‘হয়তো আমি প্র্যাকটিস করিয়ে ফিরছি, ভীষণ ক্লান্ত। এমন সময় কেউ গিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে কি একটু কথা বলতে পারি? অনেক সময় হয়তো আমাকে বলতে হয় "নো"। এটা আমি বলতে চাই না। এ কারণে আপনাদের কাছে অনুরোধ, আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বিকেএসপিতে আসার আগে আমাকে একটা কল দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসুন।’

এরপর অবধারিত যে প্রশ্নটা হওয়ার কথা, তাহলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করার টেলিফোন নম্বরটা বলুন, তা-ই হলো। কিন্তু অবধারিত উত্তরটা পাওয়া গেল না এডি বারলোর কাছ থেকে। প্রস্তাবটা নিজেই দিয়েছেন, তাই একেবারে এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। তবে চাইলে কথা বলার ঝামেলা এড়িয়ে যেতে পারেন, এমন একটা নম্বর শোনার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলাম। অথচ ‘হায়, হায়, আমার নম্বরটিই তো ভুলে গেছি’ হাসতে হাসতে এ কথা বলে সাহায্য চাইলেন পাশে বসে থাকা প্রধান নির্বাচকের কাছে। তারপর যে নম্বরটি বললেন, সেটি তাঁর মোবাইল ফোনের নম্বর।

এডি বারলোর প্রথম সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে বড় চমক বলে মনে হলো এটিকেই। একই সঙ্গে মনে পড়ে গেল বছর দুয়েক আগের একটি বিকেলের অভিজ্ঞতাও। যেখানে বারলোর সংবাদ সম্মেলন, সেই ঢাকা স্টেডিয়ামেই (এখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রস্তুতি নিচ্ছে ১৯৯৭ এশিয়া কাপের জন্য। মাস দুয়েক আগের আইসিসি ট্রফি সাফল্যে ক্রিকেটাররা সবাই তখন ‘হিরো’ আর গর্ডন গ্রিনিজ তো ‘হিরোদের হিরো’। এশিয়া কাপের প্রস্তুতি নিয়ে একটি লেখা তৈরি করতে গ্রিনিজের কাছে কিছু মন্তব্য, সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কোটস’, প্রয়োজন ছিল সেটিরই। সেজন্য গর্ডন গ্রিনিজের পেছনে ঘুরতে হলো ঘণ্টা দেড়েক। মানসিক প্রস্তুতি ছিলই, নইলে অনেক আগেই চলে আসার কথা। গ্রিনিজ কথা বলতে রাজিই হচ্ছিলেন না। এটি তেমন সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, সেটি জানানোর ধরন। কত রুক্ষভাবে একজন সাংবাদিককে প্রত্যাখ্যান করা যায়, এর উদাহরণ হিসেবে গর্ডন গ্রিনিজের চেয়ে আদর্শ কাউকে এখনও খুঁজে পাইনি। মাত্রই কলকাতায় ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ ফাইনাল কাভার করে এসেছি, সেখানকার এক সাংবাদিক বন্ধুর গ্রিনিজের একটা ইন্টারভিউ করার ইচ্ছে, গ্রিনিজের টেলিফোন নম্বরটা দিয়ে এসেছি তাকে। ‘কলকাতা থেকে এক সাংবাদিক ফোন করতে পারে। আপনার একটা ইন্টারভিউ নিতে চায়’–গ্রিনিজ খুশি হবেন ভেবেই কথাটা তাঁকে বলেছিলেন। অথচ জবাবে রীতিমতো দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে পাল্টা আক্রমণ, ‘আমার ইন্টারভিউ দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই। আমার নাম্বার দিয়েছ কেন?’

ছবিটাকে প্রতীকি ধরে নিতে পারেন। ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে বিকেএসপিতে বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে স্টোরি করতে গিয়ে গর্ডন গ্রিনিজের সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষায় লেখক। ছবি: ফিরোজ চৌধুরী

গর্ডন গ্রিনিজের হাতেও একটা মোবাইল ফোন থাকত। নম্বরটাও জানা ছিল অনেক সাংবাদিকেরই। কিন্তু তাঁকে কে কয়বার ফোন করেছে, তা বলে দেওয়া যায় হাতে গুনে। এমনকি এই প্রশ্নও করা যায়, ‘আদৌ কী করেছে কেউ?’ প্রত্যাখানের ভয়ে নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাভার করা সাংবাদিকদের প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে ভালোই পরিচয় হয়ে যায়। কিন্তু গ্রিনিজ যা করতেন, সেটি রীতিমতো দুর্ব্যবহার।

তাঁর আগেরজন অর্থাৎ মহিন্দর অমরনাথের স্টাইলটা ছিল আবার আলাদা। এদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ছিল মহা আপত্তি। অনেক সময় পীড়াপীড়ি করেও ‘নো কমেন্ট’ আর ‘লেটস সি’-এর বেশি কিছু বের করা যায়নি তাঁর মুখ থেকে। তবে জিমি অমরনাথ সেগুলোও বলতেন একটা হাসি হাসি মুখ করে। মেজাজ খারাপ হয়ে যেত, তবে কোনোভাবেই ‘অভদ্র’ বলা যেত না তাঁকে।

মহিন্দর অমরনাথের পর গর্ডন গ্রিনিজ– এই দুই ‘রত্ন’কে দেখার পর এডি বারলো এদেশের সাংবাদিকদের জন্য তাই রীতিমতো এক বিস্ময় হয়েই এসেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের জন্য দল নির্বাচন– এ দেশে বারলোর প্রথম সংবাদ সম্মেলনের বিষয় ছিল এটি। উত্তপ্ত বাক্যবান ছোঁড়ার প্রস্ততি নিয়েই গিয়েছিলেন অনেকে সাংবাদিক। তা ছোঁড়াও হলো। বারলো হাসিমুখে সামলালেন সব। সংবাদ সম্মেলনে যেমন হয়, আধঘণ্টা আগে মীমাংসা হয়ে যাওয়া বিষয়ে আবারও প্রশ্ন করলেন কেউ কেউ, সেসবও হলো। মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত হতে দেখা গেল না বারলোকে। বরং সেসবেরও হাসিমুখে উত্তর দিয়ে সাংবাদিকদের তাঁর শুভাকাঙ্খী করে তুললেন ওই পৌনে এক ঘণ্টাতেই। ক্রিকেটিং ব্যাখ্যা দিলেন সব প্রশ্নের, সুযোগ মতো রসিকতাও করলেন (যেমন একবার ‘জেন্টলমেন’ বলেই তাঁর চোখ পড়ল দুজন নারী সাংবাদিকের দিকে। হেসে বললেন, ‘স্যরি, বলা উচিত ছিল লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলমেন! আপনাদের দেখে খুব ভালো লাগল। আমাদের দক্ষিণ আফ্রিকাতে একজনও নারী সাংবাদিক নেই’)। সাংবাদিকদের যদি বারলোর প্রথম সংবাদ সম্মেলনের ‘রেটিং’ করতে বলা হয়, অনুমান করি, বেশির ভাগই তাঁকে ‘দশে দশ’ দেবেন।

আসলে বারলোর পাওয়া উচিত ১০-এর মধ্যে ৭ বা ৮। কিন্তু মহিন্দর অমরনাথ কিংবা গর্ডন গ্রিনিজের অভিজ্ঞতাটা একেবারের টাটকা বলেই বারলোর সাংবাদিকদের ‘ফ্রেন্ডস’ বলে সম্বোধন করার স্বাভাবিক সৌজন্যটুকুকেই মনে হচ্ছে অসাধারণ কিছু!

অনেক দিন গ্রিনিজের সঙ্গে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের অংশ হয়ে কাজ করা গাজী আশরাফ হোসেন লিপু এক সংখ্যা আগে এই স্টেডিয়ামে লেখা তাঁর কলামে আমাদের জানিয়েছেন, গ্রিনিজ সাংবাদিকদের একদম পছন্দ করতেন না। তাঁর অবশ্য তা জানানোর প্রয়োজন ছিল না। সাংবাদিকদের প্রতি বিতৃষ্ণা বোঝাতে একদমই সময় নেননি গ্রিনিজ। যদিও বাংলাদেশের কোচ হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনিও ‘মিডিয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে এগিয়ে যেতে হবে’ জাতীয় ভালো ভালো কথা বলেছিলেন। তবে সে সবের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি তাঁর আচরণে।

যে তিন বছর বাংলাদেশের কোচের দায়িত্বে ছিলেন গর্ডন গ্রিনিজ, বলতে গেলে তার পুরোটাই সাংবাদিকদের জন্য এমন বাজে স্মৃতিতে ভরপুর। একবার কথা বলার শুরু করলে ভালোই বলতেন, কিন্তু তাঁকে কথা বলানোটাই ছিল কঠিন।

বরং উল্টোটাই হয়েছে অনেকবার। কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফির শুরুতেই যেমন বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে এক পশলা হয়ে গেল গ্রিনিজের। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর অনেক চেষ্টা করেও কথা বলানো যায়নি তাঁকে। অথচ ম্যাচের আগে এবং পরে কথা বলাটা অধিনায়ক ও কোচের দায়িত্বেরই অংশ এখন। পশ্চিম আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচের পরও যথারীতি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অগ্রাহ্য করেছেন। কিন্তু এরপর যখন গ্রিনিজকে নাইজেরিয়ার ( হ্যাঁ, সে দেশেও অল্পবিস্তর ক্রিকেট খেলা হয়) এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেল, ঘিয়ের ছিটে পড়ল বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অপমান আর রাগের আগুনে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান সেক্রেটারি সৈয়দ আশরাফুল হকের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত একটা মিটমাট হলো। পরে আইসিসি ট্রফির বাকি সময়টাতে এই দায়িত্ব পালন করেছেন ম্যানেজার লিপু। সাংবাদিকেরা যোগাযোগ করেছেন তাঁর সঙ্গে, তিনিই গ্রিনিজের সঙ্গে কথা বলে ম্যাচের আগে অনানুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের একটা সময় জানিয়ে দিয়েছেন। এটি করতে লিপুকেও বিস্তর ঝামেলা পোহাতে হয়েছে বলে অনুমান করি।

যে তিন বছর বাংলাদেশের কোচের দায়িত্বে ছিলেন গ্রিনিজ, বলতে গেলে তার পুরোটাই সাংবাদিকদের জন্য এমন বাজে স্মৃতিতে ভরপুর। একবার কথা বলার শুরু করলে ভালোই বলতেন, কিন্তু তাঁকে কথা বলানোটাই ছিল কঠিন। একেবারেই ব্যতিক্রম বলতে হবে দুয়েকটা ঘটনাকে, যখন হয়তো দেখা হতেই কাঁধে হাত রেখে খুব আগ্রহের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছেন গ্রিনিজ। বিশ্বকাপেই যেমন, অন্য সব দেশের কোচের সঙ্গে ইচ্ছেমতো কথা বলছি আমরা বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা, কিন্তু আমাদের নিজেদের কোচই যেন ধরাছোঁয়ার বাইরের এক মহাকাশচারী। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগে তো গ্রিনিজের সঙ্গে আমার রীতিমতো ঝগড়াই হলো এ নিয়ে। একটু আগে নিউজিল্যান্ডের কোচ স্টিভ রিক্সনকে বলতে গেলে বাস থেকে নামিয়ে এনে কথা বলেছি। অথচ পরদিন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিষেকের মতো এত বড় একটা উপলক্ষ, কিন্তু গর্ডন গ্রিনিজ কথা বলবেন না তো বলবেনই না। এমনিতেই ইংল্যান্ডে পাঁচ ঘণ্টা সময় পার্থক্যের সঙ্গে লড়াই, তাই ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর গ্রিনিজের এই আচরণে মেজাজটা খুব বিগড়ে গেল। রেগেমেগে বলা ‘আমরা সব দেশের কোচের সঙ্গে কথা বলছি, আর আমাদের নিজেদের কোচের সঙ্গে কথা বলতে পারি না’–এই কথার জবাব কীভাবে ‘সো, হোয়াটস দ্য প্রবলেম’ হয়? অথচ গ্রিনিজ এই জবাবই দিলেন। সব সময়ই বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা তাঁর মেজাজ-মর্জি বুঝে চলে এসেছেন, এ কারণেই উল্টো ‘ইউ আর দ্য অনলি প্রবলেম’ শুনতে হবে, একদমই ভাবেননি। তাই রাগে গজগজ করতে করতে গিয়ে টিম বাসে উঠলেন। হাতে কী একটা ছিল, সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আগেই বাসে উঠে বসে থাকা ক্রিকেটাররা পুরো ঘটনা না জেনেও অনুমান করতে পারছিলেন, সমস্যাটা কী। তাঁরা সবাই মুখ টিপে হাসছেন। 

অথচ এই গ্রিনিজই ডাবলিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের পর সন্ধ্যেয় হোটেলের লবিতে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেয়ে নিজে থেকেই প্রায় আধঘণ্টা কথা বলে গেলেন। এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে ডিনারের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পুরো দল বাসে উঠে অপেক্ষা করছে, ম্যানেজার দুবার এসে তাঁকে ডেকে পর্যন্ত গেলেন; অথচ গ্রিনিজকে তখন কথায় পেয়েছে। এখনই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া উচিত নয়--গ্রিনিজকে বিসিবির চক্ষুশূলে পরিণত করা মন্তব্যটি সে সময়েই করা। তবে গ্রিনিজের সময়কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনাকে বলতে হবে একেবারে ব্যতিক্রম। আর কে না জানে, ব্যতিক্রম নিয়মকেই প্রমাণ করে। আর গ্রিনিজের ক্ষেত্রে নিয়মটা ছিল–সাংবাদিক মানেই ঝামেলা, ওদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করো।

শুধু সাংবাদিকই বা কেন, গ্রিনিজ কার সঙ্গে যে কখন কী ব্যবহার করবেন, তা অনুমান করাও ছিল কঠিন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিনই যেমন চেস্টার লি স্ট্রিটে অটোগ্রাফের খাতা নিয়ে সকাল থেকে ঘণ্টা তিনেক মাঠে বসে থাকা শিশু এবং বৃদ্ধের দলটির সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করলেন যে, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের গ্রিনিজের হয়ে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হলো। গ্রিনিজ যা ইচ্ছে করুন, কিন্তু বাংলাদেশের কোচ এমন করলে যে দেশের দুর্নাম!

আইসিসি ট্রফির সময় নাইজেরিয়ান সাংবাদিকের যে ঘটনা বলা হলো, তা থেকে মনে হতে পারে শুধু দেশের সাংবাদিকের সঙ্গেই সমস্যা ছিল গ্রিনিজের। একদম ভুল। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় অনীহা বা দুর্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অন্তত গ্রিনিজের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলা যাবে না। এ ব্যাপারে দেশি-বিদেশি, নামী-অনামী বাছবিচার ছিল না তাঁর। ১৯৯৭ শ্রীলঙ্কা এশিয়া কাপের সময় ভারতের এক সাংবাদিক কথা বলতে চাওয়ায় তাঁকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, কাছাকাছি দাঁড়ানো বাংলাদেশের সাংবাদিকেরাই মহাবিব্রত। সেই সাংবাদিক বিড়বিড় করে শুধু বললেন, ‘ভেবেছিলাম কোচ হয়ে হয়তো একটু বদলেছে। কিন্তু সেই খেলোয়াড়ি জীবনের মতোই আছে দেখছি!’

এটাই আসল কথা। গর্ডন গ্রিনিজ আসলে বরাবরই অমন। যে মাপের খেলোয়াড় ছিলেন, সে তুলনায় তাঁর কয়টা ইন্টারভিউ পড়েছেন, মনে করে দেখুন। শুধু সাংবাদিকদের সঙ্গেই নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলেও বলতে গেলে ছিলেন এক রকম একঘরেই। ‘স্পোর্টিং সেঞ্চুরি’ নামে যে বইতে ফ্র‍্যাঙ্ক কিটিং এই শতাব্দীর সেরাদের নির্বাচিত করেছেন, তাতে অবধারিতভাবেই সেরা ওপেনিং জুটি হিসেবে নাম এসেছে গ্রিনিজ-হেইন্সের। এই নির্বাচনের পরই কিটিং মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু খেলার স্টাইলে নয়, সবদিক থেকেই এই দুই ওপেনারে আকাশ-পাতাল তফাৎ। কিটিং লিখেছেন, ‘গলায় ‘live, love, laugh’ লকেট ঝোলানো হেইন্স ড্রেসিংরুমের যে জায়গাটায় বসতেন, সেখানকার বাতাসে নেচে বেড়াত বেড়াতো আনন্দ আর গর্ডন গ্রিনিজের কোনাটা? সেখানটা গম্ভীর, যেন মেঘে ঢাকা এক টুকরো কালো আকাশ নেমে এসেছে ওখানে।’

এই ছবিটা অনেক পরের। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ইংল্যান্ড ট্যুরের সময় ডার্বিতে তোলা। অসুস্থ বারলো তখনো একই রকম মিশুক ও আমুদে। ছবি: শা. হ. টেংকু

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান সাংবাদিকেরাও দেখলাম, এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। খেলোয়াড়েরাও তা-ই। ১৯৯৯ বিশ্বকাপেরই ঘটনা, বাংলাদেশের প্র্যাকটিস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডাবলিনের মালাহাইড মাঠে এলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান খেলোয়াড়েরা গর্ডন গ্রিনিজকে দেখেই ছুটে আসবে, এটা ছিল খুব স্বাভাবিক একটা অনুমান। অথচ লারার দলের একজন খেলোয়াড়কেও সামনেই চেয়ারে বসে থাকা গর্ডন গ্রিনিজের কাছে ঘেঁষতে দেখলাম না। শুধু কিছুক্ষণ পর অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড ‘গর্ডন, গর্ডন’ বলে বলে বার কয়েক খোঁজাখুঁজি করলেন। গর্ডন তখন বাথরুমে। বেরিয়ে আসার পর যখন জানানো হলো লয়েড তাঁকে খুঁজেছেন, ব্যতিব্যস্ত হয়ে কোথায় পুরোনো সতীর্থকে খুঁজবেন তা নয়, বরং মনে হলো, বিটিভিতে আটটার সংবাদ দেখছেন। চোখেমুখে আগ্রহের বিন্দুমাত্র চিহ্নও নেই।

গর্ডন গ্রিনিজ এমনই। কিন্তু এগুলোই নিশ্চয়ই অনেক পাঠকের কাছে বিস্ময় হয়ে এসেছে। কারণ তাঁর এই্ রূপের সঙ্গে এ দেশের মানুষের সেভাবে পরিচয় নেই। সবার তো তাঁকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ ছিল না। পত্রপত্রিকার মাধ্যমেই মানুষ চিনেছে গ্রিনিজকে। অথচ বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা অনেক অপমানকর অভিজ্ঞতার পরও গ্রিনিজের ওই উদ্ধত, বদমেজাজী রূপটি নিয়ে কখনোই কিছু লেখেননি। গ্রিনিজ এ দেশের ক্রিকেটে অতীত অধ্যায় হয়ে যাওয়ার পর এটি ভাবতে গিয়ে সত্যিই বিস্ময় জাগে, গ্রিনিজের ওই স্বেচ্ছাচারী আচরণ আমরা সবাই কেন সহ্য করলাম? বিশ্বকাপের আগে দেশে শেষ সংবাদ সম্মেলনটিতে পর্যন্ত এলেন না, অথচ তা নিয়ে একটাও আক্রমণাত্মক লেখা পড়েছেন? অন্য কেউ হলে কী ছাড় পেতেন?

পক্ষপাতিত্বের কোনো ব্যাপার নয়। একটু ভাবলেই বুঝি, শুধু গর্ডন গ্রিনিজ বলেই এমন হয়েছে। ক্রিকেটার হিসেবে গর্ডন গ্রিনিজের এমন এক চূড়ায় অধিষ্ঠান ছিল যে, নিজেদের অজান্তেই বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা তাঁকে সব সময় সেই আসনেই রেখে দেওয়ার একটা চেষ্টা করে গেছে। দায়িত্ব নিয়েই আইসিসি ট্রফি জিতিয়ে দেওয়াটাও বড়সড় ভূমিকা রেখেছে এতে। বাংলাদেমের মানুষের মনে যে বিশাল এক আসন বিছিয়ে ফেলেছিলেন গ্রিনিজ, সেই আসনটিতে যেন একটুও কালিমা না পড়ে, সর্বান্তকরণে যেন সেই চেষ্টাই করে গেছে এ দেশের মিডিয়া। বিশ্বকাপের সময় ক্রমাগত উপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে একদিন তাই গর্ডন গ্রিনিজকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘বাংলাদেশের মিডিয়া তো আপনাকে দেবতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। অনেক আপত্তিকর আচরণের পরও আপনাকে আক্রমণ করে এক লাইনও লেখা হয়নি কখনও। তারপরও আপনি এমন করেন কেন?’

গ্রিনিজ কোনো উত্তর দেননি।

উত্তর আসলে একটাই‘–তিনি গর্ডন গ্রিনিজ।’

এডি বারলো যে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সবাইকে মোহিত করে ফেললেন, তার কারণও ব্যাখ্যা করা যায় এভাবেই, ‘তিনি এডি বারলো।’

তা-ই যেন থাকেন!

 আরও পড়ুুন: এখনো বারলোর হৃদয় জুড়ে শুধুই বাংলাদেশ

                     আইসিসি ট্রফি জয়ের পর গর্ডন গ্রিনিজের একান্ত সাক্ষাৎকার