এমনিতে তাদের মধ্যে কোনো মিল নেই। একজন বাঁহাতি স্পিনার, একজন মিডিয়াম পেসার, আরেকজন উইকেটকিপার। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তিনজনই এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশের ৪টি জয়েরই প্রত্যক্ষ সাক্ষী তাঁরা তিনজন। মোহাম্মদ রফিক, খালেদ মাহমুদ ও খালেদ মাসুদ। ’৯৮ সালে ভারতের হায়দরাবাদে কেনিয়ার বিপক্ষে প্রথম, এরপর ’৯৯ বিশ্বকাপে এডিনবরায় স্কটল্যান্ড ও নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় জয়ের স্মৃতি রোমন্থন করেই এতদিন দিন কাটছিল এই তিন জনের। শুধু মনে মনে রোমন্থন করলেই চলছিল না, জয়ের অভিজ্ঞতাবর্জিত দলের বাকি খেলোয়াড়দের (শাহরিয়ার হোসেন আর মঞ্জুরুল ইসলাম ব্যতিক্রম, এই দুজন ছিলেন ’৯৯ বিশ্বকাপে) অবিস্মরণীয় সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনাতেই হচ্ছিল। সেই ‘দায়িত্ব’ থেকে এতদিনে মুক্তি পেলেন তাঁরা!

গত পরশু সকালে বাংলাদেশ দল যখন মাঠে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, মোহাম্মদ আশরাফুল খালেদ মাহমুদকে বলেছিলেন, ‘চাচা, বাংলাদেশের চতুর্থ জয়েই আপনি থাকছেন। দেখবেন, আজই আমরা চতুর্থ জয়টি পেয়ে যাব।’ আশরাফুলের জ্যোতিষ বিদ্যায় দখল দেখে অবাক হচ্ছেন? না, জ্যোতিষ বিদ্যার কোনো মাহাত্ম্য প্রকাশ করছে না তা। আশরাফুল নিজেই বললেন, ‘আমার মনে হয়েছে, তা-ই বলেছি। ভেবে চিন্তে বলিনি।’

আশরাফুলের সেই মনে হওয়াটাই ঠিক হলো। বাংলাদেশের চতুর্থ জয়েরও অংশ হয়ে গেলেন খালেদ মাহমুদ। খালেদ মাসুদ ও মোহাম্মদ রফিকও। কেনিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের নায়ক ছিলেন মোহাম্মদ রফিক। ৫৬ রানে ৩ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাটিংয়ে ওপেন করতে নেমে ৭৭ রান, ম্যান অব দ্য ম্যাচও তিনি। তবে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে একাদশে ছিলেন না, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে খেলার পর বাদ পড়েছিলেন, ফিরেছেন পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় জয়টিও সেই ম্যাচেই। প্রথম জয় এমনিতেই অন্যরকম, তার ওপর সেই জয়ের নায়ক তিনি। হায়দরাবাদ তাই মোহাম্মদ রফিকের কাছে একটা অন্য ব্যাপার হয়েই থাকবে। সর্বশেষ জয়টিও তাই, ‘টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর এটি আমাদের প্রথম জয়। এই জয়টি তাই খুব বেশি জরুরি হয়ে পড়েছিল। ম্যাচের পর ম্যাচ হারতে হারতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা। এই জয় আমাদের নতুন করে উজ্জীবিত করবে।’

খালেদ মাহমুদ এ দিক থেকে ভাগ্যবান। ’৯৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে অভিষেকের চার মাস পর ক্যারিয়ারের চতুর্থ ম্যাচেই বাংলাদেশকে জিততে দেখেছেন।

খালেদ মাসুদ অবশ্য ৪টি জয়ের মধ্যে কোনোটিকে আলাদা করে দেখতে চান না, ‘প্রতিটি জয়ই আসলে মধুর, তা সেটি ক্লাব ক্রিকেটেই হোক বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই হোক। একটি জয়ের সঙ্গে অন্যটির তুলনা চলে না।’ ৪টি জয়ই হৃদয়ের মণিকোঠায় সযত্নে সাজিয়ে রেখেছেন খালেদ মাসুদ, অন্যদের চেয়ে একটু বেশি যত্ন করেই রেখেছেন। কারণ বাংলাদেশের এই দলে পরাজয়ের কাঁটা তাঁকেই তো ক্ষতবিক্ষত করেছে বেশি। বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৭০টি ম্যাচ খেলেছেন, এটি গৌরবের দিক। তবে এই গৌরবের উল্টো পিঠ হলো, সবচেয়ে বেশি, ৬৬টি ম্যাচে পরাজয়ের যন্ত্রনাই সইতে হয়েছে তাঁকে।

খালেদ মাহমুদ এ দিক থেকে ভাগ্যবান। একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয়ের স্বাদ পেতে তাঁকেই অপেক্ষা করতে হয়েছে সবচেয়ে কম সময়। ’৯৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে আন্তর্জাতিক অভিষেক, চার মাস পর ক্যারিয়ারের চতুর্থ ম্যাচেই বাংলাদেশকে জিততে দেখেন খালেদ মাহমুদ। শুধু ‘দেখেন’ লিখলে ভুল হয়, স্টিভ টিকোলো আর রবিন্দু শাহর উইকেট নিয়ে কেনিয়ার বিপক্ষে সেই জয়ে ভালোই ভূমিকা ছিল তাঁর। এক হিসেবে টানা পরাজয়ের বেদনাটা খালেদ মাহমুদকেই বেশি ছুঁয়ে যাওয়ার কথা। ক্যারিয়ারের প্রথম ১৬ ম্যাচের মধ্যেই যাঁর ৩টি জয়ের স্বাদ পাওয়া হয়ে গিয়েছিল, চতুর্থ জয়টির জন্য আরো ৩৮ ম্যাচ অপেক্ষা করতে হওয়াটা তাঁর কাছে দুঃসহ মনে হওয়ারই কথা। দলে নিয়মিত ছিলেন না বলে ম্যাচের সংখ্যাটা কম হয়েছে, সময়ের হিসেবটা অপেক্ষার ব্যাপারটি আরো ভালো বোঝাতে পারবে। ক্যারিয়ারের প্রথম ১৭ মাসের মধ্যেই ওই ৩টি জয়, পরের জয়টির জন্য অপেক্ষা পৌনে পাঁচ বছর!

হারারেতে এই জয়-খরার অবসান হওয়ার আগে খালেদ মাহমুদের বীরত্বই পুণরাবৃত্ত হতো বারবার। ব্যাটিংয়ে ২৭ রান করার পর বোলিংয়ে ৩১ রানে ৩ উইকেট, পাকিস্তানের বিপক্ষে ওই জয়ের নায়ক তো তিনিই। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এর আগের জয়টিতে ব্যাটিংয়ে শূন্য, তবে বোলিংয়ে ২৭ রানে ২ উইকেট নিয়ে ভালোই পুষিয়ে দিয়েছিলেন সেই ব্যর্থতা। শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার কারণেই নয়, খালেদ মাহমুদের কাছে চতুর্থ জয়টির মাহাত্ম্য অন্যরকম, ‘প্রথম জয় তো অন্য ব্যাপার, বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে জেতাটাও আমাদের সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় আমাদেরকে টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে সাহায্য করেছে। তবে যেভাবে আমরা হেরেই চলছিলাম, তা মনে রাখলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই জয়টিকেই এগিয়ে রাখতে হবে। পুরো দলের আত্মবিশ্বাসটা ফিরিয়ে দিয়েছে এই জয়।’

বাংলাদেশের ৪টি জয়েই ছিলেন তারা তিন জন। থাকতে চান পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম....আরও অনেক জয়েও। পঞ্চমটির জন্য আরো পৌনে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে না বলেই তাঁদের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের একটাই উৎস-জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই জয়।

পাঁচ বছর ও ৪৭ ম্যাচ পর সেই জয়-১

পাঁচ বছর ও ৪৭ ম্যাচ পর সেই জয়-২