অতুলা সামারাসেকারা ও অশোকা ডি সিলভার আবাহনী ছেড়ে মোহামেডানে চলে যাওয়ার খবরটা কেন এত বড় ছিল, সেটি বুঝতে আগের বছর এই দুজনের পারফরম্যান্স সম্পর্কে জানাটা জরুরি। তার আগে এই দুজনের আবাহনীতে আসার প্রেক্ষাপটটা জেনে নিলে আরও ভালো।

১৯৯১ সালে আবাহনীর হয়ে খেলতে এসে রানবন্যা বইয়ে দিয়েছেন রমন লাম্বা। ঢাকার মাঠে প্রথম বিদেশি সেনসেশন বললে সেই স্বীকৃতি প্রাপ্য ব্যাটিংয়ে-চলনে-বলনে নায়কোচিত এই ভারতীয় ব্যাটসম্যানেরই। পরের বছরও আবাহনীতেই খেলার ইচ্ছা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু আগের বছর অমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও লাম্বার নানা বায়নাক্কায় বিরক্ত আবাহনী তাঁকে আর নেয়নি। সপ্তাহখানেক এ নিয়ে দেনদরবার করে ব্যর্থ হওয়ার পর আবাহনীর কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স পেয়ে লাম্বা নাম লেখান ঢাকার ক্রিকেটে নতুন শক্তি হিসাবে আবির্ভূত গ্রেটার মাইমেনসিং ক্রিকেট (জিএমসিসি)। এমন দুর্দান্ত এক ব্যাটসম্যান, আগের দিন সন্ধ্যায় জিএমসিসির পক্ষে সাইন করে পরদিন মাঠে নেমেই খেলে ফেলেন ৮১ রানের এক ম্যাচজয়ী ইনিংস। বিমানের বিপক্ষে ওই জয়ে দামাল সামারের সেমিফাইনালে উঠে যায় জিএমসিসি । এরপরও লাম্বার ব্যাট যথারীতি ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি।

তবে এতে 'লাম্বাকে কেন ছেড়ে দিলাম' জাতীয় আফসোস হয়নি আবাহনীর। না হওয়ার কারণ অতুলা সামারাসেকারা। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে আনা হয়েছিল তাঁকে। প্রথম দুই ম্যাচে তিন নম্বরে নেমে মাত্র ৪ রান করার পর সমর্থকদের মধ্যে তাই ফিসফাস শুরু হয়ে যায়। তৃতীয় ম্যাচে নিজের প্রিয় পজিশন ওপেনিংয়ে উঠে এসে ৫৩ বলে ৪৭ করে রানের চেয়ে রান করার ধরনে সেটি থামিয়ে দেন সামারাসেকারা। সেই ম্যাচটি ছিল দামাল সামারের সেমিফাইনাল। যেটিতে আবাহনীর কাছে হেরে প্রথমবারের মতো এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় এর আগের ১৩টি আসরেরই ফাইনাল খেলা মোহামেডান। এরপর শুধু ধারাবাহিকভাবে রানই করেননি, এমন ভাবেই তা করেছেন যে, সামারাসেকারা পরিণত হন বোলারদের জন্য মূর্তিমান এক আতঙ্কে। শারীরিক আকৃতির সঙ্গে মানানসই আসুরিক এক শক্তি ছিল তাঁর স্ট্রোক প্লেতে। এত রথী-মহারথী খেলে গেছেন ঢাকা লিগে,দুই-তিনটা ম্যাচে কেউ হয়তো ঝড়ও তুলেছেন, তবে প্রশ্নটা যদি হয়, তাঁদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে হার্ড হিটিং ব্যাটসম্যান কে, তর্কাতীতভাবে সেটির উত্তর হবে অতুলা সামারাসেকারা। ১৯৯২ সালে মোহামেডানের বিপক্ষে ৪৫ ওভারের ম্যাচে ১৬৭ রানের অবিশ্বাস্য এক বিধ্বংসী ইনিংস যেটির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কে জানে, সেদিনই হয়তো মোহামেডানের কর্মকর্তারা ঠিক করে ফেলেন, পরের বছর যেভাবেই হোক, সামারাকে আবাহনী থেকে ভাগিয়ে আনতে হবে।

১৯৯৩ সালের সেই আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের দিন পত্রিকায় আবাহনীর দুই ইংলিশের সঙ্গে মোহামেডানের দুই শ্রীলঙ্কানের লড়াই নিয়ে আলাদা প্রতিবেদন। ছবি: আর্কাইভ থেকে

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও দু'একবার দেখা মিলেছে এই সামারাসেকারার। ঢাকায় এসেছিলেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি (প্রথমটি ১৯৮৩ সালে) খেলে। সেই বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যে ম্যাচে শ্রীলঙ্কা প্রথমবারের মতো ওয়ানডেতে তিন শর বেশি রান তাড়া করে জিতেছিল, তাতে বড় ভূমিকা ছিল শুরুতেই সামারাসেকারার ৬১ বলে ৭৫ রানের ঝোড়ো ইনিংসটির।

ঢাকায় আসার আগেই অশোকা ডি সিলভার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ। ১০টি টেস্ট ফেলেছেন, ২৮টি ওয়ানডে। পারফরম্যান্স সেভাবে বলার মতো কিছু নয়। কিন্তু লেগ স্পিনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের অনভ্যস্ততার কারণে সেই অশোকাই ঢাকা লিগে রীতিমতো স্ট্রাইক বোলার হিসাবে আবির্ভূত হন। রান আটকে রাখা বোলিংয়ে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও রান করে একরকম অলরাউন্ডারই হয়ে যান। এই দুজনের শত্রু শিবিরে যোগ দেওয়া আবাহনীর জন্য তাই বড় একটা মর্মবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ানোই ছিল স্বাভাবিক।

১৯৯৩ সালের লিগে যে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচটিকে ‌'ফেয়ারব্রাদারের ম্যাচ' বলছি, সেটির তাৎপর্য বুঝতে এসব জানাটা জরুরি। যা জানলে পরিষ্কার বুঝতে পারবেন, ওই ম্যাচের বৃহত্তর চিত্রের মধ্যে কৌতুহলোদ্দীপক দুটি সাব প্লট ছিল।

অন্য সব বছরের মতো সেবার দামাল সামার ক্রিকেট দিয়ে মৌসুম শুরু হয়নি। লিগেই প্রথম দেখা হচ্ছে আবাহনী ও মোহামেডানের। আবাহনীর দুই ইংলিশ ক্রিকেটারের সঙ্গে মোহামেডানের দুই শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারেরও। সামারা-অশোকার অমন দল বদলের কারণে যেটিতে বাড়তি ঝাঁজ। ম্যাচের দিন পত্রিকায় এটা নিয়ে আলাদা একটা স্টোরি অবশ্যই থাকা উচিত। সেই উচিত কাজটি করার জন্য আবাহনী ক্লাবে গিয়ে ফেয়ারব্রাদার ও ইলিংওয়ার্থের সঙ্গে কথা বলেছি। বলে লাভই হলো। আগের বছরের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে দুজনই যে সামারাসেকারার বিপক্ষে খেলেছেন, এটা জানতাম। ইলিংওয়ার্থ বাড়তি একটা তথ্য দিলেন, সামারাসেকারার বিপক্ষে তিনি এর আগে কখনো বোলিং করেননি। বিশ্বকাপের ওই ম্যাচে বোলিংয়ে আসার আগেই আউট হয়ে গেছেন সামারা। পাশে বসে থাকা ফেয়ারব্রাদার মৃদু হেসে যোগ করেছেন, 'বোলিং না করলেও তোমার ভূমিকা ছিল ওর আউটে। বলটা করেছিল ক্রিস লুইস, কিন্তু ক্যাচটা তো তুমিই ধরেছিলে।'

ম্যাচের আগের দিন বিকালে একই সময়ে দুই দলের প্র্যাকটিস। এক দলেরটা দেখলে আরেক দলেরটা মিস হয়ে যায়। ফেয়ারব্রাদার-ইলিংওয়ার্থের কথা তো পেলাম, কিন্তু সামারাসেকারা-অশোকারটা পাই কীভাবে? তখন তো আর মোবাইলের যুগ নয় যে, দূর আলাপনীতে কথা বলে নেব। ঠিকানা যোগাড় করে সন্ধ্যার পর তাই চলে গেলাম বনানীতে। সেখানেই একটি ফ্ল্যাটে দুই শ্রীলঙ্কানের থাকার ব্যবস্থা করেছে মোহামেডান। কল বেল টিপতেই দরজা খুলে দিলেন সামারাসেকারার স্ত্রী। যাঁকে এই প্রথম দেখছি এবং সামারার স্ত্রী হিসাবে ঠিক মেলাতে পারছি না। সামারার অমন দশাসই শরীর, অথচ ইনি তো কিশোরীসুলভ মুখের ছোটখাটো গড়নের এক তরুণী। পরিচয় দেওয়ার পর যিনি জানতে চাইছেন, আমরা যে আসব, এটা সামারাসেকারা জানেন কি না। সামারার সঙ্গে যোগাযোগই হয়নি, কীভাবে জানবেন! আমি তাই না-সূচক মাথা নাড়লাম। ছবি তোলার জন্য এদিনও আমার সঙ্গী শামসুল হক টেংকু। সামারাসেকারা ও অশোকা দুজনই বাইরে গেছেন জানিয়ে আমাদেরকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে বসালেন সামারার স্ত্রী। চা খাব কি না, এই সৌজন্যটুকুও পাওয়া গেল। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। একটু পরই কল বেল বাজল। সামারাসেকারা ও অশোকা ফিরেছেন। অশোকার হাতে পলিথিনের ব্যাগে বেশ কয়েকটা ভিডিও ক্যাসেট। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে উঠে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। দুজনই হাত মেলালেন বটে, কিন্তু মুখে কোনো হাসি নেই। আমাদের দেখে বরং একটু বিরক্তই হয়েছেন বলে মনে হলো, বিশেষ করে সামারাসেকারা। হাত মিলিয়েই যিনি কিচেনের দিকে চলে গেলেন। সেখানে স্ত্রীর সঙ্গে সিংহলিজ ভাষায় কিছু একটা আলোচনা হচ্ছে শুনতে পাচ্ছি। সেটি শেষ করে ড্রয়িংরুমে ফিরেই সামারাসেকারা শীতল কণ্ঠে বললেন, 'তোমরা মিথ্যা কথা বলে আমার বাড়িতে ঢুকেছ। এখনই বেরিয়ে যাও।' 'বেরিয়ে যাও' কথাটা কোনো ভদ্রতার আবরণে ঢাকা নয়। একেবারে চাঁছাছোলা 'গেট আউট।'

স্ত্রীর সঙ্গে অতুলা সামারাসেকারা। ছবি: ফেসবুক

আমি আর টেংকু দুজনই রীতিমতো হতভম্ব। আমরা আবার মিথ্যা কথা বলে ঢুকলাম কোথায়? সামারাকে তা বোঝানোর চেষ্টা করতে যেতেই প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, 'তোমরা আমার স্ত্রীকে বলেছ, তোমরা আমার সঙ্গে কথা বলেই বাড়িতে এসেছ।'

আমি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে করতে বললাম, 'আমার মনে হয় তোমার স্ত্রী ভুল বুঝেছে। আমি মোটেই অমন কিছু বলিনি। বরং উল্টোটাই বলেছি। কালকের ম্যাচ নিয়ে একটু কথা বলেই আমরা চলে যাব।'

অশোকা নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সামারাসেকারার কণ্ঠ আরও এক ধাপ উঁচুতে চড়ে গেছে, 'তোমাদের সঙ্গে আমি কোনো কথাই বলব না। গেট আউট।' এবারের 'গেট আউট'টা এমনই ঝাঁজালো এবং তা বলার পর আমাদের দিকে যেভাবে এক পা এগিয়ে এসেছেন, তাতে মনে হলো, মানে মানে বেরিয়ে না গেলে আরও অপমানজনক কিছু ঘটতে পারে। 'তুমি ভুল বুঝেছ। আমাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করা ঠিক হয়নি' বলতে বলতে আমরা দুজন তাই বেরিয়ে এলাম। য পলায়তি স জীবতি!

নিচে নেমে এসে আমি আর টেংকু দুজনই আগের চেয়েও বেশি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু আগে যা ঘটে গেছে, সেটি তখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। রাগে-অপমানে শরীর কাঁপছে। সামারার স্ত্রী কেন মিথ্যা বলেছেন, সেটির কোনো ব্যাখ্যাও খুঁজে পাচ্ছি না। যেটি পেলাম পরের বছর প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কা ট্যুরে গিয়ে। সিঙ্গার ওয়ার্ল্ড সিরিজ কাভার করতে গিয়ে একদিন স্টেডিয়ামের বাইরে অশোকা ডি সিলভার সঙ্গে দেখা। হাসিমুখে বাংলাদেশের খবর জানতে চাইলেন। আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ তুলে বললেন, 'আমি এতে অবাক হইনি। তোমাদের জাতীয় দলের বেশির ভাগ ব্যাটসম্যান আবাহনী-মোহামেডানে খেলে। আম্পায়াররা এলবিডব্লু দেয় না বলে প্রত্যেকে এক ম্যাচে দুই/তিনটা ইনিংস খেলে। বাজে অভ্যাস হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তো আর এই সুবিধা পাওয়া যায় না।'

এ কথা-সে কথার পর আমি প্রসঙ্গটা তুললাম, 'আচ্ছা, সেই রাতের ঘটনাটা কী, বলো তো?'

অশোকাও সামারার কথারই প্রতিধ্বনি তুলে বললেন, 'সামারা খুব রেগে গিয়েছিল। তোমরা কেন বলেছিলে, তোমাদের আসার কথা আমরা জানতাম?'

আমি প্রতিবাদ করে বললাম, 'আমরা মোটেই তা বলিনি। সামারার স্ত্রীর প্রশ্নে আমি মাথা নেড়ে "না" বলেছি।'

আমার কথা শেষ হতেই অশোকার হো হো করে হাসি, 'এবার বুঝেছি। আমরা শ্রীলঙ্কানরা তো দুদিকে মাথা নাড়লে "ইয়েস" বুঝি।'

ভুল বোঝাবুঝির কারণটা আবিষ্কৃত হওয়ার পর অশোকা একাধিকবার স্যরি বললেন।

আমি মজা করে বললাম, 'এখন আর স্যরি বলার দরকার নেই। আমাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণের শাস্তি তো পরের দিনের ম্যাচেই পেয়ে গেছ তোমরা। সামারা আবাহনী সমর্থকদের ইট-পাটকেল খেয়েছে আর তুমি আবাহনীর ব্যাটসম্যানদের ঠ্যাঙ্গানি।'

অশোকা জিবে কামড় দিয়ে বললেন, 'ওই ম্যাচের কথা আর বলো না!'

আরও পড়ুন:

ঢাকায় সামারা-ফেয়ারব্রাদার-৩: যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন ফেয়ারব্রাদার