যাঁর জুতোয় পা গলিয়েছেন, তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া তো বটেই, ছোঁয়াটাও বেশ দুঃসাধ্য। বাংলাদেশের জেতা ১৩১ ওয়ানডের ৫০টিই এসেছে তাঁর অধিনায়কত্বে, এই পরিসংখ্যানও মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রভাবের সামান্যই বোঝাতে পারছে। যা বুঝতে হলে মাঠে-মাঠের বাইরে তাঁর অনুকরণীয়, হয়তো না অননুকরণীয়ও, অধিনায়কত্বে মন্ত্রমুগ্ধ সতীর্থদের মন পড়তে হবে।

সেই মাশরাফির কাছ থেকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন তামিম ইকবাল। প্রশ্নটা জেগেছে অবধারিতভাবেই, এগিয়ে নেওয়ার কাজটা তামিম করবেন কী করে? মাশিরাফর নেতৃত্বে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল আর চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল খেলে ফেলা ফেলা গেছে, সুতরাং তামিম বাংলাদেশকে পরবর্তী ধাপে তুলে গেছেন বলতে হলে তো ফাইনালেই খেলতে হবে। শুভ্র.আলাপে তামিম অতিথি হয়ে আসছেন জেনে এক দর্শক তো প্রশ্নই করে ফেললেন, 'বাংলাদেশ কি ২০২৩ বিশ্বকাপ জিততে পারবে?' খানিকক্ষণ ভেবে-টেবেও স্পষ্ট উত্তরটা অবশ্য তামিম দিতে পারলেন না। এখনো প্রায় দুই বছর বাকি বিশ্বকাপ শুরু হতে, এত আগে থেকেই ওসব ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় নাকি! তবে স্বপ্ন দেখতে সময় তো আর বাধা নয়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তাই তামিমের বুকেও ডানা ঝাপটায়।

সেই স্বপ্নটা কিসের ওপর দাঁড়িয়ে, তা-ও জানিয়ে দিলেন। অভিজ্ঞতা এবং শেষটা ভালো করার প্রতিজ্ঞা। বাংলাদেশ দলের অন্তত চারজনের এটাই হবে শেষ বিশ্বকাপ। সেই চারজনের নাম তো আপনার জানা থাকারই কথা। তামিম নিজে আছেন, সঙ্গে সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। মাঝখানে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। কেউ ফর্ম হারিয়ে বাদ পড়তে পারেন, থাবা বসাতে পারে ইনজুরি। তবে আপাতত ধরেই নেওয়াই যায়, এই চারজনের বিশাল মিলিত অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০২৩ বিশ্বকাপে যাবে। এটাও ধরে নেওয়া যায়, সেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে টস করতে নামবেন তামিম ইকবাল। তাঁকে ওয়ানডে অধিনায়ক করার সময় এটাই তো বলেছে বিসিবি।

প্রশ্ন হলো তামিমের 'অধিনায়কত্ব দর্শন' নিয়েও। তামিম পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, আক্রমণই তাঁর অধিনায়কত্ব দর্শনের শেষ কথা। 'যেভাবে আমি ক্যাপ্টেনসি করতে চাই, ইট হ্যাজ টু বি অ্যাগ্রেসিভ।' অ্যাগ্রেসিভ বলতে তামিম কী বোঝেন, এর ব্যাখ্যাও দিলেন, 'অ্যাগ্রেসিভ মানেটা হচ্ছে, আমি যখন ফিল্ডিংয়ে যাব, আমি আমার বোলারদের উইকেট নেবার চান্সটা দেব। তো সে জন্য যে সময় আমার অ্যাগ্রেসিভ থাকতে হবে, থাকব; যে সময় আমার ডিফেন্সিভ থাকতে হবে, থাকব। বাট ইন ন্যাচার, আই উড লাইক টু অ্যাটাক, এভরি টাইম।'

তাঁর আক্রমণাত্মক অধিনায়কত্বের একটা উদাহরণও দিলেন নিজেই, 'নিউজিল্যান্ড ট্যুরটাও যদি দেখেন, স্লিপ তো নরমালি একটা অ্যাটাকিং পজিশন। এবার যত সময় পর্যন্ত স্লিপ দাঁড়িয়ে ছিল, নরমালি আমাদের খেলায় এতক্ষণ পর্যন্ত স্লিপ থাকে না। মানে আমি আমার বোলারদের (উইকেট তোলার) সব সুযোগই দিয়েছি।'

মাঠে 'অ্যাটাকিং' থাকাটাই তামিমের অধিনায়কত্ব দর্শনের মূল কথা

এ জন্যে দলে তাঁর বোলারদের ভূমিকাও ব্যাখ্যা করলেন ছোট্ট করে, 'দেখেন, প্রত্যেকটা বোলার কিন্তু ইকোনমিক্যাল হবে না। আমার টিমে যদি পাঁচটা বোলার থাকে, দুইটা বোলার থাকবে, যারা অ্যাটাকিং বোলিং করবে। তো অ্যাটাকিং বোলিং করতে গিয়ে তাঁরা ৬০-৬৫ বা ৭০ রানও দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তাদের দুইটা-তিনটা উইকেট নিতে হবে। আমি এভাবে চিন্তা করি। হ্যাঁ, আবার দুয়েকটা বোলার থাকবে, যাঁরা ১০ ওভারে ত্রিশ/পঁয়ত্রিশ/চল্লিশ রান দেবে। তাঁদের কাজ হলো ডিফেন্স করা।'

নিজেদের দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও তামিমের কোনো আপত্তি নেই।। 'তাসকিনের কথাই যদি বলি, প্রোবাবলি (নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে) সেকেন্ড ওডিআইতে ও সম্ভবত সেভেন্টি ফাইভ (আসলে ৬৭) রান দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে আমাদের জেতার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। তো আই ডোন্ট মাইন্ড দৌজ কাইন্ড অব থিংস। কারণ আমি জানি, ও প্রত্যেকটা বল করছিল টিমের জন্য। ও উইকেট নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়েছে। যখন আপনি উইকেটের জন্য যাবেন, তখন আপনি রান লিক করবেনই। আই অ্যাকচুয়েলি এনজয় দৌজ কাইন্ড অব থিংস।'

এই দর্শনের কথা শুনে ইমরান খানের কথা মনে পড়ে গেল উৎপল শুভ্রর। ১৯৯২ বিশ্বকাপে ওয়াসিম আকরাম অনেক নো বল করছিলেন। এটা নিয়েই না তরুণ ফাস্ট বোলার বেশি ভাবতে শুরু করেন, এই শঙ্কা থেকে ফাইনালের আগে ওয়াসিম আকরামকে ডেকে ইমরান বলে দেন. 'নো বল নিয়ে তোমার ভাবার দরকার নেই। নো বল হলে হবে। তুমি উইকেট নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে।' এরপর কী হয়েছিল, তা তো ইতিহাসেই লেখা আছে। পরপর দুই বলে অ্যালান ল্যাম্ব ও ক্রিস লুইসকে বোল্ড করে দেওয়া ওয়াসিম আকরামের ওই দুটি বল ঢুকে গেছে বিশ্বকাপের অমর গল্পের খাতায়। 

তামিম জানালেন, সাদা বলের দুটি ফরম্যাট অর্থাৎ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুটিতেই অধিনায়কত্ব নিতে তিনি রাজি আছেন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে এমন কিছু ভাবতেই চান না।

তামিম ইকবালের কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাসকিনকে তিনিও নিশ্চয়ই এমন কিছুই বলেছেন, বলেন এবং বলবেন। কিন্তু এই অধিনায়কত্বের দর্শনটা কেবল এক ফরম্যাটের জন্যই বরাদ্দ থাকবে কেন? তামিম যেহেতু তিন ফরম্যাটেই সমান তালে খেলছেন, তিনটাতেই তামিমকে অধিনায়ক বানালেই তো দর্শনটা ছড়িয়ে পড়ে সব সংস্করণে! তাহলে একেক ফরম্যাটে একেক অধিনায়কের ভিন্ন ভিন্ন দর্শন আর চিন্তার সঙ্গে দলকে খাপ খাওয়ানোর কাজটা করতে হয় না। প্রশ্নের সূত্রটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন এক দর্শক। যিনি জানতে চেয়েছিলেন, তিন ফরম্যাটেই ক্যাপ্টেনসি দিলে তিনি তা নিতে রাজি কি না।

তামিম জানালেন, সাদা বলের দুটি ফরম্যাট অর্থাৎ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুটিতেই অধিনায়কত্ব নিতে তিনি রাজি আছেন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে এমন কিছু ভাবতেই চান না। হুবহু তাঁর কথাটা তুলে দিলে তা এ রকম: 'তিনটা ফরম্যাটের ক্যাপ্টেনসি আমি নেব না। হ্যাঁ, হোয়াইট বলের দুইটা ফরম্যাটের ক্যাপ্টেনসি যদি বলা হয়, আমি চিন্তা করতে পারি!'

অবধারিতভাবেই প্রশ্নটা জাগে, কেন নয়? কয়েক দিন আগে শুভ্র.আলাপের অতিথি হয়ে এসে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে তামিম ইকবালের প্রতি তাঁর পক্ষপাতের কথা জানিয়ে গেছেন। কেন টেস্টে তামিমই সেরা পছন্দ, যুক্তিও দিয়েছেন এর পক্ষে। লিপুর সেই যুক্তি (তিন ফরম্যাটে লিপুর পছন্দের অধিনায়ক)  হয়তো আপনি পড়েছেনও।

তাহলে কেন তামিম টেস্ট দলের ক্যাপ্টেনসি নেওয়ার কথা ভাবতেই চান না?

উত্তরটা সবিস্তারে জানাতে মনে হয় আরেকটা লেখা দাবি করে।