আর্জেন্টিনা: ৬ সার্বিয়া মন্টেনেগ্রো:

‘জোগো বনিতো’র স্প্যানিশটা কী হবে? 

জানাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। ‘সুন্দর ফুটবল’-এর প্রতিশব্দ এই কথাটা পর্তুগিজ এবং ১৯৭০ বিশ্বকাপের পর থেকে তা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলেরই সমার্থক হয়ে রয়েছে। কাল আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দিল, ‘সুন্দর ফুটবল’টা শুধু ব্রাজিলের একার সম্পত্তি নয়। তারাও তা খেলতে জানে। 

আর্জেন্টাইনরা তো আর পর্তুগিজ বলে না, বলে স্প্যানিশ। এ কারণেই ‘জোগো বনিতো’র স্প্যানিশ জানার চেষ্টা। তবে কালকের ম্যাচ দেখার পর আর্জেন্টাইন সাংবাদিকরা নিশ্চয়ই পেলের ওই প্রবাদের অনুবাদ না করে নিজেদের মতো করে স্প্যানিশেই নতুন কিছু বানিয়ে নিয়েছেন। তাতে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়, সৌন্দর্যবোধ আর কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলার মতো ফুটবলই যে খেলল আর্জেন্টিনা। সবুজ মাঠটা যেন বিশাল এক ক্যানভাস, আর একটু পরপরই তাতে ফুল ফুটিয়ে তুললেন রিকুয়েমে-স্যাভিওলা-তেভেজ-মেসিরা। ফুটবলের মতো শরীরনির্ভর খেলায় খুব কম দল সম্পর্কেই এমন বলা যায়। কালকের আর্জেন্টিনার জন্য এটাও মনে হচ্ছে কম বলা!

স্কোরলাইন সব সময় খেলার সৌন্দর্যের প্রতিফলক হয়ে থাকে না। এই ম্যাচে সেখানেও আর্জেন্টিনার কোনো আক্ষেপ থাকছে না। মহাদেশীয় কোটার তালেগোলে অনেক সময় অনেক দুর্বল দলও বিশ্বকাপে খেলে ফেলেছে, রেকর্ডের খাতায় তাই ৯-০ স্কোরলাইনও আছে। কিন্তু শক্তিমত্তায় আকাশ-পাতাল কোনো পার্থক্য নেই—এমন দু'দলের কোনো ম্যাচে ৬-০ ব্যবধান! না, এটি বিশ্বকাপ এর আগে আর দেখেনি।

আরও একটা গোলের পর। এখানে মেসি কোনজন, নিশ্চয়ই চিনিয়ে দিতে হবে না। ছবি: এএফপি

আর্জেন্টিনা এর আগে একবার ৬-০ গোলে জিতেছিল। তবে ১৯৭৮ সালে নিজেদের দেশে পেরুর বিপক্ষে ওই জয়কে ঘিরে আছে বিতর্ক, কলঙ্কের ছায়াও। বিশ্বকাপে তাদের বৃহত্তম জয়ের কথা উঠলে এখন আর শুধু সেটির কথাই হবে না—এই ম্যাচ থেকে এটাও আর্জেন্টিনার বাড়তি পাওয়া।

১৯৩৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে সুইডেন কিউবাকে ৮-০ গোলে হারানোর পর এক ফরাসি সাংবাদিক লিখেছিলেন, ‘৫ গোল পর্যন্ত এটা সাংবাদিকতা ছিল, এরপর হয়ে গেছে পরিসংখ্যান!’ সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে লিখতে গিয়ে এই কথা মনে হবে, এটা কল্পনাও করা যায়নি। এই দলটি ইউরোপের কঠিন বাছাইপর্বে তাদের গ্রুপ জিতেছে, যে গ্রুপে ছিল স্পেন। ১০ ম্যাচে নিজেরা ১৬ গোল দিয়ে খেয়েছে মাত্র ১টি। অথচ কাল আর্জেন্টিনা যেভাবে তাদের নিয়ে ছেলেখেলা খেলল, তাতে এর চেয়ে বেশি গোল হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। 

হ্যাঁ, এটা ঠিক, আর্জেন্টিনার শেষ ৩টি গোলই মাতেজা কেজম্যান লাল কার্ড পাওয়ায় সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর। তবে ম্যাচ তো আসলে শেষ হয়ে গেছে প্রথমার্ধেই। ম্যাক্সি রদ্রিগেজের দুটি আর ক্যাম্বিয়াসোর এক গোলে বিরতির সময়ই আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে এগিয়ে। বিশ্বকাপে তিন গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও ম্যাচ জেতার ঘটনা আছে, তবে আর্জেন্টিনা তো আর উত্তর কোরিয়া নয়। সার্বিয়ান দলেও কোনো ইউসেবিও নেই। দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা তাই প্র্যাকটিস ম্যাচের মতোই খেলল। হোসে পেকারম্যানও ‘কার কী অবস্থা’ বাজিয়ে নেওয়ার সুযোগটা ছাড়লেন না।

৭৪ মিনিটে মাঠে নেমেছেন, কিছুক্ষণ পর একটা গোল করানোর পর নিজেও গোল করলেন মেসি। ছবি: এএফপি

তিনটি গোলেরই উৎস স্যাভিওলাকে তুলে নিয়ে নামালেন তেভেজকে, প্রথম তিন গোলের দুটি যাঁর, সেই ম্যাক্সি রদ্রিগেজকে তুলে মেসিকে। ৭৪ মিনিটে মাঠে নেমেই একটা ইতিহাস গড়ে ফেললেন মেসি। হয়ে গেলেন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়। মেসি আর তেভেজের নিজেদের প্রমাণ করার তাগিদ থেকেই আসলে হলো পরের ৩টি গোল। শেষ দুটি গোল তো তাঁরাই করলেন, অন্যটিও নিজেরা ওয়ান-টু খেলে বানিয়ে দিলেন ক্রেসপোকে। গোলমুখে গিয়ে এই অসাধারণ ওয়ান-টু খেলাই আরও উচ্চতায় তুলে দিল কালকের আর্জেন্টিনাকে। তাতে যে কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার প্রকাশ, সেটি শুধু লাতিন আমেরিকান ফুটবলেরই সম্পত্তি। ক্যাম্বিয়াসোর করা ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটির কথা মনে করুন, কী বলতে চাইছি তা বুঝতে আর কোনো সমস্যাই হবে না। ব্যাক হিল কত বৈচিত্র্যময় হতে পারে, গোলমুখে এর সঠিক প্রয়োগে কেমন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স—এটারও তো প্রামাণ্যচিত্র হয়ে থাকল এই ম্যাচ। এটাই আর্জেন্টাইন ফুটবল, তবে মাঝখানে বিলার্দো-বিয়েলসাদের পাল্লায় পড়ে অনেক দিনই তা এমন ছিল না।

ফুটবলবোদ্ধারা ইউরোপিয়ান আর লাতিন আমেরিকান ফুটবলের অনেক পার্থক্যই ধরে ধরে দেখিয়ে দিতে পারবেন। তবে মোটা দাগে পার্থক্যটা বোঝাতে একটা কথা খুব প্রচলিত—ইউরোপের ফুটবল হলো গদ্য আর লাতিন আমেরিকারটা কবিতা। গদ্যে সরাসরি কথা হয়। কবিতায় থাকে রহস্যময়তা। নিজেদের উৎস থেকে সরে যাওয়ায় আর্জেন্টিনার ফুটবল থেকে এই রহস্যময়তাই হারিয়ে গিয়েছিল। বিলার্দো বিশ্বকাপ জিতেছিলেন ম্যারাডোনা নামে এক অতিমানবের কৃতিত্বে। নইলে ১৯৯০ সালে পরের বিশ্বকাপে তাঁর কোচিংয়ে যে ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল, সেটি আর্জেন্টাইন ফুটবলেরই কলঙ্ক হয়ে আছে।

মার্সেলো বিয়েলসাও চিরন্তন পাসিং গেম আর বল স্কিলের ওপর ভরসা না রেখে ইউরোপিয়ানদের মতো আরও সরাসরি শারীরিক ফুটবল খেলাতে চেয়েছিলেন দলকে। এতে লাতিন আমেরিকান দলগুলোর মতো বিপক্ষে সাফল্য পেলেও ইউরোপকে তাদের ওষুধে কীভাবে বধ করবে আর্জেন্টিনা! এ কারণেই গত বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের অপ্রতিরোধ্য দলকে গ্রুপ অব ডেথে পড়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে, আর খেলা দেখেও কখনো কালকের ‘আহা’ ‘উহু’ করার কারণ ঘটেনি।

পলকহীন চোখে মাঠে তাকিয়ে আছেন হোসে পেকারম্যান, আর্জেন্টিনিয়ান ফুটবলাররা তখন কবিতা লিখছেন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে। ছবি: এএফপি

হোসে পেকারম্যান ঐতিহ্যে বিশ্বাসী। তিনি জানেন, ফুটবলের মতো আর কোনো খেলাতেই একটা জাতির মানস প্রতিফলিত হয় না, সাফল্য পেতে তাই চিরন্তন আর্জেন্টাইন ফুটবলের সেই উৎসেই ফিরতে হবে। আর্জেন্টিনাকে সেখানেই ফিরিয়েছেন তিনি। নান্দনিকতার সঙ্গে আপস না করেও যে সাফল্য পাওয়া সম্ভব, তার প্রমাণ তো গ্রুপ অব ডেথকে হাস্যকর বানিয়ে হাসতে হাসতে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে যাওয়া। 

হোসে রোমান রিকুয়েমে পুরস্কারটা পেলেন বটে, তবে কালকের ম্যান অব দ্য ম্যাচ আসলে বাইরে বসে থাকা ওই পক্বকেশ লোকটিই। হোসে পেকারম্যান!

আরও পড়ুন:

'নতুন ম্যারাডোনা' মেসির বিশ্বকাপ-অভিষেক হচ্ছে আজ?