গ্লাভসের মধ্যে স্কোয়াশ বল নিয়ে ব্যাটিং করা যায়? এর আগে জীবনে শুনিনি। শুনলাম চৌদ্দ বছর আগে ব্রিজটাউনে।

কোন ম্যাচের কথা বলছি, তা মনে হয় বুঝে ফেলেছেন। ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনাল। অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ম্যাচ, অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ.... চাইলে অনায়াসে 'স্কোয়াশ বলের ম্যাচ'-ও বলতে পারেন। ক্রিকেটের সঙ্গে স্কোয়াশ বল মেলালেই যে কারও বুঝে ফেলার কথা, ব্রিজটাউনের কেনসিংটন ওভালে ২০০৭ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা হচ্ছে। কথা হচ্ছে অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে নিয়ে।

গ্লাভসের মধ্যে স্কোয়াশ বল ভরে ব্যাটিং গিলক্রিস্টের আগে-পরে কেউ করেছেন বলে জানা নেই। সেঞ্চুরি করার পর গ্লাভস পরা বাঁ হাতটা একটু বিশেষভাবেই তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু প্রেসবক্স থেকে সরাসরি দেখে বা পরে টেলিভিশনে রিপ্লে দেখেও এর তাৎপর্য বুঝতে পারিনি।

কেউই আসলে বোঝেনি। ম্যাচ-সেরা হিসাবে প্রেস কনফারেন্সে এসে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট যখন সবাইকে তা বলছেন, তখনো অনেকেই প্রথমে তা বোঝেনি। স্বীকার করে নেওয়া ভালো, সেই 'অনেকের' মধ্যে আমিও ছিলাম। কীভাবে বুঝব, বলুন?

প্রথমত, গিলক্রিস্টের উচ্চারণের কারণে তাঁর কথা বুঝতেই হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর এমন একটা কথা বলছেন, যা কেউ কোনোদিন শোনেনি। যা শোনার পরও মনে সংশয় জাগতে বাধ্য, 'ভুল শুনলাম না তো?' গ্লাভসের মধ্যে গুড়াগাড়া কিছু ঢুকে গেলেই যেখানে ব্যাটিং করতে অস্বস্তি হয়, সেখানে স্কোয়াশ বলের মতো একটা গোলক গ্লাভসে নিয়ে কীভাবে ব্যাটিং করা সম্ভব?

সেটিও আবার এমন ব্যাটিং! ১০৪ বলে ১৪৯ রান, ১৩টি চার ও ৮টি ছয়। যা শুধু বিশ্বকাপ ফাইনালেরই সেরা নয়, ওয়ানডের সর্বকালের সেরা ইনিংসগুলোর ছোট তালিকারও ওপরের দিকেই থাকবে। মনে আছে, প্রেস কনফারেন্সে এসে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিকি পন্টিং ইনিংসটির বর্ণনায় ‘আনবিলিভেবল’ শব্দটা কতবার যে বলেছিলেন, তার কোনো হিসেব নেই। পরিষ্কার ঘোষণা করেও দিয়েছিলেন, 'আপনারা কেউ এর চেয়ে ভালো ইনিংস দেখেছেন কি না, জানি না। আমি দেখিনি।' অথচ ঠিক আগের বিশ্বকাপ ফাইনালেই পন্টিং নিজে খেলেছেন অপরাজিত ১৪০ রানের অসাধারণ এক ইনিংস, যা সৌরভ গাঙ্গুলীর ভারতকে ম্যাচ থেকে বের করে দিয়েছে।

সেদিন গিলক্রিস্ট এমন ব্যাটিংই করেছিলেন, হেইডেনকেও বড্ড ধীর মনে হচ্ছিল। ছবি: আইসিসি

গিলক্রিস্টের ‘অবিশ্বাস্য' ব্যাটিংয়ের কাছে নিজের সেই ইনিংসকেও তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছিল পন্টিংয়ের! ওই বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে অস্ট্রেলিয়া দল থেকে রিকি পন্টিং ও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ছাড়াও প্রেস কনফারেন্সে এসেছিলেন গ্লেন ম্যাকগ্রা। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, ম্যাথু হেইডেনও এলে খুব ভালো হতো। তিনিও কম মারতে পারেন না। কিন্তু এদিন গিলক্রিস্টের ব্যাটের ছটায় হেইডেন বলতে গেলে অদৃশ্যই হয়ে থাকলেন। ৫৫ বলে ৩৮ রানই বলে দিচ্ছে, স্বভাববিরুদ্ধভাবে গিলক্রিস্টকে স্ট্রাইক দেওয়াটাকেই তিনি তাঁর মূল কাজ বলে মনস্থির করে নিয়েছিলেন। গিলক্রিস্ট এমনই ব্যাটিং করেছেন যে, হেইডেন যেন মুগ্ধ দর্শক। একবার তো তার প্রকাশও হলো। গিলক্রিস্টের একটা শটের পর মাঝ উইকেটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। সচরাচর যা সেঞ্চুরির পর পার্টনাররা করে।

প্রায়ান্ধকারে শেষ হওয়া এক বিশ্বকাপ ফাইনাল

অথচ ওই বিশ্বকাপটা কিন্তু গিলক্রিস্টের খুব একটা ভালো যায়নি। ফাইনালের আগে ১০ ম্যাচে ৩০৪ রান, সর্বোচ্চ বাংলাদেশের বিপক্ষে অপরাজিত ৫৯। ওপেনিং পার্টনার ম্যাথু হেইডেন যেখানে ম্যাচের পর ম্যাচ রানের বন্যা বইয়ে দিয়ে দিয়েছেন, গিলক্রিস্টকে হয়ে থাকতে হয়েছে নীরব দর্শক। আর এদিন ১৭২ রানের ওপেনিং জুটিতে হেইডেনকেই দর্শক বানিয়ে রাখলেন গিলক্রিস্ট। ১৭২ রানে হেইডেনের অবদান মাত্র ৩৮। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৬৬ বলে সেঞ্চুরি করে বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির যে রেকর্ড গড়েছেন হেইডেন, সেটিও প্রায় ভেঙে দিচ্ছিলেন। ৬৪ বলে ৯৩ হয়ে গিয়েছিল, বাকি ৭ রান করতে আরও ৮ বল খেলতে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি হয়েছে ৭২ বলে। যাতে ৮টি চার ও ৬টি ছয়। গিলক্রিস্টের যখন ১০০, অস্ট্রেলিয়ার স্কোর মাত্র ১৪৮--অন্য প্রান্তে হেইডেনের মতো ব্যাটসম্যান থাকার পরও এই একাধিপত্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে বিশ্বকাপ ফাইনালের গিলক্রিস্টকে।

তাতে স্কোয়াশ বলের কী ভূমিকা, সেটি গিলক্রিস্টের নিজের মুখেই শুনুন: