আর্জেন্টাইন ‘ফুটবল ঈশ্বর’ পর্যন্ত যাকে দেখতে উন্মুখ হয়ে আছেন, শেষ পর্যন্ত না তিনি গত বিশ্বকাপের রবার্তো আয়ালা হয়ে যান! অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে ২০০২ বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন আয়ালা, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে চোট পেয়ে আর মাঠেই নামা হয়নি তাঁর। লিওনেল মেসিকে নিয়েও এখন আর্জেন্টাইনদের একই ভয় পেয়ে বসতেই পারে। 

পুরোনো চোট নিয়েই বিশ্বকাপে এসেছিলেন। উরুর সেই সমস্যা মোটামুটি কাটিয়ে উঠে যখন বিশ্বকাপে অভিষেকের স্বপ্নে বিভোর, তখনই গত বুধবারের প্র্যাকটিসে বাঁ পায়ে চোট পেয়ে আবারও অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢাকা পড়ে গেলেন লিওনেল মেসি। শুধু ডিয়েগো ম্যারাডোনাই নয়, বোরা মিলুটিনোভিচ ও কার্লোস ভালদেরামাও যাকে এই বিশ্বকাপের সম্ভাব্য তারকা বলে মনে করছিলেন, কাল দুপুরে কোচ হোসে পেকারম্যানের সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিলেন, আজ সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষেও সেই মেসির মাঠে নামা একদমই নিশ্চিত নয়। 

আজ সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ গেলসেনকির্সেনে। ন্যুরেমবার্গে বসে যে সেই ম্যাচের প্রিভিউ লেখা হচ্ছে, তার কারণও পেকারম্যানের ওই সংবাদ সম্মেলন। ন্যুরেমবার্গ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে হার্জোগেনায়োর্চ নামে গ্রাম-গ্রাম চেহারার ছোট্ট শহরটিই এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ঠিকানা। বিশ্বকাপে সব দলই নিজেদের ম্যাচ খেলে ফিরে আসে তাদের ‘বেস ক্যাম্পে’। বেশির ভাগ সময়ই পরের ম্যাচের ভেন্যুতে যায় ম্যাচের আগের দিন। আর্জেন্টিনাও যেমন গেল কাল বিকেলে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিশ্বকাপের জন্যই বানানো গেলসেনকির্সেনের নতুন স্টেডিয়ামে তাদেরও প্র্যাকটিস করার কথা ছিল। মিডিয়ারও প্রবেশাধিকার ছিল তাতে, সেখানে থাকতে পারলে হয়তো আজ মেসি খেলবেন কি খেলবেন না, এ ব্যাপারে আরও নিশ্চিত হওয়া যেত। কিন্তু ন্যুরেমবার্গে পেকারম্যানের সংবাদ সম্মেলন করে ট্রেনে সাড়ে চার ঘণ্টার পথ গেলসেনকির্সেনে যাওয়াটা তো আর মুখের কথা নয়।

২০০৬ বিশ্বকাপে ১৯ ছুঁইছুঁই মেসি। ছবি: এএফপি

সর্বকালের সেরা আর্জেন্টাইন ফুটবলার হিসেবে অনেকে আলফ্রেড ডি স্টেফানোকে ম্যারাডোনারও আগে রাখতে চান। ডি স্টেফানো বিশ্বকাপে না খেলার পরও কেউ তাঁকে ম্যারাডোনার চেয়ে বড় প্রমাণ করতে চাইতেই পারেন। তবে আর্জেন্টিনার ‘বেস ক্যাম্পে’ গিয়ে মনে হলো, একটা জায়গায় শুধু ডি স্টেফানো কেন, ফুটবল ইতিহাসে আর কেউই ‘ম্যারাডোনা’ নন। নিজের দেশের ফুটবলে প্রভাব। এই বিশ্বকাপেও অনেক ব্রাজিলিয়ান সমর্থককে পেলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াতে দেখছি, তবে আর্জেন্টিনা দলের ওপর ম্যারাডোনার ছায়াটা যত বড়, ব্রাজিলের ওপর পেলের ছায়াটা অবশ্যই তা নয়। 

কদিন আগে আর্জেন্টিনার ‘বেস ক্যাম্পে’ ঘুরে গেছেন। সেখানে ম্যারাডোনা কী করেছেন, কার সঙ্গে বেশি কথা বলেছেন—এ সব আলোচনাতেই মুখর দেখলাম আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের। তাদের কাছেই জানা গেল, এখানে এসে লিওনেল মেসির সঙ্গে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়েছেন ম্যারাডোনা। সেটিই স্বাভাবিক। আর্জেন্টিনা দলে ‘নতুন ম্যারাডোনা’র যতই ছড়াছড়ি থাকুন, ম্যারাডোনা নিজে তো তাঁর উত্তরাধিকার নির্বাচিত করেছেন মেসিকেই। নইলে কি আর অনেকের মতেই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার তাঁর নিজের কলামে এখনো বিশ্বকাপ না খেলা ১৯ বছর বয়সী কাউকে ‘আমাদের সুপারস্টার’ বলে অভিহিত করেন!

ম্যারাডোনাকে নিয়ে আলোচনা অবশ্য শুধু আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। হামবুর্গে আর্জেন্টিনা-আইভরি কোস্ট ম্যাচে হাজির হওয়ার পর থেকেই তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন—তা নিয়ে সবার মধ্যে কৌতূহল। তবে তাঁর পিছু ধাওয়া করার আগ্রহ আর কারও নেই। যে দু-একজন কাছাকাছি যেতে পেরেছেন, তাদের অভিজ্ঞতাও যে খুব সুখকর নয়! কাছাকাছি যেতে পারা বলতে ম্যারাডোনার নয়, তাঁর দেহরক্ষীদের। সংখ্যায় তাঁরা আটজন। তাঁদের বাধা পেরিয়ে ম্যারাডোনা পর্যন্ত পৌঁছে একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে আসা অবশ্য কোনো ব্যাপারই নয়। করণীয়টাও জানিয়ে দিচ্ছেন দেহরক্ষীরা। মাত্র আড়াই হাজার ইউরো (সোয়া দুই লাখ টাকারও বেশি) খরচ করতে পারলেই হবে!

ম্যারাডোনা বিশ্বকাপের খেলা দেখতে এসেছিলেন সপরিবারেই। ছবি: এএফপি

অবশেষে নিজের কথার মূল্য বুঝতে পেরেই কিনা ম্যারাডোনা কথাবার্তাও খুব বেশি বলছেন না। তবে হোসে পেকারম্যানের সঙ্গে তাঁর সমস্যাটা যে এখনো আছে, সেটি তাঁর কলাম পড়লেই বোঝা যাচ্ছে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচের পর দলকে উৎসাহ জানাতে আসায় ম্যারাডোনাকে ধন্যবাদ দেওয়াটাকে পেকারম্যানের ‘শান্তি প্রস্তাব’ হিসেবেই দেখেছিলেন অনেকে। ম্যারাডোনা যে তা গ্রহণ করেননি, আজ প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া কলামটি পড়লেই তা বুঝতে পারবেন। তেভেজের বদলে স্যাভিওলাকে ক্রেসপোর সঙ্গে নামানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনাটা মৃদুই ছিল, কিন্তু দুই স্ট্রাইকারকেই তুলে নেওয়ার সমালোচনা করার সময় সেটি আর সে রকম থাকেনি। এর পর ‘মাই ফ্রেন্ড পেকারম্যান’ সম্বোধনটাও এখানে বন্ধুত্বের পরিবর্তে ব্যঙ্গই বেশি বোঝাচ্ছে।

  ২০০৬ বিশ্বকাপের সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো দল। বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির প্রথম প্রতিপক্ষ

গেলসেনকির্সেনের ম্যাচে কী হবে? সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর তিন ফরোয়ার্ড কেজম্যান, মিলোসেভিচ ও স্টানকোভিচের প্রশংসায় রবার্তো আয়ালা যতই পঞ্চমুখ হোন, ইতিহাস আর প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স বিবেচনায় আর্জেন্টিনারই জেতা উচিত। তাই যদি হয়, তাহলে হল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপের আসল ম্যাচে অনেক নির্ভার হয়ে নামতে পারবেন রিকুয়েমে-ক্রেসপোরা। তবে খেলাটা গেলকেনকির্সেনে কেন—এটা ভেবে আর্জেন্টাইনদের মন একটু খচখচ করতেই পারে। এবারের স্টেডিয়ামটা নতুন হতে পারে, তবে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে এই শহরে দুটি ম্যাচ খেলেছিল আর্জেন্টিনা। একটিতেও জেতেনি। পূর্ব জার্মানির সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল, আর ক্রুইফের হল্যান্ডের বিপক্ষে হেরেছিল ০-৪ গোলে। 

সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর এবারই বিশ্বকাপে অভিষেক বলে তাদের কোনো ইতিহাসও নেই, তবে তাদেরকেই যেহেতু যুগোস্লাভিয়ার উত্তরাধিকারী ধরে নেওয়া হচ্ছে, যুগোস্লাভিয়ার ইতিহাসটাই তাদের হয়ে যাচ্ছে। অন্তত গেলসেনকির্সেনের ম্যাচে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর তাতে আপত্তি করার প্রশ্নই ওঠে না। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে এখানেই যে জায়ারেকে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে (৯-০) হারিয়েছিল যুগোস্লাভিয়া। তবে এসব শুধুই রেকর্ডের খাতিরে বলা। নইলে সেই ২২ বছর আগের কথা আর কে মনে রেখেছে!

একজন অবশ্যই রেখেছেন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর কোচ ইলিয়া পেতকোভিচ তাঁর দলকে হয়তো মনেও করিয়ে দিয়েছেন এটি। ১৯৭৪ সালের ১৮ জুন যুগোস্লাভিয়ার ৯ গোলের একটি যে করেছিলেন এই পেতকোভিচই!

আরও পড়ুন:
যে ম্যাচে মেসির বিশ্বকাপ-অভিষেক