২৭ মার্চ, ১৯৯৪। সকালবেলা। খানিক বাদেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চার ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নামার কথা আমাদের। কিন্তু আমাদের নিয়মিত ওপেনার নভোজৎ সিং সিধুর ঘুম ভাঙল ঘাড়ব্যথাকে সঙ্গী করে। তার অবস্থা তখন এমনই বেগতিক যে 'খেলতে পারবে কি' প্রশ্ন করাও অন্যায়। 

খবরটা শুনে সাথে সাথেই আমি দৌড়ে গেলাম আজহার আর আমাদের ম্যানেজার অজিত ওয়াদেকারের কাছে। গিয়ে একরকম কাকুতি-মিনতিই জুড়ে দিলাম, টপ-অর্ডারে ফাঁকা হওয়া জায়গাটি আমার চাই-ই চাই। আমারই ইনিংস উদ্বোধন করা উচিত, এমন কেন মনে হচ্ছিল আমার? 

ওয়ানডে ক্রিকেটে সিদ্ধিলাভের তরিকাই যেহেতু প্রথম ১৫ ওভারে ফিল্ডিং বাধ্যবাধকতার ফায়দা লোটা, আর যেহেতু বোলারদের ওপর একদম শুরুর বল থেকেই চড়াও হতে পারি আমি, আমার তাই মনে হচ্ছিল, আমিও ইনিংস উদ্বোধনের যোগ্যতা রাখি। একবার মাত্র সুযোগ পেলেই আমি যে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখতে পারব, এ নিয়েও আমি নিঃসংশয় ছিলাম। ওয়াদেকার স্যারকে তো এমনও বলেছিলাম, ব্যর্থ হলে আমি আর কখনোই কোনো সুযোগ চাইব না। 

 ইডেন পার্ক, অকল্যান্ড। ২৭ মার্চ, ১৯৯৪। ওপেনার শচীন টেন্ডুলকারের জন্ম

দলে যেহেতু অতিরিক্ত কোনো ওপেনারও ছিল না, সিধুর পরিবর্তে অনিয়মিত কাউকে দিয়েই তাই ঠেকার কাজ চালাতে হতো। আর আমাকে যদি পাঠানো হয় এবং আমি ব্যর্থও হই, তবুও চার-পাঁচে খেলানোর মতো ব্যাটসম্যান তারা পাবেন, এই ছিল আমার যুক্তি। আমার অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরে মন গলেছিল তাঁদের। আমাকে ইনিংস উদ্বোধনে পাঠাতে রাজি হয়েছিলেন তাঁরা।

প্রথমে ব্যাট করে নিউজিল্যান্ড করেছিল মাত্র ১৪২, কিন্তু তারপরও ব্যাটিংয়ে আমাদের ভালো একটা শুরুর দরকার ছিল। সেদিন ব্যাট করতে হেঁটে হেঁটে ক্রিজে যাওয়ার পথেই একটু ভিন্ন কিছুর ঘ্রাণ টের পাচ্ছিলাম আমি। নিজেকে নিজেই বলেছিলাম, ভারতের হয়ে ইনিংস ওপেন করার সুযোগ তোমার সামনে, ব্যর্থ হয়ে অধিনায়ক আর কোচের মাথা হেঁট কোরো না। ক্রিজে গিয়ে পৌঁছেছিলাম একদম পরিষ্কার মাথায়। সামনে যা-ই আসুক, বল সজোরে হাঁকানো ছাড়া আর কোনো ভাবনা ছিল না আমার মনে। 

আর সেদিন যা করতে চাইছিলাম, তা-ই হচ্ছিল। এক বল খেলেই পরবর্তী বলের জন্য অপেক্ষা করতেও তর সইছিল না আমার। বল যত দ্রুত আসছিল, ততই ভালো লাগছিল। সেদিন আউট হওয়ার আগে ৪৮ বলে ৮২ রান করেছিলাম আমি, মেরেছিলাম ১৫টি চার আর ২টি ছক্কা। আউট হয়েছিলাম বাঁহাতি স্পিনার ম্যাথু হার্টের বলে। ব্যাটের কানায় লেগে ক্যাচ উঠে গিয়েছিল।

এর পরে আর কখনো ওপেন করার জন্য ওয়াদেকার স্যারের কাছে গিয়ে আর্জি জানাতে হয়নি আমাকে। সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে একই পজিশনে ব্যাট করে রানও করেছিলাম ধারাবাহিকভাবে। সিরিজ শেষ হয়েছিল ২-২ সমতায়। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড বরাবরই শক্ত প্রতিপক্ষ, ফলটাকে তাই আশ্চর্যজনক বলা যাবে না মোটেই। সিরিজে বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিলাম আমি, আমার

পরিকল্পনাগুলো কাজেও দিয়েছিল সার্থকতার সঙ্গে। যেমন স্টাম্প-টু-স্টাম্প বোলিংয়ের জন্য সুপরিচিত গ্যাভিন লারসেনকে খেলতে  বার কয়েক ডাউন দ্য উইকেটে চলে এসেছিলাম আমি, সে বাধ্য হয়েছিল লেংথে বদল আনতে। এরপর তার শর্ট বলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমি, আর যখনই সে তা করেছে, বলগুলো পত্রপাঠ পাঠিয়ে দিয়েছি স্ট্যান্ডে।

আনন্দের চেয়ে বেশি স্বস্তি। ৭৫তম ম্যাচে এসে ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরি পাওয়ার শচীন টেন্ডুলকার। ছবি: পিটিআই

একটি লক্ষ্য পূরণ হয়ে যাওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি এর পরের লক্ষ্যটা পূরণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম আমি। তখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে সেঞ্চুরির দেখা না পাওয়াতে হতাশ হয়ে পড়ছিলাম আমি, কিছুটা লজ্জাও লাগতে শুরু করেছিল। অবশেষে সত্তরটির বেশি ম্যাচ খেলে ফেলার পরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দেখা পাই আমি। শ্রীলঙ্কায় ১৯৯৪ সিঙ্গার ওয়ার্ল্ড সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেই মুহূর্তটা এলো। অন্য যেকোনো অনুভূতির চেয়ে আমার মনে বেশি কাজ করছিল স্বস্তি। কারণ সেঞ্চুরি পাওয়াটা আমার মনের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল। একবার সেঞ্চুরি পেয়ে গেলে আপনার মনে বিশ্বাস জন্মাবে, আরেকটা পাওয়াও সম্ভব। মন থেকে সংশয়টা চলে যায়, প্রথম সেঞ্চুরি পাওয়াটাই যা একটু ঝামেলার।

প্রথম সেঞ্চুরি নিশ্চিতভাবে আমার স্নায়ুগুলোকে শান্তি দিয়েছিল। এই সেঞ্চুরিটাকে তাই ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলকের স্বীকৃতি দিতেই হচ্ছে।

* শচীন টেন্ডুলকারের আত্মজীবনী 'প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে' থেকে।  অনুবাদ: রিজওয়ান রেহমান সাদিদ।

আরও পড়ুন:

'ওয়ানডের শচীন' হয়ে ওঠার পথে যেভাবে যাত্রা শুরু