শচীন ওয়ানডেতে ধারাবাহিকভাবে রান করতে না পারায় অনেকে বলছিলেন, ব্রায়ান লারার মতো কিছু চেষ্টা করে দেখতে পারেন তিনি। ব্রায়ান লারাও শুরুতে ওপেনার ছিলেন না, টেস্টে তখনো চার নম্বরেই ব্যাট করছেন, কিন্তু ওয়ানডেতে ওপেন করতে শুরু করে দিয়েছেন। রানও করছেন অনেক। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের কথা উঠলে শচীন তো লারার চাইতে কম নন কোনো অংশে। সুতরাং, একই তরিকা অনুসরণ করে সাফল্য পাবেন তিনিও, এমনটাই ভাবা হচ্ছিল।

শচীনের ভাবনাধারাও বইছিল সমান্তরালেই। খুঁজলে অনেক আলোচনারই উদাহরণ পাওয়া যাবে তখন, যেখানে শচীনের ওপেনিংয়ে উঠে আসা আর সবচেয়ে বেশি ওভার ব্যাটিং করার সুযোগ পাওয়া নিয়ে কথা হয়েছে শচীন আর ম্যানেজার (অজিত) ওয়াদেকারের মধ্য। বারংবার এ নিয়ে ছক কাটা হয়েছে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের খাতায়, তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবতার মুখ দেখেনি কোনোবারেই। ইনিংসের শুরুতেই ভারত হারিয়ে ফেলছে শচীনের উইকেট, এমন দৃশ্য কল্পনা করলেই তো শিউরে উঠতেন প্রায় সবাই।

শেষতক সুযোগ পেতে আর্জি জানাতে হয়েছিল শচীনকেই। চার ওয়ানডে আর এক টেস্টের সিরিজ খেলতে '৯৪-এর শুরুতেই নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিল ভারত। নেপিয়ারে প্রথম ওয়ানডে জিতেছিল কিউইরাই। তাই সিরিজ টিকে থাকতে দ্বিতীয় ম্যাচ জিততেই হতো ভারতকে। কিন্তু অকল্যান্ডে দ্বিতীয় ওয়ানডে শুরুর আগেই বিপত্তিতে পড়ে ভারত। ম্যাচের দিন সকালবেলা ভারতীয় ওপেনার নভোজৎ সিং সিধু বিছানা ছাড়েন ঘাড়ব্যথাকে সঙ্গী করে।

শচীনের জীবন বদলে দেওয়া ল্যান্ডে ৪৯ বলে ৮২ রানের সেই ইনিংসে

ওয়াদেকার বলছেন:

সিধুকে আনফিট ঘোষণা করা হলে সত্যিই বিপদে পড়ে যাই আমরা। ইতি-উতি সমাধান খুঁজে ফিরছি তখন, এরই মধ্যে শচীন এসে জানায়, ও ওপেন করবে। আমি উত্তর দিই, ওর উইকেট বিসর্জনে রাজি নই আমরা। ওপেনিংয়ে অভ্যস্ত নয় ও, স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলেছিলাম ওকে। শুনে  ও আমাকে চিন্তা করতে না করে। বলে, 'নতুন বলটা আমি ভালোই সামাল দেব।'

অনেকে ভাবে, ওকে ওপেনিংয়ে পাঠানোর উদ্যোক্তা আমিই ছিলাম, যা আদপে সত্যি নয়। উদ্যোগটা ও-ই নিয়েছিল, অতঃপর আমি গিয়ে অধিনায়কের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মতি জানিয়েছিলাম কেবল। 

ব্যাট করতে নামার আগে শচীন জিজ্ঞাসা করেছিল, 'স্যার, কত রান আশা করছেন আমার ব্যাটে?' আশা মানে, সেঞ্চুরির প্রত্যাশা করছি বলে জানিয়েছিলাম আমি। 'তুমি যেভাবে ব্যাট করো, তাতে অন্য যে কারও চাইতে দ্রুত সেঞ্চুরির দেখা পাবে,' এমন কথাও বলেছিলাম।

অকল্যান্ডে সেদিন সেঞ্চুরিটা অল্পের জন্য ফসকে গিয়েছিল শচীনের হাত থেকে। তবুও সেদিন ওর ৪৯ বলে ৮২ রান এসেছিল অন্য যে কারও চাইতে দ্রুতগতিতে। আর সেদিন যেন শচীন নেমেই ছিল খুনে ব্যাটিংয়ের উদাহরণ গড়তে।  প্রথমে ব্যাট করে দর্শকদের ত্যক্তবিরক্ত করে ছেড়েছিল স্বাগতিকরা। ৪৯.২ ওভার ব্যাট করে তুলেছিল সাকুল্যে ১৪২।

অজয় জাদেজাকে নিয়ে ইনিংস ওপেন করতে নেমে প্রথম তিন-চার ওভার শচীন খেলেছিলেন অপেক্ষার খেলা। কিন্তু যেইমাত্র বুঝে গেলেন, চোখ ধাতস্থ হয়েছে, পা ছন্দের তালে তালে চলতে শুরু করেছে, বলও মাঝ ব্যাট খুঁজে পেতে শুরু করেছে, সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে তাণ্ডব নামিয়েছিলেন।

অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ও কোচ অজিত ওয়াদেকারের সঙ্গে শচীন টেন্ডুলকার। সাদা পোশাক দেখে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, এটা অকল্যান্ডের সেই ম্যাচের ছবি নয়

নিউজিল্যান্ডের ওই দলে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বোলার ছিলেন ড্যানি মরিসন, নেপিয়ারে প্রথম ওয়ানডেতে হ্যাটট্রিকও করেছেন। কিন্তু সেদিন তাঁর ছয় ওভারে এসেছিল ৪৬ রান। টেন্ডুলকার ছয়বার সীমানাছাড়া করেছিলেন তাঁকে, আর প্রতিটি শটেই মিশে ছিল পরিশুদ্ধতার ছাপ। আর শটগুলো দুলকি চালে খেলছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে গায়ের জোরের কমতি ছিল না কোনো অংশে। রেগেমেগে ড্যানি মরিসন বেছে নিয়েছিলেন বাউন্সারের পথ। মরিয়া হয়ে ছোঁড়া সে বাউন্সারের নাগাল টেন্ডুলকার পাবেন, এমন সম্ভাবনাও ছিল না কোনো। টেন্ডুলকারকে ব্যাটে-বলে করতে না দেয়া ছাড়া ওই বাউন্সারের আর কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না অবশ্য।

আরও ছিলেন গ্যাভিন লারসেন। সেই সময়ে কিউই বোলারদের মধ্যে ব্যাটসম্যানের জন্য সবচেয়ে ঝামেলাপূর্ণ বোলার বিবেচিত হতেন তিনিই। সেদিন তাঁর বলে হাঁকানো হয়েছিল দু'টি ছক্কা, প্রথম দুই ওভারেই ২৪ রান দেওয়ার পর তো আক্রমণ থেকেই সরিয়ে নেয়া হয়েছিল তাকে। ক্রিস প্রিঙ্গল, ক্রিস হ্যারিস কিংবা ম্যাথু হার্ট, শচীনের হাত থেকে রেহাই পাননি কেউই।

শচীনের স্কোরিং শটগুলো ছিল এমন:

২, ৪, ৪, ৪, ৪, ৩, ৪, ৪, ৪, ৪, ৬, ৪, ৪, ৬, ৪, ৪, ৪, ৪, ২, ৪, ২, ১

দলীয় ৬১ রানে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরত এসেছিলেন জাদেজা। শচীনের সঙ্গে যোগ দিলেনবিনোদ কাম্বলি। ক্যাপ্টেন আর ম্যানেজার আগেই দুই ব্যাটসম্যাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যেমন করেই হোক, ২৫তম ওভারের মধ্যে দলীয় শতরান পূর্ণ করা চাই। তা হয়ে গেল ১৩তম ওভারেই। শচীন আউট হতে হতে কাম্বলির সঙ্গে জুটিতে তুলে ফেলেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব রান, লক্ষ্যমাত্রা এসে পৌঁছেছে একদম নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্বে।

মাঠের প্রতিটি দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন প্যাভিলিয়নে ফিরতে থাকা টেন্ডুলকারকে, স্বাগতিকদের ইনিংস দেখে মনের কোণে জমা হওয়া সমস্ত একঘেয়েমি যিনি নিমেষে দূর করে দিয়েছেন তাঁর অসাধারণ ব্যাটিংয়ে। 

সেদিনের ম্যাচে শচীনের স্কোরিং শটগুলো ছিল এমন: ২, ৪, ৪, ৪, ৪, ৩, ৪, ৪, ৪, ৪, ৬, ৪, ৪, ৬, ৪, ৪, ৪, ৪, ২, ৪, ২ এবং ১।

নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন রাদারফোর্ড, এমনকি ম্যাচে দায়িত্বরত দুই আম্পায়ার ক্রিস কিং আর ব্রায়ান অলড্রিজও যোগ দিয়েছিলেন দর্শকদের সঙ্গে শচীনকে করতালি-বৃষ্টিতে ভাসাতে।

নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট-আগ্রহী মহলেও এই ইনিংসটি সাড়া ফেলেছিল ব্যাপকভাবে। সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে মাঠ কানায় কানায় ভর্তি হয়ে গিয়েছিল খেলা শুরুর বেশ খানিকক্ষণ আগেই। কারণ, ম্যাচের সূচনাতেই শচীনের ব্যাটে ওঠা ঝড় দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছিলেন না কেউ।

যদিও সিরিজটা সমাপ্ত হয়েছিল ২-২ সমতায়, তবে সিরিজে প্রকৃত জয়টা পেয়েছিল ভারতই। কেননা এ সিরিজ দিয়েই ওপেনার হিসেবে উত্থান ঘটেছিল শচীনের। আর কেমন করে বিশ্বের নাম করা সব বোলারদের আক্রমণে আক্রমণে অস্থির করে হতাশায় ডুবিয়ে দিতে হয়, শচীন তৈরি করেছিলেন তার উদাহরণ।

এভাবেই শচীনের আরও একটি চিন্তা দেখেছিল সাফল্যের সোনালীরেখা। আর তার ক্যারিয়ারে কিংবা ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যতে, এই ইনিংসের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। কেবল ওপেনিংয়ে জায়গা পাকাপোক্ত করাই তো নয়, এই পজিশনে ব্যাটিং কেরেই রেকর্ডসংখ্যক সেঞ্চুরিসহ সুবিশাল সব কীর্তি গড়েছিলেন টেন্ডুলকার। যদিও ২০০২-তে চার নম্বরে ঠেলে দেয়া হয়েছিল তাঁকে, কিন্তু ২০০৩ বিশ্বকাপে একনাগাড়ে কিছু অনবদ্য ইনিংস খেলে শচীন ফের উঠে এসেছিলেন ইনিংসের গৌরচন্দ্রিকা লিখতে।

* বৈভব পুরান্ডারের ‘শচীন টেন্ডুলকার: আ ডেফিনিটিভ বায়োগ্রাফি’ বই থেকে। অনুবাদ করেছেন রিজওয়ান রেহমান সাদিদ।

আরও পড়ুন:

শচীনের মুখে শচীনের ওপেনার হয়ে ওঠার গল্প