আগের রাতে সামারাসেকারা-অশোকা ডি সিলভার বাসা থেকে যেভাবে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে, তাতে পরদিনের ম্যাচে এই দুজনের অমঙ্গল কামনা করাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। তবে আউট হয়ে ফেরার সময় সামারাসেকারাকে যে আবাহনী সমর্থকদের ইট-পাটকেল খেতে হলো, এর আগে আবাহনীর ব্যাটসম্যানদের হাতে চরম নিগৃহীত হতে হলো অশোকা ডি সিলভাকে, এতে আমার অমঙ্গল কামনার কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না। এই মিলে যাওয়াটা নেহাতই কাকতাল মাত্র।

সামারাকে ওই ইট-পাটকেলের 'অভ্যর্থনা' সে সময়কার আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের চিরন্তন ছবির একটা খণ্ডদৃশ্য। যেটি এখনো পরিষ্কার চোখে ভাসে। বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে আছেন সামারা, গ্যালারি থেকে উড়ে আসতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে বেরোতে পারছেন না। অথচ দারুণ এক ইনিংস খেলার জন্য তাঁর বরং অভিবাদন প্রাপ্য ছিল। ৭৯তম বলে আউট হয়ে যাওয়ার আগে ৭৮ রান করেছেন ঠিক ৭৮ বলে। এক শ পার্সেন্ট স্ট্রাইক রেটের এক ইনিংস, তারপরও সেটি ঠিক সামারাসুলভ নয়। তা নয় বলেই সেটি আরও তাৎপর্যময়। ম্যাচটা বের করে নেওয়ার বাড়তি প্রতিজ্ঞার কারণেই স্বভাববিরুদ্ধভাবে চার মেরেছেন মাত্র ৭টি। ছক্কা একটিও নয়। যার মানে ৫০ রানই নিয়েছেন দৌড়ে। ৩২ রানেই অবশ্য শেষ হয়ে যেতে পারত তাঁর ইনিংস। হয়নি নিশ্চিত রান আউটের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায়। সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলে সামারার সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি একটা জয়ের আনন্দ পেয়ে যেতেন ফেয়ারব্রাদার। আংশিকভাবে হলেও পরে অবশ্য সেটি পেয়েছেন। পয়েন্টে ফেয়ারব্রাদারের নেওয়া দুর্দান্ত এক ক্যাচই ফিরিয়ে দিয়েছে সামারাকে। পরে যেটি প্রমাণিত ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেও।

সামারা যতক্ষণ ছিলেন, মোহামেডানের জয়ের আশাও দেদীপ্যমান শিখা হয়ে জ্বলছিল। আউট হয়ে যাওয়ার পর সেটির ঔজ্জ্বল্য হয়তো একটু কমেছে, তবে মোটেই নিভে যায়নি। সমীকরণটা তখনো মোহামেডানেরই পক্ষে। বাকি ১২ ওভারে দরকার ৭৩ রান, হাতে সাত-সাতটি উইকেট। অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল তখন উইকেটে, নামছেন অশোকা ডি সিলভা। ব্যাট করতে নামার অপেক্ষায় আতহার-দুর্জয়-পাইলট। তারপরও আর ৫৫ রান যোগ করতেই মোহামেডান কীভাবে বাকি ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলল, সেই কথায় পরে আসি। ম্যাচের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়টা বলে ফেলার জন্য যে তর সইছে না। ম্যাচের আলোকে স্মরণীয়, আবাহনীর জন্য তো অবশ্যই, তবে অশোকা ডি সিলভার জন্য রীতিমতো বিস্মরণযোগ্য সেই স্মৃতি আসলে দুঃস্বপ্নেরই নামান্তর।

সেই ম্যাচে বল করেছিলেন যেন দুজন অশোকা ডি সিলভা! প্রথম চারটি ওভার ছিল অশোকার মতোই। নিখুঁত লাইন লেংথে বল ফেলে ছোট ছোট স্পিন। যাতে রান এসেছে মাত্র ১৫। সেই অশোকারই পরের চার ওভারে ৫২ রান! এর মধ্যে শেষ ওভারটি আলাদা করে নেওয়া ভালো। যেটি আবাহনী ইনিংসেরও শেষ ওভার। ওই এক ওভারেই ২৪ রান!

মোহামেডানের শ্রীলঙ্কান লেগ স্পিনার অশোকা ডি সিলভাকে ব্যাকওয়ার্ড পযেন্ট দিয়ে চার মারছেন নিল ফেয়ারব্রাদার। নন স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যান আকরাম খান। ছবি: ভোরের কাগজ

ওই ২৪ আসলে পাঁচ বলে। চতুর্থ বলে রান হয়নি, কারণ সেই বলেই ম্যাচে তাঁর একমাত্র উইকেটটি পেয়েছেন। সেটি নিল ফেয়ারব্রাদারের। স্টাম্পড হওয়ার আগের ৮৫ বলে যিনি ৯০ রান করে ফেলেছেন। আগের তিনটি বলই ছুটে গেছে মাঠের বাইরে। এর মধ্যে প্রথমটি বাতাসে উড়ে। মিড উইকেট দিয়ে মারা ওই ছক্কাটি আসলে ছয় নয়---'বারো'! দুর্দান্ত টাইমিংয়ে শিল্প ব্যাংকের লাগোয়া গ্যালারির মাঝামাঝি গিয়ে আছড়ে পড়েছে বল। ফেয়ারব্রাদার আউট হয়ে যাওয়ায় অশোকা হয়তো একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে থাকবেন। তবে খুব দ্রুতই সেটি দীর্ঘশ্বাসে রূপ নেয়। দুই বলের জন্য ব্যাট করতে নেমে 'যা আছে কপালে' মন্ত্রে উজ্জীবিত সাইফুল মেরে দেন চার আর ছয়।

স্কোরবোর্ড তখন দেখাচ্ছে ৪ উইকেটে ২৪০। ৩৮ ওভার শেষেও যেটি ছিল ৩ উইকেটে ১২২। শেষ ৭ ওভারের ব্যাটিং তাণ্ডবে শুধু মোহামেডান বোলারদের নয়, স্কোরারদেরও রীতিমতো দিশেহারা অবস্থা। ওই ৭ ওভারে আবাহনী তুলেছে ১০৭ রান! ফেয়ারব্রাদারেরই তাতে বড় ভূমিকা, তবে তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করা আকরাম খানের কথা ভুলে গেলে অন্যায় হবে। অনেকটা সময় রানার নিয়ে খেলেও ১৮.৩ ওভারে ১৩৯ রানের জুটিতে যাঁর অবদান ৫৫ বলে অপরাজিত ৫৪। শেষ দিকে তিনি অবশ্য নির্ভেজাল দর্শক। এই ম্যাচ নিয়ে লিখছি জেনে আকরাম হাসতে হাসতে জানালেন, 'আপনার মনে আছে কি না, শেষ ৩ ওভারে আমি কিন্তু স্ট্রাইকই পাইনি।'

হিসাবটাও আকরামই করে দিলেন। আউট হওয়ার বলটি সহ ধরলে শেষ ৩ ওভারের ১৮ বলের ১৬টিই খেলেছেন ফেয়ারব্রাদার, যা থেকে তুলেছেন ৪৩ রান! ফেয়ারব্রাদারের প্রতিটি শটই শেল হয়ে বিঁধেছে বুলবুলের বুকে। সেটি শুধু তিনি প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়ক বলেই নয়, ফেয়ারব্রাদার স্বরূপে দেখা দিতে পেরেছেন তো তাঁর কারণেই। ফিল্ডার হিসাবে বুলবুল বরাবরই দুর্দান্ত। আর তিনিই কিনা ফেলে দিলেন ফেয়ারব্রাদারের মহামূল্য ক্যাচ! প্রিন্সের বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে যেটি নিতে পারলে ১৮ রানেই ফিরে যেতে হয় ফেয়ারব্রাদারকে। ঢাকার ক্রিকেটে তাহলে কোনো চিহ্নই রেখে যেতে পারেন না এই বাঁহাতি। আগের পাঁচ ম্যাচের প্রথম তিনটিতে মোটামুটি রান করলেও (২৫, অপরাজিত ৪৭ ও ৪১) মহারণের আগের দুই ম্যাচে তো তাঁর স্কোর ৪ ও ০।

মাঠের ছোটখাটো ঘটনাও আকরাম খুব মজা করে বলতে পারেন। সাইফুল নামার পর উইকেটে কথপোকথনটাও তাঁর কাছ থেকেই শোনা। রানার হারুনুর রশিদ লিটনকে নিয়ে সাইফুলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন আকরাম। লিটন-সাইফুল দুজন ময়মনসিংহের দেশি ভাই। কিন্তু কোনো কারণে তাঁদের মধ্যে তখন কথাবার্তা বন্ধ। কিন্তু দলের প্রয়োজন বলে কথা! লিটন তাই বৈরিতা ভুলে ময়মনসিংহের উচ্চারণে সাইফুলকে সরল এক পরামর্শ দিলেন, 'বল ফড়ার আগেই মাইরা দিবি।' সাইফুল তাই দিয়েছিলেন।

মেরে খেলায় লিটনের খুব নাম ছিল। ছক্কাবহুল এই ম্যাচে ছক্কার আবাহনও তাঁর ব্যাটেই। ইনিংসের চতুর্থ ওভারে বাঁহাতি মোর্শেদের বল সোজা তুলে দিয়ে প্রথম ছক্কা, দ্বিতীয়টি নবম ওভারে আরেক বাঁহাতি প্রিন্সকে লং অনের ওপর দিয়ে। আউটও হয়েছেন আরেকটি ছক্কা মারতে গিয়েই। লিটনের মতো তাঁর ওপেনিং সঙ্গী গাজী আশরাফ হোসেন লিপুও দ্বিতীয় স্পেলে ফেরা আতহারের শিকার। সেটিও আতহারের পরপর দুই ওভারে। তিন নম্বরে নামা ফারুক ৭ রান করেই সেলিম শাহেদের বলে বোল্ড হয়ে যাওয়ায় বিনা উইকেটে ৬৫ থেকে দেখতে না দেখতেই আবাহনী ৩ উইকেটে ৯১! মোহামেডান তখন হাসছে। যে হাসি ক্রমশই মুছে যায় ফেয়ারব্রাদার-আকরামের যুগলবন্দিতে।

কাকতালীয়ভাবে দুই দলের ওপেনিং জুটি দুটিই ৬৫ রানের। পার্থক্য বলতে, আবাহনীর লিপু-লিটনের যেখানে তা করতে ১৮ ওভার লেগেছে, মোহামেডানের সামারাসেকারা-শিপনের ১৩.২ ওভার। শুরুর এই পার্থক্য বজায় থেকেছে শেষ পর্যন্ত। রান রেটে সব সময়ই এগিয়ে থেকেছে মোহামেডান। ৩৫ ওভার শেষেও দুই দলের রানের তুলনামূলক হিসাবে তারা ৫৬ রানে এগিয়ে। উইকেট পড়েছে মাত্র একটি বেশি। ৫ ওভার বাকি থাকতে ব্যবধান ৪০ রানের। কিন্তু এক ওভার বাকি থাকতেই অলআউট হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এসবের আর কোনো মূল্য থাকেনি।

স্টাম্প ভেঙে দিয়ে স্টাম্পিংয়ের আপিল করছেন মোহামেডানের উইকেটকিপার পাইলট। আকরাম খান ডাইভ দিয়ে অবশ্য বেঁচে গেছেন। নন স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যান নিল ফেয়ারব্রাদার। ছবি: ভোরের কাগজ

মোহামেডানের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো থাকেনি, তবে ক্রিকেটীয় বিবেচনায় তা মোটেই মূল্যহীন ছিল না। নব্বইয়ের দশকের প্রায় পুরোটা সময় বিনোদনের যে পসরা সাজিয়ে বসত আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ, সেটিতে আরেকটি সংযোজন তো হয়েছিলই। ৮৯ ওভারে রান উঠেছিল ৪৬৩, ওভার প্রতি ৫.২। টি-টোয়েন্টির এই যুগে যেটির তাৎপর্য কেউ বুঝতেই পারবেন না। উল্টো হয়তো প্রশ্ন করবেন, এ আর এমন কী!

এমন কী, সেটি বুঝতে পারবেন শুধু সেই সময়ের দর্শকেরা। সে সময়ের ঢাকার উইকেটের চরিত্র যাঁদের জানা আছে। বেশির ভাগ সময় ২০০ রানের বেশি কোনো স্কোর চেজ করতেই তো নাভিশ্বাস উঠে যেত দলগুলোর। সে বছর আরও বেশি। পুরনো পত্রিকার ক্লিপিংসে দেখছি, দুই দলের অধিনায়কই উইকেটের কথা মাথায় রেখে লো স্কোরিং ম্যাচের ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। নিল ফেয়ারব্রাদার মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছেন, এমন স্লো উইকেটে তিনি জীবনে খেলেননি। সেই উইকেটে পরদিন এমন একটা ইনিংস খেলে ফেলবেন, এটা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি। এটাই বা কে ভেবেছিলেন, লিগের আগের ১০ ম্যাচে আবাহনীর ব্যাটসম্যানদের যেখানে মোট ১২টি ছক্কা, এই এক ম্যাচেই তাঁরা ছক্কা মেরে বসবেন ১০টি! ছক্কাবহুল ম্যাচ বলছিলাম, তবে আসলে সেটি আবাহনীর একক অবদান। মোহামেডান ইনিংসে ছক্কা মাত্র একটি। যেটি মেরেছেন বুলবুল। ৩৪ বলে ২৮ রান করে যাঁর বিদায়েই আসলে বেজে যায় মোহামেডানের পরাজয়ের ঘণ্টা। এর আগেই যেটি মৃদু আওয়াজ তুলতে শুরু করেছিল আবাহনীর দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে অশোকা ও আতহার রান আউট হয়ে যাওয়ায়। মোহামেডানের শেষ আশা হয়ে ছিলেন বুলবুলই। যে বলটিতে আউট হয়েছেন, সেটির আগে ১৩ বলে ২৫ রানের সমীকরণ মোটেই অসাধ্য কিছু ছিল না।

৯০ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে আউট হয়ে গেলেন ফেয়ারব্রাদার। ছবি: ভোরের কাগজ

এই ম্যাচ ঘিরে সর্বজনীন আলোড়নের মধ্যেও বুলবুলের জন্য এটি ছিল আরও বিশেষ কিছু। মোহামেডানের আগের ছয় বছরের অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু আবাহনীতে যোগ দেওয়ায় সেবারই প্রথম বড় কোনো দলের অধিনায়কত্ব পেয়েছেন। মোহামেডান অধিনায়ক হিসাবে আবাহনীর বিপক্ষে সেটিই তাঁর প্রথম ম্যাচ। যেটি নিয়ে সর্বজনীন আলোড়নের কথা বলছিলাম। নিজের করা ম্যাচ রিপোর্টে দেখছি, মাঠে ছিলেন হাজার পঁচিশেক দর্শক। তবে দেখেছেন আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ। কারণ বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল এই ম্যাচ। রেডিওতে প্রচারিত হয়েছিল খেলার চলতি ধারাবিবরণী। তখন যে পত্রিকায় কাজ করি, সেই ভোরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের প্রিভিউ ছাপা হওয়াটা তো নিয়মই ছিল। তিন কলাম জুড়ে এই ম্যাচের প্রিভিউ ছাপা হওয়াটাও তাই নতুন কিছু ছিল না। নতুন ছিল ম্যাচ নিয়ে দুই দলের অধিনায়কের কলাম। সেটিও অনুলিখন নয়। গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ও আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নামে ছাপা হওয়া কলাম দুটি লিখেছিলেন তাঁরা নিজেরাই। এরপর বেশ কয়েক বছর আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে যা নিয়ম হয়ে যায়।

ম্যাচ নিয়ে পরের দিনের ভোারের কাগজে লেখকের প্রতিবেদনে সামারাসেকারা, নান্নু ও লিপুর ছবি। ছবি: সংগৃহীত

অধিনায়ক প্রসঙ্গ যখন উঠলই, মজার আরেকটি তথ্যও জানাতে ইচ্ছা করছে। সেই মৌসুমের আবাহনীতে যেন মেলা বসেছিল অধিনায়কদের। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু যথারীতি আবাহনীর অধিনায়ক। যাঁর দলে কিছুদিন আগে বিতর্কিতভাবে জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব হারানো মিনহাজুল আবেদীন ও তাঁর জায়গা নেওয়া ফারুক আহমেদ। অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলের অধিনায়ক খালেদ মাহমুদও সেবার আবাহনীতে। নিল ফেয়ারব্রাদার তখন ইংলিশ কাউন্টি ল্যাঙ্কাশায়ারের অধিনায়ক। তাঁর ঢাকা লিগে খেলতে আসার চেয়ে নান্নুর মোহামেডান ছেড়ে আবাহনীতে যোগ দেওয়াও সেই মৌসুমে কম আলোড়ন তোলেনি। টানা সাত বছর ওই দলে, শেষ ছয় বছর অধিনায়ক---নান্নু আর মোহামেডান হয়ে গিয়েছিলেন সমার্থক। আগের মৌসুমের মাঝপথে মোহামেডানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কী একটা ঝামেলা জড়িয়ে অধিনায়কত্ব হারানোতেই 'মোহামেডানের নান্নু'র আবার আবাহনীর হয়ে যাওয়া। সেই মোহামেডানের সঙ্গে ম্যাচে নান্নু কিছু করবেন না, এটা হয় নাকি! ব্যাটিং করার সুযোগই পাননি। সেই দু:খ ভুলেছেন বোলিংয়ে ২ উইকেট নিয়ে। মোহামেডানের প্রথম দুটি উইকেটই তাঁর। এর মধ্যে সেলিম শাহেদের (৪৭) উইকেটটির কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। সামারাসেকারার সঙ্গে ৯৯ রানের জুটি গড়ে আবাহনীর শির:পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান। এর আগে বোলিংয়েও যিনি ভালো করেছেন (৯ ওভারে ২৬ রানে ১ উইকেট)।

বোলিংয়ের কথা বললে সেই ম্যাচের সফলতম বোলারের নামটাও বলা উচিত। যাঁকে দিয়ে আমি ম্যাচ রিপোর্টের হেডিং করেছিলাম: শেষ ম্যাচে জ্বলে উঠলেন ফেয়ারব্রাদার ও সামারা, নায়ক তবুও লিপু! ৩৫ রানে ৩ উইকেট, এর মধ্যে ছিল সামারাসেকারা ও বুলবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট দুটিও। তবে লিপুকে ম্যাচসেরা বলে ঘোষণা করায় এর সঙ্গে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর অধিনায়কত্বের। আবাহনীর সঙ্গে ম্যাচে মোহামেডানের সমর্থকেরা যে লিপুকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভয়ে থাকতেন, সেটি যত না তাঁর ব্যাটিংয়ের কারণে, তার চেয়ে বেশি ক্যাপ্টেনসির কারণে। কখন কী করে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেবেন, কে জানে! এই ম্যাচেও তা দিয়েছেন। বোলারদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দারুণ চাতুর্য্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। সামারা যখন প্রমত্ত হয়ে উঠতে চাইছেন, নিজেই হাতে তুলে নিয়েছেন বল। মোহামেডান যখন ম্যাচ বের করে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, অধিনায়কের নিষ্কম্প মূর্তি সতীর্থদের মনে ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বাস, 'এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি।' ম্যাচশেষে পরাজয়ের কারণ হিসাবে বুলবুলও তাই ফেয়ারব্রাদারের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে 'লিপু ভাইয়ের ক্যাপ্টেনসি'র কথাও উল্লেখ না করে পারেননি।

ম্যাচ রিপোর্টের হেডিংয়ে শেষ ম্যাচে ফেয়ারব্রাদারের জ্বলে ওঠার কথাটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু সামারাসেকারার ক্ষেত্রেও কেন একই কথা? কারণ সেই মৌসুমে এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত সামারা নিজের ছায়া হয়েই ছিলেন। আগের বছর মোহামেডানের বিপক্ষে এক ম্যাচেই যেখানে ১৬৭ রান করে ফেলেছিলেন, সেবার মোহামেডানের পক্ষে ১০ ম্যাচে তাঁর মোট রান ২৬৭।

যে প্রতিবেদনের অপেক্ষায় ছিলেন দেশের সকল ক্রিকেট অনুরাগী। ছবি: সংগৃহীত

ম্যাচে নাটক কম হয়নি। তবে এই ম্যাচকে ঘিরে আসল নাটকটা অভিনীত হয়েছে কিন্তু ম্যাচের আগেই। যে 'ফেয়ারব্রাদারের ম্যাচ' নিয়ে লিখতে বসে তিন পর্ব লেগে গেল, সেই ম্যাচে ফেয়ারব্রাদার না-ও খেলতে পারতেন। ৫ ইনিংসে একটিও ফিফটি নেই, সর্বশেষ দুই ম্যাচে ৪ ও ০। সেই সময়ে বিশ্বের সেরা ওয়ানডে ব্যাটসম্যানদের একজন হতে পারেন, কিন্তু ঢাকার এই স্লো-লো উইকেটের সঙ্গে যে মানিয়ে নিতে পারছেন না, সেটি তো পরিষ্কারই। ফেয়ারব্রাদারকে তাই ড্রপ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন আবাহনী কর্মকর্তারা। কিন্তু সেটি তাঁকে বলবেন কে? ফেয়ারব্রাদারকে বলার আগে আবাহনীর দুই কর্মকর্তা জালাল ইউনুস ও জিএস হাসান তামিম কথা বলতে যান গুরিন্দার পাল সিংয়ের সঙ্গে। আকরাম খানকেও নিয়ে যান সাথে করে। গুরিন্দার পাল সিং, সংক্ষেপে যিনি জিপি সিং নামেই বেশি পরিচিত, তাঁকে আগে চিনিয়ে দিই। ফেয়ারব্রাদার তো এসেছিলেন শেষ ছয় ম্যাচের জন্য। এর আগ পর্যন্ত আবাহনীর দুই বিদেশি খেলোয়াড়ের একজন হিসাবে খেলেছেন এই ভারতীয় অলরাউন্ডার। প্রথম দুই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরিসহ ৩৭.৫ গড়ে করেছেন ১৫০ রান। সঙ্গে উইকেটও নিয়েছেন ৬টি। মোহামেডানের বিপক্ষে ফেয়ারব্রাদারের চেয়ে তাঁকে খেলানোই তো ভালো। কিন্তু প্রস্তাবটা শুনেই জিপি সিং আঁতকে উঠেন, 'আপনাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ফেয়ারব্রাদারকে বসিয়ে আমাকে খেলালে পাবলিক আমাকে আস্ত রাখবে না।'

ফেয়ারব্রাদারকে ড্রপ করার চিন্তার সেখানেই ইতি। জিপি সিং এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, জানি না। তবে তাঁকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া কর্তব্য বলে মনে হচ্ছে। তিনি খেলতে রাজি হয়ে গেলেই তো ঢাকার ক্রিকেট নিল ফেয়ারব্রাদারকে মনে রাখার মতো কিছু পায় না। ঢাকা লিগের একটা ম্যাচ নিয়ে তিন পর্বের এই ঢাউস রচনাটাও আর লেখা হয় না!