সেঞ্চুরিটা করার পর মোহাম্মদ আশরাফুল যা করলেন, তাঁর পেছনে একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে। প্রায় চার বছর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেকে ওই ইতিহাস-গড়া সেঞ্চুরিটির পর থেকেই যে একটা প্রশ্ন শুনে আসতে হচ্ছিল তাকে।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ারও আগে, সেই ১৯৯৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মেহরাব হোসেনের সেঞ্চুরিটিই কালকের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র ওয়ানডে সেঞ্চুরি হয়ে ছিল। আশরাফুলকে এ নিয়ে প্রায়ই কথা বলতে হতো। বছরখানেক আগে একবার তিনি বলেই ফেললেন, ‘ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটা আমিই করব।’

সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারার আনন্দেই আশরাফুলের ভেসে যাওয়া স্বাভাবিক। তাঁর ওপর এই সেঞ্চুরি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং বাংলাদেশ তখন জয়ের পথে। আশরাফুলের উচ্ছ্বাসটা তো অমন বাঁধনছাড়াই হবে। পরের বলেই আউট হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য আশরাফুলের মনে হয়েছে, আর একটু পরিমিতি বোধের পরিচয় দিলেই হয়তো ভালো হতো। ‘জয়ের সময় আমি মাঠে থাকতে চেয়েছিলাম। তা পারলে আমার আরও খুশি লাগত—ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার হাতে নিয়ে বললেন আশরাফুল।

ওয়ানডেতে সেঞ্চুরির স্বপ্নই শুধু দেখেননি, তা করার ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছিলেন। তবে কাল মাঠে নামার সময় সেঞ্চুরির কথা ভাবার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না তাঁর। টেস্ট সিরিজে রান পাননি, আগের ম্যাচে আউট হয়ে গেছেন প্রথম বলেই। নেমেই ব্র্যাড হগের বলটা যেভাবে খেললেন, সেটিই বুঝিয়ে দিয়েছিল, কেমন পাহাড়প্রমাণ চাপ মাথায় নিয়ে নেমেছেন তিনি। আশরাফুলও স্বীকার করছেন তা এবং জানাচ্ছেন, ১৫-২০ রান হয়ে যাওয়ার পর প্রথম তাঁর মনে হতে থাকে, এ দিনটি হয়তো তাঁরই।কার্ডিফে বিশ্ব কাঁপানো সেই সেঞ্চুরির পর মোহাম্মদ আশরাফুল

শুধু কাল মাঠে নামার সময়ই নয়, টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরির পর থেকেই পাহাড়প্রমাণ চাপ নিয়ে পথ চলতে হয়েছে তাকে। একেকটা এমন ইনিংস খেলার পর সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন ভারমুক্তির আনন্দটাই। কালই যেমন বললেন, ‘প্রতি ম্যাচেই ব্যাট করতে নামার সময় টেলিভিশনে যখন আমার রেকর্ডটা দেখাত, আমি নিজেই লজ্জা পেতাম। আমি কি এতই খারাপ খেলি! আজও নামার সময় মনে হচ্ছিল ৪৯ ম্যাচে আমার মাত্র ৭৮৯ রান!’

আগের দিন মায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে। মা জিজ্ঞেস করেছেন, ‘কেমন আছিস?’ আশরাফুল জবাব দিয়েছেন, ‘ভালো নেই। রান করতে পারছি না’। মা ক্রিকেট তেমন বোঝেন না। হয়তো সান্ত্বনা দিতেই তিনি বলেছেন, ‘তুই কীভাবে পারবি? তুই তো ছোট, তোর বিপক্ষে যারা খেলছে তারা সবাই অনেক বড়।’

আশরাফুল খুব হেসেছেন, তাঁরপর রান করতে না পারার দুঃখ নিয়ে অসহায়ের মতো বলেছেন, ‘আসলেই ওরা বড়। একেবারে কাছ থেকে মুখের ওপর এমনভাবে বল তোলে যে, খেলতে খুব সমস্যা হয়।’মা সামনে থেকে বল তোলা আর একেবারে শর্টপিচ বলের পার্থক্য বোঝেন না। চিরন্তন মা হয়ে তিনি তাই বললেন, ‘মন খারাপ করিস না। দেখিস, তুই ঠিকই রান করবি।’

আশরাফুল রান করেছেন। এমনভাবেই করেছেন যে, রিকি পন্টিং কণ্ঠে মুগ্ধতা নিয়ে বলছেন, ‘এই উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০০ বলে ১০০ রান! এটাই তো বলে দিচ্ছে সব। অসাধারণ এক ইনিংস।’আশরাফুলের ওপর ডেভ হোয়াটমোরের একটু ক্ষোভ আছে। সেঞ্চুরির পরও তা গোপন করলেন না তিনি, ‘এই ছেলে আবার জগতকে দেখাল, ও কী করতে পারে! ও এমন এক প্রতিভা যে, ওকে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসতে দেখাটা খুব হতাশার। আমি আশা করি, এই ইনিংসের পর ওর ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা আসবে।’

আশরাফুলের সামনে এই ধারাবাহিকতা-টারাবাহিকতার কথা তোলার জন্য সময়টা আদর্শ মনে হলো না। কতই বা বয়স, ২১ বছরের এক ছেলে, জীবনের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে! এই দিনটায় কি ওকে যা ইচ্ছা তা-ই করতে দেওয়া উচিত নয়!

কার্ডিফ রূপকথা, রূপকথার কার্ডিফ-১

কার্ডিফ রূপকথা, রূপকথার কার্ডিফ-২

কার্ডিফ রূপকথা, রূপকথার কার্ডিফ-৩