ইন্টারভিউ হয়ে যাওয়ার পরই রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করল আমার ওপর। অনেক দিনের ইচ্ছে আর নয়-দশ দিনের প্রাণান্তকর চেষ্টার ফসলটা ধরা আছে আমার হাতের মুঠোয়, মিনি টেপ রেকর্ডারটিতে–এটা যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। খানিকটা অবাক করা এই অনুভূতির কারণও আছে, সিঙ্গার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জন্য শারজা পৌঁছুলাম ১০ অক্টোবর। ইন্টারভিউটা হলাে ফাইনালের আগের দিন, ১৯ অক্টোবর। এর মধ্যে অনেকবারই আশা ছেড়ে দিয়েছি এর, সত্যি মনে হয়েছে প্রেসবক্সে সাংবাদিকদের কথা, শুধু শুধুই ঘুরে মরছি বলে রাগ হয়েছে নিজের ওপর। রাতে প্রতিজ্ঞা করে শুয়েছি, কাল থেকে আর এর পেছনে একটুও সময় নয়, ম্যাচ শেষে রিপাের্ট পাঠিয়ে বরং ঘুরে বেড়াব শারজা-দুবাই। কিন্তু সকালে উঠে ভুলে গেছি সেই প্রতিজ্ঞা। সারা দিন ম্যাচ দেখা, এরপর রিপাের্ট লেখার ক্লান্তির পরও আবার পিছু নিয়েছি ব্রায়ান লারার।

নিরাশ করে দেওয়ার মতো খবর অবশ্য নিয়মিতই কানে আসছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খবরটা হলাে-খেলােয়াড়দের অনেকেই এক্সকুসিভ ইন্টারভিউয়ের জন্য টাকা নেন, লারাও নাকি তা নিতে শুরু করেছেন। অস্বাভাবিক কিছু নয়, বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটে মিডিয়ার কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত খেলােয়াড় তো সুযোগটা নিতেই পারেন। আগের বছর টেস্টে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভেঙেছেন, কিছুদিন পরই ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে পা রেখেছেন পাঁচ শ রানের শৃঙ্গে। ব্রায়ান লারার ইন্টারভিউ পেলে বিশ্বের যেকোনো পত্রিকাই তো এখন বর্তে যায়। 

লারার সঙ্গে সরাসরি কথা বলে অনুরােধ করব, এই পরিকল্পনা অবশ্য সফল হলাে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকেই। ১১ অক্টোবর শ্রীলঙ্কা-ওয়েস্ট ইন্ডিজ উদ্বোধনী ম্যাচের পর রিপাের্ট পাঠিয়ে সন্ধ্যার পর 'হলিডে ইন' হােটেলে গেছি বাসিত আলীর ইন্টারভিউ করতে। বাসিত রুমে নেই, তাই অপেক্ষা করছি লবিতে বসে, লিফটের মুখােমুখি এক সােফায়। হঠাৎ লিফট থেকে বেরিয়ে এলেন লারা, সঙ্গে উইকেটকিপার কোর্টনি ব্রাউন। পিছু নিয়ে হােটেলের বাইরে ধরলাম, পরিচয় দিয়ে করুণ কণ্ঠে বললাম, 'শারজা আসার মূল কারণ, আপনার একটা ইন্টারভিউ করা। টুর্নামেন্ট চলাকালীন যেকোনো দিন দশ/পনের মিনিট সময় দেওয়া কি সম্ভব?'

হাঁটতে হাঁটতে লারা জবাব দিলেন, ‘ম্যানেজারের অনুমতি লাগবে।'

'ম্যানেজার অনুমতি দিলে কি আপনি ইন্টারভিউ দেবেন?'

'আগে অনুমতি নিন, তারপর আমার কাছে আসুন' বলে গাড়িতে উঠে বসলেন লারা। খুশি হতে গিয়েও সঙ্গে সঙ্গেই নিভে গেলাম আমি। সহসাই বুঝতে পারলাম, ম্যানেজারের অনুমতিটা নিশ্চয়ই এড়ানাের একটা কৌশল। ম্যানেজারকে হয়তাে বলাই আছে অনুমতি না দেওয়ার জন্য। উইন্ডিজ ম্যানেজার অ্যান্ডি রবার্টসের কাছে শুরুতেই লারার ইন্টারভিউয়ের জন্য অনুমতি না চেয়ে তাঁর একটা বড় ইন্টারভিউ করে, ইগােবর্ধক নানারকম কথাবার্তা বলে শেষে আসল প্রসঙ্গে আসব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু সেজন্য বেশ খানিকটা সময় প্রয়োজন। সেটাই দিচ্ছিলেন না রবার্টস।

সন্ধ্যার পর খানিকটা সময় চাইতেই বললেন, 'আফটার ইভেনিং, নাে ক্রিকেট।' পরদিন (১৫ অক্টোবর ১৯৯৫) পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচের সময় কথা বলতে রাজি হলেন। কিন্তু ম্যাচ চলার সময় রবার্টস এমন গভীর মনঃসংযােগে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকেন যে, তাঁকে বিরক্ত করতেই অস্বস্তি হয়। লাঞ্চের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ব্যাট করতে নামল, গেলাম তাঁর কাছে। 'ইনিংসের শুরুতে নয়, কিছুক্ষণ পর'-রবার্টসের এ কথার পর বললাম, 'আপনার সময়মতাে আমাকে ইশারা করবেন আপনি।' প্লেয়ার্স লাউঞ্জের পাশেই প্রেসবক্সে বসে বারবার রবার্টসের দিকে তাকাচ্ছি। কই, তিনি তো আর ডাকেন না। গভীর মনোযোগে খেলা দেখছেন। ম্যাচ শেষ হতেই আবার ছুটে গেলাম তাঁর কাছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম জয় পেয়েছে টুর্নামেন্টে, এমনিতে সব সময়ই গম্ভীর রবার্টস তাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে। দেখেই বললেন, 'স্যরি, স্যরি, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, ইনভলভ হয়ে গিয়েছিলাম খেলায়। আগামীকাল আমি অবশ্যই কথা বলব তােমার সঙ্গে।'

'আগামীকাল' অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই অবিস্মরণীয় ম্যাচটির প্রথমার্ধে তাে রবার্টসের কাছে যাওয়ার সময়ই দিলেন না ব্রায়ান লারা। ১৬৯ রানের ওই ইনিংসটি যখন খেলছেন তিনি, এক মুহূর্তের জন্যেও মাঠ থেকে দৃষ্টি সরাতে মন চায়নি। লাঞ্চের পর অনেকক্ষণ কথা বলার ইচ্ছে নিয়ে বসলাম রবার্টসের পাশের চেয়ারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছে ৩৩৩ রান, ম্যাচ তাে শেষই, বেশ নিশ্চিন্ত আমি। রবার্টসেরও তা-ই থাকার কথা। কিন্তু কথা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল মহানামা ও জয়াসুরিয়ার বেধড়ক মার। মিনিট পাঁচেক কথা বলার পরই রবার্টস বললেন, 'ওকে?' আর একটু সময় চাইতেই বললেন, 'আমি এখন খেলা দেখব।' লারার প্রসঙ্গে আসার সুযােগই হলাে না।

টুর্নামেন্ট শেষে অফিসিয়াল ডিনারে ব্রায়ান লারার সঙ্গে। অক্টোবর, ১৯৯৫

আরেকটা পথেও চেষ্টা চলছিল। শারজায় ক্রিকেট সরঞ্জামের দোকান এ জে স্পাের্টস। ক্রিকেটারদের সেখানে নিত্য যাওয়া-আসা। মালিকদের সঙ্গেও খুব ভালো সম্পর্ক। সিবিএফএস'র অফিসিয়াল স্কোরার মােহাম্মদ আলী জাফরির সঙ্গে খুব খাতির হয়ে গিয়েছিল। এ জে স্পাের্টসের মালিক আলী ব্রাদার্সদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বড়। তাঁর ছােট ভাই আলী আনােয়ারও সিবিএফএসে কাজ করেন। আলী জাফরি কথা দিলেন, ব্যবস্থা করে দেবেন। আলী আনোয়ারের পরিচয়ও করিয়ে দিলেন। ১৬ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের পর লারার সঙ্গে কথা বলে এসে আলী আনােয়ার সুসংবাদ দিলেন, পরদিন ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়েছেন লারা, বলেছেন হােটেলে যােগাযােগ করতে।

পরদিন পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। যারা জিতবে, তারাই উঠে যাবে ফাইনালে। এই ম্যাচে একটা চোখ রেখে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বার দশেক লারার রুমে ফোন করলাম। প্রতিবারই রিসেপশন থেকে একই উত্তর, 'লারা রুমে নেই। সকালে উঠেই চলে গেছেন গলফ কোর্সে।' ১৮ ও ১৯ অক্টোবর ছিল ফাইনালের আগে দুদিন বিরতি। ১৮ অক্টোবর সকালে স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখি, আর কোনো সাংবাদিক ওমুখাে হননি সেদিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্র্যাকটিসে গিয়ে ডুবে যেতে হলাে হতাশায়, সবাই আছে, শুধু যাঁর জন্য এই ছুটির দিনে সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে আসা, সেই লারাই নেই।

ইন্টারভিউটা আর হবেই না-এটা যখন মােটামুটি মেনে নিয়েছি, তখন তিনি এলেন, চোখে তখনাে ঘুম। এলেন ঠিকই, কিন্তু কথা বলার কোনাে সুযােগই পেলাম না। তবুও একটা শেষ চেষ্টা করে দেখার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দ্বারস্থ হলাম অ্যান্ডি রবার্টসের। সেদিনের সেই ছােট্ট ইন্টারভিউটির পর দেখা হলে হেসেছেন সাবেক ফাস্ট বােলার, কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন। সেসবই একটু আশা যোগাচ্ছে। প্র্যাকটিস শেষে সবাই যখন ড্রেসিংরুমে ঢুকেছে, তখন ধরলাম অ্যান্ডি রবার্টসকে। 'আমি আপনার কাছে একটা ফেভার চাইব' –এ কথা শুনে জিজ্ঞাসু মুখে দাঁড়িয়ে গেলেন রবার্টস। মিথ্যা বলা মহাপাপ, তবে ইন্টারভিউ পাওয়ার জন্য মিথ্যা বলায় দোষের কিছু নেই -অনেক আগেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি আমি।

'আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ' শুনে বললেন, 'সেখানে অনেক ক্রিকেটার খেলতে যায় শুনেছি।' কিন্তু ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে কিছুই না বলে উঠে গেলেন মার্সিডিজে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্য খেলােয়াড়রা হােটেলে ফিরবেন বলে বাসে উঠছেন, তিনি একা যাচ্ছেন দুবাই।

অবলীলায় তাই রবার্টসকে বলে গেলাম, 'আপনি জানেন, আমি বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক, আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকাগুলাে সচরাচর বাইরে রিপাের্টার পাঠায় না। এটাই আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। আমি যদি বিশেষ কিছু না করতে পারি, তাহলে আর কোনাে দিন সুযােগ পাব না।'

'কী চান আপনি?' অ্যান্ডি রবার্টসের চোখমুখ নরম হয়ে উঠেছে দেখে খানিকটা আশান্বিত হলাম।

'লারার একটা ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে যদি একটু সাহায্য করেন। ওকে বলেছিলাম, ও বলেছে, আপনার অনুমতি পেলেই ইন্টারভিউ দেবে।' 

অ্যান্ডি রবার্টস মাথা নাড়লেন, 'খুবই কঠিন। খুবই কঠিন। লারার ইন্টারভিউ পাওয়াটা সহজ হবে না। ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করে দেখি।'

নরম মুখ শক্ত বানিয়ে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেলেন অ্যান্ডি রবার্টস। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। ড্রেসিংরুমেই শাওয়ার সেরে পােশাক পাল্টে কালাে জিন্স আর সাদা টি-শার্ট পরা লারা বেরিয়ে এলেন কিছুক্ষণ পর। না, আমাকে ইন্টারভিউ দিতে নয়, সােজা হাঁটা শুরু করলেন গাড়ির দিকে। পাশে গিয়ে বললাম, আপনি বলেছিলেন ম্যানেজারের অনুমতি নিতে, আমি ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছি। এজে স্পোর্টসে আলী আনোয়ারের কথা বলে এটাও মনে করিয়ে দিলাম যে, আগের দিন হােটেলে যোগাযােগ করতে বলেছিলেন।

এর মধ্যেই 'আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ' শুনে বললেন, 'সেখানে অনেক ক্রিকেটার খেলতে যায় শুনেছি।' কিন্তু ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে কিছুই না বলে উঠে গেলেন মার্সিডিজে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্য খেলােয়াড়রা হােটেলে ফিরবেন বলে বাসে উঠছেন, তিনি একা যাচ্ছেন দুবাই। আমি দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির পাশে, অ্যান্ডি রবার্টস বাসে ওঠার পথে লারার গাড়ির পাশে থেমে গিয়ে বললেন, 'ওর কথাই তােমাকে বলেছিলাম। একটু সময় দিয়ে দাও।'

আমি তো ভাবলাম, কাজ হয়ে গেছে। কিসের কী! ম্যানেজারের কথা এভাবে অগ্রাহ্য করতে আমি আর কাউকে দেখিনি। 'এখন সম্ভব নয় । কাল কোনাে এক সময়'-জবাব দিয়ে জানালার কাচ তুলে দিলেন লারা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ম্যানেজার অ্যান্ডি রবার্টস শুধু অনুমতিই দেননি, লারাকে অনুরোধও করেছিলেন আমাকে ইন্টারভিউ দিতে। লারা পাত্তাই দেননি

'কোনাে এক সময়'টা ইন্টারভিউ পাওয়ার জন্য মােটেই আশাপ্রদ প্রতিশ্রুতি নয়। তারপরও অন্তত প্রতিশ্রুতিটা পাওয়া গেছে বলে খানিকটা আশা জেগে থাকল মনে। পরদিন সকাল আটটায় হােটেলে ফোন করলাম, লারা রুমে নেই। জানলাম, দশটায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের প্র্যাকটিস। দশটায় স্টেডিয়ামে গিয়ে শুনি, লারা টিমের সঙ্গে আসেননি, সম্ভবত আগের রাতে হােটেলে ছিলেন না, আধঘণ্টা আগেই একা চলে এসেছেন স্টেডিয়ামে। আফসােসে মরে যেতে ইচ্ছে হলাে। আগে এলেই তো একা পাওয়া যেত লারাকে!

যা হােক, ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্র্যাকটিস শুরু করতে করতে শ্রীলঙ্কার প্র্যাকটিস প্রায় শেষ। নেট প্র্যাকটিসটা হয় মূল মাঠের ঠিক বাইরে, ফিল্ডিং প্র্যাকটিসটা মাঠেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফিল্ডিং প্র্যাকটিসের প্রস্তুতি নিচ্ছে।  লারার একেবারে পাশে গিয়ে বসলাম, 'আপনি আজ ইন্টারভিউ দেবেন বলেছিলেন।' হাতখানেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আমার কথা যেন শুনতেই পেলেন না লারা, দূরে দাঁড়ানাে অরবিন্দ ডি সিলভার সঙ্গে হাতের ইশারায় কী যেন ভাব বিনিময় করলেন, তারপর আমাকে পুরাে অগ্রাহ্য করে ঘুরেই দৌড় লাগালেন এর মধ্যে খানিকটা এগিয়ে যাওয়া দলের বাকি খেলোয়াড়দের ধরতে। এই প্রথম হতাশার সঙ্গে সঙ্গে একটা অপমানের বােধও আচ্ছন্ন করে ফেলল আমাকে।

ইচ্ছে হলাে চিৎকার করে বলি, 'ওরে মিথ্যেবাদী শয়তান, কাল যে তুই বলেছিলি, আজ ইন্টারভিউ দিবি।' বললামও। তবে মনে মনে। লারা ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করেছেন, পুরাে মাঠটা পার হয়ে যেতে হবে নেটের দিকে । দ্রুত পায়ে হেঁটে ধরলাম লারাকে।

অনেক হয়েছে, আর নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যখন প্রায় নিয়েই ফেলেছি, তখনই দেখলাম, মাঠ থেকে লারা ড্রেসিংরুমের দিকে আসছেন। একা। বাকি খেলােয়াড়েরা তখন রওনা হয়ে গেছে নেটের দিকে। এত কষ্ট করলাম, আরেকবার একটা চেষ্টা করেই দেখি –এই ভেবে ড্রেসিংরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলাম, মিনিট দশেক পর লারা বেরােলেন, আমি কাছে যেতেই ঘােষণা করলেন, 'আই ডােন্ট গিভ ইন্টারভিউ।'

ইচ্ছে হলাে চিৎকার করে বলি, 'ওরে মিথ্যেবাদী শয়তান, কাল যে তুই বলেছিলি, আজ ইন্টারভিউ দিবি।' বললামও। তবে মনে মনে। লারা ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করেছেন, পুরাে মাঠটা পার হয়ে যেতে হবে নেটের দিকে। দ্রুত পায়ে হেঁটে ধরলাম তাঁকে, আবারও যখন আমাকে তাঁর পাশে দেখলেন, 'বিশ্বের সেরা নাছােড়বান্দা সাংবাদিক আমি' এমন একটা স্বীকৃতি দিয়ে ফেলল তাঁর দৃষ্টি।

এর মধ্যেই মর্মস্পর্শী গল্পটা বানিয়ে ফেলেছি আমি, 'দেখুন, খুব সমস্যায় আছি, আমার আর কোনাে উপায় নেই বলেই বারবার বিরক্ত করছি আপনাকে। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো বাইরে রিপোর্টার পাঠায় খুব কম। আমাকে এখানে পাঠিয়েছে শুধু একটা কারণে। আমি অফিসে বলেছি, আপনার ইন্টারভিউ নিয়ে যাব। এখন আপনি ইন্টারভিউ না দিলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।'

এই ভয়ঙ্কর কথার পরও লারা নিশ্চুপ। গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মুখ করে আমি হাঁটতে লাগলাম তাঁর সঙ্গে। স্টেডিয়ামের যে গেট দিয়ে নেটে যেতে হয়, তার কাছাকাছি এসে কর্ণযুগলে মধুবর্ষণ করল তাঁর কথা, 'ফাইভ মিনিটস, ওকে?'

এত সাধনার পর পাঁচ মিনিট মোটেই 'ওকে' নয়, তারপরও সেটাকেই মন্দের ভালাে বলে দুবার লারাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফেললাম। 'আই উইল ডু ইট ডিউরিং প্র্যাকটিস' বলে নেটের পাশে সােফায় বসে পড়লেন লারা। আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম নেটের পাশে, চাকরি সুতার ওপর ঝুলছে, এমন কারও যেভাবে দাঁড়ানাের কথা, ঠিক সেভাবে। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর, নেট যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, আমার পা যখন ব্যথায় জর্জর, খেয়াল করিনি কখন উঠে এসেছেন লারা। হঠাৎ শুনতে পেলাম তাঁর কণ্ঠস্বর, 'আর ইউ রেডি?' এ প্রশ্ন আর করতে হয়, আমি তাে সেই কখন থেকে রেডি। নেটের পাশে ঘাসের ওপর বসলেন লারা, পাঁচ মিনিটের ইন্টারভিউটা গড়াল প্রায় সতেরো-আঠারো মিনিটে।

ইন্টারভিউটা হয়ে যাওয়ার পর জড়িয়ে ধরা ক্লান্তির কথা তো আগেই বলেছি। একটা কিছু পেয়ে যাওয়ায় তখন আর সেটিকে তেমন বিরাট কিছু মনে হয় না। এক্ষেত্রেও তা-ই হতে যাচ্ছিল। হয়নি একটা কারণে। কিছুক্ষণ পর প্রেসবক্সে বসে পরের দিনের ফাইনালের প্রিভিউ লিখছি। চোখে চশমা, থুতনিতে সামান্য একটু দাড়ি, মধ্যবয়সী এক ভদ্রলােক জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি শ্রীলঙ্কান?' এই ভুলটা অনেকেই করে, তাই অবাক হলাম না।

পরিচয় পাওয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, 'দেখলাম, লারার ইন্টারভিউ করছিলেন। কীভাবে ম্যানেজ করলেন?'

ভদ্রলােককে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সঙ্গেই দেখেছি সব সময়। এবার পরিচয়ও পেলাম। নাম জি এ লেপস। তিনিও জাতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান। বাড়ি গায়ানায়, আপাতত দিল্লিতে আছেন, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের প্রদর্শনী ম্যাচের আয়ােজন-টায়ােজনে জড়িত। প্রশ্নের কারণটা নিজেই ব্যাখ্যা করলেন লেপস। আগের বছরের ভারত ট্যুরের সময় থেকে তিনি লারার পেছনে ঘুরছেন ইন্টারভিউয়ের জন্য। ভারতে তাে হয়ইনি, শারজাতেও এখন পর্যন্ত পাঁচ মিনিট সময় চেয়েও পাননি। ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় আমার পরনে সিঙ্গারের টি-শার্ট দেখে আমাকে যে স্পনসরের লােক ভেবেছিলেন, জানালেন সেটাও। আমার সঙ্গে কথা বলতে দেখে লারাকে জিজ্ঞেস করে নাকি উত্তর পেয়েছেন, 'ওকে আমি এড়াতে পারিনি।' কৌতূহলটা তাই আরও বেড়েছে লেপসের।

আমি লেপসকে আসল গল্পটা বললাম না। শুধু একটা হাসি দিলাম। যার অর্থ, লারা এত বােঝে, আর এটা বােঝে না কাকে ইন্টারভিউ দিলে তাঁর ক্যারিয়ারের ভালাে হবে?