দুই ম্যাচেই সিরিজ জেতা সারা, তৃতীয় ম্যাচে হোয়াইটওয়াশের হাতছানি। এ আর নতুন কি, এক সময় বাংলাদেশের প্রায় সব সিরিজেরই নিয়মিত চিত্র ছিল এটি। তবে তখন একটু মান বাঁচানোর জন্য তৃতীয় ম্যাচ খেলতে নামা দলটির নাম হতো বাংলাদেশ। আজ যেখানে শ্রীলঙ্কা।

প্রতিপক্ষ নামত হোয়াইটওয়াশ করে আধিপত্যটা সংশয়াতীত করে তুলতে। আজ যেমন নামছে বাংলাদেশ। হোয়াইটওয়াশকে বদলে ‘বাংলাওয়াশ’কে ক্রিকেটীয় পরিভাষায় ঢুকিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বও বাংলাদেশের। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যে কথাটা টিভি কমেন্ট্রিতে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন আতহার আলী খান। পরের বছর দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪-০তে সিরিজ জেতার পর সর্বজনীন ব্যবহারে যা বিখ্যাত হয়ে যায়।

আজ আরেকটি হোয়াইটওয়াশ বা বাংলাওয়াশ হবে কি না, তা জানতে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে এই হোয়াইটওয়াশ হওয়া না-হওয়ার ম্যাচের আগেই বড় একটা অন্যায় হয়ে গেছে। ‘অন্যায়’ শব্দটা হয়তো একটু বেশি কঠোর শোনাচ্ছে, তবে নাঈম শেখকে তৃতীয় ওয়ানডের স্কোয়াডে ডাকাটাকে যে আমার তা-ই মনে হচ্ছে।

নাঈমের প্রতি কোনো বিরাগ থাকার প্রশ্ন ওঠে না। কোনো খেলোয়াড়ের প্রতিই তা নেই। নাঈমের বদলে অন্য কোনো ওপেনারকে স্কোয়াডে ডাকলেও আমি সেটিকে অন্যায়ই বলতাম। কারণ এটা নির্বাচনী নীতির প্রশ্ন।

না বললেও আপনি বুঝতেন, তারপরও বলি, অন্যায়টা অবশ্যই নাঈমের নয়। যে অন্যায়ের কথা বলছি, নাঈমকে ডেকে তা করেছেন নির্বাচকেরা। যে ‘অন্যায়’ তাঁরা এর আগেও বেশ কবার করেছেন। সেসবে পরে আসি। মাত্র একটি ম্যাচ সামনে রেখে নাঈমকে ডেকে যেহেতু ১৫ জনের স্কোয়াডকে ১৬ জনের করা হয়েছে, ধরে নেওয়া যায়, নাঈম আজ খেলছেন। যে অন্যায়ের কথা বলছি, তার সঙ্গে নাঈম শেখের খেলা না-খেলার কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁকে খেলানো হলে তা যেমন অন্যায় হবে; তেমনি অন্যায় হবে না খেলালেও। খেলালে সৌম্য সরকারের প্রতি অন্যায় হবে, না খেলালে নাঈম শেখের প্রতি।

দ্বিতীয়টার ব্যাখ্যা যেহেতু সংক্ষেপেই সেরে ফেলা যায়, সেটিই আগে সেরে ফেলি। একটা ম্যাচের জন্য নাঈমকে ডাকা মানেই দল তাঁর ভীষণ প্রয়োজন বোধ করেছে। ডাক পেয়েই নাঈমের তাই 'আমি খেলছিই' ধরে নেওয়াটাই স্বাভাবিক। তার মানে না-খেলালে তরুণ এক ক্রিকেটারকে অকারণে আশাভঙ্গের বেদনায় ডুবিয়ে দেওয়া হবে।

খেলালে কেন সৌম্য সরকারের প্রতি অন্যায় হবে? কারণ সৌম্যকে দলে নেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় ওপেনার হিসেবে। তাঁকে না খেলিয়ে বাইরে থেকে কাউকে ডেকে এনে খেলিয়ে দেওয়াটা শুধু তাঁর প্রতি অন্যায়ই নয়, অপমানজনকও বটে। কেন, তা পাঠককে বুঝিয়ে বলার দরকার হয়তো আছে, তবে নির্বাচকদের তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন দেখি না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের তিন নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, হাবিবুল বাশার সুমন ও আবদুর রাজ্জাক, তিনজনই নামি ক্রিকেটার। বাংলাদেশের হয়ে অনেক স্মরণীয় পারফরম্যান্স আছে তিনজনেরই। একজন ক্রিকেটারের জন্য চরম অপমানজনক কী হতে পারে, এটি তাঁদের না বোঝার কথা নয়। 

তিন নির্বাচকের প্রথম দুজন ছিলেন ব্যাটসম্যান, শেষজন বাঁহাতি স্পিনার। তাঁদেরকে স্কোয়াডে রেখে বাইরের কোনো ব্যাটসম্যান বা বাঁহাতি স্পিনারকে এনে খেলিয়ে দিলে কেমন লাগত, এটা কি তাঁদের একবার ভেবে দেখার একটু সময় হবে? যদি তাঁরা সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হতেন, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যদি এই সিরিজের পরিস্থিতিটাই কল্পনা করি, প্রথম দুই ম্যাচে খেলেননি, অথচ তৃতীয় ম্যাচে তাঁদের জায়গায় খেলতে বাইরের কাউকে ডেকে আনলেন নির্বাচকেরা–কেমন লাগত তাঁদের? শুধু মান-অপমানের প্রশ্ন নয়, আত্মবিশ্বাসেও কি তা বড় একটা আঘাত হতো না!

আজ যদি নাঈম শেখ খেলেন আর সৌম্যকে প্রথম দুই ম্যাচের মতোই বাইরে বসে তা দেখতে হয়, সৌম্যর কেমন লাগবে? নিজের ওপর বিশ্বাসটা কি আরও নড়বড়ে হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক নয়! অনুভূতিটা কেমন হতে পারে, এটা ভাবতেই তো বিবশ লাগছে। যা ভেবে সবচেয়ে অবাক লাগছে, তা হলো, বর্তমান তিন নির্বাচকই তো তাঁদের খেলোয়াড়ি জীবনে নির্বাচনী অবিচারের শিকার হয়েছেন। নির্বাচক হলে সেসব আর মনে থাকে না দেখছি!

চলুন, পুরো ব্যাপারটা এবার একটু অন্যদিক থেকে দেখার চেষ্টা করি। প্রথম প্রশ্ন হলো, তিন ম্যাচ সিরিজে প্রথম দুই ম্যাচের জন্য দল দিতে হবে কেন? প্রথম দুই ম্যাচ দেখে যদি মনে হয় কোনো পরিবর্তন দরকার, তা যেন করা যায়, এই জন্যই তো? এমন সেফটি নেটই যদি রাখতে হয়, তাহলে আর তাঁরা নির্বাচক কেন? তিন ম্যাচের জন্য ১৫ জনের দল নির্বাচন করার আত্মবিশ্বাসও তাঁদের নেই, এ কেমন কথা!

ঠিক আছে, এটা না হয় বাদই দিলাম। এবার অন্য একটা প্রশ্ন করি। প্রথম দুই ম্যাচের জন্য ১৫ জনের যে দল নির্বাচন করেছেন তাঁরা, তা তো সব পজিশনে বিকল্প চিন্তা করেই। তার মানে সপ্তাহখানেক আগেও তিন নির্বাচকের চোখে তামিম ও লিটনের পর তৃতীয় সেরা ওপেনার বিবেচিত হয়েছেন সৌম্য সরকার, আমাদের তো এটাই্ বোঝার কথা, তাই না? তা মাঝের সময়টাতে কী ঘটেছে যে, হঠাৎই তাঁদের মনে হলো, সৌম্যর চেয়ে নাঈম শেখ বেশি ভালো হবেন। যদি সত্যি সত্যিই তা মনে হয়ে থাকে, তাহলে তো তাঁদের নির্বাচনী ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়।

নাঈমকে না খেলালে তাঁর প্রতি অন্যায় হবে, ওপেনিংয়ে খেলালে সৌম্যর প্রতি। ছবি: হাটন হপকিনস/গেটি ইমেজেস

পুরো আলোচনাটাই করছি অবশ্য আন্দাজের ওপর। নাঈম শেখকে যে ওপেনার হিসেবেই দলে নেওয়া হয়েছে, এই নিশ্চয়তাই বা কীভাবে পাবেন? বাংলাদেশের এই দলে তো ওপেনারেরও সাত নম্বর ব্যাটসম্যান হয়ে যেতে সময় লাগে না। এই নির্বাচকদের উর্বর কল্পনাশক্তির কারণেই আমরা কি সৌম্যকে সাত নম্বরের পাওয়ার হিটার হিসেবে দেখিনি! এর চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো, এমন বৈপ্লবিক একটা চিন্তা করে তা থেকে মাত্র এক ম্যাচ পরই সরে আসা। এক ম্যাচই বলছি, কারণ সৌম্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচেই খেললেও ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র একটা ম্যাচেই। তাতে তাঁকে ৮ বলে ৭ রান করতে দেখেই নির্বাচকেরা বুঝে ফেললেন যে, এই পরিকল্পনা কাজে আসবে না। যদি তা-ই হয়, তাহলে আবারও নির্বাচক হিসেবে তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। এমন একটা পরিকল্পনা করলেন, যা অকার্যকর প্রমাণ হতে এক ম্যাচের বেশি লাগল না! ভুল স্বীকার করেছেন এরপর? কই, ঠিক মনে পড়ছে না তো। 

এ কারণেই বলছিলাম, নাঈম শেখকে যদি আজ সাত নম্বরের পাওয়ার হিটার হিসেবেও নামিয়ে দেওয়া হয়, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ এমন তুঘলকি কাণ্ড দেখে দেখে তো আমরা অভ্যস্তই হয়ে গেছি। তাছাড়া এর আগে যে একটি মাত্র ওয়ানডে খেলেছেন নাঈম, সেটি তো মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেই। ঘটনাচক্রে গত বছর মার্চে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ম্যাচেই লিটনের রেকর্ড ভাঙা ১৭৬। তামিমের সঙ্গে তাঁর ২৯২ রানের ওপেনিং জুটি। পাঁচ নম্বরে নামার অপেক্ষায় থাকা নাঈমের আর নামতেই হয়নি।  

এভাবে হুটহাট কাউকে খেলিয়ে দিলে তাঁর ওপর অবিশ্বাস্য চাপ তৈরি হয়। আর আগে থেকেই যাঁরা স্কোয়াডে ছিলেন, তাঁদের মনে তৈরি হয় নিরাপত্তাহীনতা। সেখানেই শেষ না হয়ে যা বিস্তৃত হয় ভবিষ্যতেও।

আবারও মনে করিয়ে দিই, যে আলোচনাটা করছি, তাতে নাঈম শেখের আজ খেলা না-খেলার কোনো সম্পর্ক নেই। আগেই তো বলেছি, তাঁকে ডেকেই অন্যায় করেছেন নির্বাচকেরা। সবচেয়ে যা ভয়ঙ্কর, এমন ঘটনা এখন নিয়মই হয়ে যাচ্ছে। নাঈমকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যে সৌম্য এলেন, তাঁকেও তো এভাবে একাধিকবার খেলানো হয়েছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জিতে যাওয়ার পর শেষ ম্যাচে স্কোয়াডের বাইরে থেকে ডেকে নিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সৌম্যকে। খুলনায় জাতীয় লিগের মাঝখান থেকে হন্তদন্ত হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে সৌম্য যে সেঞ্চুরি করেছিলেন, সে জন্য তিনি হাততালি পেতে পারেন, কিন্তু তাঁকে ওভাবে ডেকে নেওয়ার জন্য নির্বাচকেরা নন। এভাবে হুটহাট কাউকে খেলিয়ে দিলে তাঁর ওপর অবিশ্বাস্য চাপ তৈরি হয়। আর আগে থেকেই যাঁরা স্কোয়াডে ছিলেন, তাঁদের মনে তৈরি হয় নিরাপত্তাহীনতা। সেখানেই শেষ না হয়ে যা বিস্তৃত হয় ভবিষ্যতেও।

গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচকেরা যা করেছেন, তা তো আরও ভয়াবহ। এখানেও আসছেন সৌম্য সরকার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ওপেনার সাদমান ইসলাম ইনজুরিতে পড়ার পর দ্বিতীয় টেস্টে স্কোয়াডে থাকা বিকল্প ওপেনার সাইফ হোসেনকে না খেলিয়ে বাইরে থেকে ডেকে আনা হয় সৌম্যকে। সৌম্য ব্যর্থ হন। সাফল্য-ব্যর্থতা যদিও এখানে বিবেচ্যই নয়, কারণ প্রশ্নটা নির্বাচনী নীতির। চট্টগ্রাম ওয়ানডেতে সৌম্য সেঞ্চুরি করাতেই যা মুছে যায়নি বা ঢাকা টেস্টে ব্যর্থ হওয়াতেই তা বড় হয়ে ওঠেনি। সৌম্যকে ওভাবে ডেকে আনা ঠিক হয়েছে কি হয়নি, প্রশ্ন হচ্ছে এটা। তিনি সফল না ব্যর্থ হয়েছেন, তা নয়। এই ম্যাচে নাঈম শেখের ঘটনাও তা-ই। এখানে যদিও একটা ফাঁক থাকছে, বা বলতে পারেন, ফাঁকটা ভরাট করা হয়েছে তাঁকে আগেই স্কোয়াডের অংশ করে নিয়ে।

লেখাটা শেষ করার আগে চুপিচুপি একটা কথা বলে যাব? লিটন বাদ পড়ছেনই বলে যে আমরা ধরে নিয়েছি, হয়তো আসলেই পড়ছেন, হঠাৎই মনে হলো, একটু অন্যভাবে কি ভাবা যেত না! বাংলাদেশ সিরিজ জিতে গেছে, অনেক নির্ভার হয়ে খেলার সুযোগ করে দেওয়া এই ম্যাচটাতে কি লিটনকে আরেকটা সুযোগ দিয়ে দেখা যেত না? তা যতটা না লিটনের জন্য, তার চেয়ে বেশি তামিম-লিটন ওপেনিং জুটিটা বাঁচানোর জন্য। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে ওয়ানডেতে ১০টি ওপেনিং জুটি যে আমরা এরই মধ্যে দেখে ফেলেছি!