দ্বিতীয় দিন শেষে

ভারত ১ম ইনিংস: ৩৮৪/৬

শচীন টেন্ডুলকার-সৌরভ গাঙ্গুলী সেঞ্চুরি করেছেন বলে কী হয়েছে, দ্বিতীয় দিনের খেলাশেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দল থেকেই কারও আসা উচিত ছিল। দিনটি তো পুরোপুরিই বাংলাদেশের। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ক্রমশ বিব্রতকর হয়ে ওঠা চট্টগ্রামের এই মাঠের শোচনীয় নিষ্কাশনব্যবস্থার কল্যাণে সেই দিন অবশ্য মাত্র ২০ ওভারের। তাতে ভারতের ৮৯ রান, বাংলাদেশের ৩ উইকেট।

শুধু ৩ উইকেট বোঝাতে পারছে না। এর দুটি যে শচীন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলীর। হাবিবুল বাশারের কণ্ঠটা তাই খুব পরিতৃপ্ত শোনাল, সেট হয়ে যাওয়া দুই ব্যাটসম্যানকে আউট করতে না পারলে আমাদের হয়তো ওদের ডিক্লারেশনের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন ওদের অলআউট করাটা খুবই সম্ভব।

সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনরত মাশরাফি, ওই টেস্টে এমন মুহূর্তের দেখা আরও চারবার পেয়েছেন তিনি। ছবি: এএফপি

বাংলাদেশের দিন, অথচ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের কেউই এলেন না। এলেন শচীন টেন্ডুলকার। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর ৩৬তম সেঞ্চুরি করার পর। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সফরে ঢাকায় অপরাজিত ২৪৮ রানের ইনিংস খেলে সুনীল গাভাস্কারের সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড ছুঁয়েছিলেন। কালকের সেঞ্চুরি ভেঙে দিল টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের রেকর্ডটি। এটিও ছিল গাভাস্কারের। টেন্ডুলকার মহা বিনয়ী, গাভাস্কার, রিচার্ডস এঁরা বেঞ্চমার্ক। তাঁদের ছাড়িয়ে যাওয়াটা সব সময়ই বিশেষ কিছু।

বিশেষ কিছু এই সেঞ্চুরিটাও। সেটি প্রায় দেড় বছর পর টেস্ট সেঞ্চুরি বলে নয়। এই সেঞ্চুরিতে গাভাস্কারের আরেকটি রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন বলেও নয়। ১৯৯৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের সময় বাবা রমেশ টেন্ডুলকারের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে দেশে শেষকৃত্যশেষে বিশ্বকাপে ফিরে গিয়েই সেঞ্চুরি করেছিলেন, সেই সেঞ্চুরি বাবাকে উৎসর্গ করাটা অবধারিতই ছিল। বাবার অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীর পর দিন করা এই সেঞ্চুরিটাও বাবার স্মৃতিতেই উৎসর্গিত হলো। না, এ কারণেও নয়।

এই সেঞ্চুরিটা বিশেষ কিছু, কারণ এখানে শচীন টেন্ডুলকার শুধু মাশরাফি-শাহাদাতদের বোলিংয়ের বিপক্ষেই খেলছিলেন না। খেলছিলেন আরও অনেক বড় অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। ১৬৯ বলে ১০১, বাউন্ডারি মাত্র ৯টি। হাবিবুল বাশার বলছিলেন, টেন্ডুলকার ব্যাটিংটা একদম বদলে গেছে। মিড অন-মিড অফ উপরে রাখলাম, তাও একবারও তুলে মারার চেষ্টা করল না। টেন্ডুলকারের আরেকটি রেকর্ডের কথা শুনে বাংলাদেশ-অধিনায়কের কণ্ঠে বিস্ময়বিস্মিত শ্রদ্ধা, সব রেকর্ডই করে ফেলবে ও। রেকর্ড হয়তো টেন্ডুলকার সবই করে যাবেন, তবে টেন্ডুলকারের ব্যাটিংয়ের মজাটা হারিয়ে যাওয়ার দুঃখটাও মনে হচ্ছে ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। এবার হাবিবুল ডাক করলেন, আমার কিছু বলা ঠিক হবে না। হাবিবুলের কিছু বলার দরকার নেই। টেন্ডুলকারের এই সেঞ্চুরি যাঁরা মাঠে বসে দেখেছেন, তাঁরাও কিছুদিন পর আর তা মনে করতে পারবেন কি না সন্দেহ। টেন্ডুলকারের মনে থাকবে!

শচীনের সেঞ্চুরিটা যেন বহু কষ্টে গড়া। ছবি: এএফপি

সৌরভ গাঙ্গুলীরও যেমন আলাদাভাবে মনে থাকবে এই ত্রয়োদশ টেস্ট সেঞ্চুরিটা। এটাকে ক্রিকেট-বিধাতার আশ্চর্য খেয়াল বলেই মনে হচ্ছে যে, এই টেস্টে যে দুজনের ওপর আলাদা করে স্পটলাইট পড়েছিল, তাঁদের মধ্যেই ১৮৯ রানের পার্টনারশিপ। সেই দুজনেরই সেঞ্চুরি! ব্যক্তিজীবনে যেমন, তেমনি ক্রিকেট ক্যারিয়ারেও টেন্ডুলকার-সৌরভে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। অথচ সেই দুজনকেই নিয়তি মিলিয়ে দিল এক বিন্দুতে।

বিশ্রামের আড়ালে ওয়ানডে দল থেকে বাদ, অধিনায়কত্বের লোভে বিশ্বকাপে দলবাজির অভিযোগসব মিলিয়ে অবমাননার চূড়ান্ত এবং তাতে একে অন্যের সঙ্গী। এমনিতে যা হতো শুধুই আরেকটি টেস্ট ম্যাচ, বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই চট্টগ্রাম টেস্টই তাই শচীন-সৌরভের কাছে হয়ে গিয়েছিল ক্যারিয়ারের কঠিনতম পরীক্ষার একটি। টেন্ডুলকারের জন্য হয়তো ব্যাপারটি নতুন, সৌরভের জন্য তা নয়। তাঁর কাছে ভারতীয় দলে প্রতিটি দিনই একেকটি পরীক্ষা। বিশ্বকাপে তাঁকে পাঠানো এক মুম্বাই সাংবাদিকের এসএমএস ভুল করে বীরেন্দর শেবাগের মোবাইলে চলে যাওয়ার পর এমনই বিতর্ক হয়েছিল যে, স্ত্রী ডোনার পরামর্শে এই প্রথম কোনো সফরে মোবাইলই ব্যবহার করছেন না সৌরভ। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের কারণে চট্টগ্রাম টেস্টে তাঁকে না খেলিয়ে উপায় ছিল না। কিন্তু সৌরভ জানতেন, এখানে ব্যর্থ হলেই কেউ আর দক্ষিণ আফ্রিকার কথা মনে রাখবে না। ভেঙ্কট লক্ষ্মণ বা যুবরাজ সিং ঢুকে যাবেন দলে।

সৌরভের আরও একটি কাট। ছবি: এএফপি

সৌরভের জন্য এই সেঞ্চুরির অর্থ তো অন্য রকম হবেই। টেস্টে সর্বশেষ সেঞ্চুরিটি সেই ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বুলাওয়েতে সেই সেঞ্চুরির পরই সংবাদ সম্মেলনে গ্রেগ চ্যাপেলের সঙ্গে কথোপকথন ফাঁস করে দিয়ে সৌরভের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ঝঞ্ঝামুখর অধ্যায়ের সূচনা।

এই টেস্টের আগে প্রেক্ষাপটে মিল, সেঞ্চুরিতে মিল। মিল আউট হওয়ার সময় ও ধরনেও। সৌরভ-শচীন দুজনই আউট হলেন সেঞ্চুরি করার এক বল পর। দুজনই পুল করতে গিয়ে। সৌরভকে নিলেন মাশরাফি। টেন্ডুলকারকে শাহাদাত।

দ্বিতীয় নতুন বল মাত্র ১৫ ওভার পুরোনো। আজ সকালেও তাই মাশরাফি ও শাহাদাতের মুখ চেয়েই থাকবে বাংলাদেশ। গলার কাঁটা হয়ে থাকা মহেন্দ্র সিং ধোনিকে তাড়াতাড়ি তুলে নিতে পারলে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ড্রয়ের স্বপ্নটা একদমই বাড়াবাড়ি বলে মনে হবে না।

আরও পড়ুন:

প্রথম দিন: ঝাল মিটিয়ে নিচ্ছেন টেন্ডুলকার-সৌরভ!

চতুর্থ দিন: মাশরাফি সামনে বলেই আড়ালে বৃষ্টি

পঞ্চম দিন: অবধারিত ড্রয়ের আগে একটু বিনোদন