর নিবেদনকে। তখনকার প্রেক্ষাপটে গভীর প্রেম না থাকলে ক্রিকেটকে তাঁর মতো করে কেউ আঁকড়ে ধরতেন না। ক্রিকেটের দুর্গম পথকে সুগম করার জন্য তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগের মতো ঢাকা লিগে আজাদ বয়েজ ক্লাবে খেলা অব্যাহত রাখেন রকিবুল। ততদিনে সমৃদ্ধ হয়েছে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তখন থেকে দেখতে পাওয়া যায় একজন পরিণত ব্যাটসম্যানকে। ১৯৭৪ সালে শহীদ স্মৃতি ক্রিকেটের ফাইনালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে অপরাজিত ১৪৩ রানের একটি ইনিংস খেলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে যোগ দেন ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে। ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে লিগের সেমিফাইনালে মোহামেডানের বিপক্ষে করেন ১৬৭ রান। এর পর থেকে অনেক বড় বড় ইনিংস উপহার দেন তিনি। সে সময় দীর্ঘ ইনিংস দেখতে দর্শকরা অভ্যস্ত ছিলেন না। কারণ, তখন এমন ব্যাটিং কালেভদ্রেই দেখা মিলত। ১৯৭৭ সাল থেকে তাঁর ঠিকানা হয় মোহামেডান। দীর্ঘ দিন সাদা-কালোদের হয়ে তিনি মাঠ মাতিয়েছেন। ভিক্টোরিয়ার পর তিনি মোহামেডানের অধিনায়কত্ব করেন। মোহামেডানের হয়ে স্মরণীয় ইনিংসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে উদিতির বিপক্ষে অপরাজিত ১২৮ এবং ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমে ধানমন্ডির বিপক্ষে অপরাজিত ১৫৭ রান। ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে যোগ দেন সূর্যতরুণ ক্লাবে।

১৯৯১-৯২ মৌসুমে মিলনার্স প্রথম বিভাগ লিগে তিনি ছিলেন ভিক্টোরিয়ার অধিনায়ক। ক্লাবটিকে প্রিমিয়ার লিগে ফিরিয়ে নেওয়ার তাগিদ থেকে তিনি এই দায়িত্ব নেন। সে মৌসুমে অগ্রণী ব্যাংকের বিপক্ষে খেলেছেন অপরাজেয় ১১০ রানের ইনিংস। উদিতি ক্লাবের অধিনায়ক, পুত্র সাজিদ হাসানের প্রতিপক্ষ হিসেবে টস করতেও নামেন তিনি। একই ম্যাচে পিতা-পুত্রের খেলার পাশাপাশি দুই দলের অধিনায়ক হিসেবে পরস্পরের বিপক্ষে খেলতে নেমে ঢাকার ক্রিকেটে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তাঁরা। এর আগে ১৯৭৮ সালে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে দুই ভাই আবাহনী ক্রীড়া চক্রের অধিনায়ক নান্নু আর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের অধিনায়ক মঞ্জু একে অপরের মুখোমুখি হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

১৯৯২-৯৩ মৌসুমে দামাল সামার ক্রিকেটে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে পিতার সঙ্গে ওপেন করতে নামেন সাজিদ। এটাও ঢাকার মাঠে বিরল এক ঘটনা। নাভানা প্রিমিয়ার লিগেও পিতা-পুত্র একই দলে খেলেছেন। সেই মৌসুমে ২৬ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের অবসান ঘটিয়ে মাঠ ছেড়ে আসার সময় রকিবুল হাসান আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ছেলেকে হয়তো শুনিয়েছেন রবীন্দ্র সংগীত, 'তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা/তোমায় আমায় মিলে এমনি বহে ধারা'। সাজিদ ১৯৯৪ সালে আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলেছেন।

জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি রকিবুলের। ১৯৮১-৮২ মৌসুমে অষ্টম আসরের সেমিফাইনালে বগুড়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের হয়ে ২১৪ রানে অপরাজিত থাকেন। ব্যাকরণসম্মত ব্যাটিংয়ের অনুসারী ছিলেন তিনি। টেকনিক ও ডিফেন্সের দিক দিয়েও ছিলেন বিশুদ্ধ ঘরানার। সাবলীলভাবেই খেলতেন কাভার ড্রাইভ, স্কয়ার ড্রাইভ, স্কয়ার কাট, পুল-হুক। অফ স্পিন বোলিং করে উইকেটও পেয়েছেন তিনি।

এমসিসি দলের সফরের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে পালাবদলের সূচনা হয়, তার সঙ্গে রকিবুল হাসানের নামও ইতিহাস হয়ে আছে। ১৯৭৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজশাহী স্টেডিয়ামে প্রথম কোনো বিদেশি ক্রিকেট দলের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশের কোনো দল। দু'দিনব্যাপী এই ম্যাচে টেড ক্লার্কের এমসিসির বিপক্ষে 'নর্থ জোন'-এর নেতৃত্ব দেন তিনি। দলটির প্রথম একাদশে খেলেন রকিবুল হাসান, ওমর খালেদ রুমি, আলিউল ইসলাম, মাইনুল হক মাইনু, এস এম ফারুক, খবির আহমেদ (অগ্রণী ব্যাংক), দৌলতউজ্জামান, সামিউর রহমান সামী, কামরুল হাসান (ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং), ওয়াহিদুজ্জামান মন্টু (ব্রাদার্স ইউনিয়ন) ও মাহবুব হোসেন নান্টু (ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং)। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে দু'দলের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বাধিক ৭৩ রান। এরপর থেকে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের যে কোনো দলে তিনি ছিলেন অটোমেটিক চয়েজ। 

এর আগে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে আমন্ত্রিত হয়ে স্বাগতিক পাকিস্তান একাদশের বিপক্ষে ইন্টারন্যাশনাল একাদশের হয়ে সাত ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে খেলেছেন রকিবুল। ইন্টারন্যাশনাল একাদশে তাঁর সহযোগী ক্রিকেটারদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ডের পিটার উইলি, মাইক হেনড্রিক, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ল্যারি গোমেজ, কলিস কিংস, বার্নার্ড জুলিয়ান, ভারতের অজিত ওয়াদেকার, শ্রীলঙ্কার অনুঢ়া টেনেকুন, অস্ট্রেলিয়ার কিথ মিলার প্রমুখ। ১৯৭৮ সালে সফরকারী শ্রীলঙ্কা, ভারতের ডেকান ব্লুজ, দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ সফরকারী এমসিসি দল, ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম আইসিসি ট্রফি, ১৯৮০ সালে সফরকারী পাকিস্তান টেস্ট দল, তৃতীয়বার বাংলাদেশ সফরকারী এমসিসি দল, ১৯৮২ সালে সফরকারী ভারতের হায়দরাবাদ ব্লুজ, ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় আইসিসি ট্রফি, ১৯৮৩ সালে সফরকারী পশ্চিমবঙ্গ দল, ১৯৮৪ সালে প্রথম দক্ষিণ এশিয়া টুর্নামেন্ট, কেনিয়া সফর, সফরকারী হায়দরাবাদ এবং পিআইএ দল, ১৯৮৫ সালে সফরকারী শ্রীলঙ্কা দল এবং পাকিস্তানের ওমর কোরেশী দলের বিপক্ষে খেলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়া টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।

১৯৮৬ সালে পাকিস্তান সফরে বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলতে যান তিনি। একই বছর শ্রীলঙ্কায় দ্বিতীয় এশিয়া কাপ ক্রিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশাপাশি তাঁরও ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয়। এছাড়া ইংল্যান্ডে তৃতীয় আইসিসি ট্রফিসহ অসংখ্য ম্যাচ খেলেছেন। ব্যক্তিগত বা দলীয়ভাবে বেশির ভাগ ম্যাচে সফলতা না পেলেও এই ম্যাচগুলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের বুনিয়াদকে ক্রমান্বয়ে সুদৃঢ় করেছে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দ্বিতীয় অধিনায়ক। এক টানা অনেক ম্যাচ খেলায় রেডিও ও টেলিভিশনের কল্যাণে তাঁর নাম পৌঁছে যায় বাংলার ঘরে ঘরে। আর পত্র-পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখালেখি কখনোই থেমে থাকেনি। যে কারণে তাঁর আলাদা একটা ইমেজ গড়ে ওঠে। কাছের বলয়ে 'রকি' নামে অভিহিত হলেও তাঁকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের 'রক অ্যান্ড রোল' বললে অত্যুক্তি হবে না। 

রকিবুল হাসানের জীবনটাই ক্রিকেট কেন্দ্রিক। ক্রিকেট তাঁর কাছে প্রাইড ও প্যাশন। খেলা ছেড়ে দিলেও ক্রিকেটের সান্নিধ্য থেকে তিনি কখনো দূরে সরে থাকার কথা চিন্তাই করেননি। কোনো না কোনোভাবে ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। মিডিয়ার সঙ্গে তাঁর রাখিবন্ধন বরাবরই অটুট রয়েছে। টক শো কিংবা বিশেষজ্ঞের কলাম লেখার ক্ষেত্রে তাঁকে অপছন্দ করার কোনো কারণ নেই। এ ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। 

২০০৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের তিনি ছিলেন হোস্ট টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর। এর পর থেকে কখনো জাতীয় দলের ম্যানেজার, কখনো নির্বাচক, কখনো ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। এছাড়াও অলঙ্কৃত করেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ। সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির। সমিতি তাঁকে ১৯৭৫ ও ১৯৮১ সালে সেরা ক্রিকেটার এবং ১৯৮২ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত করে। ২০০০ সালে পেয়েছেন 'জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার'। এছাড়া অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন এবং সম্মানিত হয়েছেন।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ম্যাচ রেফারি হিসেবেও বেশ সম্মান কুড়িয়েছেন তিনি। ছবি: উইকিপিডিয়া

তবে তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সবটাই যে নায়কোচিত, তা তো নয়। সেটা কারো পক্ষেই হওয়া সম্ভব নয়। মানবিক মানুষ হিসেবে তাঁরও ভুল-ত্রুটি থাকা অস্বাভাবিক নয়। কখনো কখনো তাঁর খেপাটে ভূমিকা কাউকে কাউকে আহত করেছে কিংবা তাঁর নেওয়া কোনো কোনো সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়নি। সেটা নিজেও অনুধাবন করতে পারেন মেজাজি ও স্পষ্টভাষী এই ক্রিকেটার। তবে তা শুধরে নিতে তিনি মোটেও কার্পণ্য করেন না। অবশ্য এটাও ঠিক, এই ক্রেজিনেসের কারণেই অন্য সবার থেকে তিনি আলাদা। না হলে হয়তো 'একজন সাদামাটা ছোটখাটো লোক' হয়ে থাকতেন। যদিও এ বিষয়ে ভালো বিশ্লেষণ করতে পারবেন মনস্তাত্ত্বিকরা। আপাতদৃষ্টিতে তাঁকে 'রকি পর্বতমালা'র মতো কঠিন মনে হলেও ভিতরটা রস আর রসিকতায় টইটম্বুর। যে কোনো আড্ডা বা আলোচনা জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। সব দিক দিয়েই ব্যতিক্রমধর্মী একজন ক্রিকেটার রকিবুল হাসান। 

শুধু ক্রিকেট নয়, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর রয়েছে আলাদা মর্যাদা। দেশ-বিদেশে স্ফুরণ ঘটিয়েছেন তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের। আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে তিনি অপ্রতিম। এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, বাংলাদেশের ক্রিকেট বর্তমানে যে পর্যায়ে এসেছে, পূর্বসূরি হিসেবে তার সঙ্গে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি। রকিবুল হাসানরা যে ভিত গড়ে দেন, যে স্বপ্ন চারিয়ে দেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে, ক্রিকেটের পরিচর্যায় যেভাবে নিবেদন করেন--তারই ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ আজ পরিচিত একটি নাম।

আরও পড়ুন......
একজন প্রলেতারিয়েত জ্যোতিষ লাল চৌহানের টেনিস কোর্টে লড়াই 
বিদ্রোহিনী দুই জলকন্যা