সাকিবকে আমি প্রথম দেখি বিকেএসপিতে। তখন বোধ হয় ও  অনূর্ধ্ব-১৭ খেলছে। একদিন ম্যাচে দেখলাম, এক ছেলে তিন উইকেট পেল, সঙ্গে ব্যাটিংটাও বেশ ভালো। এর আগ পর্যন্ত  আমি ওর নাম জানতাম না, সেদিনই প্রথম চিনেছিলাম ওকে। সাকিব আল হাসান।

প্রথম দেখাতেই ওর বোলিংটা মনে ধরেছিল আমার। তবে বিকেএসপিতে প্রথম দিকে ও ব্যাটিং নিয়েই পড়ে থাকত বেশিরভাগ সময়। ব্যাটিংটাই ছিল ওর মূল আকর্ষণ। তাই ওর বোলিংটা বলতে গেলে ধরাই পড়েনি আমাদের চোখে। একদিন অনুশীলনে হঠাৎ করেই আমি ব্যাট করতে নামলাম ওর বোলিংয়ে। ব্যাট করতে গিয়ে দেখি, বল পড়ে বাঁক খেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিকমতো খেলতে পারছি না ওর বল। তখন থেকেই মূলত আমি কিংবা বিকেএসপিতে আরও যারা ছিলেন, সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করি, বোলার হিসেবে ও অনেক দূর যেতে পারবে। এই বিশ্বাস থেকেই ওকে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ভিক্টোরিয়াতে সুযোগ দিয়েছিলাম। আমার তখনকার দল ভিক্টোরিয়াও একজন অলরাউন্ডার খোঁজ করছিল।

সাকিব আল হাসানের সঙ্গে মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন

বোলার সাকিবকে বিশ্লেষণ করতে বললে আমি 'গড গিফটেড’' কথাটাই বলব। এ কারণে গড গিফটেড বলছি যে, ব্যাটসম্যানকে পড়ার ক্ষমতা, ব্যাটসম্যানের মুভমেন্ট কী হতে পারে, ব্যাটসম্যান কোন শট খেলতে পারে, এসব জিনিস আগে থেকেই বুঝতে পারে ও। নিজে ব্যাটসম্যান তো, সেটাও বোধ হয় সাহায্য করে। আর বোলার সাকিবের একটা গুণ যদি বিশেষ করে জানতে চাওয়া হয়, তো ওর উইকেট বুঝতে পারার ক্ষমতাকেই আমি বেছে নেব। কোন উইকেটে কতটুকু পেস দিতে হবে, কোথায় একটু টেনে বল করতে হবে, কোথায় হাওয়ায় ভাসাতে হবে, এই সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো ও খুব ভালো বুঝতে পারে। এই গুণগুলোর সমন্বয়ই ওকে আর দশজন বোলার থেকে আলাদা করে তুলেছে।

নইলে ওর বোলিংটা কিন্তু খুব সিম্পল। ব্যাপারটা ও নিজেও স্বীকার করে। একবার অশ্বিনের বোলিং দেখে ওকে আমি বলতে গিয়েছিলাম, 'ওদের দেখ্, এই দুসরা মারতেছে, আন্ডারকাটার মারতেছে। আর তোর বলে তো কোনো ভ্যারিয়েশনই নাই।' জবাবে ও যা বলেছিল, শুনে আমি একদম চুপ মেরে যেতে বাধ্য হই। ও বলেছিল, 'স্যার, মানছি, আমার ভ্যারিয়েশন নাই। অত কিছুর চেষ্টাও করতে পারি না। তবে আমি যেখানে চাই, যে লেংথে চাই, সেখানেই বল ফেলতে পারি। এ জন্যই আমি নাম্বার ওয়ান বোলার।' আমার চুপ হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না, কারণ বোলারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে সাকিব তখন এক নম্বরেই ছিল।

খেলাটা ভালো পড়তে পারে, সঙ্গে নিজের ওপরে ওর অগাধ বিশ্বাস তো, তাই খুব ভালো করেই জানে, বলটা কোথায় ফেলছে, কোন লেংথে বল করলে ব্যাটসম্যান তা খেলতে গিয়ে সমস্যায় পড়বে। আর বোলার সাকিব কিন্তু খুব নিখুঁত। বোলিংয়ের লেংথে খুব একটা হেরফের হয় না ওর। নিজের খেলাটা বোঝেও ভালো। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের আগেই যেমন, আমাকে ও বলছিল, 'স্যার, বোলিং অ্যাকশনে কিছুটা বদল আনতে হবে মনে হচ্ছে। ওই যে সেবার অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পাঁচ-পাঁচ দশ উইকেট তুললাম, ওই অ্যাকশনেই বেশি রিদম পাচ্ছিলাম মনে হচ্ছে।' এই যে নিজেই নিজের টেকনিকের ভুল-শুদ্ধ নিরূপণ, এর জন্য কিন্তু খেলা নিয়ে বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ভাবা চাই। কীভাবে নিজেকে বোলার হিসেবে আরেকটু শাণিত করা যায়, দিন-রাত তেমন ভাবনায় রত থাকা চাই।

কোচ হিসেবে যে মজাটা আমি পাই, ওকে কোনো কথার পুনরাবৃত্তি করতে হয় না। ধরুন ওকে বোলিংয়ে কোনো জিনিস ঠিক করতে বললেন আপনি, ব্যস, ওই একবারই, এরপরে নিজেই কাজটা ঠিকভাবে করে জানতে চাইবে, 'এরকমই চাইছিলেন তো?'

খেলা নিয়ে সার্বক্ষণিক ভাবনাটাই সম্ভবত ওকে নিয়ে একটা রহস্যের উত্তর দেয়। ওর অনুশীলন নিয়ে কৌতূহল তো সার্বজনীন। এখন অনুশীলনে আগের চাইতে বেশি খুঁজে পাওয়া যায় হয়তো, তবে আগে সত্যিই অনুশীলনে খুব একটা দেখা পেতাম না ওর। একবার ওর মনে হলো, বল ঠিক ডিপ করছে না, সিম পজিশন নিয়ে কাজ করতে হবে। আমার কাছে এলো, আমি দেখিয়ে দিলাম। তো চার-পাঁচটা বল করে আমাকে বলে, 'স্যার, হয়ে গেছে। আমি চলে গেলাম।' ওর অনুশীলন এমনই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে এমন না, ও যদি বুঝে যায়, কাজটা এভাবে করতে হবে, তাহলে ওখানেই অনুশীলন শেষ।

নিজের ভুল-ভ্রান্তি নিজেই বুঝতে পারে, সাকিবকে অনুশীলন করিয়েও তাই শান্তি। কোচ হিসেবে যে মজাটা আমি পাই, ওকে কোনো কথার পুনরাবৃত্তি করতে হয় না। ধরুন, ওকে বোলিংয়ে কোনো জিনিস ঠিক করতে বললেন আপনি, ব্যস, ওই একবারই, এরপরে নিজেই কাজটা ঠিকভাবে করে জানতে চাইবে, 'এরকমই চাইছিলেন তো?'

জনমনে একটা ধারণা জন্মেছে, সাকিবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বোধহয় খুব বেশি অন্তরঙ্গ। আমরা খুব বেশি কথা বলি, আমাদের প্রতিদিনই যোগাযোগ হয়। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়, আমাদের কথাবার্তা হয় খুবই কম। তবে দুজনের মধ্যেকার বোঝাপড়াটা চমৎকার বলে আমি একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বললেও, ও বুঝতে পারে, আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি। 

তাৎক্ষণিকভাবে একটি উদাহরণ মনে পড়ছে। ও তখন সিপিএল খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজে। এক ম্যাচে বোলিংটা খুব বাজে হলো ওর। ম্যাচের পর ফোন দিয়ে আমি শুধু একটা কথাই বলেছিলাম ওকে, 'স্টাম্পের এত কাছ থেকে তোকে কখনো বল করতে দেখি নাই আমি।' কথা এতটুকুই, বোলিং খারাপ করেছে কী ভালো, এ নিয়ে কোনো কথাই হয়নি আমাদের। তবে ও ঠিকই বুঝে নিয়েছিল, আমি কী বুঝিয়েছি। পরের ম্যাচেই নিজের স্বাভাবিক অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য স্টাম্পস অ্যাকশনে ফেরত গেল ও। আর সেদিনই ওই ৬ রানে ৬ উইকেটের ইতিহাস। আমার সঙ্গে কথা বলার পরদিনই৷ এমন রেকর্ড, ঘটনাটা কাকতালীয়ই হবে সম্ভবত। তবে আমার ধারণা, কী করতে হবে, কী সংশোধন আনতে হবে, এই ব্যাপারগুলো খুব দ্রুত বুঝে ফেলতে পারে ও।

'সাকিবকে বোলিং নিয়ে কিছু বললে ও খুব দ্রুত তা বুঝে ফেলে'

আরও একটা ঘটনা মনে পড়ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার এই গল্পটা শুভ্রদাকে আমি এর আগেও বলেছিলাম। এক টেস্টে প্রথম দিন ২৫ ওভার বল করেও কোনো উইকেট পায়নি সাকিব। তো টিম বাসে করে হোটেলে ফেরার সময় আমি বললাম, 'যে গতিতে বল করতেছিস, এই পেসে এই উইকেটে বল করলে হবে না একটু ফ্লাইট দিতে হবে।' কিন্তু আমার সাথে ও তাৎক্ষণিকভাবে একমত হলো না। পরদিন আমি টিম বাসে বব উলমারের একটা বই পড়তে শুরু করলাম।  আমার পাশের সিটে বসে ও আমাকে জিজ্ঞাসা করল, 'স্যার, কী পড়েন?' আমি বললাম, ‘স্পিন বোলিংয়ে ফ্লাইট দেওয়া নিয়ে পড়ছি।’ এর বাইরে কোনো কথাই হলো না। খেলা শুরু হওয়ার পর দেখি, ওর বোলিংয়ে অনেক পরিবর্তন। অনেক ফ্লাইট দিচ্ছে। ইনিংস শেষ করল ৫ উইকেট নিয়ে।

ওর চরিত্রটাই এমন। কেউ ওকে কিছু বলল, আর অন্ধভাবে ও সেটা বিশ্বাস করে নিল, এমন ছেলে ও নয়। ও জিনিসটা নিয়ে ভাববে, ভেবে যদি মনে হয়, হ্যাঁ, কথাটা মানা যায়, তখনই কেবল মানবে। ওই যে আমি কথাটা বলেছিলাম, অন্য কেউ তা বললে ও হয়তো কিছুই বলত না, তবে আমার সঙ্গে সাথে সাথেই দ্বিমত জানিয়েছিল। আমাদের সম্পর্কের গভীরতাও বোধহয় বুঝে নেয়া যায় এই উদাহরণ থেকে।

সে অর্থে কোনো বোলারকেই সাকিব সেভাবে অনুসরণ করে না। তবে সব বোলারের অ্যাকশনই বুঝতে চেষ্টা করে, বৈচিত্র্যগুলো ধরতে চেষ্টা করে। ও নিজেই আমাকে বলেছিল, 'আমরা চাইলেই অশ্বিন কিংবা মুরালি হতে পারব না। আমাদের শারীরিক গঠন কিংবা অ্যাকশন সেসব করতেও দেবে না। আমরা তাই কীভাবে আরেকটু অ্যাকুরেট হতে পারব, কীভাবে ফ্লাইটে বৈচিত্র্য আনতে পারব, সেসব সাধারণ বিষয়গুলো নিয়েই কেবল কাজ করতে পারি।' 

এই সাধারণ বিষয়গুলো অনুসরণ করেই সাকিব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য পাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ভাবতে গিয়ে নিজেই বিস্মিত হয়ে যাই, এরকম একটা সিম্পল অ্যাকশন নিয়ে কীভাবে এত বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাপটের সঙ্গে টিকে আছে ও! আর শুধু এক ফরম্যাট তো নয়, সব ফরম্যাটেই, এমনকি আইপিএলেও। প্রতিনিয়ত খেলায় বদল আসছে, নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে, চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে বছরের পর বছর, তবুও সহজ-সরল এক বোলিং অ্যাকশন দিয়ে সাকিব টিকে আছে ভালোভাবেই।

খেলাটা সম্পর্কে খুব ভালো রকমের আন্ডারস্ট্যান্ডিং না থাকলে যা কখনোই সম্ভব হতো না।