'এখানে এলে আমার একটুও বিদেশ বলে মনে হয় না’– ঢাকায় আসার পর কথাটা সৌরভ গাঙ্গুলীর মুখে শোনা যাবেই। সেটিই স্বাভাবিক। কলকাতা থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের উড়ান, বিদেশ মনে হবে কীভাবে! দেশের মধ্যেই তো সৌরভের এত সংক্ষিপ্ত বিমানযাত্রার সুযোগ হয় না। তবে এই দূরত্ব, বরং বলা ভালো তার অভাবটা মূল কারণ নয়, ঢাকার সঙ্গে সৌরভের এত নৈকট্য বোধ করার আসল কারণ ভাষা। বাংলায় কথা বলতে পারছেন সবার সঙ্গে, রাস্তার পাশে মিউজিকের দোকান থেকে পুরনো দিনের যে গানটি হঠাৎ ভেসে এল, সেটির সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে আছে তাঁর শৈশবের কোনো স্মৃতি। ঢাকাকে তাঁর বিদেশ মনে হবে কেন?

সেই ১৯৮৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ দিয়ে শুরু করে এরপর যতবার ঢাকায় খেলতে এসেছেন, কোনোবারই তা মনে হয়নি। ঢাকা সব সময়ই একটা আলাদা জায়গা নিয়ে থেকেছে সৌরভ গাঙ্গুলীর মনে। '৯৮-এর জানুয়ারি থেকে তো আরও বেশি। বিস্ময়কর এক ক্যারিয়ারে পুনর্জন্মের ঘটনা কম নেই তাঁর। সেই '৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে ১টি ওয়ানডে খেলেই হারিয়ে যাওয়ার প্রায় সাড়ে চার বছর পর আবার ভারতীয় দলে ডাক পাওয়াটা যদি পুনর্জন্ম হয়, তাহলে এর চার বছর পর ‘কোটার প্লেয়ার' অপবাদ ঘোচানো লর্ডসের সেঞ্চুরিই বা তা হবে না কেন? ঢাকাতেও অন্যরকম এক পুনর্জন্মই হয়েছে সৌরভ গাঙ্গুলীর। ব্যাট হাতে ম্যাচ উইনার হিসেবে পুনর্জন্ম।

টেস্ট ক্রিকেটে এখনো বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হবে তাঁকে। কিন্তু ওয়ানডেতে ব্যাপারটি অন্যরকম। সেখানে ভারতের প্রতিপক্ষ দলগুলো শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের চেয়ে সৌরভ চণ্ডীদাস গাঙ্গুলীকে নিয়ে একটুও কম দুশ্চিন্তা করে না। ব্যাট হাতে দুজনই ম্যাচ উইনার, গত বছর দুয়েকের পরিসংখ্যান বরং বিস্ময়করভাবে সৌরভ গাঙ্গুলীকেই এগিয়ে রাখবে খানিকটা। সৌরভ সেঞ্চুরি করছেন আর ভারত ম্যাচ জিতছে— এই দৃশ্য দেখতে এখন অভ্যস্তই হয়ে গেছে সবাই। তবে সব কিছুরই একটা শুরু থাকে, সৌরভের সেঞ্চুরিতে প্রতিপক্ষের পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার যে ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত, সেটির সূচনা বলতে হবে এই ঢাকাতেই– বাংলাদেশে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপের তৃতীয় ফাইনালে। অবিস্মরণীয় সেই ম্যাচে ১৩৮ বলে ১২৪ রান ওয়ানডেতে সৌরভ গাঙ্গুলীর প্রথম সেঞ্চুরি নয়। মাস কয়েক আগে শ্রীলঙ্কাতে পেয়েছিলেন প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। কিন্তু সে সেঞ্চুরি নিয়ে আলোচনায় সৌরভ কখনোই খুব একটা আগ্রহ বোধ করেন না। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে তাঁর খেলা ১১৩ রানের ইনিংসের পরও যে হেরেছিল ভারত। ঢাকায় ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ খেলতে আসার আগেই অবশ্য ম্যাচ উইনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ সেরে ফেলেছিলেন তিনি এবং সেটিও অভূতপূর্ব এক কীর্তি গড়ে। মাস চারেক আগে ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথম টানা চার ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে '৯৭-এর সাহারা কাপকে বানিয়ে ফেলেছেন 'সৌরভ কাপ'। কিন্তু সেটি শুধু তাঁর ব্যাটিংয়ের পুরস্কার ছিল না, ৫ ম্যাচে ২২২ রানের চেয়ে তাঁর নেওয়া ১৫ উইকেটও কম অবদান রাখেনি তাতে। টরন্টোর নরম পিচে বল হাতেও মহারাজ এতটাই দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছেন যে, অধিনায়ক শচীন টেন্ডুলকার তাঁকে ডেকেছেন 'আমার গোপন অস্ত্র' বলে। সাহারা কাপ তাই সৌরভের অলরাউন্ড সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। কিন্তু শুধুই ব্যাটিং দিয়ে ভারতকে ম্যাচ জেতানোর শুরু এই ঢাকাতেই। সৌরভের সেঞ্চুরি আর ভারতের জয়– এই ঘটনার শুভ উদ্বোধনও। ঢাকাকে আলাদাভাবে মনে না রেখে সৌরভের উপায় কী?

ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত অলরাউন্ড প্রদর্শনীতে '৯৭-র সাহারা কাপকে বানিয়ে ফেলেছিলেন 'সৌরভ কাপ'। ছবি: এএফপি

তা-ও যদি মামুলি জয় হতো। সেই ম্যাচ জিতে এমন কোনো মহামূল্যবান ট্রফি জেতেনি ভারত, তারপরও বিশ্বকাপজয়ী দেশটির স্মরণীয় জয়ের তালিকাতেও একেবারে শুরুর দিকেই থাকবে তা। বলতে গেলে লাঞ্চের সময়ই একরকম হার মেনে নেওয়ার পর অমন অপ্রত্যাশিত জয়ের আনন্দ, সেটিও আবার যাদের বিপক্ষে যেন-তেন জয়ই উৎসবে মাতিয়ে তোলে, সেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতীয়রা তো এই জয়ের জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ করবেই। সেই জয়ের নায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীই বা এটিকে আলাদাভাবে মনে না রেখে পারেন কীভাবে?

সে টুর্নামেন্ট দিয়েই ভারত অধিনায়ক হিসেবে আবার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের। ঢাকার সেই জানুয়ারিটা ছিল একেবারেই অন্যরকম, কুয়াশার চাদরে ঘোমটা দিয়ে ঘুম ভাঙত দিনের, কনকনে বাতাস আর হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে পরম আকাঙ্ক্ষার রোদ একটু দেখা দিয়ে মিলিয়ে যেত পরক্ষণেই। বিলেত ফেরত অনেকে তখন রসিকতা করে বলছেন, 'ঢাকাতেই তো এখন লন্ডন দেখা হয়ে যায়।' তেমনই কুয়াশা মোড়ানো এক সকালে টস জিতে প্রতিপক্ষকে ব্যাট করতে পাঠানো নিয়ে কেন ক্ষীণতম দ্বিধাতেও ভুগবেন আজহারউদ্দিন?

পাকিস্তানকে ব্যাট করতে পাঠানোর সময় এ রকম পরিস্থিতিতে ব্যাটসম্যানদের কী কী অসুবিধা হয়, দিব্যচোখে শুধু তা-ই দেখছিলেন আজহার, যে দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে, সেটি কল্পনাও করেননি। খেলা শুরুর আধঘণ্টার মধ্যেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসায় খেলা বন্ধ থাকল কিছুক্ষণ ম্যাচ থেকে চার ওভার খসে গেল এতেই, প্রতি দলের জন্য বরাদ্দ ৪৮ এভায়। সেই ৪৮ ওভারেই ৫ উইকেটে ৩১৪ রান করে ফেলার পর পাকিস্তান অধিনায়ক রশিদ লতিফ যদি লাঞ্চের সময়ই ট্রফিটি দাবি করে বসতেন, সেটিকেও বাড়াবাড়ি বলে মনে হতো না অনেকের কাছে। ভারতীয় বোলিংকে ছিন্নভিন্ন করে সাঈদ আনোয়ার করেছেন তাঁর পঞ্চদশ ওয়ানডে সেঞ্চুরি (১৪০), ইজাজ আহমেদ সপ্তম (১১৭), দুই সেঞ্চুরিয়ান তৃতীয় উইকেটে ২৩০ রান তুলে ভেঙে দিয়েছেন ১৪ বছরের পুরনো পার্টনারশিপ রেকর্ড, তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচের মীমাংসাও করে দিয়েছেন তাঁরা। ভারতের ইনিংসটি যেন খেলতে হবে বলেই খেলা, সেটি নিছকই আনুষ্ঠানিকতা। তখন কে জানত, ভরা দুপুরকে শেষ বিকেলের মতো বিষণ্ণ বানিয়ে দেওয়া সেই মেঘলা দিন কী চমক নিয়েই না অপেক্ষা করছে।

ম্লান আলোয় সৌরভ গাঙ্গুলী আর শচীন টেন্ডুলকার যখন ব্যাট করতে নামছেন, তাঁদের ব্যাটে সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে চেপে ছিল ইতিহাস। তখনই তাঁদের জানা, জিততে হলে করতে হবে বিশ্ব রেকর্ড। আরও জানা– সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার আগের যে রেকর্ড, '৯২-এর বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা সেই ৩১২ করেছিল নিউজিল্যান্ডের পুঝেকারা পার্ক নামে ছোট্ট একটি মাঠে, ঢাকা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল মাঠে নয়। তার ওপর সেখানে খেলা হয়েছে পুরো ৫০ ওভার, শ্রীলঙ্কা যে বোলিংয়ের বিপক্ষে ৩১২ করেছিল, এখানে প্রতিপক্ষ দলের বোলিংটাও তার চেয়ে একটু ভালো।

ব্যাট হাতে নামার সময় সৌরভ কী ভাবছিলেন, কে জানে! খেলাটা ঢাকায় বলে একটু বাড়তি অনুপ্রেরণা যে অনুভব করছিলেন, তাতে অবশ্য সন্দেহ নেই কোনো। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে সৌরভকে করেছিলাম প্রশ্নটা। ঢাকায় এই যে তাঁর পরিচিত পরিবেশ, বাঙালি বলে দর্শকদের মনে তাঁর জন্য একটা আলাদা আসন– এটা কি এখানে খেলার সময় একটু হলেও বাড়তি অনুপ্রেরণা যোগায় না? এ ধরনের প্রশ্নে সৌরভকে আগেও স্বচ্ছন্দ বোধ করতে দেখিনি, সেদিনও তা-ই। ভারতীয় ক্রিকেটে আঞ্চলিকতা খুব স্পর্শকাতর বিষয় বলেই হয়তো এ ধরনের প্রসঙ্গে শশব্যস্ত হয়ে নিজেকে বাঙালির আগে ভারতীয় প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সৌরভ। তারপরও এখানে ভালো খেললে অবশ্যই একট। 'বাড়তি ভালো লাগা কাজ করে’ – এ কথাতে প্রশ্নের উত্তরটা ছিল। ১৮ জানুয়ারি দুপুরে ব্যাট করতে নামার সময় সম্ভাব্য সব উৎস থেকেই যখন অনুপ্রেরণার সন্ধান করছেন, চারপাশ থেকে বাংলায় চিৎকারও সৌরভকে বাড়তি সাহস যুগিয়ে থাকবে।

সাহস যুগিয়েছিল অন্যপ্রান্তে 'ছোটে বাবু'র ব্যাটও। শচীন টেন্ডুলকারকে মাঝে মধ্যে এই নামেই ডাকেন সৌরভ। 'ছোটে বাবু' তাঁর ক্যাপ্টেনসি কেড়ে নেওয়ার জ্বালা মেটাতেই কিনা, সেই টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে নেমেই বিপক্ষ বোলিংকে ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন। দিলেন সেদিনও। সমানে সমানে পাল্লা না দিলেও সৌরভের ব্যাটও ঝলসে উঠছিল ভালোমতোই। আজহার মেহমুদের এক ওভারের পর পর চারটি বল বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে এগিয়ে যান টেন্ডুলকার, নইলে সৌরভের মারা বলও নিয়মিতই সীমানার বাইরে থেকে কুড়িয়ে আনতে হচ্ছিল পাকিস্তানি ফিল্ডারদের। আজহার মেহমুদের করা চতুর্থ ওভারে দুটি চার মেরে শুরু, আকিব জাভেদের পরের ওভারে এল আরও একটি। আজহার মেহমুদের পরের ওভারেই টেন্ডুলকারের ওই প্রলয় নাচন, নইলে এর আগ পর্যন্ত সৌরভের যেখানে ৩টি চার মারা হয়ে গেছে, টেন্ডুলকার মেরেছেন মাত্র ১টি। ৬.১ ওভারে দলকে ফিফটিতে পৌঁছে দিতে যে ধরনের ব্যাট করতে হয়, তাতে একটু বেশিই ঝুঁকি থাকে, লাগে ভাগ্যের একটু পক্ষপাতও। সেটি অবশ্য শুরুতেই পেয়ে গেলেন সৌরভ, চতুর্থ ওভারে আজহার মেহমুদের বলে তাঁর যে দুটি চার, তার দ্বিতীয়টি আসলে চারের বদলে ক্যাচ হওয়ার কথা। থার্ডম্যানে আকিব জাভেদ তা ফেলে দিয়ে উল্টো চার উপহার দেন সৌরভকে।

শচীন টেন্ডুলকার ছিলেন বরাবরের মতোই রুদ্রসংহারী মূর্তিতে। আউট হওয়ার আগে করেছিলেন ২৬ বলে ৪১ রান

অন্যপ্রান্তে যখন শচীন টেন্ডুলকার থাকেন, ব্যাটিং ব্যাপারটিই সহজ মনে হয় অনেক। নবম ওভারে শচীন টেন্ডুলকার আউট হয়ে যাওয়ার পর তাই শুরু হলো সৌরভের আসল পরীক্ষা। ৮.২ ওভারেই ৭১ রান উঠে যাওয়ার মতো দারুণ একটি সূচনা হয়েছে সত্যি, কিন্তু টার্গেটটা যে এখানে আকাশছোঁয়া। ভারতের স্বপ্নের সারথী হয়ে সেই পথেই যাত্রা শুরু করলেন সৌরভ। সঙ্গী ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে দারুণ খেলতে থাকা রবিন সিং। রবিনের ভালো খেলাটা বোনাস, দলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মূল দায়িত্বটা তখন সৌরভেরই। টেন্ডুলকার থাকা-না থাকায় আকাশ-পাতাল তফাৎ, কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা একদমই ছায়া ফেলল না তাঁর ব্যাটে। পরের চার ওভারের একটিকেও বাউন্ডারিহীন কাটতে দিলেন না, রানও উঠতে লাগল আগের গতিতেই। ওয়াসিম আকরামহীন পাকিস্তানি বোলিং অ্যাটাকে সাকলায়েন মুশতাকই ছিলেন মূল অস্ত্র, তাঁর পর পর দুই ওভারেই মারলেন চার, তুলে নিলেন ৭ ও ৮ রান। দ্বাদশ ওভারে তাঁর বলে চার মেরেই দলকে পৌঁছে দিলেন সেঞ্চুরিতে, নিজের ফিফটিতে পৌঁছে যেতেও বেশি সময় লাগল না। খরচ হলো মাত্র ৪২ বল, চার মেরেছেন এর ৮টিতে, ফিফটিতে পৌঁছেছেন একমাত্র ছয়টি মেৱে। সেটি শহীদ আফ্রিদির বলে, বল হাতে পেয়ে দ্বিতীয় বলেই এই লেগ স্পিনার টেন্ডুলকারকে আউট করে দিয়েছেন— এই রাগেই কিনা বেধড়ক পিটিয়ে সৌরভ আক্রমণ থেকেই সরিয়ে দিলেন তাঁকে। আফ্রিদির দ্বিতীয় ওভারে পুল ও স্কয়ার ড্রাইভ করে মারলেন দুটি চার, তৃতীয় ওভারে লং অফের ওপর দিয়ে ওই ছক্কা। দুই ওভার থেকেই এল ১১ করে রান।

এভাবে ধুমধাড়াক্কা চালিয়ে হয়তো আরো কিছু চার-ছয় পেতে পারতেন, কিন্তু তখন আর একটি উইকেট পড়লেই ব্যাকফুটে চলে যেতে হয় ভারতকে, তা ছাড়া ১৫ ওভারের ফিল্ডিং বাধ্যবাধকতা শেষে ফিল্ডাররাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন; তাই একটু দূরের দিকে তাকালেন সৌরভ। লম্বা ইনিংস খেলার প্রতিজ্ঞাটা নিজেই নিজেকে মনে করিয়ে দিতে লাগলেন বারবার। এ কারণেই হাফ সেঞ্চুরিতেই যেখানে ৮টি চার আর ১টি ছয়, ১২৪ রান পর্যন্ত বাকি ইনিংসে আর মাত্র ৩টি বাউন্ডারি। ত্রয়োদশ ওভারে আফ্রিদিকে ছক্কা মারার পর ১৯ নম্বর ওভারে এসে আবার চার। ৩৫তম ওভারে সেঞ্চুরিতে পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে আর কোনো বাউন্ডারিই নেই। দ্বিতীয় ফিফটির জন্য খেলতে হলো ৭৩ বল, ওই একটিই চার, বাকি সব রানই নিয়েছেন দৌড়ে। অবদান ছিল রবিন সিংয়েরও, অন্যপ্রান্তে ব্যাটিং স্টাইলে পুরোপুরি বিপরীত এই বাঁহাতি তাঁর জীবনের সেরা ইনিংস খেলতে থাকায় সৌরভকে উদ্বেগ ছুঁতে পারেনি, নিশ্চিন্তে খেলে যেতে পেরেছেন তিনি তাঁর নিজের খেলা। বাড়তি উদ্বেগের কোনো কারণও ছিল না, নিজে চার-ছয় না মারার পরও রবিন সিংয়ের সঙ্গে ১৭১ বলে ১৭৯ রানের পার্টনারশিপটি ওভারে ৬/৭ রান করে যোগান দিয়েই যাচ্ছিল ঠিকই। ৩৯তম ওভারের প্রথম বলে রবিন সিং (৮২ বলে ৮২) আউট হয়ে যাওয়ার পর একটু বদলে গেল পরিস্থিতিটা, সেট ব্যাটসম্যান হিসেবে চার-টার মারার দায়িত্বটা পড়ল সৌরভের ওপরই।

সৌরভকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলেন রবিন সিং। দ্বিতীয় উইকেটে দুজনের জুটি ছিল ১৭৯ রানের

সেই দায়িত্বের ব্যাপারে তিনি সচেতন, যেন তা প্রমাণ করতেই ৪০তম ওভারে চার মারলেন আজহার মেহমুদকে, প্রায় ২০ ওভার বিরতির পর সৌরভের ব্যাট থেকে প্রথম বাউন্ডারি। তখন মারতেও হতো, কারণ শেষ ৯ ওভার থেকে ভারতের প্রয়োজন দাঁড়িয়েছে ৬৩ রান। পাকিস্তানি বোলিং তখন খুব একটা সমস্যা করতে পারছে না, কিন্তু শুধু পাকিস্তানি বোলিংই নয়, সৌরভকে লড়তে হচ্ছে এর চেয়েও প্রবল এক প্রতিপক্ষের সঙ্গে। মাঝখানে একবার উঁকি দিয়েছিল সূর্য, তা শুধুই কয়েক মিনিটের জন্য। ভারতীয় ইনিংসের বাকিটা খেলা হয়েছে গোধূলির ম্লান আলোর মতো মন খারাপ করা আবহাওয়ায়, আলো-অন্ধকারের সেই লড়াইয়ে অন্ধকারেরই জয় হচ্ছিল ক্রমশ। এমন অবস্থায় সমস্যাটা বেশি ব্যাটসম্যানদেরই। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে যখন কথা হলো তাঁর সঙ্গে, এই সময়টার কথা মনে করে মাথা নেড়েছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী, 'এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কোনোদিন ব্যাট করিনি। বলই দেখতে পাচ্ছিলাম না।'

বল দেখতে পাচ্ছেন না, কিন্তু তারপরও ব্যাটসম্যানদের কোনো আপত্তি নেই, রবিন সিং আউট হওয়ার পর সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে যোগ দেওয়া মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের সেই আলোতেই খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ। কারণটা আর কিছুই নয়, তখন খেলা বন্ধ হয়ে গেলে ভারত হেরে যায়। খেলার অকাল সমাপ্তি হলে রানরেটের হিসেবে ৪০ ওভার শেষে প্রয়োজন যেখানে ২৭৪ রান, সেখানে ভারতের স্কোর তখন ২৫৮। আজহার-সৌরভ তাই তাঁদের সমস্যাকে পাত্তা দিচ্ছেন না, বল দেখা যাক বা না যাক, খেলা চালিয়ে না যাওয়ার কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। কিন্তু পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের অন্যরকম মনে করাটাই স্বাভাবিক। ৪০তম ওভারের তৃতীয় বলটি হয়ে যাওয়ার পরই অনেকক্ষণ ধরে অনুমিত নাটকের সূত্রপাত। তাঁর ফিল্ডাররা বল দেখতে পাচ্ছে না— এ কারণে রশিদ লতিফ খেলা বন্ধ রাখার আবেদন জানানোর পর দুই আম্পায়ার যখন মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, ভাগ্যিস সৌরভ গাঙ্গুলীকে সান্ত্বনা দিতে অধিনায়ক আজহার ছিলেন মাঠে। সৌরভের ভেঙে পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক। এমন একটা ইনিংস খেলছেন, দল আর ৫১ বলে ৫৭ রান করলেই যখন তিনি নায়ক হয়ে যান অবিস্মরণীয় এক জয়ের, তখনই ভাগ্য এমন নিষ্ঠুর রূপ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে যাবে! আম্পায়াররা খেলা বন্ধ করেননি, 'টাইম আউট' দিয়ে তাঁরা গিয়েছিলেন ম্যাচ রেফারির সঙ্গে কথা বলতে, 'তাঁরা কী চায়' তা স্পষ্ট করে দিতে পাকিস্তানি খেলোয়াড়রাও তাঁদের পিছু পিছু ড্রেসিংরুমে। ব্যাটসম্যানদেরও তা করাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তা না করে সৌরভকে নিয়ে মাঠেই দাঁড়িয়ে রইলেন আজহার, উদ্দেশ্য আম্পায়ার, ম্যাচ রেফারির ওপর একটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।

অধিনায়ক হিসেবে প্রত্যাবর্তন টুর্নামেন্টেই শিরোপা জিতেছিলেন আজহার। ছবি: এএফপি

এটাই কারণ কিনা কে জানে, তবে খেলা খুব তাড়াতাড়িই শুরু হলো আবার। ফ্লাডলাইটে খেলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে মিনিট পাঁচেক পর সবার মাঠে ফেরা উদযাপন করতে মোহাম্মদ হোসেনের বল এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে একাদশতম চারটি মারলেন সৌরভ। তখন তো আর বোঝা যায়নি যে, সেদিনের মতো এটিই হয়ে থাকবে তাঁর শেষ চার। বোলিং ছাড়াও আরও অনেক বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়তে হচ্ছিল বলেই ভিন্ন মাত্রা যোগ হচ্ছিল সৌরভের ইনিংসটিতে। তবে পরের ওভারে যে যুগল ধাক্কা এল, তাঁরও সাধ্যের অতীত হয়ে গেল সেটি সামলানো। সাকলায়েনের ফুলটসে আজহার ক্যাচ দিয়ে আসার দু'বল পরই বাঁ পায়ের পেশিতে টান পড়ায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন সৌরভ। রানার হিসেবে পেলেন আজহারকেই, কিন্তু তখন সৌরভ আর আগের ব্যাটসম্যান নন। রানার নিয়ে খেললে রান আউট হয়ে যাওয়ার বাড়তি ভয় থাকে। সৌরভ অবশ্য তা হলেন না, বলটি সময়মতো দেখতে না পাওয়া বা পা ঠিকমতো না যাওয়া যেটিই কারণ হোক, সবাই দেখল সৌরভ গাঙ্গুলীর স্টাম্প ছত্রখান করে দিয়ে উল্লাস করছেন আকিব জাভেদ। ১৩৮ বলে ১২৪ রান— তারপরও দর্শকদের অভিবাদনের জবাবে সৌরভের মুখে হাসি নেই। তখনও তিনি জানেন না, তাঁর এই ইনিংস দলকে জেতানোর জন্য যথেষ্ট কি না। জয়ের জন্য তখনো ৩২ বলে ৪১ রান চাই ভারতের।

পরে সৌরভের কাছ থেকে জানা গেল, মাঠে ৩১৫ রানের টার্গেট নিয়ে নামার সময়ও তাঁর সে রকম টেনশন হয়নি, যা হয়েছে আউট হয়ে আসার পর ড্রেসিংরুমে বসে থাকার সময়টায়। সৌরভের সেই টেনশনের সমাপ্তি কীভাবে হয়েছিল, ঢাকা স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইটের আলোয় মঞ্চস্থ সেই নাটকের স্মৃতি তো এখনো আপনার মনে টাটকাই থাকার কথা। ভারতকে ৯ রান করতে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে শেষ ওভারটি করতে সাকলায়েন মুশতাকের বল হাতে নেওয়া আর ২ বলে ৩ রান প্রয়োজন—এ অবস্থায় হৃষিকেশ কানিতকারের মিড উইকেট দিয়ে চার মেরে ক'দিনের জন্য 'হিরো' হয়ে যাওয়ার গল্প তো ক্রিকেটামোদীদের আড্ডার অপরিহার্য অংশই হয়ে ছিল অনেকদিন।

(লেখকের 'সেই সব ইনিংস' বই থেকে)।

আরও পড়ুন: ম্যাচশেষে ভারতীয় ড্রেসিংরুমে ম্যাচের নায়ক সৌরভের সঙ্গে