সকালে কমেন্ট্রি বক্স খুঁজতে খুঁজতে প্রেসবক্সে ঢুকে পড়েছিলেন ইমরান খান। ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক তাঁর শিষ্য ওয়াসিম আকরামের দল সম্পর্কে তাঁর উঁচু ধারণার কথা জানিয়েছেন অনেক আগেই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে যেতে আবারও বললেন তাই, ‘এই মুহূর্তে খুবই ভালো খেলছে পাকিস্তান।’ বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না, মিনিট ত্রিশেক পর শুরু হতে যাওয়া ম্যাচ সম্পর্কে বললেন একটা লাইনই, ‘আশা করি, ওরা ভালো ফাইট দেবে।’

ইমরানের পরের মন্তব্যটা নিজে শুনিনি। তা ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত ‘দ্য নেশন’ পত্রিকার সম্পাদক সুলতান মাহমুদের কাছ থেকে শোনা। লাঞ্চের সময় ইমরানের সঙ্গে কথা বলে এসে তিনি জানালেন, বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত পাকিস্তানি ‘গ্রেট’। ইমরান নাকি বলেছেন, ‘ম্যাচের ফলাফল যা-ই হোক, যেভাবে ব্যাট করেছে তারা, তাতে জয় হয়েছে বাংলাদেশেরই। বিশ্বের সেরা বোলারদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা যেভাবে ব্যাট করেছে, তাতে আমি মুগ্ধ।’

শুধু এ রকম ‘সান্ত্বনার জয়’ নয়, এই রিপোর্ট যখন লিখছি, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আপসেটটি ঘটানোর পথে ভালোমতোই এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। ২৩ ওভার শেষে পাকিস্তান ৫ উইকেটে ৭১। শুরুর ৪.৪৮ আস্কিং রেট প্রায় পৌঁছে গেছে ৬-এর ঘরে। নর্দাম্পটন মাঠ উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে প্রতীক্ষা করছে ইতিহাসের।

ব্যাটিংয়ে ৩৪ বলে ২৭ রানের পর পাকিস্তানের প্রথম ৫ উইকেটের ৩টিই তুলে নিয়েছিলেন খালেদ মাহমুদ। ছবি: অল স্পোর্ট

পাকিস্তানের টার্গেট ২২৪, এটাই বুঝিয়ে দেয় ম্যাচের প্রধমার্ধটা ছিল বাংলাদেশের। আগের চার ম্যাচের মতো এবারও প্রথমে ব্যাট করতে হয়েছে বাংলাদেশকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচটি ছাড়া বাকি সবগুলোতেই তা প্রতিপক্ষ অধিনায়কের ইচ্ছেয়। চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে বড় ছিল মনে হয় এদিনই। ওয়াসিম আকরাম-শোয়েব আখতার-ওয়াকার ইউনিস-সাকলায়েন মুশতাক, ওয়ানডে ইতিহাসে এর চেয়ে বৈচিত্র্যময় বোলিং অ্যাটাক নিয়ে খেলতে নেমেছে খুব কম দলই।

ম্যাচের আগের দিন পাকিস্তানি ফাস্ট বোলারদের নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তা ছিল বাংলাদেশের। তবে অনেক দিন পর পাকিস্তানের বোলিং ওপেন করা ইউনিস আর বিশ্বের দ্রুততম হিসেবে তাঁর উত্তরসূরি শোয়েব আখতারের তোলা গতির ঝড় দারুণভাবেই সামলালেন বাংলাদেশ দুই ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ ও মেহরাব হোসেন অপি। গত মার্চেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭১ রানের ওপেনিং জুটি গড়েছিলেন এঁরা দুজন। প্রথম দুই ম্যাচে ব্যর্থতার পর বাদ পড়া বিদ্যুৎ কাল ফিরেই প্রমাণ করলেন—এই জুটিতেই বাংলাদেশের ওপেনিংয়ের ভবিষ্যৎ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬৪ আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪২ রানের দারুণ দুটি ইনিংস খেলা অপিকে ম্লান করে দিয়ে এদিন শুরু থেকেই বিদ্যুতের মতোই ঝলসে ওঠে শাহরিয়ারের ব্যাট। ওয়াকারকেই পছন্দ করেছিলেন বেশি, তাঁর দ্বিতীয় ওভারে তিন বলের মধ্যে দুটি বাউন্ডারি মেরে বিদ্যুৎ পুরো দিনেরই একটা পূর্বাভাস দিয়ে দেন। আগের চার ম্যাচে বাংলাদেশের ওপেনিং পার্টনারশিপ ছিল ০, ৮, ৬, ও ১০। দু শ পার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে পারছিল না মূলত এ কারণেই।

কাল সাকলায়েনের ওয়াইড বলে অপি স্টাম্পড হওয়ার আগে স্কোরবোর্ডে ৬৯ শুধু বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের সেরা ওপেনিং পার্টনারশিপ নয়, পাকিস্তানের বিপক্ষেও এই টুর্নামেন্টে দুই ওপেনারের সেরা সাফল্য।

ওয়াসিম আকরামের এমন হতাশার প্রকাশই বুঝিয়ে দিচ্ছে এদিন বাংলাদেশের ব্যাটিং। ছবি: অল স্পোর্ট

পরের ওভারেই আউট হয়ে যান বিদ্যুৎও। সাকলায়েনের সেই বিখ্যাত ‘সোজা বলে’ এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে। ফাস্ট বোলারদের নিয়ে বেশি ভেবেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, অথচ তাদেরকে ছাপিয়ে মূল হন্তারক হয়ে দাঁড়ালেন যিনি, তাঁকে এখনই সর্বকালের সেরা অফ স্পিনার বলতে প্রস্তুত অনেকে। সাকলায়েন মুশতাক ১০ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ৫ উইকেট, অভ্যাসমতো পুরোনো বলে আঘাত হেনেছেন ওয়াকার ইউনিসও। এক ওভারে ২ উইকেট, এর মধ্যে দুর্জয়কে বোল্ড করা তাঁর বলটি মনে করিয়ে দিয়েছে পুরোনো ওয়াকারের কথা, যখন সারে কাউন্টির মায়েরা সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর জন্য বলতেন, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমাও, ওয়াকার আসছে।’

এর দুই বল আগেই টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো নিজেকে খুঁজে পাওয়া আকরাম খানকে বিদায় করেছেন এই ফাস্ট বোলার। আইসিসি ট্রফি জয়ের পর আকরাম খান বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর স্বপ্ন দেখি।’ হয়তো সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো জ্বলে উঠল তাঁর ব্যাট। ১৬, ৪, ০, ০—টানা চার ম্যাচে ব্যর্থতার পর শুধু অভিজ্ঞতার প্রশ্নই দলে রেখেছিল তাঁকে। শুরু থেকেই পজিটিভ মনে হওয়া আকরামের ৪২-এর পর বাংলাদেশের ইনিংসে সর্বোচ্চ অবদান মিস্টার এক্সট্রার। ৪০ রান এসেছে এই খাতে, এর মধ্যে ওয়াইড থেকেই ২৮।

আগের চার ইনিংসে মোট ২০ রান, সর্বশেষ দুই ইনিংসে শূন্য...এই দুঃস্বপ্নকে সঙ্গী করে নেমে ম্যাচের সর্বোচ্চ স্কোরার আকরাম খান

৪২ সর্বোচ্চ স্কোর, তারপরও পাকিস্তানের বিপক্ষে ষষ্ঠ ম্যাচে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ দুই শ পেরিয়েছে নান্নু, সুজন, পাইলট সবাই কিছু না কিছু অবদান রাখায়। অফ স্পিন ভেবে সাকলায়েনের সোজা বল বেরিয়ে মারতে গিয়ে স্টাম্পড হওয়ার আগে বড় কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সুজন। তা পূরণ না হওয়ার পরও লাঞ্চের সময় পরিতৃপ্ত বাংলাদেশ দল। ২২৩-কে ফাইটিং স্কোর বলার কারণ ছিল যথেষ্টই। কিন্তু সেটিই যে উইনিং স্কোর, তখন তা কে জানত!

আরও পড়ুন:

এই জয় পুরো ক্রিকেট কাঠামোকেই বদলে দেবে: বুলবুল