আমাদের দেশে নারীরা প্রকাশ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সাঁতারে অংশ নেবেন, পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝিও এই চিন্তা খুব একটা করা যেত না। পুকুর-খাল-নদীর দেশে সাঁতার কাটা যতই প্রাকৃতিক হোক না কেন, রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় তা মোটেও সহজ ছিল না। হয়তো পড়ন্ত দুপুরে পুরুষরা যখন কৃষি বা অন্য কোনো কাজে বাড়ির বাইরে থাকতেন, তখন গাছ-গাছালিতে ঘেরা পুকুর বা কোনো জলাশয়ে গোসল সেরে নিতেন নারীরা। অবশ্য অর্থনৈতিক অবস্থা ভেদে এ ক্ষেত্রে তারতম্য ঘটে। দরিদ্র পরিবারের নারীরা নদীতে গোসল করতে দ্বিধা করতেন না। তবে অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারের মেয়েরা সাধারণত গৃহকর্মে নিয়োজিতদের মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনোভাবে পুকুর বা নদী থেকে পানি এনে বাড়ির স্নানকক্ষে গোসল সেরে নিতেন। কারও কারও বাড়িতে থাকত ইঁদারা বা চাপকল। বলতে গেলে কিশোরী বয়স কিংবা বিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর সাঁতার কাটার সুযোগ খুব একটা মিলত না। সেই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আজও যে কেটে গেছে, তা বলা যায় না। 

আর ঢাকা শহরে তো নারীদের সাঁতার কাটার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। ব্যক্তিগত কিছু চৌহদ্দি বাদ দিলে তেমন পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল না। এখনো কি আছে? শারীরিক ফিটনেসের অংশ হিসেবে কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে সাঁতার শেখা ও অনুশীলনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ব্যাপক অর্থে প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে অংশ নেওয়ার জন্য সুব্যবস্থা তেমনভাবে নেই। এমন পরিস্থিতিতে শহরের মেয়েদের সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ কোথায়? যে কারণে সাঁতার প্রতিযোগিতায় এখনো মূলত গ্রাম, খানিকটা মফস্বল শহরের মেয়েদেরই প্রাধান্য। আর এখন তো অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের আশায় সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় মূলত দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা। দৃষ্টিভঙ্গির একটা ব্যাপার তো আছেই। গ্রামের মেয়েদের সাঁতার কাটতে দেখলে সেটাকে তেমনভাবে অস্বাভাবিক মনে হয় না। কিন্তু শহরের মেয়েদের সাঁতার কাটতে দেখলে ভ্রু কুঁচকে যায়। একই বিষয়কে নিজেদের মর্জিমাফিক বিচার-বিশ্লেষণ করার মানসিকতা সমাজের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তার ভালো দিক যেমন আছে, আছে মন্দ দিকও। তবে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, তা বিবেচিত হতে পারে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে। 

যত দূর জানা যায়, নারীরা ১৯৫৬ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এটা কি এখন অবিশ্বাস্য মনে হয় না? শুরু থেকে এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন নারায়ণগঞ্জের কাশিপুরের মেয়েরা। তাঁরা সামাজিক প্রচল ভেঙে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রকৃত অর্থেই সাঁতারে কাশিপুরের সর্দার আবদুস সাত্তারের পরিবারের ভূমিকার কোনো তুলনা হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাঁতারে এই পরিবারের ছেলেরা সাফল্য বয়ে এনেছেন। পাশাপাশি এই বাড়ির মেয়েরাও ঢাকায় এসে প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন। বাড়ির আঙ্গিনার পুকুরে সাঁতারে তালিম নিয়েই জাতীয় পর্যায়ে সুনাম কুড়িয়েছেন। 

সেই সময়ে প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে নারীদের অংশ নেওয়া ছিল এক ধরনের বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। সামাজিক দৃষ্টিতে তা ছিল বিদ্রোহের শামিল। কাশিপুরের মেয়েরা প্রচলিত ধারাকে অস্বীকার করে শান্ত পুকুরে রীতিমতো ঢেউ তোলেন। সমাজ প্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা ছিল বড় ধরনের একটা উলস্ফন। এখন হয়তো তা স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে এক ধরনের অভ্যুত্থানই বলা যেতেই পারে। এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তাহলে হয়তো এমন একটা বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সার্বিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যাবে।

কাশিপুরের সর্দার পরিবারের মেয়েরা যে পরিবর্তনের সূচনা করেন, তারই ধারাবাহিকতায় জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় সম্মুখ সারিতে উঠে আসেন আরিফা আক্তার ও সেতারা বেগম। এই দুজনও সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাশিপুর এলাকা থেকেই এসেছেন। তবে তাঁদেরকে শুরু করতে হয় নতুন এক প্রেক্ষাপটে। তাঁদের পূর্বসূরিরা সমাজকে নাড়া দিলেও একটা পর্যায়ে তাঁদের গুটিয়ে যেতে হয়। যে কারণে দীর্ঘ দিন প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে নারীদের অংশ গ্রহণ ছিল না। এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তাঁদেরকেই নেতৃত্ব দিতে হয়। দেওভোগ হাজী উজির আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী আরিফা ও সেতারা স্কুল সংলগ্ন মোহাম্মদ আলীর পুকুরে অনুশীলন করে জাতীয় পর্যায়ে সুখ্যাতি অর্জন করেন। তবে তাঁদের চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। 

সাঁতারের আনন্দে সেতারা আরিফারা। ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতার আগে ঢাকা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক রাজধানী। শহরের ব্যাপ্তি বিস্তৃত ছিল না। লোকসংখ্যাও বেশি ছিল না। সেই পঞ্চাশের দশক এবং তার পরবর্তী সময়েও ছিল অনেকটা গ্রামীণ আমেজ। যে কারণে সাঁতার প্রতিযোগিতায় মেয়েদের অংশ নিতে হয়তো খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। আরেকটি ইতিবাচক দিক ছিল, তখনকার সাঁতার প্রতিযোগিতায় কাশিপুরের ছেলেদের সংখ্যা বেশ ভালোই ছিল। তাঁরা ছিলেন পরস্পরের আত্মীয়-স্বজন। যে কারণে অনেকটা পারিবারিক পরিবেশেই মেয়েরা সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। সাঁতারের পোশাকও হাল জমানার মতো ছিল না। নোংরা চোখের কদর্যতাও তেমনভাবে স্পর্শ করতে পারত না। তবে প্রতিকূলতা আর প্রতিরোধের মুখোমুখি যে হতে হয়নি, তা তো বলা যায় না। কিন্তু পারিবারের নিরঙ্কুশ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকায় তাঁরা সেই সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে ওঠার সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তাছাড়া বয়স বাড়বাড়ন্ত হওয়ার আগেই প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে অংশ নেওয়া থেকে দূরে সরে যান। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সাঁতারে বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারেননি। তবে রক্ষণশীল সমাজকে অন্তত একটা ধাক্কা দিতে পেরেছেন। 

এক সময় ঢাকা একটি দেশের রাজধানী হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় ভিড় বেড়েছে। কোলাহল বেড়েছে। স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমাজ এগিয়েছে। দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতার কারণে পিছন দিকে টেনে রাখার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তার প্রভাব পড়েছে সর্বত্রই। সেই সময়ে সাঁতারে নারীদের পোশাকের পরিবর্তন আসায় আকর্ষণ বেড়ে যায়। গ্ল্যামার বেড়ে যায়। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাঁতার অব্যাহত রাখা মোটেও সহজ ছিল না। এ কারণে মানসিকভাবেও হেনস্তা হতে হয়। সব প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে দিয়ে সাহসী যে নারীরা সাঁতার প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান গড়েন, তাঁদের পথিকৃৎ হলেন আরিফা আক্তার, সেতারা বেগমরা। আরও অনেকেই ছিলেন। কিন্তু সাহসিকতার পাশাপাশি সাফল্য দিয়ে এই দুই সাঁতারু নিজেদের আলাদাভাবে তুলে ধরেন। 

১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণকারী সমসাময়িক এই দুই সাঁতারু একই সময় প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে অংশ নেন। পরস্পরের সঙ্গে সমানতালে লড়াই চালিয়ে যান। সাফল্যও ভাগাভাগি করে নেন। তাঁরা দেশীয় সুইমিং কস্টিউম পরে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। অতীতে তাঁদের পরিবারের নারী সাঁতারুরা সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করতে না পারায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করার পর সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁরা যা পারেননি, তাঁদের বংশধররা তাঁদের অবদমিত ইচ্ছে পূরণে এগিয়ে আসেন। আরিফা ও সেতারা অনেকটা পথ নির্বিগ্নে এগিয়ে যান। উজ্জ্বল করেন দেশের মুখ। 

 আরিফা আক্তার

স্বাধীনতার পর জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১৯৭৫ সালে প্রথম অংশ নেওয়ার সুযোগ পান নারীরা। সেটাও সীমিত পরিসরে, অনূর্ধ্ব-১৫ গ্রুপে। সেই আসরে নিজেদের প্রতিভার প্রমাণ রাখেন আরিফা, সেতারারা। আরিফা আক্তার বালিকাদের অনূর্ধ্ব-১৫ বছরের সাঁতার প্রতিযোগিতায় মহানগরী ক্রীড়া সংস্থার হয়ে ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে প্রথম ও ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে তৃতীয় হন। ১৯৭৬ সালে জুনিয়র গ্রুপে ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে প্রথম ও ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে হন দ্বিতীয়। ১৯৭৭ সালে জুনিয়র গ্রুপে ৫০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে প্রথম এবং ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে দ্বিতীয় হয়েছেন। ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশ অলিম্পিকে সিনিয়র গ্রুপে নারীরা প্রথম অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তাতে তিনি বিটিএমসির হয়ে ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক, ১০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোকে স্বর্ণ ও ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে রৌপ্যপদক জয় করেন। রিলে দলের হয়েও পেয়েছেন স্বর্ণপদক। ১৯৮০ সালে দ্বিতীয় বাংলাদেশ গেমসে ১০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক, ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে স্বর্ণ ও ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে রৌপ্যপদক জয় করেন। ফর্মের তুঙ্গে থাকাবস্থায় সরে যেতে হয় প্রতিভাবান এই সাঁতারুকে। অথচ আরিফার ইচ্ছে ছিল, সাঁতার দিয়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা। 

আরিফা সরে গেলেও সেতারা বেগম লড়াই অব্যাহত রাখেন। তিনি ১৯৭৫ সালে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় বালিকাদের অনূর্ধ্ব-১৫ বছর গ্রুপে ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে প্রথম হন। ৫০ মিটার ব্যাক স্ট্রোকে দ্বিতীয় ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে হন তৃতীয়। ১৯৭৬ সালে জুনিয়র গ্রুপে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে প্রথম এবং ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে তৃতীয় হন। ১৯৭৭ সালে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে প্রথম, ৫০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে তৃতীয় হয়েছেন। ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি জাতীয় সাঁতারের সিনিয়র গ্রুপে অংশ নেন। শুরু হয় তাঁর জয়যাত্রা। সেবার প্রথম বাংলাদেশ অলিম্পিকে বিটিএমসির হয়ে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে স্বর্ণপদক লাভ করেন। রিলেতেও স্বর্ণপদক পান। ১৯৮০ সালে দ্বিতীয় বাংলাদেশ গেমসে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে স্বর্ণ, ১০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক ও ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রৌপ্যপদক পান। ১৯৮১ সালে বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় ৭টি স্বর্ণপদক জিতে নেন। একই বছর ৮ম জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ৭টি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্যপদক জয় করেন। রেকর্ড গড়েন ৭টিতে। ১০০, ২০০ ও ৮০০ মিটার ফ্রিস্টাইল, ২০০ ও ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে, ১০০ ও ২০০ মিটার বাটারফ্লাইতে স্বর্ণপদক এবং ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে রৌপ্যপদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তৃতীয় বাংলাদেশ গেমসে পান বিস্ময়কর সাফল্য। মেয়েদের ১১টি ইভেন্টের মধ্যে ১০টিতে স্বর্ণ ও একটিতে রৌপ্যপদক জয় করেন এই জলকন্যা। ১০০, ২০০, ৪০০ ও ৮০০ মিটার ফ্রিস্টাইল, ১০০ ও ২০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক, ১০০ ও ২০০ মিটার বাটারফ্লাই, ২০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক, ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে স্বর্ণপদক এবং ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রৌপ্যপদক লাভ করেন। 

 সেতারা বেগম

সেতারা ও আরিফাকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে অনেকেই আরো বেশি সাফল্য পেয়েছেন। এমনকি এস এ গেমসে জয় করেন স্বর্ণপদকও। কিন্তু এশিয়ান পর্যায়ে এই দুই সাঁতারুর সাফল্যের মাইলফলক কারও পক্ষে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৮০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছয় জাতির প্রথম এশিয়ান সাঁতারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তাঁদের জন্য এ ছিল রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। প্রতিযোগিতা শুরুর মাত্র একদিন আগে তাঁদের অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়। শারীরিক ও মানসিক কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। অনেকটা 'ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে' প্রবাদের মতো। যে কারণে এক ধরনের অস্বস্তি নিয়ে তাঁরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। 

প্রতিদ্বন্দ্বী চীনা মেয়েদের কাছ থেকে দেখাই ছিল তাঁদের কাছে স্বপ্নের মতো। অত্যাধুনিক সুইমিং কস্টিউম পরে চীনা সাঁতারুরা যখন পানির মধ্যে সাবলীল ভঙ্গিমায় ছুটতেন, তাঁরা তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। পুতুল পুতুল গড়নের এই মেয়েদের তাঁদের কাছে মনে হয়েছে রূপকথার জগত থেকে আসা আগন্তুক। এঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, সেটা ছিল তাঁদের কাছে পরম এক বিস্ময়, এই জড়তা ভাঙা সহজ ছিল না। সব মিলিয়ে তাঁদের মনের গহনে তুফান বয়ে যায়। তারপরও কোনো অনুশীলন ছাড়াই অংশ নিয়ে তাতে তাঁরা খুব একটা খারাপ করেনি। 

প্রতিযোগিতায় আরিফা আক্তার দুটি রৌপ্য ও তিনটি ব্রোঞ্জ আর সেতারা বেগম জয় করেন চারটি ব্রোঞ্জ পদক। আরিফা ১০০ ও ২০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রৌপ্য এবং ১০০ ও ২০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক আর ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন। সেতারা ১০০ মিটার বাটারফ্লাই, ১০০ ও ২০০ মিটার ফ্রিস্টাইল এবং ২০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের মেয়েদের মধ্যে প্রথম পদক জয়ের গৌরব অর্জন করেন সেতারা। ১৯৮০ সালের ৪ জুন তিনি ১০০ মিটার বাটারফ্লাইতে পদক পেয়ে এই কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। ৪ গুণন ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল এবং ৪ গুণন ১০০ মিটার ব্যক্তিগত রিলেতে রৌপ্যপদক জয়ের অংশীদারও আরিফা ও সেতারা। গেমসে বাংলাদেশের অর্জিত পাঁচটি রৌপ্য আর পনেরোটি ব্রোঞ্জ পদকের মধ্যে নারীরাই পেয়েছেন চারটি রৌপ্য ও আটটি ব্রোঞ্জ। অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী কম থাকায় এমনিতেই কিছু পদক তাঁদের মুফতে জুটে যায়। 

এশিয়ান পর্যায়ে এতগুলো পদক পাওয়া সেই সময়ে তো বটেই, বর্তমান সময়েও কল্পনা করা যায় না। নারীদের মধ্যে তাঁরাই প্রথম এই পর্যায়ে পদক জয়ের গৌরব অর্জন করেন। এশিয়ান পর্যায়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এতগুলো পদক মেয়েদের তো বটেই, পুরুষদের মধ্যেও কারও নেই। অথচ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই দুই সাঁতারুকে আন্তর্জাতিক আর কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। 

আরিফা আক্তার ১৯৮০ সালে এবং সেতারা বেগম ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা সাঁতারু হন। ২০০৫ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন সেতারা। ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। এই দুই সাঁতারুই সাফল্য পেয়েছেন, তার গুরুত্ব তো আছেই, কিন্তু তাঁরা যেভাবে সুইমিং কস্টিউম পরে ঢাকা স্টেডিয়াম এবং নৌবাহিনীর সুইমিং পুলে ঝড় তোলেন, তা দীর্ঘ দিনের একটা অচলায়তনকে ভেঙে দেয়। সেক্ষেত্রে এই দুই জলকন্যাকে বিদ্রোহিনী বললে অত্যুক্তি হবে না। সাঁতারে বাংলাদেশের নারীদের চলার পথকে অনেকটাই মসৃণ করে দেন তাঁরা। তাঁদের দেখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করে সাফল্যের পথে সাঁতার কাটছেন পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা।

আরও পড়ুন: একজন রকিবুল হাসান