উৎপল শুভ্র: অসাধারণ এক ক্যারিয়ার আপনার। সর্বকালের সেরা বােলারদের একজন হিসেবেও ইতিহাসে নাম লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু খেলা ছাড়ার এত বছর পর আপনি নিজে যখন পেছন ফিরে তাকান, কেমন মনে হয় আপনার?

রিচার্ড হ্যাডলি: (হাসি) এ ব্যাপারে কী বলতে পারি আমি! আমার ক্যারিয়ার ছিল সফল, একই সঙ্গে দীর্ঘও। তার চেয়েও বড় কথা, আমি যখন খেলেছি তখন নিউজিল্যান্ড বিশ্বের সেরা দলগুলাের সঙ্গে সমান তালে খেলতে শুরু করেছে। আমরা নিয়মিত টেস্ট ম্যাচ জিততে শুরু করেছি। ২২ বার টেস্টজয়ী দলের সদস্য ছিলাম আমি, এর বেশির ভাগ জয়ই এসেছে আশির দশকে। এখনাে দুটি বিশ্ব রেকর্ড আছে আমার সবচেয়ে বেশিবার ইনিংসে ৫ উইকেট এবং ম্যাচে ১০ উইকেট। খেলা ছাড়ার দশ বছর পরও এমন কিছু রেকর্ড টিকে থাকাটা আনন্দেরই বলতে হবে। এর সঙ্গে প্রথম বােলার হিসেবে টেস্টে ৪০০ উইকেট পাওয়ার মুহূর্তটাও খুব স্মরণীয়। এটি আমার ক্যারিয়ারের বড় একটা মাইলফলক। ব্যাট হাতে কিছু রানও করেছি, যদিও আরও বেশি সেঞ্চুরি করা উচিত ছিল আমার। সব মিলিয়ে আমি বলব, খুবই তৃপ্তিদায়ক এক ক্যারিয়ারই কাটিয়েছি আমি। ক্রিকেটের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এটিই আমাকে বিভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি দেখার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্বে জড়ানােরও সুযােগ করে দিয়েছে।

শুভ্র: আপনার ক্যারিয়ারে স্মরণীয় কীর্তির তাে অভাব নেই। তবে আপনি নিজে এর কোনটি নিয়ে বেশি গর্বিত?

হ্যাডলি: ব্যক্তিগত কীর্তির মধ্যে একটার কথাই বলব। ১৯৮৫-৮৬-তে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গ্যাবায় (ব্রিসবেন) ইনিংসে ৯ উইকেট নিয়েছিলাম। সব খেলােয়াড়ই তার ক্যারিয়ার জুড়ে পারফেকশনের জন্য সাধনা করে যায় এবং বেশির ভাগই তার দেখা পায় না। তবে আমি গ্যাবায় পারফেকশনের খুব কাছাকাছি গিয়েছিলাম। স্কোরকার্ডে ১০ বার নাম লেখা হয়েছিল আমার, কারণ একমাত্র যে ব্যাটসম্যানটিকে আমি আউট করতে পারিনি, তার ক্যাচটি নিয়ে ভন ব্রাউনকে প্রথম টেস্ট উইকেট উপহার দিয়েছিলাম আমি।

দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ম্যাচটি স্মরণীয়। আমরা ভালাে বােলিং করেছি, সবগুলাে ক্যাচ নিয়েছি এবং অস্ট্রেলিয়াকে সব সময়ই চাপে রেখে শেষ পর্যন্ত হারিয়েছি ইনিংস ও ৪১ রানে। কোনাে সন্দেহ নেই, এটিই আমার ক্যারিয়ারের স্মরণীয়তম ম্যাচ। তবে কোনাে দেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় সব সময়ই অন্য রকম আনন্দের ব্যাপার। ১৯৭৩-৭৪য়ে অস্ট্রেলিয়াকে যখন আমরা প্রথমবারের মতাে হারালাম, সেটি ছিল নিউজিল্যান্ডের জন্য বিশাল এক জয়। একইভাবে ৫০ বছরে ৫০টির মতাে টেস্টে চেষ্টা করার পর ১৯৭৮ সালে আমরা যখন ওয়েলিংটনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয় পেলাম, সেটিও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে আছে। এর সঙ্গে আমি দেশের বাইরে পাওয়া সব জয়কেই যােগ করতে চাই। নিজের দেশে অনেক দেশই ভালাে খেলে। কিন্তু অন্য দেশে গিয়ে ভিন্ন কন্ডিশনে ভালাে করাটাই টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে জেতাটা দেশে জেতার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দের।

শুভ্র: আপনার ক্রিকেট কফিনে তাে মােটিভেশনাল কার্ড জাতীয় একটা কিছু লাগানাে থাকত, সেটার কতটা ভূমিকা আপনার সাফল্যে?

হ্যাডলি: খারাপ সময়েই এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াত। যখন আমি বােলিংয়ে ছন্দ খুঁজে পেতাম না, রান আসত না, আত্মবিশ্বাস একটু নড়বড়ে হয়ে যেত, তখনই কফিনে লাগানাে ওই কাগজটার দিকে তাকাতাম। সেখানে কিছু জিনিস লেখা ছিল যা আমাকে মনে করিয়ে দিত আমার কী করা উচিত। সেটি আমাকে নির্ভার করে দিয়ে প্রতিপক্ষকে হারানাের কাজে আরও মনঃসংযােগ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করত। এটি ছিল আসলে নিজেকে জাগিয়ে তােলার একটা উপায়। আমার ক্যারিয়ারের শেষ আট বছরই কফিনে লাগানাে ছিল এবং কাকতালীয় বললে বলুন, ওই সময়টাতেই আমি আমার বেশির ভাগ সাফল্য পেয়েছি।

শুভ্র: আপনারা চার অলরাউন্ডার তাে একই সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেট দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। নিশ্চয়ই আপনাদের মধ্যে বড় একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারও ছিল। ইয়ান বােথাম, ইমরান খান ও কপিল দেব কী করছে, নিশ্চয়ই সেটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতেন আপনি?

হ্যাডলি: (হাসি) ওরা তাে সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছােট, খেলাও শুরু করেছে পরে। তাই হয়তাে ওরাই আমার দিকে বেশি খেয়াল রাখত। না, সিরিয়াসলি বলি, বোথাম, ইমরান বা কপিলের পারফরম্যান্সের দিকে সব সময়ই নজর রাখতাম আমি। আমরা যখন পরস্পরের মুখােমুখি হতাম, বাড়তি একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ থাকতই। ব্যাটিংয়ের সময় একজন আরেকজনের বলে আউট হব না বলে যেমন বাড়তি একটা প্রতিজ্ঞা থাকত, তেমনি বােলিং করার সময় একে অন্যকে আউট করার একটা মরিয়া চেষ্টা থাকতই আমাদের। পরস্পরের বিপক্ষে আমাদের সাফল্যও আছে। কখনাে হয়তাে ইয়ান বােথাম আমাকে চার-ছয় মেরে সেঞ্চুরি করেছে, আবার কখনাে আমিও কম রানেই আউট করে দিয়েছি ওকে। ইমরান আর কপিলের ক্ষেত্রেও একই কথা। আমরা সবাই সবার বিপক্ষে কখনাে না কখনাে সাফল্য পেয়েছি। সবার ক্যারিয়ার শেষে হিসাব করলে হয়তাে দেখা যাবে ড্রতেই শেষ হয়েছে আমাদের লড়াই। আশির দশকে এই অলরাউন্ডারদের লড়াইটা যেমন মিডিয়া হাইপ তৈরি করেছিল, তেমনি ক্রিকেটেও যােগ করেছিল বাড়তি কিছু। যখন আমি বােথাম, ইমরান বা কপিলকে বল করতাম, সবাই বাড়তি একটা কিছুর আশা করত। আমাদের নিজেদের মধ্যেও কিছু বােঝাপড়ার ব্যাপার থাকত। সব মিলিয়ে ক্রিকেটের জন্য এটি ছিল দারুণ এক বিজ্ঞাপন। ওদের সঙ্গে একই যুগে খেলতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। ইমরান-বোথাম-হ্যাডলি-কপিল: সেই অলরাউন্ডার কোয়াট্রেট। ছবি: উইজডেন

শুভ্র: আপনাদের এই চার অলরাউন্ডারের মধ্যে যদি তুলনা করতে বলি...

হ্যাডলি: একেকজনের একেক গুণ ছিল। ওরা তিনজনই ছিল ম্যাচ উইনার। সবাই রান করেছে, উইকেট নিয়েছে। ব্যাটিং-বােলিং মিলিয়ে ইমরান হয়তাে বাকিদের চেয়ে বেশি নির্ভরযােগ্য ও ধারাবাহিক ছিল। ব্যাট হাতে ইয়ান বােথাম ছিল খুব বিধ্বংসী, খুব তাড়াতাড়িই ম্যাচের রং বদলে দিতে পারত ওর ব্যাটিং। আর কপিল তাে যেন অনন্তকাল ধরে বােলিং করে গেল, দারুণ কিছু ইনিংসও খেলেছে ও। চারজনের মধ্যে যদি তুলনা হয়, আমার ব্যাটিংই ছিল দুর্বলতম। বাকি তিনজনই আমার চেয়ে বেশি রান করেছে, বেশি সেঞ্চুরি করেছে। তবে বােলার হিসেবে আমি হয়তাে ওদের চেয়ে ভালাে ছিলাম । আরেকটি কথাও মনে রাখবেন, আমাকে কিন্তু সব সময়ই দলের মূল স্ট্রাইক বােলারের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ কথা অবশ্য কপিলের বেলায়ও প্রযােজ্য।

শুভ্র: বােলার হিসেবে আপনি তাে সর্বকালের সেরাদের একজন। আপনি নিজে বােলার রিচার্ড হ্যাডলির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক মনে করেন কোনটিকে?

হ্যাডলি: আমার ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি ও শেষ পর্যায়ে আমি ছিলাম খুব অ্যাকুরেট। আমি সব সময়ই অফ স্টাম্পের লাইনে বল করে ব্যাটসম্যানকে খেলাতে চেয়েছি। সঙ্গে আরও কিছু স্কিল তাে ছিলই। বলকে সুইং করানাে, সিম করানাে, বাউন্সের ব্যবহার... এসব তাে পারতামই। অনেক ছােট রান আপে বল করলেও কখনাে কখনাে অন্য যে কারও মতাে গতিতে বল করতে পারতাম। ব্যাটসম্যানকে সব সময় চাপে রাখাটাই ছিল আমার মূল কৌশল। তিন স্লিপ ও এক গালি নিয়ে আমি অফ স্টাম্পের বাইরের ওই চ্যানেলটাতেই টানা বল করে গেছি। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে আমার চেষ্টাটা ছিল যত জোরে সম্ভব বল করার। আস্তে আস্তে বুঝতে শিখলাম, গতিটাই সব নয়। অন্য সব দক্ষতা যােগ হলাে বােলিংয়ে। তখন ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল অনেকটা দাবা খেলার মতো, ব্যাটসম্যানকে নানাভাবে ক্রিজে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলিয়ে তারপর চূড়ান্ত আঘাত হানা। এটিই ছিল আমার শক্তি এবং তা অর্জন করতে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।রিচার্ড হ্যাডলির বোলিংয়ের সময় যা ছিল সবচেয়ে নিয়মিত দৃশ্য। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: যাঁদের বিপক্ষে বােলিং করেছেন, তাঁদের মধ্যে সেরা ব্যাটসম্যান মনে হয়েছে কাকে?

হ্যাডলি: একজনকে বেছে নিতে পারব না। ভিভ রিচার্ডস, গাওয়ার, গ্রিনিজ, গ্রেগ চ্যাপেল, বয়কট... অনেক ভালাে ব্যাটসম্যান ছিল আমার সময়ে । ক্রিকেটে একটা ব্যাপার সব সময় মনে রাখতে হয়। কখনাে কখনাে প্রতিপক্ষেরও দিন আসবে, তাঁরাও রান করবে, প্রতিপক্ষকে তাই সম্মান করতে শিখতে হবে । তারপরও যাদের কথা বললাম, তাঁরা বিশেষ কিছু । যেমন মিয়াঁদাদ, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওর দারুণ সাফল্য। ওকে আউট করা ছিল সত্যিই খুব কঠিন। অসাধারণ খেলােয়াড়। এমনই আরেকজন বাের্ডার। গাভাস্কার ওয়াজ অ্যানাদার গ্রেট প্লেয়ার। এদের বিপক্ষে হয়তাে একদিন আমি জিতেছি, কিন্তু পরদিনই হয়তাে ওরাও জবাব দিয়ে দিয়েছে ।

শুভ্র: ক্যারিয়ার শুরু করার সময় কি কোনাে 'আইডল' ছিল আপনার?

হ্যাডলি: ডেনিস লিলির প্রচণ্ড প্রভাব ছিল আমার ওপর। লিলি সম্ভবত ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা ফাস্ট বােলার। দারুণ এক রােল মডেল। শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী, দুর্দান্ত স্কিল, আক্রমণাত্মক, দারুণ টেকনিক, ব্যাটসম্যানদের জন্য ভীতিকর—সব মিলিয়ে অসাধারণ এক বােলার। এই একজন লােক যার সঙ্গে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি। তাঁর প্রচুর ভিডিও ফুটেজও ছিল আমার কাছে। মাঠে কঠিন কোনাে পরিস্থিতিতে পড়লে আমি চিন্তা করতাম, এ অবস্থায় লিলি কী করত! আমার জন্য লিলি ছিল সব সময়ের এক অফুরান প্রেরণার নাম।

শুভ্র: বর্তমান ক্রিকেটে সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বােলার ও সেরা অলরাউন্ডার মনে করেন কাদের?

হ্যাডলি: ব্যাটসম্যান তাে অবশ্যই টেন্ডুলকার, এ নিয়ে আসলে কোনাে প্রশ্নই থাকতে পারে না। ও হলাে জিনিয়াস। টেস্ট-ওয়ানডে সব ধরনের ক্রিকেটে সব রেকর্ডই ও ভেঙে দেবে—সবচেয়ে বেশি রান, সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি, সবচেয়ে বেশি ফিফটি, ব্র্যাডম্যানের পর সেরা অ্যাভারেজ সবই ওর হবে। বােলারদের মধ্যে শেন ওয়ার্ন সর্বকালের সেরা স্পিন বােলার। ফাস্ট বােলারদের মধ্যে ওয়াসিম আকরাম 'গ্রেট' বােলার। বাঁহাতি হওয়াটা ওর বাড়তি সুবিধা। পেস, সুইং, রিভার্স সুইং-কী এক বােলার! ইদানীংকার কথা বললে ম্যাকগ্রা দারুণ করছে। ওভারের পর ওভার একই রকম অ্যাকুরেট বল করে যেতে পারে ও।