স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সেরা দল নিয়ে মহাবিতর্কের পর নিজের পছন্দের বিশ্ব একাদশ বেছে নেওয়ার কথা বললে ক্রিকেটের রথী-মহারথী অনেকেই তখন তা এড়িয়ে যেতে পারলে বাঁচেন। এই মাস আড়াই আগেই করাচিতে তাঁর বাড়িতে পাকিস্তানের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান হানিফ মোহাম্মদ রাজ্যের বিষয় নিয়ে কথা বললেন, কিন্তু তাঁর পছন্দের একটা বিশ্ব একাদশ নির্বাচন করতে বলতেই রীতিমতো আঁতকে উঠলেন। প্রথমে মনে হয়েছিল, একটু পীড়াপীড়ি করলেই হয়তো রাজি হয়ে যাবেন। এই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই; হানিফ মোহাম্মদকে বিশ্ব একাদশ-এর নির্বাচকের ভূমিকায় নামানোই গেল না।

স্যার রিচার্ড হ্যাডলি আর মার্টিন ক্রোর ক্ষেত্রে সেই সমস্যা হলো না। হ্যামিল্টন টেস্টের বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া দ্বিতীয় দিন মার্টিন ক্রোকে ইন্টারভিউ করার পর শেষ প্রশ্ন হিসেবে যখন যাঁদের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলেছেন তাঁদের মধ্য থেকে একটি বিশ্ব একাদশ গড়তে বলা হলো, সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন তিনি। এক টুকরো কাগজ টেনে নিয়ে নিজেই লিখলেন তাঁর বিশ্ব একাদশের খেলোয়াড়দের নাম। এর আগে অবশ্য স্যার ডনের দলের কথা উঠল। মার্টিন ক্রো নিজের দলটা নির্বাচন করার আগে স্যার ডনের নির্বাচিত দলটি লিখলেন কাগজে। লিখতে লিখতেই অস্ফুটে মন্তব্য করলেন, ‘ক্রেজি’। উইকেটকিপার ডন ট্যালনের নামটি লিখে বললেন, ‘ছয় নম্বরে ডন ট্যালন! অবিশ্বাস্য! অস্ট্রেলিয়ার বাইরে কজন তাঁর নাম জানে?’ জ্যাক হবস এবং ওয়ালি হ্যামন্ডের প্রতিও স্যার ডন খুব সুবিচার করেননি বলে নিজের মতও জানিয়ে দিলেন নিদ্বির্ধায়।

স্যার রিচার্ড হ্যাডলির দলটি পেলাম পরদিন। মার্টিন ক্রোর মতো বলতেই কাগজ-কলম নিয়ে নেমে পড়েননি টেস্ট ক্রিকেটে চার শ উইকেট নেওয়া প্রথম বোলার। ‘ওপেনিংয়ে সুনীল গাভাস্কার’—বলেই চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। বোঝা গেল, দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যাঁদের সবচেয়ে 'বড় শত্রু’ ভেবে নতুন বল হাতে দৌড় শুরু করেছেন, তাঁদের মুখগুলো একে একে ভেসে উঠছে তাঁর চোখের সামনে। একটু সাহায্য করতেই আগের দিন মার্টিন ক্রোর নির্বাচিত দলটি বের করে দিলাম তাঁর হাতে।

১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন হ্যাডলি, মার্টিন ক্রোর অভিষেক হয়েছে হ্যাডলি খেলা শুরু করার নয় বছর পর। তারপরও মার্টিন ক্রোর দলের আটজন স্থান পেলেন স্যার হ্যাডলির দলে। ওপেনিংয়ে সুনীল গাভাস্কারের পার্টনার হিসেবে যাঁকে বেছে নেওয়ার সময় ‘হি ওয়াজ অ্যা ব্রিলিয়ান্ট প্লেয়ার’ মন্তব্য করছিলেন ক্রো, সেই গর্ডন গ্রিনিজকে রাখলেনই না হ্যাডলি। ‘আমি আরেকটু সলিড কাউকে চাই’ বলে গ্রিনিজের পাশে লিখলেন জিওফ বয়কটের নাম।

উইকেটকিপার বিষয়েও দুজনের মত মিলল না। মার্টিন ক্রোর দলের উইকেটকিপার ইয়ান হিলির চেয়ে অ্যালান নটকেই বেশি পছন্দ হ্যাডলির। আরেকটি পরিবর্তন—ক্রো যাকে মনে করতেন তাঁর দেখা সেরা বোলার, সেই ম্যালকম মার্শালের জায়গায় ওয়াসিম আকরাম।

উইকেট স্পিনারদের পক্ষে কথা বললে ইয়ান বোথামের জায়গায় আবদুল কাদিরকে খেলাতে চান বলে তাঁর দলের ১২ নম্বর সদস্য হিসেবে পাকিস্তানি লেগ স্পিনারের নাম লিখেছিলেন মার্টিন ক্রো। স্যার হ্যাডলি এখানেও একটু ভিন্নমত প্রকাশ করলেন, তাঁর দলের ১২ নম্বর সদস্য ২৯৭ উইকেট নেওয়া ইংল্যান্ডের বাঁহাতি স্পিনার ডেরেক আন্ডারউড।

স্যার রিচার্ড হ্যাডলি ও প্রয়াত মার্টিন ক্রো। ছবি: গেটি ইমেজেস

‘ক্রোর দলের সঙ্গে আমার দলের খুব বেশি পার্থক্য নেই’—এই মন্তব্য করলেন ঠিকই, কিন্তু মার্টিন ক্রোর বিশ্ব একাদশে নিজের নামটি দেখতে না পেয়ে কি একটু ব্যথিত হয়েছেন রিচার্ড হ্যাডলি? হওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক, যদিও তা প্রকাশ পেল না। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বোলার ও সেরা ব্যাটসম্যানের নির্বাচিত বিশ্ব একাদশে আটটি নাম ‘কমন’। সুনীল গাভাস্কার, ভিভ রিচার্ডস, শচীন টেন্ডুলকার, ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, শেন ওয়ার্ন ও ডেনিস লিলি আছেন দুজনের দলেই।

ওপেনিং ব্যাটসম্যান বেছে নেওয়ার সময় মার্টিন ক্রো অবশ্য বলেছিলেন, ‘ব্যারি রিচার্ডসকে রাখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তাঁর খেলা আমি খুব বেশি দেখার সুযোগ পাইনি।’ শেন ওয়ার্নের নামটি লেখার সময় বললেন, ’৯৩ সালে ইংল্যান্ডে ওই গ্যাটিং বল করার আগে ওয়ার্ন তেমন কিছুই করেনি। কিন্তু তারপরও ওকে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে এর আগেই আমি বলেছিলাম, 'সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনার হতে যাচ্ছে ওয়ার্ন।’

ম্যালকম মার্শাল আর ওয়াসিম আকরামের ক্ষেত্রে যে ক্রো-হ্যাডলির ভিন্নমত হলো, তার কারণটাও বোঝা যাবে তাঁদের ব্যাখ্যা থেকে। মার্টিন ক্রো তাঁর খেলা সেরা বোলার হিসেবে বেছে নিয়েছেন মার্শালকে, ‘সব মিলিয়ে ডেনিস লিলি হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা ফাস্ট বোলার। কিন্তু আমার ক্যারিয়ারের শুরু আর লিলির ক্যারিয়ারের শেষ মিলে যাওয়ায় তাঁকে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাইনি। কিন্তু মার্শালকে টেস্ট ক্রিকেট, কাউন্টি ক্রিকেট, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট, ওয়ানডে ক্রিকেট--সব ধরনের পরিস্থিতিতে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলব, তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য এক বোলার।’

হ্যাডলি মার্শালকে বাদ দিয়ে ওয়াসিম আকরামকে নিলেন, তার একটা কারণ এই পাকিস্তানি বাঁহাতি। আসল কারণ অবশ্য অন্য, নিজের যুগ শেষ হওয়ার পরের সময়টায় আকরামই তাঁর কাছ থেকে সেরা বোলারের স্বীকৃতি পেয়ে আসছেন।

আটটি নাম 'কমন' পাবেন দু'পাশেই

ভিভ রিচার্ডস সম্পর্কে দুজনের অভিন্ন মন্তব্য, ‘নিজের দিনে ওর চেয়ে বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান আর কেউ ছিল না'। আরেকটি ব্যাপারেও প্রায় একই সুরে কথা বললেন—শচীন টেন্ডুলকার সম্পর্কে মার্টিন ক্রোর মতো স্যার রিচার্ড হ্যাডলিও রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। ‘এমন খেলোয়াড় বহু যুগ পর একজন আসে’—মার্টিন ক্রোর কথাই যেন প্রতিধ্বনিত হলো স্যার হ্যাডলির কণ্ঠেও।

আরও পড়ুন:

রিচার্ড হ্যাডলির একান্ত সাক্ষাৎকার