মাঠে কোনো ফিল্ডার ক্যাচ মিস করল, সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল 'অধিনায়ক হিসেবে আপনার তাঁকে সেখানে রাখা উচিত হয়েছে কি না' জাতীয় প্রশ্ন; মাঠের ফাঁকা জায়গায় ক্যাচ পড়ল, ওখানে কেন ফিল্ডার নেই? বোলারদের নিয়ে প্রশ্ন তো অহরহই ওঠে। আর দল হেরে গেলে তো কথাই নেই, প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হবে অধিনায়ককে। বিপদ তো শুধুই বাইরেই নয়, দলের মধ্যেও। কোনো খেলোয়াড় বাদ পড়া মানেই অধিনায়কের প্রতি তাঁর একটা বিরাগ তৈরি হওয়া। উৎপল শুভ্রকে বলা ইয়ান চ্যাপেলের কথাটা মানলে অধিনায়ক হওয়া মানেই নাকি দলের অন্তত অর্ধেক ক্রিকেটারের অপছন্দের পাত্রে পরিণত হওয়া।

ইয়ান চ্যাপেলের পুরো কথাটা তুলে দিলে বুঝতে সুবিধা হবে কী বোঝাতে চেয়েছেন, 'ক্যাপ্টেনসি কিন্তু কোনো পপুলারিটি কনটেন্ট না। আমি কখনো এক্সপেক্ট করি না, আমার দলের ক্রিকেটাররা তার ছেলের জন্মদিনে আমাকে ইনভাইট করবে। আমার দলের অর্ধেক ক্রিকেটারই হয়তো আমাকে হেইট করবে। তাতে কিছু আসে যায় না, আমার ভালোবাসা দরকার নেই, দিনশেষে আমি যেটা চাই, তা হলো ওটা যেন আমাকে রেসপেক্ট করে। যেন এটুকু বুঝতে পারে, আমি বায়াসড ছিলাম না।'

দল নির্বাচন, ফিল্ডিং সাজানো, মিডিয়া সামলানো-- ক্রিকেটের মতো আর কোনো খেলাতে অধিনায়কের দায়িত্বটা এত বেশি বিস্তৃত নয় বললে চর্বিত চর্বণই হবে। পাল্লেকেলেতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা প্রথম টেস্ট শেষ হতেই যেমন ফের শুরু হয়েছে আলোচনা, 'কেমন ছিল মুমিনুলের ক্যাপ্টেনসি?'

শুভ্র.আলাপে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুকে পেয়ে অধিনায়কত্বের আলাপ ওঠাটা তাই অবধারিতই ছিল। বিশেষ করে গাজী আশরাফ হোসেন লিপু যেখানে অনেকের চোখেই টেস্ট পূর্ব বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক। গতকাল সন্ধ্যার শুভ্র.আলাপে অধিনায়কত্ব নিয়ে আলোচনা অবশ্য পাল্লেকেলের প্রথম টেস্টের সীমানা ছাপিয়ে তা ধরা দিল আরও বৃহত্তর রূপে। যেটির সূত্র এক পাঠকের প্রশ্নে, এই যে বিসিবি তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়ক বেছে নিয়েছে, এটি ঠিক কি না।

টি-টোয়েন্টির আবির্ভাবের আগে শুধু টেস্ট আর ওয়ানডে নিয়ে ভাবলেই চলত। দুই ফরম্যাটে দুজন ভিন্ন অধিনায়ক নির্বাচনের বৈপ্লবিক কাজটা প্রথম করেছিল অস্ট্রেলিয়া। যার বড় কারণ ছিল, তখন পর্যন্ত দুই ফরম্যাটেরই অধিনায়ক মার্ক টেলরের ওয়ানডে দলে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা। যার সমাধান হিসাবে মার্ক টেলরকে টেস্ট অধিনায়ক রেখে স্টিভ ওয়াহকে দেওয়া হয় ওয়ানডের দায়িত্ব। এরপর থেকে সেই ধারা অস্ট্রেলিয়ায় তো বটেই, অনুসৃত হয়েছে অন্য দেশগুলোতেও। তিন অধিনায়কের প্রবর্তন ইংল্যান্ডের সৌজন্যে। ২০১১ সালে অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস সীমিত ওভারের ক্রিকেটকে বিদায় বললে অধিনায়কত্বের দায়িত্বটা ভাগ হয়ে যায় অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস, অ্যালিস্টার কুক ও স্টুয়ার্ট ব্রডের মাঝে। প্রথম পছন্দ স্ট্রাউস সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেলবেন না, দ্বিতীয় পছন্দ কুক টি-২০ দলের বিবেচনাতে আসবেনই না; মাথায় এ সমীকরণগুলো রাখলে ইসিবির এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতাও খুঁজে পাওয়া যায়। আবার, স্ট্রাউস টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় বলতেই যে অধিনায়কত্বের ব্যাটনটা উঠেছিল কুকের হাতে, এ থেকেও ইসিবির ভাবনা-চিন্তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায়।

অবশ্য এমন ভাবনা-চিন্তার প্রমাণ চাইলে বিলেত যেতে হবে কেন! ২০১৪ সালে বাংলাদেশের দুই অধিনায়কের যুগে প্রবেশ তো প্রথম পছন্দ মাশরাফিকে টেস্ট ফরম্যাটে পাওয়া যাচ্ছিল না বলেই। সীমিত ওভারের দায়িত্বটা কেড়ে নিলেও সাদা পোশাকের ক্রিকেটের নেতৃত্বটা রেখে দেয়া হয়েছিল মুশফিকুর রহিমের কাছেই।

কিন্তু ২০১৯ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে তিন অধিনায়কের যুগে প্রবেশ করল, তার পেছনে থাকা ভাবনার একইরকম সরলীকরণ করা যাচ্ছে কি? টি-২০ অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ টেস্ট দলে অটো-চয়েজ নন, সে হিসেবে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে বিকল্প অধিনায়ক বিসিবি খুঁজতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, সে বিকল্পটা তামিম ইকবাল নন কেন? ওয়ানডে-টি২০ দলে তামিম ইকবালের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সমর্থকদের মধ্যে টুকটাক আলোচনা হলেও টেস্ট দলে তাঁর জায়গা তো প্রশ্নাতীত।

মুমিনুল-তামিম-মাহমুদউল্লাহ: বাংলাদেশের তিন অধিনায়ক

গত রাতে শুভ্র.আলাপের আলোচনায় উৎপল শুভ্র আঙুল তুললেন ঠিক এই জায়গাটায়। অধিনায়কত্বের বদল মানে তো শুধু মানুষটাই বদলে যাওয়া নয়, বরং পুরো দলের সংস্কৃতি, আবহতেও বড় রকমের পরিবর্তন আসা। সেক্ষেত্রে, কোনো অধিনায়ক যদি তিন ফরম্যাটেই একাদশে থাকার যোগ্য হন, দায়িত্বটা তাঁকেই কেন দেওয়া হবে না?

গাজী আশরাফ হোসেন লিপু অবশ্য একজনকেই তিন ফরম্যাটে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে নন। কেন নন, শুনে নিন সেই কারণটা, 'তিন অধিনায়ক কনসেপ্টটা খারাপ না। শর্টার ফরম্যাট এবং লঙ্গার ফরম্যাটের জন্য দায়িত্বটা আলাদা করে নেওয়া একদিক থেকে ভালো। নইলে একজন যদি সিক কিংবা ইনজুরড হয়ে যায়, তাহলে দেখা গেল তিন ফরম্যাটের জন্যই একটা ক্রাইসিস শুরু হয়ে গেল।'

ফরম্যাটভেদে অধিনায়ক আলাদা হলে দলের আরেকজন খেলোয়াড়কে ফরম্যাট অনুযায়ী কাউন্সেলিং করা, কথা বলাও অধিনায়কের জন্যে সহজ হয় বলে মনে করেন লিপু। তবে তাঁর মত, ব্যাপারটা লাল বল আর সাদা বলে ভাগ নিলে আরও ভালো হয়। এ জন্য ক্রিকেটের তিন সংস্করণে অন্তত দুজন অধিনায়ক দেখতে চান তিনি।

অবধারিতভাবেই প্রশ্ন চলে আসে, এখন যাঁদের ওপর নেতৃত্বভার আছে, সুযোগ থাকলে লিপুও কি তাঁদের ওপরই আস্থা রাখতেন? বাংলাদেশে 'অধিনায়ক কে হবে' প্রশ্নে খুব বেশি বিকল্প নেই বলে লিপু যে উত্তরটা দিলেন, তাতে সুনির্দিষ্ট নামই বলে দিলেন তিনি। সাদা বলে অর্থাৎ টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডেতে অধিনায়ক হিসেবে সাকিবকেই পছন্দ তাঁর, টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তামিমকে।

ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ যেন সৃষ্টি না হয়, তাই ব্যাখ্যাও দিলেন নিজের মন্তব্যের। টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে সাকিবকে চাইছেন এই ফরম্যাটে বাকি সবার চাইতে তাঁর অভিজ্ঞতা অনেক বেশি বলে। ওয়ানডেতেও অন্য কাউকে খুঁজছেন না এই ফরম্যাটে সাকিবের সমৃদ্ধশালী রেকর্ডের জন্য। টেস্ট ফরম্যাটের দায়িত্বটা তামিমকে দিতে চাইছেন, টেস্ট ক্রিকেটটা বোঝার ক্ষমতা আর পরিণতিবোধের জন্য। তামিমের টেস্টে পারফরম্যান্সও হয়তো তাঁকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে এমন ভাবতে।

ক্যাপ্টেনসি নিয়ে শুভ্র.আলাপে উৎপল শুভ্রর সঙ্গে গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর আলাপের বিস্তারিত শুনতে ও দেখতে ইউটিউবে ভিডিওটা দেখে নিতে পারেন। ইউটিউব চ্যানেলে তো বটেই, যা পাবেন এই ওয়েবসাইটের ভিডিও সেকশনেও।