উৎপল শুভ্র: বিসিসিবি একাদশের গত ভারত সফর কেমন হলো বলে মনে করেন আপনি?

মিনহাজুল আবেদীন নান্নু: আমি মনে করি, সন্তোষজনক। বিশেষ করে মঈন-উদ-দৌলা গোল্ডকাপে আমাদের পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট। এ ধরনের টুর্নামেন্টে আরও আগেই খেলা উচিত ছিল আমাদের। চেমপ্লাস্টের বিপক্ষে আমরা হেরেছি ব্যাটিং কলাপস্ করায়। তবে উইকেটও ভেজা ছিল। যদিও আমরা লাঞ্চের পর ব্যাটিং করি, ওদের ইনিংসের পর হেভি রোলার চালানোয় পিচ আর্দ্র হয়ে যায়।

শুভ্র: গত বছর এই টুর্নামেন্টে আবাহনী ক্রীড়াচক্র রানার্সআপ হয়েছিল। আর এবার আপনারা প্রায় জাতীয় দল সেমিফাইনালেও উঠতে পারলেন না। তারপরও এই পারফরম্যান্সকে সন্তোষজনক বলছেন কীভাবে?

নান্নু: একটা কথা ঠিক, গতবারের চেয়ে এবার টুর্নামেন্টের দলগুলো ছিল অনেক শক্তিশালী। তারপরও হায়দরাবাদের খেলোয়াড় কর্মকর্তারা সবাই ধরে নিয়েছিলেন আমাদের দলটি চ্যাম্পিয়ন না হলেও অন্তত ফাইনাল খেলবেই। এক ম্যাচে ব্যাটিং কলাপস্ করায় আমরা পারলাম না। শেষ পর্যন্ত যে দলটি চ্যাম্পিয়ন হলো, ওদেরকে কিন্তু প্র্যাকটিস ম্যাচে আমরা হারিয়েছিলাম।

শুভ্র: আমরা যখন স্কোরকার্ড পেয়েছি, প্রায় সব ম্যাচেই দেখেছি বোলাররা খুব ভালো করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন ব্যাটসম্যানরা।

নান্নু: বোলাররা ভালো করেছে উইকেটের সাহায্য পাওয়ায়। একই কারণে খারাপ করেছে ব্যাটসম্যানরা। তবে মূল কারণ ছিল, দীর্ঘদিন ম্যাচ খেলিনি আমরা। ম্যাচ তো দূরের কথা, নেট প্র্যাকটিসও করতে পারিনি যাওয়ার আগে। তাই ব্যাটসম্যানরা প্রায় সবাই ছিল আউট অব টাচ। যাওয়ার আগে ইনডোরে ম্যাটিং উইকেটে প্র্যাকটিস করেছি আমরা। হায়দরাবাদে প্রথম তিনটি ম্যাচ হয়েছে ম্যাটিংয়ে, তিনটিই ভালো মতো জিতেছি। মঈন-উদ-দৌলা টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচটিও হয়েছে ম্যাটে। কিন্তু এরপর টার্ফে খেলা শুরু হতেই আমাদের ম্যাচ প্র্যাকটিসের অভাবটা বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। আর একটা ব্যাপার খুব প্রভাব ফেলেছে আমাদের ওপর। কোচ মহিন্দর অমরনাথ প্রত্যেক ম্যাচের আগে বারবার বলেছেন একই কথা: ‌‘তোমরা আগে যা খেলেছ, ভুলে যাও। আজ যা খেলবে তাই ধরা হবে।’ তাঁর এই কথা ব্যাটসম্যানদের বাড়তি চাপে ফেলে দেয়, যে কারণে স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারেনি তারা।

শুভ্র: এই ট্যুরে দল গঠন, ব্যাটিং অর্ডার নির্ধারণে আপনার কী ভূমিকা ছিল?

নান্নু: কিচ্ছু নয়। দল গঠন, ব্যাটিং অর্ডার ঠিক করা-- সবই করেছেন মহিন্দর অমরনাথ। এমনকি কারও সঙ্গে কোনো আলোচনাও করেননি তিনি। ম্যানেজারের সঙ্গেও নয়। আমি দলের অধিনায়ক, আমার সঙ্গেও কোনো আলোচনা নয়। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে অমরনাথই বলে দিতেন, ওকে ওপেনিংয়ে পাঠাও, অমুক অত নম্বরে নামবে। এমনকি দলও জানা থাকত না আগে, টস করতে যাওয়ার আগে দল বলে দিতেন তিনি।

ভোরের কাগজের খেলার পাতায় মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর দেওয়া তুমুল আলোচিত সেই ইন্টারভিউ, যেটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটে

শুভ্র: ম্যাচের আগের দিন টিম মিটিং হয়নি?

নান্নু: হয়েছে। ওতে কোচ বলেছেন টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো নিয়েই। যেমন ব্যাটসম্যানদের বলেছেন, স্ট্রেইট খেলবে, পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে হবে। দল কি হবে বা ব্যাটিং অর্ডার কী এসব নিয়ে কথা হয়নি। পুরো ক্ষমতাই ছিল তাঁর। উনি এমন অনেক কিছুই করেছেন, যা মেনে নেওয়া যায় না। যেমন সার্ভিসেস দলের বিপক্ষে প্র্যাকটিস ম্যাচের দিন সকালে ওয়ার্ম আপ শেষে টস করতে যাব, এমন সময় অমরনাথ আমাকে বললেন,‌‘ তুমি অ্যাজ এ প্লেয়ার খেলো, মনি আজ অধিনায়ক।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কেন?' উনি উত্তরই দিলেন না। আমার মনে হয় না, পৃথিবীতে কোনো ক্রিকেট দলের অধিনায়কের সঙ্গে এমন ব্যবহার করা হয়েছে।

শুভ্র: এই ব্যাপারটি নিয়ে আগে কোনো আলোচনা হয়নি?

নান্নু: না।

শুভ্র: ঘটনার পর ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করেননি?

নান্নু: ম্যানেজারের কোনো ভূমিকাই ছিল না। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোনো উত্তর দিতে পারেননি। আসলে অমরনাথের সঙ্গে কথা বলার সাহসই নেই তাঁর। ম্যানেজারের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন বলি আমাদের ম্যানেজার (আলিউল ইসলাম) সব সময় দূরে দূরে থেকেছেন দল থেকে। কোনো দায়িত্বই পালন করেননি তিনি। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে সাদ গিয়েছিল বলে বেঁচেছে ক্রিকেটাররা। ম্যানেজার ছিলেন পুরোপুরি ব্যর্থ।

শুভ্র: কিন্তু দেশে ফেরার পর ম্যানেজার তো বলেছেন, নান্নু-বুলবুল-আকরাম ব্যর্থ হয়েছে।

নান্নু: ম্যানেজার তো ঠিক মতো খেলাই দেখেননি। হায়দরাবাদে এক প্র্যাকটিস ম্যাচে আমরা যখন ব্যাটিং করছি, উনি চলে গেছেন মিউজিয়াম দেখতে। আমি আর ব্যর্থই বা হলাম কীভাবে? প্রথম ম্যাচে তিন রান করে আউট হয়ে গেছি, দ্বিতীয় ম্যাচে করেছি ৫৮, চেমপ্লাস্টের বিপক্ষে শূন্য রানে এলবিডব্লিউ। এরপর তো আঙুলই ভেঙে গেল, খেলতেই পারিনি।

কোচ মহিন্দর অমরনাথকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল নান্নুর। ছবি: প্রথম আলো

শুভ্র: মহিন্দর অমরনাথের ব্যাপারেও আপনার বেশ ক্ষোভ আছে মনে হচ্ছে।

নান্নু: অমরনাথ কোচ হিসেবে আসার পর যেভাবে কন্ডিশনিং ক্যাম্প এবং প্র্যাকটিস করিয়েছেন, সবই খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু ভারত সফরে তাঁর কিছু কাজ ভালো লাগেনি। বোম্বেতে এমন এক কাণ্ড করেছেন, যা মেনে নেওয়া কঠিন। টাটার বিপক্ষে ম্যাচটিতে দল যখন ফিল্ডিং করছে, দুই/তিন ওভার পরই মাঠে নেমে যান অমরনাথ এবং মনিকে অফ করে তিনি ক্যাপ্টেনসি করেছেন। ফিল্ড প্লেসিং শেখানোর জন্য নাকি তিনি এমন করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, উনি মাঠে না নেমে যদি বাইরে ব্যাপারটা  এক্সপ্লেইন করতেন তাহলে অনেক ভালো হতো। প্র্যাকটিসের সময় অথবা বাংলাদেশে ফিরে অন্য একটা ম্যাচেও তা করতে পারতেন। এভাবে একটা বিদেশী দলের বিপক্ষে সিরিয়াস ম্যাচে উনার মাঠে নামাটা ঠিক হয়নি। এতে প্রতিপক্ষ দল এবং দর্শকদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি মোটেই উজ্জ্বল হয়নি। বরং ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে ছোটই মনে হয়েছে আমার। অমরনাথের ক্ষেত্রে আরও একটা সমস্যা হলো, হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নিলেন উনি, কিন্তু কারণটা বলেন না কখনোই।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত, অমরনাথকে সিলেকশনের পুরো ক্ষমতা দেওয়া ঠিক হয়নি। উনি খেলা দেখার সুযোগ পাননি, তাই প্লেয়ার চেনেন না। যেমন আমি, নোবেল বা আতহার আলী জাতীয় দলের পক্ষে কি খেলেছি, তা তো উনি জানেন না। খেলা দেখার সুযোগ পেলেন না, অথচ পুরো দায়িত্ব তাঁকে দিয়ে দেওয়া হলো, এটা মনে হয় ঠিক নয়।

শুভ্র: কিন্তু যতদূর জানি, আগামীতে ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য ভিন্ন দুটো দল গঠন করা হবে। সেক্ষেত্রে অমরনাথ বরং আগের সুনামের চেয়ে এখনকার ফর্ম এবং তিন সফরে সার্বিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই দল নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন। সেটাই কী ভালো নয়?

নান্নু: এ ব্যাপারটি নিয়েও আমার আপত্তি আছে। তিনবার তিনটা টিম পাঠাতে হবে কেন? ৩২ জন প্লেয়ারই ক্যাম্পে রাখার প্রয়োজনটা কী? আইসিসিতে কারা খেলবে তা তো মোটামুটি জানাই। তাই আমার মতে ২০ জন প্লেয়ারকে ক্যাম্পে রেখে, বেশির ভাগ খেলোয়াড় অপরিবর্তিত রেখে তিনবারই একটা টিম পাঠানো উচিত, তাহলে প্লেয়াররা ভালো প্র্যাকটিসের সুযোগ পেত। এখনও যদি এক্সপেরিমেন্টই চলে, হাতে সময় তো বেশি নেই।

শুভ্র: দেশের মানুষ যখন বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নে বিভোর, তখন খুব আশার কথা তো কিছু শোনাতে পারলেন না আপনি?

নান্নু: না, হতাশ হবার মতো কিছুই ঘটেনি। দীর্ঘদিন ম্যাচ না খেলায় গত সফরটা ভালো হয়নি। তবে দেখবেন, আগামী সফরেই ভালো খেলব আমরা। মুষড়ে পড়ার কোনো কারণ নেই।

আরও পড়ুন: নান্নুর সেই ইন্টারভিউয়ের আগে-পরে