তাঁকে কেন্দ্র করে খেলার মাঠে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল বুর্জোয়া বনাম প্রলেতারিয়েতের মধ্যকার সামাজিক চিরন্তন লড়াই। এটি ঠিক সেই অর্থে জার্মান দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল মার্ক্সের শ্রেণি সংগ্রামের লড়াই না হলেও তা ছিল অবহেলিত ও নিগৃহীত একজন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তাতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে সামাজিক ব্যবধানের দূরত্ব। সেই লড়াইয়ে তিনি একদমই হার মানেননি। হয়তো মচকেছেন তবে ভাঙেননি। প্রতিষ্ঠা করেন নিজের অধিকার। অটুট রাখেন শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু জীবন যাপনের লড়াইয়ে তিনি পেরে ওঠেননি। না পারার কারণে খেলার মাঠে আলো জ্বালিয়েও সংসার জীবনে তাঁকে থাকতে হচ্ছে অন্ধকারে। 

তৎকালীন বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় লন টেনিস তো ছিল মূলত দেওয়াল দিয়ে ঘিরে বসবাস করা অভিজাত অধিবাসীদের খেলা। সেখানে কীভাবে বস্তির বাসিন্দাদের প্রবেশাধিকার মেনে নেওয়া যায়? যায় না বলেই জ্যোতিষ লাল চৌহানের আধিপত্য তো দূরে থাক, তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ যাতে না ঘটে, সেজন্য সব রকম চাতুর্যতার আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রতি পদে পদে সৃষ্টি করা হয় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু অদম্য, অনড় ও অনমনীয় জ্যোতিষকে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়নি। হয়নি বলে সর্বহারা এই খেলোয়াড় অভিজাতদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেন। একইসঙ্গে বিত্তবানদের এই খেলাটিকে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। 

কিশোর বয়সে ভাগ্যান্বেষণে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকা আসেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান জ্যোতিষ। সামনে ছিল অনিশ্চিত এক জীবন। সেটা ১৯৬১ সালের কথা। ঘোরাঘুরি করতে করতে সম্ভ্রান্তদের জন্য সুনির্দিষ্ট ঢাকা ক্লাবে বলবয়ের কাজ পেয়ে যান। তাঁকে কাজটি জুটিয়ে দেন ঢাকা ক্লাবের স্কোয়াশের মার্কার রামবালি। কিন্তু তা এমন এক কর্মক্ষেত্র, যেখানে নির্ধারিত কোনো পারিশ্রমিক ছিল না। খেলা হলে ছোটাছুটি করে বল কুড়িয়ে দিতেন। তার বিনিময়ে বখশিশ পেতেন। তা দিয়ে ঠিকমতো খাবারও জুটতো না। সব সময় বখশিশ পেতেনও না। অনেক সময় অভুক্ত পেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল কুড়াতেন। শরীর ভেঙে পড়তে চাইত। কিন্তু বিকল্প কোনো উপায় ছিল না। বল কুড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সহযোগী বলবয়দের সঙ্গে কখনো কখনো টুকটাক খেলতেন। যখন কোর্ট ফ্রি পেতেন, তখন পরিত্যক্ত বল আর জীর্ণ র‍্যাকেট দিয়ে অনুশীলন করতেন। শিল্পী কবীর সুমনের ভাষায়, 'কখনও সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে/ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা।' 

জ্যোতিষ লাল চৌহান: বলবয় থেকে টেনিসের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন

খেলতে খেলতে কখন যেন তিনি খেলাটির গভীর প্রেমে পড়ে যান। প্রকৃত অর্থেই গরীবের ঘোড়া রোগ হলে যা হয় আর কি। সেই রোগের আর নিরাময় হয়নি। টেনিসের মতো শক্তির খেলায় সাফল্য পেতে হলে শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখাটা অপরিহার্য। প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মমাফিক এক্সারসাইজ আর পর্যাপ্ত অনুশীলন। এজন্য আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থাকাটা খুব জরুরি। এটা তো তাঁর ছিল না। তারপরও একটু একটু করে রপ্ত হয়ে যায় খেলাটি। আবেগ, আত্মবিশ্বাস আর মনের জোরে তিনি ঠিকই এগিয়ে যান। অনেক সময় টেনিস কোর্টের নিয়মিত খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষ হিসেবে কাউকে না পেলে তাঁর সঙ্গে খেলতেন। এভাবে খেলতে খেলতেই টেনিসে তাঁর সহজাত প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে।আর এ ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে যান একজন গুরুর আশীর্বাদ। ১৯৬৪ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আবদুর রশিদ নামে একজন অভিজ্ঞ মার্কার ঢাকা ক্লাবে যোগ দেন। খেলার প্রতি জ্যোতিষের নিবেদন দেখে তিনি তাঁকে গড়েপিটে তোলেন। প্রায় তিন বছর তাঁর কাছে দীক্ষা পেয়ে জ্যোতিষ হয়ে ওঠেন দক্ষ এক টেনিস খেলোয়াড়। 

১৯৬৭ সালে প্রথম পূর্ব পাকিস্তান জুনিয়র টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে একক ও দ্বৈত ইভেন্টে শিরোপা জয় করেন জ্যোতিষ। তারপর থেকেই তাঁর জয়জয়কার। পরের বছর থেকে পূর্ব পাকিস্তান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেতে থাকেন। এককের পাশাপাশি দ্বৈত ও মিশ্র দ্বৈতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। হোক ক্লে, হার্ড বা গ্রাস, যে কোনো কোর্টেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এটা কারও কারও কাছে আত্মসম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মতো একজন সামান্য বলবয় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জয়ী হবে, এটা রীতিমতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য শুরু হয় নানা অভিসন্ধি। বরখাস্ত করা হয় কর্মক্ষেত্র থেকে। টুর্নামেন্টে অংশ নিতে দেওয়া হয় না। এমনকি অপবাদ দেওয়া হয় চৌর্যবৃত্তির। তাঁকে চূড়ান্ত রকমের নাজেহাল করা হয়। টেনিস কোর্ট থেকে তাঁকে ঝাড়ে-বংশে নির্মূল করার জন্য নানান রকম ফন্দি-ফিকির প্রয়োগ করা হয়। 

জ্যোতিষ লাল চৌহান

এত কিছুর পরও তাঁকে কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা যায়নি। টেনিস তাঁকে ততদিনে এমনভাবেই পেয়ে বসেছে, তা পরিণত হয় অনেকটা নেশার মতো। এমনকি অভুক্ত থাকলেও না খেলে থাকতে পারতেন না। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে তাঁর জেদ বেড়ে যায়। ক্ষুধার্ত পেটে কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যান। ড্রাইভ বা লবগুলোকে আরও নিখুঁত করার জন্য নিজেকে নিংড়ে দেন। সার্ভিস, রিটার্ন, প্লেসিং, স্ম্যাশিং আর ব্যাকহ্যান্ডে হয়ে ওঠেন আরও বেশি দক্ষ, নিপুণ ও পরিপূর্ণ। প্রতিদানে দু’হাত ভরে পান সাফল্য। এই সাফল্য তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে উজ্জীবিত করে। এত বৈরিতার মধ্যেও কখনো কখনো কেউ না কেউ তাঁর পিঠে রেখেছেন সমর্থনের হাত। পরম দুর্দিনে সেই হাত তাঁকে যথেষ্ট সাহস যুগিয়েছে। 

সাফল্য দিয়ে টেনিসে ঢাকা ক্লাবকে তিনি নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়। কিন্তু রয়ে যায় তাঁর জীবনের অনিশ্চয়তা। আর্থিক সংকট থেকে রেহাই মেলে না। সামাজিক নিয়মে সংসারী হয়েছেন। ক্রমান্বয়ে বেড়েছে তার পরিধি। বড় একটি পরিবারের অন্ন সংস্থান করার চিন্তাই আচ্ছন্ন করে রাখে তাঁকে। একবার তো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে যান জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নিরুপায় হয়ে নারায়ণগঞ্জের ঠিকানা ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টের বস্তিতে মায়ের কাছে আশ্রয় নিতে হয়। ভুগতে হয়েছে দীর্ঘ দিন। অথচ তাঁর চাকরিস্থল ঢাকা ক্লাব তো দেশের ধনীদের আখড়া। যে কেউ চাইলে নিমিষেই পরিবর্তন করে দিতে পারতেন তাঁর এই দুর্বিষহ জীবন। কিন্তু যতই ক্লাবের জন্য সুনাম-সুখ্যাতি বয়ে আনুন না কেন, একজন বলবয়ের জন্য কার এমন দায় ঠেকেছে? বরং তাঁকে 'সাইজ' করতে পারলে নিজেদের মর্যাদা অটুট থাকে। একটা সময় বলবয় থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে টেনিসের মার্কার হিসেবে অনেক দিন কর্মরত ছিলেন। আত্মসাতের সাজানো ঘটনায় তাঁকে চট্টগ্রাম ক্লাবের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর অবশ্য ঢাকা ক্লাবের মার্কার হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই আয় দিয়ে টেনেটুনে সংসার চালিয়েছেন। 

টেনিসে তো অর্থ, গ্ল্যামার, জনপ্রিয়তার কোনো কমতি নেই। চারটি গ্র্যান্ড স্লাম উইম্বলডন, ইউ এস ওপেন, ফ্রেঞ্চ ওপেন আর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন টেনিসসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আকর্ষণ দুনিয়াব্যাপী। তাতে তো অর্থের বিস্তর ছড়াছড়ি। এ কারণে মনে হতে পারে, টেনিস খেললেই পাওয়া যায় অঢেল টাকা। সেই সঙ্গে আছে ঝলমলে জীবনের হাতছানি। কিন্তু এই আড়ম্বর ও প্রাচুর্যের সঙ্গে বাংলাদেশের টেনিসের মোটেও তুলনা চলে না। শুরু থেকেই এ দেশে টেনিস খেলাটা মূলত সৌখিনতার বলয়ে আবদ্ধ ছিল। এ খেলা মূলত ধনী, স্বচ্ছল ও প্রভাবশালীদের অবসরের বিনোদনের অংশ। এখনও যে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে, তা বলা যাবে না। টেনিস গণমানুষের খেলা হয়ে ওঠতে পারেনি। যে কারণে টেনিস খেলে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। 

জ্যোতিষ লাল চৌহান

এমন এক প্রেক্ষাপটে ষাট ও সত্তর দশকে একজন বলবয়ের পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান গড়ে নেওয়াটা কতটা কঠিন ছিল, সেটা সহজেই অনুমেয়। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি খেলাটার আধুনিক কলাকৌশল শেখার ব্যবস্থা ছিল না। তখন তো মিডিয়ার এত রমরমা ছিল না। ছিল না টেলিভিশনে খেলা দেখার সুযোগ। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার রয় এমারসন, রড লেভার, যুক্তরাস্ট্রের আর্থার অ্যাশ আরেকটু পরে আমেরিকান জিমি কনর্স, সুইডেনের বিয়ন বোর্গের মতো খ্যাতিমান তারকারা টেনিস কোর্ট দাপিয়ে বেড়ালেও জ্যোতিষের পক্ষে তার খোঁজ-খবর রাখা কিংবা তাঁদের খেলা অনুসরণ করার তেমন সুযোগ ছিল না। নিজের বিদ্যায় যেটুকু কুলোয়, তা দিয়েই পরাক্রমশালীদের সঙ্গে লড়েছেন। 

সমস্ত প্রতিকূলতাকে উজিয়ে জ্যোতিষ এগিয়ে গেছেন অপ্রতিহত গতিতে। তাঁর মধ্যে ছিল প্রকৃতিদত্ত প্রতিভা। ১৯৬৮ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন জাতীয় টেনিসে অবিসংবাদিতভাবে সেরা। দুই পর্যায় মিলিয়ে পুরুষ এককে নয়বার শিরোপা জয় করেন। এরমধ্যে ১৯৭৭ সাল থেকে টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এছাড়া দ্বৈত ইভেন্টে ১০ বার এবং মিশ্র দ্বৈতে অসংখ্যবার চ্যাম্পিয়ন হন। পুরুষ দ্বৈতে হাবিবুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭৪ সাল থেকে টানা সাতবার শিরোপা জয় করেন। ১৯৬৯ সালে আমেরিকান প্রথিতযশা খেলোয়াড় ড. রবেডোকে হারিয়ে চমক দেখান। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন খালেদ সালাহ উদ্দিন, হারুন-অর-রশিদরা। চ্যাম্পিয়ন থাকাবস্থায় ১৯৮০ সালে টেনিস খেলা থেকে তিনি সরে যান। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর পক্ষে আর খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাতে কেউ কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। 

দীর্ঘ দিন জাতীয় পর্যায়ের সেরা খেলোয়াড় হয়েও মাত্র একবারই তাঁর দেশের বাইরে খেলার সুযোগ হয়। ১৯৭৪ সালে বার্মায় একটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে পুরুষ এককে রানারআপ হয়েছিলেন। তারপরও তাঁকে আর সুযোগ দেওয়া হয়নি। জীবনে অনেক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। আর্থিক স্বচ্ছলতা কখনোই ছিল না। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সব দুঃখ-কষ্ট মন থেকে মুছে যেত। সেটাই ছিল তাঁর বড় অহংকার ও আত্মতৃপ্তি। কিন্তু একটি ঘটনার কথা তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে ঢাকায় তৃতীয় ফিলিপস আন্তর্জাতিক লন টেনিস টুর্নামেন্টে তাঁকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তখন তিনি ফর্মের তুঙ্গে। সঙ্গত কারণেই এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদুল করিমের ব্যাখ্যা ছিল এমন, চট্টগ্রাম ক্লাবের কিছু মূল্যবান মালামাল বেহাত হয়েছে এবং এ বিষয়ে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। ক্লাবের মার্কার হিসেবে তখন কর্মরত ছিলেন জ্যোতিষ। স্পষ্টতই ইঙ্গিতটা ছিল তাঁর দিকেই। এ কারণে জ্যোতিষকে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। অথচ জ্যোতিষকে তিনি জানিয়েছিলেন, কোনো ক্লাবের সদস্য না হওয়ায় তাঁর খেলার সুযোগ নেই। এ থেকে বিষয়টির দ্বিমুখীতা পষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই টুর্নামেন্টের এককে শিরোপা জয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিল জ্যোতিষের। কিন্তু শ্রেণিগত রোষের কারণে তাঁকে খেলতে দেওয়া হয়নি। এ কারণে জ্যোতিষ একবার খেদোক্তি প্রকাশ করে বলেন, আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে পারতেন। কিন্তু খালি পেটে আর কত দূর যাওয়া যায়! 

নয় বারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। এর বাইরে কত ট্রফি যে জিতেছেন, তার কোনো হিসেব নেই

দেশের মাটিতে তিনি কত টুর্নামেন্টে জিতেছেন, তার কোনো হিসাব নেই। জব্বার স্মৃতি টুর্নামেন্ট, শামসুল স্মৃতি টুর্নামেন্ট, হার্ড কোর্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, চিটাগং গ্র্যাভেল কোর্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, ফিলিপস টুর্নামেন্টে একক ও দ্বৈত ইভেন্টে সাফল্য পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম বাংলাদেশ হার্ড কোর্ট টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। কোনো টুর্নামেন্টে জ্যোতিষ লাল চৌহান খেললে প্রতিপক্ষরা বুঝে ফেলতেন, তাঁদের আর শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা নেই। যদিও বিজয়ের এত এত ট্রফি তো তাঁর কোনো কাজেই লাগে না। উল্টো তাঁকে উপহাস করে। কেননা তা দিয়ে তো তাঁর অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘোচেনি। যে কারণে জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে টিম-টিম করে টিকে আছেন তিনি। 

স্বীকৃতি হিসেবে জ্যোতিষ ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা টেনিস খেলোয়াড় হয়েছেন। তাঁর কথা কজনইবা মনে রেখেছেন? 'আনসাং হিরো' হয়ে আছেন টেনিসের সফল এই ক্রীড়াবিদ। তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে সাফল্য পেয়েছেন হীরালাল, শিবুলাল, দিলীপের মতো প্রলেতারিয়েতরা। কিন্তু তাঁর জীবন রয়ে গেছে আগের মতোই অভাব-অনটনে ভরা। চৌহান পরিবারের সাফল্য শুধু টেনিসে সীমাবদ্ধ নেই। জ্যোতিষ লালের পিসতুতো ভাই ভোলালাল চৌহানের বাংলাদেশের স্কোয়াশে ছিল প্রায় দুই যুগের একাধিপত্য। 

বাংলাদেশের লন টেনিসের গৌরবময় এক অধ্যায়ের নাম জ্যোতিষ লাল চৌহান। তিনি এই খেলাটিকে সর্বজনীন করে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথে এলিটদের এ খেলায় এগিয়ে এসেছেন তাঁরই মতো আরও অনেক প্রলেতারিয়েত। যাঁরা দেশের জন্য বয়ে এনেছেন গৌরব ও সম্মান। টেনিসে অনন্য এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি।

আরও পড়ুন:

দাবায় নতুন পথের দিশারি নিয়াজ মোরশেদ 

যে কৃতিত্ব শুধু মোশাররফের

ঢাকার মাঠে সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব 
মোহাম্মদ আলী যখন বাংলাদেশের 
আকাশি-নীলের উত্থান
বক্সাররাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের পথ-প্রদর্শক!
কাজী সালাউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার
অশ্রু আর বেদনা নিয়ে শুরু ক্রীড়াঙ্গনের যাত্রা