১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতা উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে ঢাকায় আসেন সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্র্যান্ডমাস্টার আনাতোলি লুতিকভ। তিনি ছিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বরিস স্পাসকির সমসাময়িক খেলোয়াড়। বাংলাদেশ সফরে আসা প্রথম কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার তিনি। সে সময় নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর মতোই সমাদৃত হতেন একজন গ্র্যান্ডমাস্টার। তাঁকে কেন্দ্র করে দাবানুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। এ দেশের দাবার উত্তরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সে সফরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। তারই অংশ হিসেবে পরের মাসে জাতীয় প্রেসক্লাবে পুরো দেশ হতে বাছাইকৃত ৩০ দাবাড়ুর সঙ্গে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তখনকার প্রেক্ষাপটে এটা ছিল অভিনব এক আয়োজন। লুতিকভ একে একে সবাইকে হারিয়ে দিলেও একজনের কাছে এসে তাঁকে থমকে যেতে হয়। নানান কৌশল প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে চেকমেট করতে চাইলেও তা সম্ভবপর হয়নি। তাঁর মতো বিশ্বখ্যাত একজন খেলোয়াড়কে রুখে দেন ক্ষুদে এক দাবাড়ু! বিস্ময়কর হলেও সত্য, তাঁর সঙ্গে একমাত্র নিয়াজ মোরশেদই ড্র করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ১০ বছরের কাছাকাছি। বাংলাদেশের দাবার অঙ্গনে এটি ছিল চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। দেশের তাবড় তাবড় দাবাড়ুরা হার মানলেও একজন গ্র্যান্ডমাস্টারের গতিরোধ করে দেন অখ্যাত এক কিশোর, তা দাবার ইতিহাসে অনন্য এক নজির হয়ে আছে। একইসঙ্গে দাবায় জন্ম নেয় নতুন এক নক্ষত্র। সেদিনই বোধ করি বাংলাদেশের দাবায় একটা পালাবদল ঘটে যায়। 

কিশোর নিয়াজ মোরশেদ

লুতিকভ ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করেন। তাতে নিয়াজও অংশ নেন। জহুরি যেমন জহর চেনেন, তেমনিভাবে নিয়াজের মধ্যে আগামী দিনের সম্ভাবনাময় একজন দাবাড়ু দেখতে পান তিনি। তাঁকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু টিপস এবং অটোগ্রাফসহ কয়েকটি দাবার বই ও ম্যাগাজিন উপহার দিয়ে যান। লুতিকভকে দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, নিয়াজ একদিন গ্র্যান্ডমাস্টার হবে। অথচ গ্র্যান্ডমাস্টার দূরে থাক, সে সময় বাংলাদেশের কোনো দাবাড়ুর আন্তর্জাতিক রেটিং পাওয়া ছিল সুদূরের স্বপ্ন। তখন থেকেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে নিয়াজের নাম। সহজাত মেধা ও প্রতিভা দিয়ে তিনি সবার নজর কাড়তে সক্ষম হন। প্রচারের সার্চ লাইটের আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকেন সাফল্যের পথে। স্বাভাবিক কারণেই বছর দুয়েকের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশের সেরা দাবাড়ুদের একজন। 

১৯৭৬ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একসঙ্গে ৩০ জন দাবাড়ুর সঙ্গে খেলছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্র্যান্ডমাস্টার আনাতোলি লুতিকভ। একমাত্র দশ বছরের নিয়াজকে (ডানে) তিনি হারাতে পারেননি

মাত্র ছয় বছর বয়সে বড় ভাইয়ের কাছে দাবায় হাতেখড়ি হয় 'গোগো' অর্থাৎ নিয়াজের। শুরু থেকেই দাবা বোর্ডের সামনে তিনি ছিলেন ধীর-স্থির-শান্ত স্বভাবের। খেলায় প্রতিফলন ঘটে তাঁর পরিণত মনের গড়ন ও গঠনের। শিশু বয়সেই মাথায় গেঁথে যায় হাতি, ঘোড়া, নৌকা, সৈন্য, মন্ত্রী, রাজার কৌশলী, বুদ্ধিদীপ্ত ও সূক্ষ্ম চাল। কোন চাল দিয়ে কাকে কীভাবে কিস্তিমাত করা যাবে, তার ছক যেন সাজানো ছিল তাঁর ক্ষুরধার মগজে। ধৈর্য, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, ধী-শক্তি, পরিকল্পনা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর বয়সীরা আনন্দ আর দুষ্টুমিতে মেতে থাকলেও তাঁর মনের জিমনেসিয়ামে স্থান করে নেয় কেবলই দাবা। সাদা-কালো চৌষট্টি খোপেই সাজিয়েছেন নিজের জীবনের আনন্দ-বেদনা। দাবা হয়ে ওঠে তাঁর আজন্ম ভালোবাসা। তখন তো দাবার হালফিল অবস্থা জানা ও শেখার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। বিদেশ থেকে বইপত্র এনে তিনি নিজেকে হালনাগাদ করতেন। আর এ ক্ষেত্রে পেয়েছেন পারিবারিক সমর্থন ও সহযোগিতা। সেন্ট যোসেফ স্কুলের ছাত্র হওয়ায় সেখানকার অনুকূল পরিবেশের কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি মেধার খেলা দাবায় তাঁর চর্চার পথ আরো সুগম হয়। ধীরে ধীরে সাফল্যের আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকেন।

খুব কম বয়সেই নিয়াজ জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ১৯৭৫ সাল থেকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে যান। ১৯৭৯ সাল থেকে টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন (পরবর্তীকালে আরো দুইবার ২০১২ ও ২০১৯ সালে শিরোপা জিতেছেন)। টানা জয়ের এই কৃতিত্ব আর কারও নেই। তখনও তিনি স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করেননি। কিন্তু অতিক্রম করেন সাফল্যের মাপকাঠি। নিজের দাবার গুরুকেও তিনি টেক্কা দিতে সক্ষম হন। তিনি যাঁর কাছে হাতে-কলমে জানতে পারেন দাবার আধুনিক কলাকৌশল, প্রতিবেশী সেই জামিলুর রহমান জাতীয় দাবায় প্রথম শিরোপা জয় করেন ১৯৮৩ সালে। অবিভক্ত ভারতের অন্যতম সেরা দাবাড়ু জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে অল্প বয়সেই ভারিক্কি চালে নিয়মিত দাবা খেলতেন।

জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে দাবা নিয়ে মগ্ন কিশোর নিয়াজ মোরশেদ

নিয়াজের সঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেনের যোগাযোগটাও অদ্ভুত। পত্রিকায় নিয়াজের প্রতিভার কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই এক বিকেলে তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হন। তিনি নিয়াজের সঙ্গে খেলতে এসেছেন শুনে নিয়াজের আম্মা তো হতভম্ব হয়ে যান। অশীতিপর বয়সের কাছাকাছি একজন প্রবীণ বাচ্চা একটা ছেলের সঙ্গে কী খেলবেন? বিব্রত অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য তিনি হাসি মুখে তাঁকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর পীড়াপীড়িতে হার মেনে নিয়াজকে তিনি ডেকে আনেন। মজার ব্যাপার, নিয়াজের সঙ্গে খেলে হেরে যান 'দাবাগুরু'। হেরে যাওয়াটা সাধারণত তিনি সহজে মেনে নিতে পারতেন না। কিন্তু এই পরাজয় তাঁকে অনেক আনন্দ দিয়েছিল। আবেগাপ্লুত কাজী মোতাহার হোসেন ছোট্ট নিয়াজকে বুকে নিয়ে বলেন, এই ছেলে একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। আসলে বয়স কোনো ফ্যাক্টর নয়। প্রতিভাই মিলিয়ে দেয় অসমবয়সীদের। অনেকটা 'চাইল্ড প্রডিজি' হিসেবে সবার মনোযোগ কেড়ে নেন নিয়াজ। অল্প বয়সেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি হয়ে ওঠেন আইকন। তাঁর চমকপ্রদ নৈপুণ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই দাবায় আকৃষ্ট হয়েছেন। কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। 

তখন তো আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে খুব বেশি সাফল্যের দেখা পাওয়া যেত না। অল্প যে কজন উজ্জ্বল করেন দেশের নাম, তিনি তাঁদের অন্যতম। বরং তাঁর সাফল্যে অনেক বেশি উদ্ভাসিত হয়েছে বাংলাদেশ। দাবার জগত তো অনেক বিস্তৃত। সেই জগতে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন লাল-সবুজ পতাকা। ১৯৭৯ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক আলেখিন স্মৃতি দাবা প্রতিযোগিতা দিয়ে শুরু হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পথ চলা। অভিষেক এই টুর্নামেন্টে সাব-জুনিয়র অনূর্ধ্ব-১৫ গ্রুপে সেরা হন। ঢাকায় প্রথম আন্তর্জাতিক রেটিং প্রতিযোগিতা সিলভার কিং দাবায় তিনি যুগ্মভাবে রানারআপ হয়েছেন। তার পর থেকে হাঁটতে থাকেন সাফল্যের পথে। ১৯৮০ সালে প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক রেটিং পয়েন্ট অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব দাবা প্রতিযোগিতার আঞ্চলিক বাছাইপর্বে যুগ্মভাবে রানারআপ হয়ে 'আন্তর্জাতিক মাস্টার' খেতাব অর্জন করেন। একই বছর এশিয়ান জুনিয়র দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে ফিলিপাইনের রিকার্ডো ডি গুজম্যানের সমান পয়েন্ট পেলেও টাইব্রেকিংয়ে রানারআপ হন। ১৯৮২ সালে ঢাকায় জিতেছেন ফেডারেশন আন্তর্জাতিক রেটিং দাবার শিরোপা। কিউ এম হোসেন আন্তর্জাতিক দাবায় চ্যাম্পিয়ন হন দু'বার (১৯৮২ ও ১৯৮৪ সাল)৷ ১৯৮৩ সালে যুগোস্লাভিয়ায় অনুষ্ঠিত বেলা ক্রোভা ওপেনে গ্র্যান্ড মাস্টার দাবায় রানারআপ এবং একই বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ৯ নম্বর জোনের বাছাই টুর্নামেন্টে যুগ্মভাবে রানারআপ হন। 

১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের লেস্টারশায়ারের পাবলিক স্কুল ওকহামের ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ইয়ং মাস্টার ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্ট। এই আয়োজনটি বিশ্ব জুনিয়র দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের চেয়েও বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অনূর্ধ্ব-২১ এই টুর্নামেন্টে অংশ নেন বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন বুলগেরিয়ার কিরিল জর্জিয়েভ, ইংল্যান্ডের জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন নাইজেল শর্ট, পরের বছর বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন ও গ্র্যান্ডমাস্টার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাক্সিম ডলুগি, পরবর্তী সময়ে গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব পাওয়া চেকোস্লোভাকিয়ার ইগর স্টহলের মতো সে সময়ের আলোচিত ৪০ জন তরুণ খেলোয়াড়। সবাইকে টেক্কা দিয়ে বাজিমাত করেন নিয়াজ। তিনি অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হন। তাঁর এই সাফল্য দাবার দুনিয়ায় বিস্ময় সৃষ্টি করে।

একই বছর হংকংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নোভাগ কমনওয়েলথ দাবায় ব্রিটিশ গ্র্যান্ডমাস্টার জোনাথন স্পিলম্যানের সঙ্গে যুগ্মভাবে তৃতীয় হন নিয়াজ। চ্যাম্পিয়ন-রানারআপের সঙ্গে তাঁদের ব্যবধান ছিল আধা পয়েন্ট। এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া তিন গ্র্যান্ডমাস্টারের দুজনকে হারিয়ে এবং একজনের সঙ্গে ড্র করে অপরাজিত থাকেন তিনি। প্রতিযোগিতায় একমাত্র তিনিই গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাবের একটি নর্ম অর্জন করেন। ফিদের ১০ নম্বর জোনে তিনিই প্রথম এই কৃতিত্ব দেখান। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় ক্যাপস্টান আন্তর্জাতিক রেটিং দাবায় চ্যাম্পিয়ন হন। দ্বিতীয় নর্ম অর্জন করেন ১৯৮৬ সালে, কলকাতায় অনুষ্ঠিত আলেখিন ক্লাব গ্র্যান্ড মাস্টার্স দাবা টুর্নামেন্টে। এই টুর্নামেন্টে ৬ জন গ্র্যান্ডমাস্টার অংশ নেন। তাঁদের দুজনের সঙ্গে তিনি জয়ী হন এবং চারজনের সঙ্গে ড্র করেন। চ্যাম্পিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্র্যান্ডমাস্টার জর্জি আগজামভের চেয়ে আধা পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে তিনি রানারআপ হন। টেকনিক্যাল কিছু সমস্যা দেখা দিলেও ১৯৮৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব দাবা সংস্থার সভায় তাঁকে গ্র্যান্ডমাস্টারের খেতাবে ভূষিত করা হয়। গোটা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, মঙ্গোলিয়া-তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত ১০ নম্বর অঞ্চলের ১৭টি দেশের মধ্যে নিয়াজই প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন। পুরো এশিয়া অঞ্চলে তাঁর আগে এই খেতাব ছিল মাত্র চারজনের। ২১ বছর বয়সে তিনি এই সাফল্য অর্জন করেন। এটি শুধু দাবা নয়, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ছিল অনেক বড় ঘটনা। ক্রীড়া বিশ্বে বাংলাদেশ নামটি প্রথমবার উচ্চারিত হয় তাঁর কৃতিত্বে। 

গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া নিশ্চিত করে ঢাকায় ফেরার পর নিয়াজকে ফুলেল সংবর্ধনা

দেশ-বিদেশে অসংখ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন নিয়াজ। এখনও নিচ্ছেন। এর খতিয়ান অনেক দীর্ঘ। তাতে কখনো সাফল্য পেয়েছেন, কখনো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। তিনি সব ভ্যারিয়েশনে খেলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ওপেনিংয়ে দুর্বলতা থাকলেও মিডল গেমে তিনি যথেষ্ট শক্তিশালী। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ দেশের দাবাকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন তিনি। তাঁর কারণে দাবা চর্চার প্রতি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয় তরুণ প্রজন্ম। এরই ধারাবাহিকতায় গ্র্যান্ডমাস্টার হন জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিব ও এনামুল হক। অনুপ্রাণিত হয়েছেন প্রথম মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার রাণী হামিদ। বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি ১৯৭৯ সালে তাঁকে সেরা দাবাড়ু এবং ১৯৮৩ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত করে। ১৯৮৯ সালে তিনি পেয়েছেন ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’।

নিয়াজের মধ্যে যে অফুরান সম্ভাবনা দেখা যায়, তাতে তাঁর আরো অনেক দূর যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর পুরো মনোযোগ দাবায় কেন্দ্রীভূত করেননি। যে কারণেই হোক তেমনভাবে সচেষ্ট হননি দাবানুরাগীদের প্রত্যাশা পূরণে। অথচ তাঁর পরে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে ভারতের বিশ্বনাথন আনন্দ নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা দাবাড়ু হিসেবে প্রমাণ করেন। হয়েছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নও। আর নিয়াজ যেন ক্রমশ মিইয়ে যেতে থাকেন।

আসলে দাবার সর্বোচ্চ খেতাব পাওয়ার পর নানান দিকে ছুটে যায় তাঁর মন। দীর্ঘদিন দাবার ছকে আবদ্ধ ছিল যে জগৎ, তা যেন হঠাৎ বাঁধনহারা হয়ে যায়। কত কিছুই না করেছেন! কোনোটা অর্থনৈতিক কারণে, কোনোটা শখের বশে। একবার সংগীতশিল্পী হওয়ার অভিলাষ নিয়ে ক্যাসেট প্রকাশ করেন। এ রকম অনেক বিষয় নিয়ে সময়ক্ষেপণ করায় দাবায় পুরোপুরিভাবে মনোনিবেশ করতে পারেননি। প্রায়শই দাবার অঙ্গন থেকে কখনো দূরে সরে যান। আবার ভালোবাসার টানে ফিরেও আসেন। এমন দোটানার কারণে তাঁর খেলায় ধারাবাহিকতা থাকেনি। অথচ দাবায় তো গভীর অভিনিবেশ ছাড়া লক্ষ্যে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তাঁকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখা হলেও সেটা পূরণ হয়নি। তা না হলেও বাংলাদেশের দাবাকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় ক্ষেত্রে নিয়াজ মোরশেদের কোনো তুলনা হয় না। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে তিনি যে বাংলাদেশের প্রথম 'পোস্টার বয়'--তা তো আর ভুলে যাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন.........
ঢাকার মাঠে সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব 
মোহাম্মদ আলী যখন বাংলাদেশের 
বক্সাররাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে পদক জয়ের পথ-প্রদর্শক!
কাজী সালাউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার
অশ্রু আর বেদনা নিয়ে শুরু ক্রীড়াঙ্গনের যাত্রা