ভারতীয় ড্রেসিংরুমের ঠিক মাঝখানের টেবিলে রাখা ছিল কাপটি। বারবার তা নিয়ে পোজ দিতে হচ্ছিল একজনকেই। সৌরভ গাঙ্গুলী তাতে একটুও আপত্তি করছিলেন না। তাঁর মুখে ছিল দারুণ এক হাসি, যে হাসিই বলে দিচ্ছিল–এই দিনটি আমার।

কালকের দিনটি ছিল ভারতীয় দলের সবারই, কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলীর মতো আর কারও নয়। স্বপ্নের মতো কেটেছে গত বছর, এ রকম দিন অনেক এসেছে সৌরভ গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ারে। তারপরও এগিয়ে রাখলেন নতুন বছরের এই দিনটিকেই। তাঁর ইনিংসে ভারত ম্যাচ জিতেছে– এটি নতুন ঘটনা নয়। তবে কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে ম্যাচ উইনিং ইনিংস এটিই প্রথম। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান– এটা একটা বাড়তি তৃপ্তি। তার চেয়েও বড় তৃপ্তি, ৩১৪ রানের পাহাড় টপকে নতুন শৃঙ্গে ওঠার যে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে ভারত, তাতে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর। ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার তো তারই স্বীকৃতি। উচ্ছ্বাসের সে রকম তীব্র প্রকাশ ছিল না, কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলীর পুরো অস্তিত্বই ঝলমল করছিল আনন্দে।

ক্যারিয়ারের স্মরণীয়তম দিন হতে পারে এটি, তবে এদিনে খেলা ১৩৯ বলে ১২৪ রানের ইনিংসটিকে তাঁর খেলা সেরা ইনিংস মনে করেন না সৌরভ। গত সেপ্টেম্বরে টরন্টোতে সাহারা কাপের পঞ্চম ম্যাচে ৯৬ রানের ইনিংসটিকে দিতে চান সেই মর্যাদা। ‘আজ তো খেলেছি পুরো ব্যাটিং উইকেটে। টরন্টোতে উইকেট ছিল খুব খারাপ’–বললেন কারণটাও। সাহারা কাপের কদিন পরই পাকিস্তানে ওয়ানডে সিরিজে করাচিতে খেলা ৮৯ রানের ইনিংসটির কথাও বললেন বেশ কবার।

ঢাকার উইকেট হয়তো অনেক ভালো ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট কঠিন। আলোর স্বল্পতায় ব্যাট করতে সমস্যা হচ্ছিল কি না, এই প্রশ্নটা শেষ করতে না দিয়েই সৌরভ বললেন, ‘অসুবিধে মানে? শেষ দিকে বলই দেখতে পাচ্ছিলাম না ঠিকমতো।’

সমস্যা আরও ছিল। রান নিতে গিয়ে বাঁ পায়ে ক্র্যাম্প হয়েছিল, শেষ দিকে ব্যাট করেছেন অধিনায়ক আজহারকে রানার হিসেবে নিয়ে। ব্যাট করতে কি খুব অসুবিধে হচ্ছিল? ‘তা তো হচ্ছিলই। এখনো ফুলে আছে জায়গাটা’– ড্রেসিংরুম ছাড়ার সময়ও দেখা গেল, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই হাঁটছেন।

গত শ্রীলঙ্কা সফরে (১৯৯৭ সালে) ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন, কাল পেলেন দ্বিতীয়টি। আমার কাছেই জানতে চাইলেন সেই সেঞ্চুরির বিস্তারিত। প্রথম ফিফটি ৪২ বলে, ১১৫ বলে সেঞ্চুরি, পুরো ইনিংসটি ১৩৮ বলে, যাতে ১১টি চার ও ১টি ছয়। ‘পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি আমার প্রথম সেঞ্চুরি হলেও ওদের বিপক্ষে কিন্তু আমার চার/পাঁচটি ৮০/৯০ রানের ইনিংস আছে’–মনে করিয়ে দিলেন হাসতে হাসতে।

তা আছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হওয়ার পর থেকেই সৌরভ গাঙ্গুলীর সাফল্যও এক রকম নিয়মিতই। সাহারা কাপে টানা চার ম্যাচে ভারতের জয়ের স্থপতি ছিলেন তিনি, ওয়ানডে ইতিহাসে টানা চার ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও সৌরভ গাঙ্গুলী ছাড়া আর কেউই পাননি। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে কি তাহলে আলাদা কোনো প্রেরণা অনুভব করেন সৌরভ? মানতে চাইলেন না, ‘ভারতের পক্ষে সব ম্যাচেই ভালো খেলতে চাই আমি, প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন!’

সৌরভকে থামাতে পারছিল না পাকিস্তান। পাকিস্তানের অধিনায়ক রশিদ লতিফের চেহারা কিছুটা হলেও তা বলে দিচ্ছে

কিন্তু পাকিস্তান ৩১৪ রান করে ফেলার পর ব্যাট করতে নামার সময় সৌরভ সত্যিই কি জয়ের কথা ভেবেছিলেন? সৌরভের উত্তরে প্রচলিত ক্রিকেটীয় চিন্তারই প্রতিফলন, ‘ইনিংসের শুরুতে আমরা সেভাবে কিছু ভাবিনি। ধাপে ধাপে এগোব বলে ঠিক করে নেমেছিলাম আমরা।’ ‘আমরা’ মানে শচীন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলী।

টেন্ডুলকারের আউট হয়ে যাওয়াটা কি চাপে ফেলেছিল তাঁকে? ‘আমরা যেভাবে খেলছিলাম, তাতে আউট হওয়ার সম্ভাবনা ছিলই। শচীন আউট হওয়ার পরও সেভাবে চাপ অনুভব করিনি, কারণ রবিন সিংয়ের সঙ্গে মিলে প্রতি ওভারে ৭/৮ রান করে ঠিকই তুলছিলাম, তাই রান রেটের প্রেসার কিন্তু সেভাবে ছিল না আমাদের ওপর।’ সেই প্রেসারটা আসলে কমিয়ে দিয়েছিল মাত্র ৮.২ ওভারে ৭১ রান তুলে ফেরা শচীন-সৌরভ ওপেনিং জুটিই।

যতক্ষণ ব্যাট করেছেন, ততক্ষণই বরং কম প্রেসারে ছিলেন সৌরভ। ৪৩তম ওভারে আকিব জাভেদের বলে বোল্ড হয়ে ফেরার পরই কাটিয়েছেন সবচেয়ে অসহ্য সময়টা।

দলকে জয়ের ঠিকানা পৌঁছে দিয়ে ব্যাট উঁচু করে দৌড়ে যাচ্ছেন ড্রেসিংরুমের দিকে– এমন একটা দৃশ্য কল্পনা করেছিলেন ব্যাট করার সময়। সেই কল্পনাকে বাস্তব করতে না পেরে একটু রাগও হচ্ছিল নিজের ওপর। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা নিয়ে অনুতাপে পুড়তে হয়নি তাঁকে। বরং মেতে উঠতে পেরেছেন জয়ের উৎসবে, যে উৎসবের মধ্যমণি সৌরভ গাঙ্গুলী নিজেই।

আরও পড়ুন: ঢাকার যে ইনিংসে ব্যাটসম্যান সৌরভের ম্যাচ উইনার হিসেবে জন্ম