ট্যাক্সিচালক নানকারগেট চেনে না, চ্যাপেল স্ট্রিট তো পরের কথা। ‘তোমরা বরং অন্য ট্যাক্সিতে যাও’ বলে নিজেই ট্যাক্সি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে আরেকটা ট্যাক্সি আনানোর ব্যবস্থা করল। হায় কপাল, সেই ট্যাক্সিচালক জাতিতে আফগান—হ্যারল্ড লারউডকে তাঁর চেনার কোনো কারণই নেই! তা না চিনুন, কিন্তু নানকারগেটের নামও যে তিনি ইহজীবনে শোনেননি!

শেষ পর্যন্ত নটিংহ্যামশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে তাঁকে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়ার পর যথাস্থানে পৌঁছার আশ্বাস পাওয়া গেল। আফগান ট্যাক্সিচালকের আশ্বাসে আস্থা রেখে আমরা কলকাতা আর ঢাকার পত্রিকার দুই বঙ্গ-সাংবাদিক চললাম হ্যারল্ড লারউডের শিকড়ের সন্ধানে।

নটিংহাম শহর থেকে গাড়িতে মিনিট চল্লিশের পথ। ছোট্ট নিরিবিলি একটা গ্রাম। নানকারগেট সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল, চ্যাপেল স্ট্রিটের ১৭ নম্বর বাড়িও। গায়ে গা লাগানো ১৭ ও ১৯ নম্বর দুটি বাড়িই ছিল লারউড পরিবারের, তবে লারউড জন্মেছিলেন ১৭ নম্বরে। দর্শনার্থীদের নিঃসন্দেহ করতে বাড়ির গায়ে লাগানো আছে একটা ফলক—ক্রিকেট বল ধরা একটি হাত, নিচে লেখা ‘হ্যারল্ড লারউড, ইংল্যান্ড ও নটিংহ্যামশায়ার ক্রিকেটার, ১৯০৪ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত এখানে বাস করতেন।’

আশেপাশের আর দশটা বাড়ির মতোই দেখতে। কিন্তু ১৭ নম্বর বাড়িটা আলাদা শুধুই এতে হ্যারল্ড লারউডের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে। ছবি: ইএসপিএন ক্রিকইনফো উল্টো দিকের বাড়ির মধ্যবয়সী দম্পতি পর্যটকবেশী দুই ভিনদেশিকে ছবি-টবি তুলতে দেখে জানালেন, শহরে লারউডের একটা মূর্তি আছে। রাস্তার ওপারে একটি পাবে লারউডের অনেক ছবি-টবিও। বাড়িতে এখন যাঁরা থাকেন, লারউডের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। তার পরও লারউডের বাড়িতে থাকতে কেমন লাগে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টোকার তীব্রতা ক্রমশ বাড়িয়েও দরজা খোলানো গেল না। হয় ভেতরে কেউ নেই অথবা প্রায়ই এই জাতীয় দর্শনার্থীর কৌতূহলের উত্তর দিতে হয় বলে শুনেও শুনলেন না।

লারউডের বাড়িতে বডিলাইন সিরিজের বিতর্কিত নায়কের চিহ্ন বলতে ওই ফলকটাই। তবে পাবটাতে ছড়িয়ে লারউডের অনেক স্মৃতি। ফ্রেমে বাঁধানো তাঁর জন্ম ও বিয়ের সনদ। বেশ কিছু ছবি, যার একটি এই গ্রামেরই আরেক ছেলে বডিলাইন সিরিজে লারউডের বোলিং পার্টনার বিল ভোসের সঙ্গে। পরিণত বয়সের ছবি। বডিলাইন-পরবর্তী নিগ্রহ সহ্য করতে না পেরে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন লারউড। ১৯৭৭ সালে শতবার্ষিকী টেস্ট উপলক্ষে যখন আবার ইংল্যান্ডে আসেন, তখন তোলা ওই ছবি।

পাবে লারউডের ছবি অঙ্কিত মগ বিক্রি হচ্ছে পাঁচ পাউন্ড করে। সাতসকালেও বিয়ার গিলতে গিলতে তুমুল আড্ডায় মেতেছে বুড়ো-বুড়ির দল। তাঁদেরই একজন, মাইকেল ব্যাঙ্কস লারউড অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর আগে তাঁকে দেখেছেন। ব্যাঙ্কসের বয়স তখন এগারো, চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়া লারউডের কাছ থেকে বোলিং টিপসও পেয়েছেন। লারউডের একটাই কথা ছিল—‘লাইন-লেংথ, লাইন-লেংথটাই আসল। গতি পরে আসবে। পপিং ক্রিজের ছয় ইঞ্চি বাইরে দশ পেনির মুদ্রা ফেলে সেটিতে বল ফেলে যেতে বলতেন।’

ট্যাক্সিচালক নানকারগেট চেনে না, চ্যাপেল স্ট্রিট তো পরের কথা। ‘তোমরা বরং অন্য ট্যাক্সিতে যাও’ বলে নিজেই ট্যাক্সি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে আরেকটা ট্যাক্সি আনানোর ব্যবস্থা করল। হায় কপাল, সেই ট্যাক্সিচালক জাতিতে আফগান—হ্যারল্ড লারউডকে তাঁর চেনার কোনো কারণই নেই! তা না চিনুন, কিন্তু নানকারগেটের নামও যে তিনি ইহজীবনে শোনেননি!

শেষ পর্যন্ত নটিংহ্যামশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে তাঁকে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়ার পর যথাস্থানে পৌঁছার আশ্বাস পাওয়া গেল। আফগান ট্যাক্সিচালকের আশ্বাসে আস্থা রেখে আমরা কলকাতা আর ঢাকার পত্রিকার দুই বঙ্গ-সাংবাদিক চললাম হ্যারল্ড লারউডের শিকড়ের সন্ধানে।

পাবে লারউডের ছবি অঙ্কিত মগ বিক্রি হচ্ছে পাঁচ পাউন্ড করে। সাতসকালেও বিয়ার গিলতে গিলতে তুমুল আড্ডায় মেতেছে বুড়ো-বুড়ির দল। তাঁদেরই একজন, মাইকেল ব্যাঙ্কস লারউড অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর আগে তাঁকে দেখেছেন।

নটিংহাম শহর থেকে গাড়িতে মিনিট চল্লিশের পথ। ছোট্ট নিরিবিলি একটা গ্রাম। নানকারগেট সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল, চ্যাপেল স্ট্রিটের ১৭ নম্বর বাড়িও। গায়ে গা লাগানো ১৭ ও ১৯ নম্বর দুটি বাড়িই ছিল লারউড পরিবারের, তবে লারউড জন্মেছিলেন ১৭ নম্বরে। দর্শনার্থীদের নিঃসন্দেহ করতে বাড়ির গায়ে লাগানো আছে একটা ফলক—ক্রিকেট বল ধরা একটি হাত, নিচে লেখা ‘হ্যারল্ড লারউড, ইংল্যান্ড ও নটিংহ্যামশায়ার ক্রিকেটার, ১৯০৪ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত এখানে বাস করতেন।’

উল্টো দিকের বাড়ির মধ্যবয়সী দম্পতি পর্যটকবেশী দুই ভিনদেশিকে ছবি-টবি তুলতে দেখে জানালেন, শহরে লারউডের একটা মূর্তি আছে। রাস্তার ওপারে একটি পাবে লারউডের অনেক ছবি-টবিও। বাড়িতে এখন যাঁরা থাকেন, লারউডের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। তার পরও লারউডের বাড়িতে থাকতে কেমন লাগে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টোকার তীব্রতা ক্রমশ বাড়িয়েও দরজা খোলানো গেল না। হয় ভেতরে কেউ নেই অথবা প্রায়ই এই জাতীয় দর্শনার্থীর কৌতূহলের উত্তর দিতে হয় বলে শুনেও শুনলেন না।

লারউডের বাড়িতে বডিলাইন সিরিজের বিতর্কিত নায়কের চিহ্ন বলতে ওই ফলকটাই। তবে পাবটাতে ছড়িয়ে লারউডের অনেক স্মৃতি। ফ্রেমে বাঁধানো তাঁর জন্ম ও বিয়ের সনদ। বেশ কিছু ছবি, যার একটি এই গ্রামেরই আরেক ছেলে বডিলাইন সিরিজে লারউডের বোলিং পার্টনার বিল ভোসের সঙ্গে। পরিণত বয়সের ছবি। বডিলাইন-পরবর্তী নিগ্রহ সহ্য করতে না পেরে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন লারউড। ১৯৭৭ সালে শতবার্ষিকী টেস্ট উপলক্ষে যখন আবার ইংল্যান্ডে আসেন, তখন তোলা ওই ছবি।

পাবে লারউডের ছবি অঙ্কিত মগ বিক্রি হচ্ছে পাঁচ পাউন্ড করে। সাতসকালেও বিয়ার গিলতে গিলতে তুমুল আড্ডায় মেতেছে বুড়ো-বুড়ির দল। তাঁদেরই একজন, মাইকেল ব্যাঙ্কস লারউড অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর আগে তাঁকে দেখেছেন। ব্যাঙ্কসের বয়স তখন এগারো, চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়া লারউডের কাছ থেকে বোলিং টিপসও পেয়েছেন। লারউডের একটাই কথা ছিল—‘লাইন-লেংথ, লাইন-লেংথটাই আসল। গতি পরে আসবে। পপিং ক্রিজের ছয় ইঞ্চি বাইরে দশ পেনির মুদ্রা ফেলে সেটিতে বল ফেলে যেতে বলতেন।’

পাবের পেছনেই সেই মাঠ, যেখানে হ্যারল্ড লারউড নামের অমিত প্রতিভাবান কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বিত এক ফাস্ট বোলারের রোমাঞ্চোপন্যাসের মতো ক্রিকেট জীবনের শুরু। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে ১৪ বছর বয়সেই কয়লাখনিতে কাজ করতে শুরু করেছিলেন। ছুটির দিনে ক্রিকেট খেলতে খেলতেই নটিংহ্যামশায়ারের ট্রায়ালে ডাক, সেখান থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে। এরপর ২১ টেস্টে ৭৮ উইকেট, যার ৩৩টিই ১৯৩২-৩৩ বডিলাইন সিরিজে।

হ্যারল্ড লারউডের শহর অ্যাশফিল্ডে লারউডের মূর্তিপ্রমত্ত ব্র্যাডম্যানকে থামাতে ইংলিশ অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন লেগ সাইডে ছাতার মতো ফিল্ডার সাজিয়ে ক্রমাগত পাঁজর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বোলিংয়ের যে কৌশল বের করেছিলেন, সেটির সার্থক রূপায়ণ লারউডের হাতে। আগের অ্যাশেজে যে ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং গড় ছিল ১৩৯.১৪, বডিলাইন সিরিজে তা নেমে এসেছিল মাত্র ৫৬-তে। ইংল্যান্ড জিতেছিল ৪-১-এ। ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কময় সেই সিরিজে ভেঙে পড়তে বসেছিল দু দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। যার চরম মূল্যটা দিতে হয়েছিল হ্যারল্ড লারউডকেই। আর কোনোদিন ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলা হয়নি। নটিংহ্যামশায়ারের পক্ষেও খুব বেশিদিন নয়।

নানকারগেট ক্রিকেট ক্লাবের নাম বদলেছে। কিন্তু মাঠটা নাকি লারউডের সময় যেমন ছিল, তেমনই আছে। সেই মাঠে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। এখানেই তা হলে শুরু লারউডের রানআপের। যেটির শেষে বিখ্যাত সেই ক্লাসিক্যাল অ্যাকশন, ব্যাটসম্যানের দিকে ছুটে যাওয়া আগুনের গোলা।

তাঁর প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল, এমবিই খেতাব দিয়ে সেটির প্রায়শ্চিত্ত করেছে ইংল্যান্ড। নানকারগেটও কৃতী হিসেবেই মনে রেখেছে তাঁর সন্তানকে। ছোট শহরের মাঝখানে বোলার লারউডের মূর্তি সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে এটা লারউডের গ্রাম।

নানকারগেট যাওয়ার পথেই পড়ল রবিন হুডের স্মৃতিধন্য শেরউড ফরেস্ট। রবিন হুড আর লারউড এত কাছাকাছি! মিলটা বোধ হয় ওখানেই শেষ! 

নানকারগেট ক্রিকেট ক্লাবের নাম বদলেছে। কিন্তু মাঠটা নাকি লারউডের সময় যেমন ছিল, তেমনই আছে। সেই মাঠে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

পাবের পেছনেই সেই মাঠ, যেখানে হ্যারল্ড লারউড নামের অমিত প্রতিভাবান কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বিত এক ফাস্ট বোলারের রোমাঞ্চোপন্যাসের মতো ক্রিকেট জীবনের শুরু। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনে ১৪ বছর বয়সেই কয়লাখনিতে কাজ করতে শুরু করেছিলেন। ছুটির দিনে ক্রিকেট খেলতে খেলতেই নটিংহ্যামশায়ারের ট্রায়ালে ডাক, সেখান থেকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে। এরপর ২১ টেস্টে ৭৮ উইকেট, যার ৩৩টিই ১৯৩২-৩৩ বডিলাইন সিরিজে।

প্রমত্ত ব্র্যাডম্যানকে থামাতে ইংলিশ অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন লেগ সাইডে ছাতার মতো ফিল্ডার সাজিয়ে ক্রমাগত পাঁজর লক্ষ্য করে শর্টপিচ বোলিংয়ের যে কৌশল বের করেছিলেন, সেটির সার্থক রূপায়ণ লারউডের হাতে। আগের অ্যাশেজে যে ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং গড় ছিল ১৩৯.১৪, বডিলাইন সিরিজে তা নেমে এসেছিল মাত্র ৫৬-তে। ইংল্যান্ড জিতেছিল ৪-১-এ। ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কময় সেই সিরিজে ভেঙে পড়তে বসেছিল দু দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। যার চরম মূল্যটা দিতে হয়েছিল হ্যারল্ড লারউডকেই। আর কোনোদিন ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলা হয়নি। নটিংহ্যামশায়ারের পক্ষেও খুব বেশিদিন নয়।

নানকারগেট ক্রিকেট ক্লাবের নাম বদলেছে। কিন্তু মাঠটা নাকি লারউডের সময় যেমন ছিল, তেমনই আছে। সেই মাঠে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। এখানেই তা হলে শুরু লারউডের রানআপের। যেটির শেষে বিখ্যাত সেই ক্লাসিক্যাল অ্যাকশন, ব্যাটসম্যানের দিকে ছুটে যাওয়া আগুনের গোলা।

তাঁর প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল, এমবিই খেতাব দিয়ে সেটির প্রায়শ্চিত্ত করেছে ইংল্যান্ড। নানকারগেটও কৃতী হিসেবেই মনে রেখেছে তাঁর সন্তানকে। ছোট শহরের মাঝখানে বোলার লারউডের মূর্তি সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে এটা লারউডের গ্রাম।

নানকারগেট যাওয়ার পথেই পড়ল রবিন হুডের স্মৃতিধন্য শেরউড ফরেস্ট। রবিন হুড আর লারউড এত কাছাকাছি! মিলটা বোধ হয় ওখানেই শেষ!