ডান পায়ে পুরু ব্যান্ডেজ, দুই বগলের নিচে ক্রাচ। তারপরও ব্রায়ান লারার সঙ্গে দেখা করতেই হবে। দুই সঙ্গিনীকে নিয়ে জেমস সাদারল্যান্ড তাই স্যান্ডটন সান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের লবিতে। নয় দিন আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ডান পা ভেঙে গেছে। তারপরও ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল দেশে ফিরে যাচ্ছে শুনে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে স্যান্ডটনে আইসিসির অফিসিয়াল হোটেলে ছুটে এলেন সাদারল্যান্ড।

টেন্ডুলকার-লারাদের এমন পাগল ভক্তের সঙ্গে ভালোই পরিচয় আছে। তারপরও ব্রায়ান লারাকে নাড়া দিল ঘটনাটা। লবিতে নেমে এলেন তাই, অনেকক্ষণ কথাও বললেন। কিন্তু কথার স্মৃতি তো শুধু নিজের মনেই থাকবে, অন্যদের দেখানোর জন্যও তো কিছু থাকা দরকার। তাই একটি ছবি তোলার আবদার সাদারল্যান্ডের। সেটিও রাখলেন লারা। হোটেলের লবিতে আলো কম বলে বাইরে গিয়ে সিঁড়িতে বসে সাদারল্যান্ডের ব্যান্ডেজে জড়ানো পা কোলে তুলে নিয়ে যত্ন করে অটোগ্রাফ দিলেন সেই ব্যান্ডেজে। নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুললেন সাদারল্যান্ডের সঙ্গিনীরা। লারার মুখে কোনো বিরক্তি তো নেই-ই, বরং তাতে ঝলমলে হাসি।

পুরো নাটকটা হাত দশেক দূর থেকে দেখতে দেখতে মনে করার চেষ্টা করছিলাম, লারাকে এমন মুডে শেষ কবে দেখেছি। এই বিশ্বকাপেই এর আগে দুবার ইন্টারভিউ চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। হাসিখুশি মেজাজে থাকা লারাই আরেকবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করল। 

সাদারল্যান্ডদের বিদায় দিয়ে ঘুুরতেই লারার সামনে—এর আগেও চেষ্টা করেছি, আজ দশ মিনিট হলেও দিতেই হবে। এবারও প্রত্যাখ্যান, তবে সেটি আগের দুবারের মতো নয়। ‘আমাকে ইন্টারভিউ করে কী হবে? আই অ্যাম ফিনিশড!’ বলার সময় লারার মুখে হাসি।

২০০৩ বিশ্বকাপ চিন্তা করলে ব্রায়ান লারা সত্যিই ‘ফিনিশড’, কিন্তু এই বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়া মানেই তো লারার গল্প শেষ নয়। এ কথা বলার পরও লারার মুখে সেই একই কথা, ‘আই অ্যাম ফিনিশড।’

এবার শেষ অস্ত্র, ‘আমার পত্রিকার সম্পাদক তোমার খুব ফ্যান। বিশ্বকাপে আসার আগে একটা কথাই বলেছেন তিনি— 'যেভাবেই হোক লারার একটা ইন্টারভিউ চাই।’

বরফ গলল, লবির সোফার দিকে ইঙ্গিত করে লারা বললেন, ‘চলুন, বসি।’

এই বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দু-একজন সাংবাদিক ছাড়া আর কেউ লারার একান্ত সাক্ষাৎকার নিতে পেরেছেন বলে শুনিনি। মনে তাই যুদ্ধজয়ের আনন্দ। হায়, কে জানত, মাত্র মিনিট চারেকই তা স্থায়ী হবে! 

যেন ঘোরের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছিলেন লারা। আগেও অনেকবার কথা বলেছি, কিন্তু এমন মুডে পাইনি কখনো। সেই মুডটা খান খান হয়ে গেল পরের দু-তিনটি প্রশ্ন ভুল (!) লাইনে চলে যাওয়ায়। 

শুরুটা ভালোই হয়েছিল। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে জীবনের শেষ বিশ্বকাপ থেকে এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হওয়ার হতাশাটা সবিস্তারেই বর্ণনা করলেন লারা, ‘আমি খুবই, খুবই হতাশ। দারুণ শুরু করেছিলাম আমরা! নিউল্যান্ডসে স্টেডিয়ামভর্তি ২৫ হাজার দর্শক, স্বাগতিক দেশের বিপক্ষে খেলা। এত উদ্দীপ্ত বোধ করিনি অনেক দিন। জিতলামও, কিন্তু এরপরই আমাদের পারফরম্যান্সে কেন যেন ভাটার টান লাগল। তবে এই হতাশা ভুলে আমাদের সামনের দিকে তাকাতে হবে। অস্ট্রেলিয়া আসছে ওয়েস্ট ইন্ডিজে— এটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ। শ্রীলঙ্কা আসছে এরপর। আমরা আবার আসছি দক্ষিণ আফ্রিকায়। সবগুলোই খুব কঠিন সিরিজ। আমাদের এখন বিশ্বকাপটা ভুলে যেতে হবে।’

যেন ঘোরের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছিলেন লারা। আগেও অনেকবার কথা বলেছি, কিন্তু এমন মুডে পাইনি কখনো। সেই মুডটা খান খান হয়ে গেল পরের দু-তিনটি প্রশ্ন ভুল (!) লাইনে চলে যাওয়ায়। 

লারা-টেন্ডুলকারদের মতো অসাধারণ যাঁরা টিম গেম খেলেন, নিজে দুর্দান্ত খেলার পরও বাকিদের ব্যর্থতায় যখন তাদের পরাজয়ের বিস্বাদ নিতে হয়, সেই হতাশাটা কেমন? এটা জানার জন্য লারার চেয়ে উপযুক্ত কাউকে পাওয়া কঠিন। ছবি: গেটি ইমেজেস

লারা-টেন্ডুলকারদের মতো অসাধারণ যাঁরা টিম গেম খেলেন, নিজে দুর্দান্ত খেলার পরও বাকিদের ব্যর্থতায় যখন তাদের পরাজয়ের বিস্বাদ নিতে হয়, সেই হতাশাটা কেমন? এটা জানার জন্য লারার চেয়ে উপযুক্ত কাউকে পাওয়া কঠিন। সাধারণ দলের অসাধারণ খেলোয়াড় হয়েই তো কাটল তাঁর ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময়।  

শুধু বিশ্বকাপের কথা বলছি ভেবে লারা উত্তর দিলেন, ‘না, এই টুর্নামেন্টে টিমমেটদের কারণে আমাকে হতাশায় পুড়তে হয়নি। আমি নিজেই ভালো পারফর্ম করতে পারিনি।’

শুধু এই বিশ্বকাপের কথা হচ্ছে না, আপনি যেমন গলফ খেলতে খুব পছন্দ করেন— কখনো কি এমন মনে হয়, গলফ বা টেনিসের মতো একক খেলা খেললে ভালো হতো, নিজের ভালো-মন্দ নিজের হাতেই থাকত— প্রশ্নটা শুনতে শুনতেই লারার মুখটা একটু শক্ত হয়ে গেল। শীতল গলায় বললেন, ‘আমি অনেকদিন গলফ খেলিনি। আমি ক্রিকেট খেলতেই ভালোবাসি। আমি টিম গেম খেলতেই ভালোবাসি। টিম গেমের পরিবেশটাই আমার পছন্দ।’

তাল কেটে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টানো। পরের প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর রান আউট হওয়াটাই এই টুর্নামেন্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য টার্নিং পয়েন্ট কি না। এরপরই তো ভেঙে পড়ল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। 

কিন্তু লারা যে তখন সব প্রশ্নেই অন্য সুর খুঁজে পাচ্ছেন। তার কণ্ঠ আরও শীতল, ‘না, আমার মনে হয় না, সেটি টার্নিং পয়েন্ট।’

কিন্তু ওই রান আউটটিই তো ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছিল! এবার কয়েক সেকেন্ড চুপ, তারপর কাটা কাটা স্বরে ‘ক্রিকেট টিম গেম, আমরা টিম হিসেবে ভালো খেলতে পারিনি’ বলেই উঠে দাঁড়ালেন লারা। কী ব্যাপার— জিজ্ঞেস করতেই ‘আপনার প্রশ্ন আমার পছন্দ হচ্ছে না’ বলে হাঁটতে শুরু করলেন লিফটের দিকে। আমার প্রশ্নে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না—এটা বোঝাতে যেতেই এমন ভঙ্গিতে ‘এক্সকিউজ মি’ বললেন যে, আলোচনার সেখানেই সমাপ্তি। শুধু সমাপ্তিই নয়, 'এক্সকিউজ'টা এমন জোরে বললেন যে, হোটেল লবিতে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা সচকিত হয়ে উঠলেন। আমার তখন মনে হচ্ছে, ইন্টারভিউর দরকার নেই বাবা, মানসম্মান নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচি।

বেরোতে তো পারলাম। মানসম্মানসহই। কিন্তু ব্রায়ান লারাকে পেয়েও হারানোর দুঃখটা ভুলতে অনেকক্ষণ লাগল। এমন ভালো মুডে ছিলেন, হঠাৎ অমন রেগে গেলেন কেন? আমি তখন এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছি। তা পেতে রিওয়াইন্ড করে বেশ কবার শুনলাম অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারের টেপটা। হঠাৎই বুঝতে পারলাম, নিজের অজান্তেই লারার গোপন ক্ষতে আঘাত করে ফেলেছি। এই বিশ্বকাপের আগে লারাকে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিতর্কের যে ঝড় উঠেছিল, তাতে তাঁকে দলে না রাখার দাবি তুলেছিলেন যাঁরা, তাঁদের যুক্তি ছিল একটাই— লারা নিজেকে দলের চেয়েও বড় মনে করেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের প্রতি তাঁর কোনো কমিটমেন্ট নেই।

ভিনদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নগুলোকে তা প্রমাণের চেষ্টা বলেই মনে হয়েছে ব্রায়ান চার্লস লারার!