স্বাধীনতার পর ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। তবে সে সময় ক্রীড়াঙ্গনের সীমানা খুব বেশি বিস্তৃত ছিল না। তখন দেশের অভ্যন্তরে সফল ক্রীড়াবিদরাই মূলত তারকা হিসেবে বিবেচিত হতেন। সাঁতারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মো. মোশাররফ হোসেন খান। তাঁর সময়ে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় তাঁকে টপকে যাওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। সে কারণে তারকা খ্যাতি অর্জন করতে তাঁকে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। হাতে গোনা আলোচিত ক্রীড়াবিদদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। দেশের ক্রীড়া পরিমণ্ডল তো বটেই, তার বাইরেও কম-বেশি সবাই তাঁকে চিনতেন। অবশ্য তা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট থাকেননি। অতীতের ধারা ভেঙে দিয়ে তিনি নিজেকে আরও উঁচু ধাপে নিয়ে যান। ঘরোয়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাফল্য দেখিয়ে তিনি 'তারকা' মর্যাদাকে আরো বেশি মহিমান্বিত করে তোলেন। দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশে এখনো সাঁতারু বললে তাঁর নামটাই সবার আগে উঠে আসে। 

সত্তর দশকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন থেকে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের পদক জয় করা ছিল রীতিমতো স্বপ্নের মতো। তেমন এক প্রেক্ষাপটে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও মোশাররফের নাম ক্রমশ উচ্চারিত হতে থাকে। বিদেশ থেকে তিনি পর্যায়ক্রমে পদক জয় করতে শুরু করেন। শুরুর দিকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুব বড় মাপের আসর থেকে না হলেও সে সময় যেকোনো আন্তর্জাতিক পদকের গুরুত্বকেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। অবশ্য ধীরে ধীরে তাঁর পাওয়া পদকের মর্যাদা বেড়েছে। বেড়েছে সংখ্যাও। এ ক্ষেত্রে তাঁর সমসাময়িককালে তিনি অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি যত পদক পেয়েছেন, তাঁর ধারে-কাছেও আর কেউ ছিলেন না। এখন পর্যন্তও সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক পদকজয়ীদের মধ্যে পুরোভাগেই থাকে তাঁর নাম। 

মোশাররফের আন্তর্জাতিক পদক পাওয়ার সূচনা ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে। কলকাতায় সেন্ট্রাল সুইমিং ক্লাবের হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সাঁতার প্রতিযোগিতায় সর্বভারতীয় ২টি রেকর্ডসহ চারটি ইভেন্টে প্রথম হন। তারপর থেকে একের পর এক পদক জয় শুরু হয়। মাসখানেকের মধ্যে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে আয়োজিত ট্রায়াঙ্গুলার অ্যাকুয়াটিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক ও ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে রেকর্ডসহ তিনটি স্বর্ণ ও একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন। ১৯৭৮ সালে ভারতের কেরালায় আমন্ত্রণমূলক সাঁতারে লাভ করেন ২টি স্বর্ণ ও ১টি ব্রোঞ্জ পদক। একই বছর পাকিস্তানের লাহোরে কায়েদ-এ-আজম সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি পান সেরা সাঁতারুর স্বীকৃতি। ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক, ১০০ মিটার বাটারফ্লাই, ২০০ মিটার মিডলে ও ৪০০ মিটার মিডলেতে স্বর্ণপদকের সঙ্গে জেতেন একটি রৌপ্যপদকও। ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে পাকিস্তানের ১৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে দেন। ১৯৭৯ সালে কলম্বোয় আমন্ত্রণমূলক সাঁতারে ২টি স্বর্ণ ও ১টি ব্রোঞ্জ পান। ধারাবাহিক এই সাফল্য তাঁকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। বেড়ে যায় পদক জয়ের ক্ষুধা। 

ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৯৮৫ সাফ গেমসে ৫টি স্বর্ণ ও ২টি রৌপ্যপদক জিতেছিলেন মোশাররফ হোসেন

১৯৮০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে রৌপ্য ও ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোকে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন তিনি। ১৯৮৪ সালে নেপালে প্রথম সাফ গেমসে যে কারণেই হোক, নিজের নামের প্রতি তেমনভাবে সুবিচার করতে পারেননি। ১০০ ও ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক, ৪ গুণন ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল এবং ৪ গুণন ১০০ মিটার মিডলে রিলে দলের হয়ে রৌপ্য আর ২০০ মিটার বাটারফ্লাইতে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছেন। তবে এই গেমসে স্বর্ণপদক জিততে না পারার কষ্ট প্রায় ষোল আনা মিটিয়ে নেন পরবর্তী আসরে। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় সাফ গেমসে ৩৩ বছর বয়সে ৫টি স্বর্ণ ও ২টি রৌপ্যপদক জয় করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন। ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক, ২০০ ও ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলে, ৪ গুণন ১০০ মিটার মিডলে, ৪ গুণন ২০০ মিটার ফ্রিস্টাইল রিলে দলের হয়ে স্বর্ণ এবং ২০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক ও ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে রৌপ্যপদক জয় করেন। একই গেমসে বাংলাদেশের আর কোনো ক্রীড়াবিদের এতগুলো পদক পাওয়ার রেকর্ড নেই। এমনকি সাফ গেমসে দেশের হয়ে  সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত স্বর্ণপদকও তাঁর। ক্যারিয়ারের বেলা শেষে ১৯৮৭ সালে কলকাতায় তৃতীয় সাফ গেমসে ১০০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক এবং ৪ গুণন ২০০ মিটার ফ্রিস্টাইল ও ৪ গুণন ১০০ মিটার মিডলে রিলেতে রৌপ্যপদক লাভ করেন। এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য পেয়েছেন। কোথাও সাঁতার প্রতিযোগিতা আয়োজিত হলে তিনি সুস্থির থাকতে পারেন না। বয়স ও সামর্থ্য অনুসারে তাতে অংশ নিতে মোটেও দ্বিধা করেন না। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী জীবনেও প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারে অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করেন। তবে এশিয়ান গেমসে তাঁর কাছে পদক জয়ের প্রত্যাশা করা হলেও তা পূরণ হয়নি। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা সাঁতারু মোশাররফ হোসেন

জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার ক্যারিয়ারের উপান্তে দাঁড়িয়ে মোশাররফের মনে হঠাৎ প্রশ্ন জাগে, জগতবিখ্যাত ইংলিশ চ্যানেল-এর অনার বোর্ডে তো বাংলাদেশের নাম নেই। বাংলাদেশ কেন এই গৌরবের ভাগীদার হতে পারবে না? তিনি জানতেন, মুন্সিগঞ্জের সন্তান ব্রজেন দাস আর চাঁদপুরের আবদুল মালেক এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের নামের পাশে লেখা আছে 'পাকিস্তান'। এটা তাঁকে দারুণভাবে পীড়া দিতে থাকে। তাঁর ভাবনা হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশ নামটি কীভাবে সেখানে খোদাই করা যায়! এই ভাবনায় তাড়িত হয়ে ইংলিশ চ্যানেল জয়ের সংকল্প করেন অদম্য এই সাঁতারু। সাঁতার যাঁর কাছে অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস, বুকের মধ্যে যাঁর বাংলাদেশ, তাঁর জন্য এই চ্যানেল জয় করাটা খুব কঠিন মনে হয়নি। ১৯৮৮ সালের ২২ আগস্ট ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ১০ ঘণ্টা ১৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের প্রথম সাঁতারু হিসেবে তিনি এই গৌরব অর্জন করেন। ১৮৭৫ সালে ইংলিশ চ্যানেল সুইমিং শুরু হওয়ার পর চ্যানেল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের অনার বোর্ডে এই প্রথম স্থান করে নেয় বাংলাদেশ নামটি। এরপর বাংলাদেশের আর কারও এই অর্জন নেই। 

মোশাররফ হোসেন: জলে ও ডাঙায়

গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের পুকুরে সাঁতার কেটে দক্ষতা অর্জন করেন মোশাররফ। ১৪ বছর বয়সে পূর্ব পাকিস্তান আন্তঃস্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান সাঁতার প্রতিযোগিতার জুনিয়র গ্রুপে ৪টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে সবগুলোতে প্রথম হন। ১৯৭০ সালে আন্তঃকলেজ সাঁতার প্রতিযোগিতায় ৭টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে সব কটিতেই প্রথম হয়ে নজর কাড়তে সক্ষম হন। ১৯৭২ সাল থেকে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রায় নিয়মিতই অংশ নেন। প্রায় প্রতিবারই পেয়েছেন সর্বাধিক পদক। ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশ অলিম্পিক গেমসে ৭টি ব্যক্তিগতসহ সর্বাধিক ১০টি স্বর্ণপদক জয় করেন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতা থেকে অবসর নেন। ব্যক্তিগত ও রিলে দলের হয়ে জাতীয় সাঁতারে সব মিলিয়ে ৯১টি স্বর্ণপদক জয় করেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ইভেন্টে স্বর্ণপদক এসেছে ৭৮টি। এমন কৃতিত্ব আর কোনো ক্রীড়াবিদের নেই। বিস্ময়কর ব্যাপার, ব্যক্তিগত ইভেন্টে তাঁকে কেউ কখনো হারাতে পারেননি। কত যে রেকর্ড গড়েছেন, তার সঠিক হিসাব নেই। শুধু জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় তাঁর রেকর্ডের সংখ্যা ৬৬টি। মূলত নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙেছেন। 

সাঁতারে তাঁর টেকনিক, স্টাইল ও স্কিল ছিল চমৎকার। তাঁর সময়ে আধুনিক সাঁতারের কলাকৌশল শেখার জন্য তেমন কোনো সুযোগ বা প্রশিক্ষক ছিল না। তিনি ছিলেন সহজাত সাঁতারু। নিজের ইচ্ছাশক্তি, প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সাঁতার কেটেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, সাঁতার কাটাটা তিনি দারুণভাবে উপভোগ করতেন। সুইমিংপুলে নামার পর তিনি যেন মাছের মতো সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যেতেন। 

বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি মোশাররফকে ১৯৭৩ সালে সেরা সাঁতারু, ১৯৭৬ ও ১৯৮৫ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ এবং ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় সাফ গেমসের সেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত করে। তিনি ১৯৭৭ সালে 'জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার' এবং ১৯৮৬ সালে 'স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার' পেয়েছেন। এছাড়াও দেশে-বিদেশে অসংখ্যবার পুরস্কৃত ও সম্মানিত হয়েছেন। দীর্ঘ এক যুগ ছিলেন বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। 

বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা সাঁতারু হিসেবে তাঁর নামটি এখনো উচ্চারিত হয়। হয়তো তা রয়ে যাবে আরও অনেক দিন।

আরও পড়ুন:

ঢাকার মাঠে সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব 
মোহাম্মদ আলী যখন বাংলাদেশের 
আকাশি-নীলের উত্থান
বক্সাররাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের পথ-প্রদর্শক!
কাজী সালাউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার
অশ্রু আর বেদনা নিয়ে শুরু ক্রীড়াঙ্গনের যাত্রা