জিতলে সব ভালো আর হারলে সব খারাপ, ব্যাপারটা মোটেই এমন নয়। সমস্যা কিন্তু প্রথম দুই ওয়ানডেতেও ছিল। অধিনায়ক তামিম ইকবাল সিরিজ জয়ের আনন্দে ভেসে যেতে যেতেও ঠিকই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, দলের কাছ থেকে যে পারফরম্যান্স আশা করেন, তা এখনো হয়নি। সিরিজের শেষ ম্যাচটায় আশায় ছিলেন সেই ‘পারফেক্ট গেম’-এর।

অথচ হলো কী? ‘পারফেক্ট’ দূরে থাক, মুশফিকের ব্যাটে আড়াল হয়ে থাকা সব প্রশ্নগুলো বরং আরও উচ্চকিত হয়ে উঠল এই ম্যাচে। ‘পারফেক্ট গেম’-এর সন্ধানে নামা তামিম ইকবালের ‘ইমপারফেক্ট ক্যাপ্টেনসি’-ই যেমন একটা বড় প্রশ্ন। দারুণ বোলিং করা তাসকিন কেন দশম ওভারটা করার সুযোগ পেলেন না, এটা একটা বিস্ময়। বিস্ময় সাকিবকে এত পরে বোলিংয়ে আনাও। পাঁচজন জেনুইন বোলার থাকার পরও মোসাদ্দেককে দিয়ে কেন তিন ওভার করাতে হবে, এটাও ঠিক বোধগম্য হলো না।

ক্যাপ্টেনসি এমন একটা জিনিস, চাইলে সব ম্যাচেই ক্যাপ্টেনের কোনো না কোনো খুঁত বের করা যায়। প্রথম দুই ম্যাচেও নিশ্চয়ই তা করার সুযোগ ছিল। কিন্তু জয়ের চাদর অনেক কিছুই ঢেকে দেয়। না, কারণ মনে হয় শুধু এটা নয়। এভাবে নির্দিষ্ট করে বলা যায়, প্রথম দুই ম্যাচে এমন বড় কোনো ‘ভুল’ করেননি তামিম। আবার এটাও তো ঠিক, প্রথম দুই ম্যাচে সেভাবে চাপেও পড়েননি। ব্যাটসম্যান যখন চড়াও হয়, উইকেট পড়ে না, তখনই না ক্যাপ্টেনসির আসল পরীক্ষা। সেটাই হয়তো তামিমের হিসেব একটু এলোমেলো করে দিয়েছে।

তাসকিন কেন দশম ওভারটা করার সুযোগ পেলেন না, তা একটা প্রশ্ন বটে। ছবি: বিসিবি

সিরিজ শুরুর আগে ফিল্ডিংয়ের সময় সুযোগ কাজে লাগানোর গুরুত্বটা যেভাবে বুঝিয়েছিলেন, তাতে দল সাড়া দিয়েছিল বলেই মনে হয়েছিল। এ দিন সেই ক্যাচিংও ভোগাল। ওই যে বললাম, ক্যাপ্টেনসি বলুন, বা ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং, চাপ না থাকলে এই পর্যায়ে সবাই তা পারে। এই দক্ষতা আছে বলেই তো তাঁরা আজ এখানে। কিন্তু চাপের মধ্যে কে পারে, কে পারে না–এটাই হলো কোটি টাকার প্রশ্ন।

কুশল পেরেরার আবির্ভাবের সময় তাঁকে ‘নতুন জয়াসুরিয়া’ বলা হতো। ব্যাটিং করার ধরনে মিল আছে, মেজাজেও। এই সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে তা দেখা যায়নি। মান বাঁচানোর ম্যাচে কিছুটা দেখালেন, তাতে শ্রীলঙ্কার স্কোরটা যেখানে চলে গেল, তাতে প্রথম দুই ম্যাচের কথা মনে রাখলে বাংলাদেশের জেতার পূর্ব শর্ত ছিল একটাই। মুশফিকুর রহিমের ব্যাট থেকে বড় একটা ইনিংস। বাংলাদেশ প্রথম দুই ম্যাচের বৈতরণী পার হয়েছে তো মুশফিকের ব্যাটে চড়েই।

'নতুন জয়াসুরিয়া' কুশল পেরেরা কিছুটা স্বরূপে দেখা দিলেন এদিন। ছবি: বিসিবিওই দুটি ম্যাচের দিকে যদি ফিরে তাকান, সমস্যা কিন্তু সেখানেও ছিল। হাতের তালুর মতো চেনা উইকেটে নিজেদের দক্ষতা এবং শ্রীলঙ্কানদের ব্যর্থতা মিলিয়ে বোলাররা তাঁদের কাজটা ভালোমতোই সম্পন্ন করেছেন। তবে ব্যাটিংয়ে কিন্তু বিপদের আভাস ছিল। প্রথম ম্যাচে তামিমের ফিফটি, দুই ম্যাচেই মুশফিকের দারুণ দুটি ইনিংস, সঙ্গে মাহমুদউল্লাহর সঙ্গত পার করে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে। এভাবে বলতে গিয়ে অবশ্য মনে হলো, ক্রিকেট ম্যাচে তো এমনই হয়। এক ম্যাচে সবাই তো রান করে না, সবাই উইকেট পায় না। কিন্তু একেক ম্যাচে একেকজনকে তো পারফর্ম করতে হয়। সমস্যাটা হয়ে গেল সেখানেই। মাহমুদউল্লাহ এদিনও প্রথম দুই ম্যাচের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু মুশফিকের আর ম্যাচজয়ী ইনিংসের হ্যাটট্রিক হলো না। পাঁচ নম্বরে মোসাদ্দেকের রান পাওয়া তাঁকে অবশ্যই একটু স্বস্তি দেবে। কিন্তু শুরুতেই ধপাধপ উইকেট পড়ে গিয়ে আস্কিং রেট যেভাবে তরতর করে বাড়ছিল, তাতে বাংলাদেশ জিতবে বলে মনে হয়নি কখনোই। বরং ম্যাচ ঘুরপাক খাচ্ছিল একটা প্রশ্নেই, পরাজয়ের ব্যবধান হিসেবে লেখা থাকবে কত রান?

শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নের উত্তর, ৯৭ রান। ওয়ানডেতে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান হিসেবে অনেক বড়। প্রথম দুই ম্যাচে জয়ী কোনো দলের জন্য একটু অপ্রস্তুত হওয়ার মতোও। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয়টা যে হোয়াইটওয়াশের রূপ পেল না, তা নিয়ে মন খারাপ করতে পারেন। আবার যা পেয়েছেন, তা নিয়েই খুশিও থাকতে পারেন। প্রথম তো প্রথমই, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রথম সিরিজ জয়ের মাহাত্ম্য তো আর এই পরাজয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আইসিসি ওয়ানডে লিগের পয়েন্ট তালিকাটাকেও ধরতে পারেন প্রাপ্তির হিসেবে। এক সময় হয়তো থাকবে না, কিন্তু এখন যে বাংলাদেশের নামটি সেখানে সবার ওপরে, দেখতে খুব ভালো লাগে না, বলুন?

দুষ্মন্ত চামিরা আগের দুই ম্যাচেই ভুগিয়েছেন, এদিন তো বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য তিনি ভোগান্তির চূড়ান্ত। ছবি: বিসিবিসাকিবের বড় কোনো অবদান ছাড়া যে বাংলাদেশ একটা সিরিজ জিতে ফেলল, এটাও তো মোটামুটি অভূতপূর্ব ঘটনাই। আজই এই ওয়েবসাইটে সংখ্যা-পরিসংখ্যান-র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসেব দিয়ে সাকিবকে নিয়ে একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছে। যা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে যে, ওয়ানডে ইতিহাসে সেরা অলরাউন্ডারের নাম সাকিব আল হাসান। আর সেদিনই কিনা ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বাজে দিনগুলোর একটি কাটল সাকিবের। আগের দুই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে ০ ও ১৫ রানের ক্ষতে একটু হলেও প্রলেপ বুলিয়েছিল বোলিং। দ্বিতীয় ম্যাচে ২ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ডে মাশরাফির পাশে বসেছিলেন। এক ভেন্যুতে সবচেয়ে বেশি উইকেটের রেকর্ডে ওয়াসিম আকরামের পাশেও। তৃতীয় ম্যাচে দুটি রেকর্ডই সাকিব নিজের করে নেবেন–সন্ধ্যাবেলাতেও এর বিপক্ষে বাজি ধরার লোক পাওয়া যেত বলে মনে হয় না। অথচ সেই অভাবনীয় ঘটনাই ঘটল। ১০ ওভার বোলিং করেও সাকিবের কোনো উইকেট নেই!

বাংলাদেশ দল নিয়ে নির্বাচকেরা যা করেছেন, সেটিকে অবশ্য অভাবনীয় বলা যাচ্ছে না তাঁদের ট্র্যাক রেকর্ডের কারণে। কারণ অতীতেও তাঁরা এমন করেছেন। নাঈম শেখ যখন অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বলে চালিয়ে দিয়ে আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তাঁর মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। এর আগে যে একটাই ওয়ানডে খেলেছেন, তাতে ব্যাটিং করার সুযোগই পাননি। এই বাঁহাতি নির্ভেজাল ব্যাটসম্যান, এই বিবেচনায় এদিনই আসলে সত্যিকার অভিষেক নাঈমের। স্কোয়াডে আরও দুইজন ওপেনার থাকার পর শুধুই একটা ম্যাচের জন্য একজন তরুণকে বাইরে থেকে এনে নামিয়ে দেওয়া মানে তাঁর ওপর চাপটা আরও বাড়িয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের ম্যাচটাই শুরু হয়েছে এই 'ভুল' দিয়ে। এটা বলছি, নাঈম ব্যর্থ হয়েছেন বলে নয়। নাঈম সেঞ্চুরি করে ফেললেও তা ভুলই থাকত। কারণ প্রশ্নটা নাঈম-সৌম্য বা লিটনকে নিয়ে নয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে। 

লাভটা কী হলো? ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ওপেনিং জুটির সংখ্যা ১১ হয়ে যাওয়া ছাড়া তো আর কিছু দৃশ্যমান নয়। এটাকে অবশ্য লাভ না বলে ক্ষতিই বলা উচিত। নাঈমকে এভাবে ডেকে এনে না খেলানোটা অন্যায় হতো, আবার লিটনকে বাদ দিলে প্রথম সুযোগটা যাঁর প্রাপ্য, সেই সৌম্যকে বসিয়ে রেখে তাঁকে খেলানোটাকেও বলতে হচ্ছে অন্যায়। এ নিয়ে বড় একটা লেখা লিখে ফেলেছি বলে বিস্তারিততে আর না-ই বা যাই। শুধু এটুকু বলি, টানা দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ পকেটে পুরে ফেলা একটা দলে এই অনাসৃষ্টিটা নির্বাচকেরা না করলেও পারতেন।

তাতেই বাংলাদেশ জিতে যেত, এমন বলছি না। ক্রিকেটমূর্খ ছাড়া কেউ তা বলবেও না। কিন্তু কেন যেন ক্রিকেটীয় সব ব্যাখ্যার বাইরেও কী একটা মনে খচখচ করছে। কখনো এমনও মনে হচ্ছে, ঘটনাপ্রবাহ দেখে ক্রিকেট-বিধাতা কখনো কখনো সিরিজের সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বহীন একটা ম্যাচেও হস্তক্ষেপ না করে পারেন না। 

আরও পড়ুন:
নাঈমকে না খেলালে অন্যায় হবে, খেলালেও!!
সাকিবই কি ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার?