ফ্লাডলাইটের আলোয় ভাসতে থাকা কিংসমিড স্টেডিয়ামে কানাডিয়ানরা যখন ল্যাপ অব অনার দিচ্ছে, বিস্ময়করভাবে এই ম্যাচ দেখতেও ভিড় জমানো প্রায় ১১ হাজার দর্শক তুমুল করতালিতে মুখরিত করে তুলল চারপাশ। সেই করতালি, যা শুধু আন্ডারডগদের জন্যই বরাদ্দ থাকে। ১৯৯৯ সালের ৩১ মে নর্দাম্পটনে যে করতালি পেয়েছিল বাংলাদেশ! 

ওই ১১ হাজার দর্শকের মধ্যে শুধু জনা পঞ্চাশেক তখন নিঃশব্দে স্টেডিয়াম ছাড়ছেন। মুখে রাজ্যের আঁধার, উদগত অশ্রু সামলানোর চেষ্টা করছেন অনেকে। ওরা ডারবানে বসত গাড়া প্রবাসী বাংলাদেশী, যাদের অনেকে কাজ থেকে ছুটি না পাওয়ার পরও চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন মাঠে। হাতে জাতীয় পতাকা, মাঠে ঢোকার সময় তাদের কল্পনাতেও ছিল না যে, ফেরার সময় সেটি লুকোনোর চেষ্টা করতে হবে!

পরদিন ঈদের আনন্দে বাড়তি ঔজ্জ্বল্য যোগ করার কথা ছিল যে ম্যাচটির, সেটিই বাংলাদেশের মানুষের ঈদকে পরিণত করল নিরানন্দ আনুষ্ঠানিকতায়। 

’৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই অবিস্মরণীয় জয়ের পর বাংলাদেশ আর কোনো ওয়ানডে জেতেনি। ২০০৩ বিশ্বকাপের ফিকশ্চার চূড়ান্ত হলো যেদিন, সেদিনই সবাই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল সেই জয়-খরার অবসান ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচেই। প্রতিপক্ষ কানাডা, ১৯৭৯ বিশ্বকাপের পর থেকে যাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে কোনো সংশ্রব নেই। যে দেশে ক্রিকেট ততটাই জনপ্রিয়, বাংলাদেশে যতটা রাগবি। অথচ কানাডা, সেই কানাডাই যে ১১ মার্চ বাংলাদেশের জয়োৎসবে মেতে ওঠার কথা সে দিনটিকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ‘কালো দিন’ বানিয়ে দিল!

পরদিন ঈদের আনন্দে বাড়তি ঔজ্জ্বল্য যোগ করার কথা ছিল যে ম্যাচটির, সেটিই বাংলাদেশের মানুষের ঈদকে পরিণত করল নিরানন্দ আনুষ্ঠানিকতায়। ডারবানে সেই আনুষ্ঠানিকতাটুকুও হয়নি। আগের দিনই ঠিক করা ছিল, হোটেলের কাছেই এক মসজিদে ঈদের নামাজ পড়বে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা। কিন্তু ডোপ টেস্টের আনুষ্ঠানিকতা সেরে রাত সাড়ে ১২টায় হোটেলে ফেরার সময় ‘ঈদ’ ছিল না খেলোয়াড়দের কারোর মনেই। পরদিন সকালে অনেক দিনের অভ্যাসের টানে দু-তিনজন শরীরটাকে কোনো রকমে টানতে টানতে নিয়ে গেছেন মসজিদ পর্যন্ত, ঈদের নামাজ পড়েই সরাসরি রুমে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগের সূচি অনুযায়ী ১২ মার্চ মানে ঈদের দিন বাংলাদেশ দলের ডারবানেই থাকার কথা ছিল। এই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি থেকে পালানোর জন্যই কি না, সেদিনই সকাল ১১টায় পিটার মারিজবার্গের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল বাংলাদেশ দলের বাস। নিষ্প্রাণ পুতুলের মতো একে একে বাসে উঠলেন খেলোয়াড়দের সবাই। ওঠার আগে অধিনায়ক খালেদ মাসুদ তার স্বভাবসুলভ ইতিবাচক ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি ওদের (সহ- খেলোয়াড়দের) বলেছি, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। বাকি পাঁচটি ম্যাচে আমাদের এমন কিছু করতে হবে যাতে এই পরাজয়ের স্মৃতিকে চাপা দেওয়া যায়।’ বললেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের দেখে মনে কোনো আশা জাগল না। হতভম্ব, বিভ্রান্ত একটা দল! ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছুক্ষণ যেমন চোখেমুখে তার একটা রেশ থেকে যায়, মুখগুলো দেখাল ঠিক সে রকম। আগের রাতের দুঃস্বপ্ন তখনো তাড়া করে ফিরছে তাদের। একটু আগেই হান্নান সরকার বলেছেন, ‘আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে, এই ম্যাচটি এখনো হয়নি।’

১৯৯৯ সালের ৩১ মে যদি এক সুখস্বপ্ন হয়, তাহলে ২০০৩-এর ১১ ফেব্রুয়ারি হয়ে থাকবে ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্নের সমার্থক। এতটাই যে, বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘আর আছি! বিষ থাকলে বিষ দাও!’ 

ঈদের দিন বাংলাদেশ দলকে নিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশীদের অনেক কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। অথচ বাংলাদেশ দল যখন ডারবানের হোটেল ছাড়ছে, তাদের বিদায় জানাতে তাদের কেউই নেই। এমনকি একই হোটেলে থাকার পরও বোর্ড প্রেসিডেন্ট আলী আসগার লবী পর্যন্ত নেমে আসার উৎসাহ পাননি। 

বাংলাদেশ দলের রওনা হওয়ার একটু আগেই হোটেল থেকে চেক আউট করে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছেন বোর্ডের অন্যতম পরিচালক ও ক্রিকেট কমিটির প্রধান মাহবুুবুল আনাম। তার চোখেমুখে তখনো অবিশ্বাস, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না কয়েকদিন আগে যে দল ২৫১ রান চেজ করে এখানেই জিতল (কাওয়াজুলু-নাটালের বিপক্ষে), তারা কীভাবে ১৮০ চেজ করতে পারল না!’ কেন পারল না তার মূল কারণটাও বললেন নিজেই, ‘মনে হলো আমাদের ব্যাটসম্যানদের সবাই কানাডাকে উড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই নেমেছিল।’

এর আগে সকালে টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বোর্ড কর্মকর্তাদের রুদ্ধদ্বার এক মিটিং হয়েছে। সেখানে বোর্ড প্রেসিডেন্ট পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, শুধু বোর্ডই খেলোয়াড়দের দিয়ে যাবে আর বিনিময়ে তারা এমন পারফরম্যান্স করবে— এটা আর মেনে নেওয়া হবে না। এই হুঁশিয়ারিতে কতটা কাজ হবে, সেটি জানতে অপেক্ষা করতেই হচ্ছে। 

তবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ’৯৯-এর ৩১ মে যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক সুখস্বপ্ন হয়, তাহলে ২০০৩-এর ১১ ফেব্রুয়ারি হয়ে থাকবে ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্নের সমার্থক। এতটাই যে, খেলা দেখতে আসা বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘আর আছি! বিষ থাকলে বিষ দাও!’ 

বাংলাদেশ দল ডারবান ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই এখানে এসে পৌঁছালেন সিসিডিএম’র দুই কর্মকর্তা আলী হোসেন ও গোলাম ফারুক ফটিক। ঢাকা থেকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য ফুল স্লিভ জার্সি নিয়ে এসেছেন তাঁরা। দুবাই বিমানবন্দরে শুনেছেন অকল্পনীয় এই খবর। শুনে বিশ্বাস করতে পারেননি। ডারবানে পৌঁছে বাংলাদেশের দুই সাংবাদিকের কাছ থেকে সেই দুঃস্বপ্নের বিস্তারিত শুনে ঠিক পাশেই গর্জনরত আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘ইচ্ছে করছে, জার্সিগুলো ওই সাগরে ফেলে দিই!’ 

 ১১ ফেব্রুয়ারি রাতটিকেও যদি এমন সাগরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যেত!

আরও পড়ুন: যেভাবে রচিত হলো দুঃস্বপ্ন