সাকিবের অনেক কিছুই অন্যদের সঙ্গে ব্যতিক্রম। ব্যাটিংটাও তাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ব্যাটসম্যান সাকিবকে আর সবার চাইতে আলাদা করে দিয়েছে ওর স্বকীয়তা, ওর নিজস্বতা। ওর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাও এটি। ও কিন্তু প্রথাগত ব্যাটসম্যানদের মতো ব্যাট করে না, বরং ওর টেকনিকে কিছুটা ভিন্নতা আছে অন্যদের চেয়ে। আমরা যাকে ক্রিকেট ব্যাকরণ বলে আখ্যায়িত করি, অনেক ক্ষেত্রেই তার সঙ্গে মেলে না ওর ব্যাটিংটা।

এটা বোধ হয় খুব বড় একটা ব্যাপার যে, সাকিবের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই যে সমস্ত কোচ সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তারা কেউই সাকিবের এই টেকনিকে বদল আনার চেষ্টা করেননি। কেননা, বাংলাদেশে যেটা হয়ে থাকে, কেউ প্রথাগত টেকনিকের বাইরে চলে গেলেই আমরা চেষ্টা করি তাকে বদলে ফেলার জন্য। ব্যাকরণ যা বলছে, সেভাবেই সবাইকে গড়ে তোলার চেষ্টা থাকে আমাদের। সাকিবের ক্ষেত্রে তা হয়নি, এই ক্ষেত্রে সাকিবকে তাই ভাগ্যবান বলতেই হচ্ছে।

আর এই নিজস্বতার কারণেই ও ছোটবেলা থেকে যেভাবে খেলাটাকে শিখেছে, বিশেষত ব্যাটিংটাকে যেভাবে শিখেছে, কিংবা ব্যাটিংয়ের সঙ্গে ওর মননের যে সংযোগ ঘটেছে, সেখানটায় কোনো রদবদল আনতে হয়নি। একইভাবে ও ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত খেলে যাচ্ছে। যে কারণে ওর চিন্তা আর ব্যাটিংয়ের যে সমন্বয়, সেখানটায় কখনো গোল বাঁধেনি। এটাও তাই একটা বড় শক্তির জায়গা।

আরেকটা ব্যাপার, সাকিব মানসিকভাবে খুব ইতিবাচক। জিততে চায় সবসময়, আর জেতার জন্য খুব ভালো হিসেব-নিকেশও করতে পারে। খেলায় ওকে এ ব্যাপারগুলোও খুব সাহায্য করে থাকবে সম্ভবত। সাকিব ব্যর্থ হয়েছে, খুঁজলে এমন উদাহরণও তাই খুব বেশি একটা পাওয়া যাবে না। 

গুরু-শিষ্য: নাজমুল আবেদীন ফাহিমের সঙ্গে সাকিব আল হাসান

সাকিবকে আমি প্রথম যখন দেখি, অনূর্ধ্ব-১৫ কিংবা অনূর্ধ্ব-১৬ দলে, তখন তামিম-মুশফিকও ছিল ওর সাথে৷ প্রথম ম্যাচেই খুব ভালো রান করেছিল ও। এবং ওর ব্যাটিংয়েই আমরা ম্যাচটা জিতেছিলাম। আর তারপর থেকে খুব কম সংখ্যক ম্যাচই আমি দেখেছি, যেখানে ও রান করেনি। হ্যাঁ,হয়তোবা এক-দুই ম্যাচে রান করেনি, তবে কখনোই একদম 'আউট অব দ্য ফর্ম' হয়ে যায়নি। বহু বছরের মধ্যে গত বছরের বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টিতে যা একটু দেখতে পেলাম, ও একটানা বেশ কিছু ম্যাচে রান করতে পারেনি। এছাড়া ওকে খুব বেশি ব্যর্থ হতে দেখিনি আমি।

যে কারণে আমার জন্যে ওর সেরা ইনিংস নির্বাচনের কাজটাও বেশ দুরূহ। আমার চোখে সেরা ইনিংস হতে গেলে সেটি যে রানসংখ্যার বিচারেই বড় হতে হবে, এমন নয়, বরং কোন পরিস্থিতিতে ইনিংসটা খেলা হচ্ছে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ মানতে হবে। এমন তো অনেকবারই হয়েছে, দল খুব বাজে শুরু করেছে, 'গেল, গেল' রব উঠেছে, পরে সাকিব এসে হাল ধরেছে, বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছে কিংবা জিতিয়েছে। হয়তোবা সেসব ইনিংসে ৩০-৪০ রানের বেশি করেনি ও, কিন্তু পর্বতপ্রমাণ চাপের মুখে খেলা ওই ইনিংসগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় কোথায়!

আমার ধারণা, নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে কোনোকালেই কোনো রকম আপস না করার গুণটা ওর ক্ষেত্রে ঈশ্বরপ্রদত্ত। প্রতিনিয়ত নিজের উন্নতি সাধনে কাজ করে যাচ্ছে ও। যখনই বাইরে থেকে কোনো সুযোগ এসেছে, কাউন্টি বা অন্য কোথাও ক্রিকেটে খেলার প্রস্তাব এসেছে, লুফে নিয়েছে। উন্নতির জায়গা খুঁজতে চেয়েছে। আর বিশেষ করে বলতে হয় আইপিএলের কথা। আইপিএল ওর খেলা দেখার চোখটাকে অনেক বেশি বিস্তৃত করেছে, খেলোয়াড় সাকিবকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, আইপিএল মানে কেবলই টাকার ঝনঝনানি, তবে আইপিএল কিন্তু শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারদের মিলনমেলাও। তাবৎ দুনিয়ার সেরা সেরা খেলোয়াড়েরা জড়ো হন সেখানে। তারা কীভাবে ভাবেন, চিন্তা করেন, তাদের খেলার ধরন কেমন, তা কিন্তু বেশ কাছ থেকে বুঝতে পারা যায় ওখানে। তাই আইপিএলে গিয়ে ও কিন্তু ধারণাগুলো পেয়ে যায় ভালোভাবেই, দেশে এসে বাকিদের সঙ্গে ভাগাভাগিও করে নিতে পারে সেগুলো। আবার বাকি বিশ্বের ক্রিকেটারদের মধ্যে ও কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কোথায় পৌঁছুতে হবে, মোট কথা, নিজেকে মূল্যায়ন করাও ওর জন্য সহজ হয়ে যায় তখন। নিজেকে খুব উঁচুতে নিয়ে যেতে আত্মসমালোচনাটা কিন্তু খুব জরুরি। এখানেই বোধহয় আর দশজন ক্রিকেটারের সঙ্গে সাকিবের তফাৎটা দাঁড়িয়ে যায়।

আর গত বিশ্বকাপে আমরা দেখেছি, সাকিব তার ফর্মের চূড়ায় ছিল। এখানেও খুব সম্ভবত আইপিএলের একটা অবদান আছে। আমার ধারণা, ২০১৯ আইপিএলে খুব বেশি সংখ্যক ম্যাচ খেলতে না পারার ব্যাপারটা ওর ভেতরে কাজ করছিল। এটাই বোধহয় ওকে বাড়তি কিছু করে দেখাবার তাগাদা দিয়েছিল। সুযোগ দেওয়া না হলে ও তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ করবে না হয়তো, কিন্তু ও এমন কিছু একটা করে দেখাতে চাইবে, যার জন্য আপনি ওর দিকে নজর দিতে বাধ্যই হবেন। সেই কাজটাই ও করেছে, গত বিশ্বকাপে।

অনমনীয় মানসিকতা, নিজেকে যেখানে দেখতে চায়, তার সঙ্গে কোনো আপসে না যাওয়া, এটা বোধহয় সাকিবের সবচেয়ে বড় গুণ। শুধু ক্রিকেটের কথাই বলছি না, যেকোনো পেশাতেই নিজেকে সেরা হিসেবে দেখতে চাইলে এই গুণটা থাকতেই হবে। 

দীর্ঘ এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সাকিব আবার যখন ফেরত এলো, গত বছরের প্রস্তাবিত শ্রীলঙ্কা সফরের ঠিক আগে আগে, তখন অনেকদিন পর ওকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। বিকেএসপিতে এক মাস নিবিড় অনুশীলন করেছিলাম আমরা। তখন শুধু সাকিবের ব্যাটিং-বোলিংটাই পর্যবেক্ষণ করিনি আমি, ওর মানসিক অবস্থাও বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম আরেকবার। ওর মধ্যে এ বয়সেও খেলাটার প্রতি যে পরিমাণ আগ্রহ আছে, খেলাটার জন্য যতটা পরিশ্রম করার ইচ্ছে আছে, তা অভাবনীয়। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ওর সুতীব্র আগ্রহটা সেখানেই টের পেয়েছি আমি। ফিটনেস ট্রেনিং বলুন কিংবা স্কিল ট্রেনিং, একটা মাস শুধুমাত্র টেস্ট ক্রিকেটকে মাথায় রেখেই কাজ করেছে ও। এমনও হয়েছে, সারাদিন অনুশীলন মাঠে কাটিয়েছে সাকিব। উদ্দেশ্য একটাই, টেস্ট খেলতে গিয়ে ওকে যদি একটানা দেড় দিন কিংবা দু'দিনও মাঠে থাকতে হয়, তা-ও যেন ও থাকতে পারে। এই যে এই অনমনীয় মানসিকতা, নিজেকে যেখানে দেখতে চায়, তার সঙ্গে কোনো আপসে না যাওয়া, এটা বোধহয় সাকিবের সবচেয়ে বড় গুণ। শুধু ক্রিকেটের কথাই বলছি না, যেকোনো পেশাতেই নিজেকে সেরা হিসেবে দেখতে চাইলে এই গুণটা থাকতেই হবে। 

অনেককেই বলতে শুনি, 'সাকিবের এমনিতেই সব হয়'। আদপে ব্যাপারটি কিন্তু মোটেও তেমন কিছু নয়। হয়তোবা ও মাঠে অনুশীলন করছে না, কিন্তু ওর মননে-চিন্তায় খেলা নিয়েই ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে তখন। এই ভাবনা-চিন্তাগুলোই ওর সঙ্গে অন্য খেলোয়াড়দের পার্থক্য গড়ে দেয়। অন্য যেকোনো সফল স্পোর্টসম্যান, এমনকি অন্য পেশার সফল ব্যক্তিত্বরাও খুব সম্ভবত এমনি করে ভাবে। আর এই মানসিকতার জন্যেই তারা আর সবার চাইতে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে।