একই শহরে থেকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্রায়ান লারার শেষ ইনিংসটি আমার মাঠে বসে দেখা হয়নি। ব্রিজটাউনের কেনসিংটন ওভালে লারা যখন শেষ ম্যাচ খেলতে নামছেন, আমি তখন ব্রিজটাউন এয়ারপোর্টে কিংস্টনের ফ্লাইটের অপেক্ষায়। যেখানে ২০০৭ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল। মোটেই গ্ল্যামারাস কোনো ম্যাচ নয়। ব্রায়ান লারার শেষ ম্যাচ বাদ দিয়ে শ্রীলঙ্কা-নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনাল কাভার করতে দুদিন আগেই কিংস্টন উড়ে যাওয়ার কোনো অর্থই হয় না। সেই 'অর্থহীন' কাজটাই করতে হচ্ছে, কারণ ভ্রমণসূচি চূড়ান্ত করার সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড ম্যাচটা এর চেয়েও বেশি অর্থহীন ছিল। বিশ্বকাপ থেকে দুই দলেরই বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় শুধুই আনুষ্ঠানিকতার ম্যাচ। সেটিই যে এমন তাৎপর্যবহ হয়ে উঠবে, তা কে জানত! 

দুদিন আগে নাটকীয়ভাবে যখন তা জেনেছি, ফ্লাইট চেঞ্জ করার আর উপায় নেই। শুধু নাটকীয় বললে কম বলা হয়। নাটকীয়তায় ভরা এক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণার ধরনটাকে বলতে হবে মহানাটকীয়। কেনসিংটন ওভালেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের পর বিজয়ী অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন। যেটির একেবারে শেষে এসে লারা হঠাৎই ঘোষণা করলেন, 'আগামী শনিবারের ম্যাচটিই হবে আমার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বোর্ডকে আমি তা জানিয়েও দিয়েছি।'

প্রথমে চমকে যাওয়ার পর আমার মনে যে প্রশ্নটা জাগল, সেটি সম্ভবত বাকি সাংবাদিকের মনেই জেগেছে। কী বললেন লারা–ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট না ওয়ানডে ইন্টারন্যাশনাল? মুহূর্তের মধ্যে এটাও মনে হলো, 'ওয়ানডে ইন্টারন্যাশনাল' হলে সেটি এমন ঘটা করে বলবেন কেন? বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তো জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়ানডে ক্যারিয়ার এখানেই শেষ। নিশ্চিত হতে আরও কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে আমিও তাই মঞ্চের সামনে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের মিডিয়া ম্যানেজার যে-ই নিশ্চিত করলেন, লারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেন, অমনি একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। সাংবাদিকেরা যতই পেশাদার হন না কেন, আগে তো তাঁরা খেলাপ্রেমী। তাঁদের চোখেও তো মুগ্ধতার মায়াঞ্জন বুলিয়ে দিয়েছে লারার ব্যাটিং। সবাই তাই একটু হতবিহ্বল। সেই ঘোরের মধ্যেই ঘোষণাটা দিয়েই উঠে দাঁড়ানো লারার দিকে অটোগ্রাফের জন্য কেউ খাতা বাড়িয়ে দিচ্ছেন, কেউ বা মিনিয়েচার ব্যাট। লারার মুখে তখন হাসি। সতের বছরের পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব ঘুচিয়ে দেওয়া ভারমুক্তির আনন্দ। সেই রাতে হিলটন হোটেলে লারাকে দেখেও এটাই মনে হয়েছিল। 

পরে বুঝতে পেরেছি, এই চমকটাই দিতে চেয়েছিলেন লারা। ভেবেচিন্তেই আসল কথাটা বলেছেন সংবাদ সম্মেলনের শেষে এসে। নইলে প্রথম প্রশ্নটাই তো ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে, মাঝপথে যেটি থামিয়ে দিয়ে বলেছেন, তিনি শুধু এই ম্যাচ নিয়েই কথা বলবেন। 

পরে সংবাদ সম্মেলনটা রিওয়াইন্ড করে দেখতে দেখতে মনে হলো, আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটা না হয় পরে দিয়েছেন, কিন্তু একটু খেয়াল করলেই আভাস পাওয়াটা অসম্ভব ছিল না। এখানেই শেষ—সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে এত বিস্তারিত বলবেন কেন! অন্য একটা প্রশ্নের জবাবে আপাত অপ্রাসঙ্গিকভাবে কেন বলবেন, 'খেলোয়াড় হিসাবে, মানুষ হিসাবে অনেকবারই আমাকে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এই মানসিক শক্তিটা আমি পেয়েছি আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে। এটা আমার রক্তে আছে।' 

সংবাদ সম্মেলন কক্ষে ঢুকে রামনরেশ সারওয়ান আগেই এসে গেছেন দেখে কেন বেরিয়ে যাবেন, মিডিয়া ম্যানেজারকে ডেকে নিয়ে কেন বলবেন, ‘আগে ম্যান অব দ্য ম্যাচেরটা শেষ হোক, এরপর আমি।‘ অধিনায়ক আর ম্যাচসেরার সংবাদ সম্মেলন একসঙ্গেই হওয়ার রীতি ভেঙে দেওয়ার কারণ হতে পারে একটাই---লারা চেয়েছেন, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটা দেওয়ার সময় সব আলো তাঁর ওপরই থাকুক। কীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান, এই প্রশ্নটাই বা কেন হয়েছিল ভেবে একটু অবাকই লাগছে। হয়তো আর এক ম্যাচ পরই ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাচ্ছে বলেই। যেটির জবাবে লারা বলেছিলেন, 'দর্শক গাঁটের পয়সা খরচ করে খেলা দেখতে আসে। আমি তাদের বিনোদিত করতে চেয়েছি।'

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮ রানে রান আউট হয়ে যাওয়ার পর সীমানা দড়ি পেরোনোর আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওই প্রশ্নটাও এ কারণেই, 'ডিড আই এন্টারটেইন ইউ?' টেলিভিশনে ওই দৃশ্য দেখে মাঠভর্তি দর্শকের সঙ্গে আমিও চিৎকার করে বলেছি, 'ইয়েসসসসসসসস!' 

শেষবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ব্রায়ান লারাকে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের গার্ড অব অনার। কেনসিংটন ওভাল, ব্রিজটাউন। ২০০৭ বিশ্বকাপ। ছবি: গেটি ইমেজেস

মন থেকেই বলেছি। ব্যাটিং যদি বিনোদন হয়, সেটি লারার চেয়ে বেশি কজনই বা দিতে পেরেছেন! যখন খেলা ছেড়েছেন, টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান তাঁর, সর্বোচ্চ ইনিংসও। প্রথমটি এখন সাত নম্বরে নেমে গেলেও দ্বিতীয় রেকর্ডটি এখনো লারারই আছে। যেমন আছে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বোচ্চ অপরাজিত ৫০১ রানের ইনিংসটাও। ৩৭৫, ৪০০, ৫০১—কী অত্যাশ্চর্য সব সংখ্যা। যেন-তেনভাবে তা করলেও স্মরণীয় হয়ে থাকতেন। কিন্তু লারার ব্যাটিং তো শুধু রান আর চার-ছয়ের ব্যাপার ছিল না। লারার ব্যাটিং ছিল কবিতা। ভালো কবিতার মতোই কিছু রহস্য, কিছু দুর্বোধ্যতা, কিছু অনির্বচনীয় অনুভব মিলিয়ে লারার ব্যাটিং দর্শককে নিয়ে যেত এক ঘোরের জগতে। সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান তিনি নন, ওই আসন থেকে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে দাপুটে ব্যাটসম্যানও না, তাঁরই পূর্বসুরি ভিভ রিচার্ডসকে সেই স্বীকৃতি দেওয়ার দলে আমি মোটেই একা নই। কিন্তু ব্র্র্যাডম্যান-রিচার্ডস কারও ব্যাটিং নিয়ে কখনো 'ঘোর', 'জাদু', মায়াবী', 'ইন্দ্রজাল' শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়নি। আর কারও ব্যাটিং নিয়েই বোধ হয় এতটা নয়।

শেন ওয়ার্ন ছাড়া আর কোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে এতটা কাটাছেঁড়াও হয়নি। বিতর্ক সব সময়ই ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছে লারার। তাঁর খেয়ালি চরিত্রের ভূমিকাও তাতে কম নয়। ব্যাট হাতে বিনোদন বিলানোটা সর্বজনীন। আমার লারা-অভিজ্ঞতায় আরও কিছু আছে, যা একান্তই আমার। সাংবাদিকতা জীবনে আর কোনো খেলোয়াড় আমাকে এমন বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। 

সনাৎ জয়াসুরিয়া ছাড়া আর কোনো ভিনদেশি ক্রিকেটারকে এতবার ইন্টারভিউ করিনি। দু’তিনজন মিলে কথা বলা বাদই দিলাম, ওয়ান টু ওয়ান ইন্টারভিউই তো চার-পাঁচটি হবে। এর কোনোটিই সহজে পাওয়া নয়। প্রতিটিতেই প্রচুর কাঠখড় পোড়ানোর গল্প আছে এবং প্রতিটি গল্পই আলাদা। ইন্টারভিউয়ের মাঝপথে রেগেমেগে উঠে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও উপহার দিয়েছেন একমাত্র লারাই। 

সেই গল্পটাই তাহলে আগে বলি। স্থান: স্যান্ডটন সান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, জোহানেসবার্গ। কাল: ২০০৩ সালের ৭ মার্চ। সাতসকালে উঠে ২০০৩ বিশ্বকাপে আইসিসির অফিসিয়াল হোটেলে যাওয়ার সময় আমার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ব্রায়ান লারা একেবারেই ছিলেন না। তিন দিন আগে শেষ হয়ে যাওয়া গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে তখনো দক্ষিণ আফ্রিকাতেই আছে, এটাই তো জানতাম না। হোটেলে ঢুকেই দেখি, লবিতে সোফায় বসে ব্রায়ান লারা। পাশের সোফায় বিশালদেহী যে তরুণ, তাঁর ডান পায়ের প্রায় পুরোটাতেই প্লাস্টার। সঙ্গে দুজন মেয়ে। কথা হচ্ছে আড্ডার মেজাজে। লারাকে দেখেই আমি দাঁড়িয়ে গেছি, মোটামুটি ভদ্রতাব্যঞ্জক একটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েই থাকলাম। যেখান থেকে কথাবার্তাও ভালোই শুনতে পাচ্ছি। যা শুনে বুঝলাম, ওই তরুণ ব্রায়ান লারার বিশেষ ভক্ত। কদিন আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যাওয়ার পরও লারার সঙ্গে দেখা করার লোভ সামলাতে পারেননি। যতই তিনি লারা হন, এমন নিবেদিত ভক্ত কার না ভালো লাগে! লারার মুখ থেকে হাসি তাই সরছেই না। 

আগে থেকে জানা ছিল বলে ব্রায়ান লারাকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলেন দর্শকেরা। কেনসিংটন ওভাল, ব্রিজটাউন। ২০০৭ বিশ্বকাপ। ছবি: গেটি ইমেজেস

কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর ছবি তোলার পালা। হোটেল লবিতে আলো একটু কম বলে বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। দুই বগলে ক্রাচে ভর করে উঠে দাঁড়ালেন ওই তরুণ। হোটেলের সামনে সিঁড়িতে বসে সেই ছবি তোলা হলো। পাগল ভক্তের প্লাস্টার করা পা কোলে তুলে নিয়ে সেখানে অটোগ্রাফও দিলেন লারা। দেওয়ার সময়ও মুখে ঝলমলে হাসি। দলটার পিছু পিছু আমিও বেরিয়ে এসেছি। লারার ভক্ত, তা তো বুঝেই ফেলেছি। একটা স্টোরি করব বলে ওই তরুণের নাম-পরিচয়ও জানা দরকার। তবে আসল উদ্দেশ্য অবশ্যই লারার একটা ইন্টারভিউয়ের চেষ্টা করা, এই বিশ্বকাপের সময়ই যে চেষ্টা করে দুবার ব্যর্থ হয়েছি। আজ লারা কথায় কথায় যেমন হাসছেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছে, দারুণ মুডে আছেন। আজ শিকে ছিঁড়তেও পারে। তিন জনের দলটাকে বিদায় দিয়ে লারা হোটেলে ঢুকতে যেতেই আমি পাশে  গিয়ে দাঁড়ালাম, "এর আগে দুবার ফিরিয়ে দিয়েছেন, আজ ইন্টারভিউ দিতেই হবে।" 
লারা আগেই আমাকে দেখেছেন, উত্তরটাও হয়তো ঠিক করে রেখেছেন তখনই, "আমার ইন্টারভিউ নিয়ে কী হবে? আই অ্যাম ফিনিশড্।"

‘আপনি ফিনিশড্ মানে…ওয়েস্ট ইন্ডিজ না হয় বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে, তাই বলে ব্রায়ান লারার গল্প কি শেষ নাকি!’

লারা আবারও বললেন, "আই অ্যাম ফিনিশড্। নো ইন্টারভিউ।"

শেষ চেষ্টা করতে আমার সম্পাদকের নাম ভাঙানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, "আমার পত্রিকার সম্পাদক তোমার খুব ভক্ত। বিশ্বকাপে আসার আগে আপনার একটা ইন্টারভিউ করতে বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন।"
ততক্ষণে আমরা হোটেলে ঢুকে গেছি। লারা একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন। একটু আগে যেখানে বসে ছিলেন, সেই সোফার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "লেটস্‌ সিট।"
আমার মনে তখন যুদ্ধজয়ের আনন্দ। এই বিশ্বকাপে আর কাউকে লারা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ দিয়েছেন বলে শুনিনি। শুধু এক্সক্লুসিভ না, মহা এক্সক্লুসিভ হতে যাচ্ছে এই ইন্টারভিউ। কে জানত, মিনিট চারেক পরই সেটির এমন অপমৃত্যু ঘটবে!

শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যর্থতা নিয়ে প্রথম প্রশ্নটার এমন বিস্তারিত উত্তর দিলেন, তাতে এমন আবেগ মিশে থাকল যে, ইন্টারভিউটা দারুণ হবে ভেবে আমি রোমাঞ্চিত। ঠিক করে ফেললাম, এটি গতানুগতিক কোনো ইন্টারভিউ হবে না। কবে কোন পারফরম্যান্স করেছেন, এ সব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমি নিজেই তো এই জাতীয় দুই/তিনটি ইন্টারভিউ করে ফেলেছি। তাহলে আজকের ইন্টারভিউটার বিষয় হোক, একজন গ্রেট ব্যাটসম্যানের মন-মানসিকতা বোঝার চেষ্টা।

এরই সূচনাপর্ব পরের প্রশ্নটা। যেটি আমার মনে অনেক দিনই ঘুরপাক খাচ্ছে। লারা-টেন্ডুলকারের মতো অসাধারণ খেলোয়াড়দের নিজেরা ভালো খেলার পরও সতীর্থদের ব্যর্থতায় যখন পরাজয়ের বিস্বাদ নিতে হয়, কেমন লাগে তখন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য লারার চেয়ে ভালো আর কে হতে পারেন! এই অভিজ্ঞতা ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁরই তো সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ওই ইন্টারভিউ নেওয়ার বছর দুয়েক আগে শ্রীলঙ্কা সফর যেটির সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ। তিন টেস্টে নিজে ৬৪৮ রান করার পরও লারা দেখলেন, সিরিজের ফল: শ্রীলঙ্কা ৩-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ০। একটা টেস্টে তো দুই ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরি করার পরও হারতে হয়েছে ১০ উইকেটে। লারা একা করেছিলেন ৩৫১ রান, দলের বাকি দশজন মিলে এর ৪০ রান কম। সাধারণদের সঙ্গে অসাধারণদের টিম গেম খেলার যন্ত্রণার লাইনেই তাহলে ইন্টারভিউটা হোক।

বিদায় ক্রিকেট! আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন ব্রায়ান লারা। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুধু ওই বিশ্বকাপের কথা হচ্ছে ভেবে লারা প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই উত্তরটা দিলেন, "না, এই টুর্নামেন্টে সতীর্থদের কারণে আমাকে হতাশায় পুড়তে হয়নি। আমি নিজেই ভালো পারফর্ম করতে পারিনি।"

লারাকে বুঝিয়ে বললাম, শুধু এই বিশ্বকাপের কথা হচ্ছে না। আমি বলছি তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের কথা। উদাহরণও দিলাম, আপনি যেমন গলফ খেলতে খুব পছন্দ করেন, কখনো কি এমন মনে হয়েছে, ক্রিকেটের মতো টিম গেম না খেলে গলফ-টেনিসের মতো ইনডিভিজুয়াল খেলা খেললেই ভালো হতো, তাতে নিজের ভাগ্য নিজের হাতেই থাকত? লারা প্রশ্নটা শেষ হতে দিলেন না। তার আগেই জবাব দিলেন,‌”আমি অনেক দিন গলফ খেলিনি। আমি ক্রিকেট খেলতেই ভালোবাসি। টিম গেম খেলতেই ভালোবাসি। টিম গেমের পরিবেশটাই আমার পছন্দ।"

এতক্ষণ সপ্রতিভ কণ্ঠটা শীতল শোনানোতেই আমার সাবধান হওয়া উচিত ছিল। হলামও। কিন্তু সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। একবারেই সরল পরের প্রশ্নটাতেও লারা অন্য অর্থ খুঁজে পেলেন। লারার দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতেই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপটা দারুণভাবে শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজই মাত্র ২৪১ রান তাড়া করতে নেমে ২০ রানে হেরে বসেছে। তখন একেবারেই নতুন রিলে ফিল্ডিংয়ে ২ রানে লারার রান আউট হয়ে যাওয়াটাই প্রমাণিত হয়েছে টার্নিং পয়েন্ট বলে। ওই ম্যাচে পরাজয় পরে সুপার সিক্সে উঠতে না পারায় নির্ধারক হয়ে দাঁড়ানোয় আরও তাৎপর্যবহ হয়ে উঠেছে। আমি তাই সরল মনে প্রশ্ন করলাম, লারাও তাঁর রান আউটটিকে এই বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করেন কি না। লারার কণ্ঠ আরও শীতল, "না, আমি সেটিকে টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করি না।" 

লারা মনে না করলেই হবে নাকি, বাকি সবাই তো এ ব্যাপারে একমত। সর্বজনগ্রাহ্য মতের সঙ্গে লারার মতও  একমত বলে স্বীকার করাতে আমি তাই নাছোড়বান্দার মতো বললাম, ‘কিন্তু ওই রান আউটটিই তো ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছিল....‘। লারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাটা কাটা স্বরে বললেন, "ক্রিকেট টিম গেম। আমরা টিম হিসাবেই ভালো খেলতে পারিনি।" বলেই সটান উঠে দাঁড়ালেন। 

কী ব্যাপার, ইন্টারভিউ তো মাত্রই শুরু হলো! 

থমথমে মুখে লারা জবাব দিলেন, "আপনার প্রশ্ন আমার পছন্দ হচ্ছে না।"

বলতে বলতে লিফটের দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। আমি পিছু নিয়ে যে-ই কিছু বলতে গেছি, লারা ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন জোরে ‘এক্সিকিউজ মি’ বলে চিৎকার করে উঠলেন যে, হোটেলের নিরাপত্তারক্ষীরা পর্যন্ত সচকিত হয়ে উঠল। আমি প্রমাদ গুণলাম। য পলায়তি, স জীবতি। ইন্টারভিউ-টিন্টারভিউ বাদ দিয়ে আমি তখন মানসম্মান নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচি।

লারা লিফটে উপরে উঠে গেলেন। আমি হোটেলের সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। লারার অমন রেগে যাওয়ার কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছি না। আমার প্রশ্নে তো আক্রমণাত্মক কোনো সুরই ছিল না। লারা নিজেও জানেন, সাংবাদিক হয়েও আমি তাঁর ব্যাটিংয়ের বিশেষ ভক্ত। তাহলে এমন অবিশ্বাস্য একটা কাণ্ড করলেন কেন?

নিজের রুমে ফিরে ক্যাসেটটা রিওয়াইন্ড করে চার/পাঁচ মিনিটের ওই কথপোকথন শুনছি, তা শুনতেই শুনতে সম্ভাব্য একটা কারণ খুঁজে পেলাম। লারা ওই বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ফিরেছিলেন পাঁচ মাস বিরতির পর। ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কায় চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেঞ্চুরি করার পর সেই রাতেই রহস্যজনক এক অসুস্থতায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এরপর থেকেই ছিলেন দলের বাইরে। বিশ্বকাপের দল ঘোষণার আগে লারাকে বাইরেই রাখার একটা আন্দোলনমতো শুরু হয়েছিল, যেটির নেতৃত্বে ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রভাবশালী ক্রিকেট লেখক টনি বেক্কা। 

তা লারার অপরাধ কী? বেক্কা দাবি করেছিলেন, লারা শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের প্রতি তাঁর কোনো কমিটমেন্ট নেই। যত বড় ব্যাটসম্যানই হোন না কেন, লারা দলের জন্য ক্ষতিকর। লারা এমনিতেই অসম্ভব স্পর্শকাতর আর এটা তো একেবারে মর্মে আঘাত। এই ক্ষত নিয়েই বিশ্বকাপে এসেছিলেন লারা। বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় যা একই রকম দগদগেই থেকে গেছে। টিম গেম আর ইন্ডিভিজুয়াল গেম নিয়ে আমার প্রশ্ন থেকে লারা আমাকে নির্ঘাত টনি বেক্কার দলের লোক বলে ভেবে নিয়েছেন। নিজের অজান্তেই আমি কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিয়ে ফেলেছি।

ব্রায়ান লারাকে সর্বশেষ ইন্টারভিউ করার পর। ২০১৩ সালে এই ইন্টারভিউ করতে যেতে হয়েছিল চট্টগ্রামের গহিরায়। বিপিএলের দল চিটাগং কিংসের মালিকের বাড়িতে। ছবি: মো, মানিক

ওই ঘটনার পর আর কোনোদিন লারার ইন্টারভিউ পাব বলে ভাবিনি। কিন্তু ঠিকই পেয়েছি। তার চেয়েও আশ্চর্য হয়েছিলাম, পরের বছরই বাংলাদেশ দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ট্যুরে লারা যখন আমাকে হাসিমুখে ক্যারিবিয়ানে স্বাগত জানালেন।

ওয়ানডে সিরিজে খেলেননি। টেস্ট সিরিজে তিনিই ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক। সেন্ট লুসিয়ার প্রথম টেস্টের আগের দিন প্র্যাকটিসে দেখা হতেই একটু ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘ওয়ানডে সিরিজে আপনাকে মিস করেছি।‘ উত্তরে হাসিমুখে লারার ‘ওয়েলকাম টু দ্য ক্যারাবিয়ান’ শুনে একটু অবাকই হলাম। আমি তো ভেবেছিলাম, জোহানেসবার্গের ওই ঘটনায় লারা এমন রেগে আছেন যে, জীবনেও আর আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। আমি তাই জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, ‘ডু ইউ রিমেম্বার মি?’

লারা অর্থপূর্ণ একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘অফ কোর্স। হাউ ক্যান আই ফরগেট ইউ?’

কথাটার দুই রকম অর্থই হয়। আমি তাই খুশি হব না চিন্তিত, ঠিক বুঝতে পারলাম না। সাংবাদিক হিসাবে লারা আমাকে মনে রাখলে তো ভালোই। আবার স্যান্ডটন সান হোটেলের ওই ঘটনা ‘ফরগেট’ করে ফেললেই আমার জন্য সুবিধা। 

ওই ট্যুরে এরপরও অনেকবার কথা হয়েছে। তবে ইন্টারভিউয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত আর দেননি। তবে লারার সবচেয়ে বড় ইন্টারভিউটা এরপরই করা। তা অবশ্য আরও অনেক দিন পর, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে যখন তিনি বিপিএলের দল চিটাগং কিংসের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে এসেছিলেন। 

 লারার সেই ইন্টারভিউ:  'আমি ছিলাম বিনোদনের ফেরিওয়ালা'

সেই ইন্টারভিউ পাওয়াটাও বিরাট এক গল্প। তা অন্য কোনো এক সময় বলা যাবে। শুধু এটুকু বলি, সেই ইন্টারভিউ করতে আমাকে ছুটে যেতে হয়েছিল চট্টগ্রামের গহিরায়। ১৯৯৫ সালে শারজায় প্রথম ইন্টারভিউটাও তো তা-ই। বলতে গেলে প্রায় দশ দিন লারার পেছনে ঘুরে পেয়েছিলাম তখন সব সাংবাদিকের পরম প্রার্থিত সেই ইন্টারভিউ। পরম প্রার্থিত, কারণ টেস্ট ও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড ভেঙে ব্রায়ান লারা তখন বিশ্ব ক্রিকেটের অবিসংবাদিত এক নম্বর তারকা।

শারজার সেই ইন্টারভিউয়ের গল্প  চাকরি চলে যাবে বলে পাওয়া লারার সেই ইন্টারভিউ

ব্রায়ান লারাকে নিয়ে আমার শোনা সেরা গল্পটাতে আছেন রামনরেশ সারওয়ানও (বাঁয়ে)।

ব্রায়ান লারার আত্মজীবনী পড়েছি, তাঁকে নিয়ে অন্য অনেকের লেখাও। অন্য ক্রিকেটার ও সাংবাদিকদের মুখে অনেক গল্পও। ক্রিকেটিং গল্পগুলোর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পটা বলে লেখাটা শেষ করি। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট চলছে। লারার সঙ্গে ব্যাটিং করছেন রামনরেশ সারওয়ান, যিনি মুত্তিয়া মুরালিধরন কোনটা অফ ব্রেক মারছেন আর কোনটা দুসরা, তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছেন না। লারা বল ছাড়ার সময় মুরালির রিস্ট পজিশনের পার্থক্য বুঝিয়ে বলার পরও না। এর মধ্যেই লারা স্ট্রাইক পেলেন। মুরালিকে একটা ছক্কা মেরে সারওয়ানকে এসে বললেন, "এই বলটা ছিল দুসরা।"