নিউজিল্যান্ডে শুধুই ক্রিকেটের মাঠ এই একটাই। ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভ। বাকি সব মাঠেই রাগবির সঙ্গে অংশীদারি। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট জাদুঘরটা যে তাই বেসিন রিজার্ভেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। 
 
সব জাদুঘরে যা থাকে, এটিতেও ক্রিকেটের আদি যুগের কিছু নিদর্শন অবশ্যই আছে। নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা বোলার ও ব্যাটসম্যান স্যার রিচার্ড হ্যাডলি ও মার্টিন ক্রোকে নিবেদিত দুটি অংশ থাকাটাও স্বাভাবিক। আছেও। ব্রুস রিডের বাউন্সার মুখে লাগার পর রক্তে মাখামাখি ক্রোর সোয়েটারটা আছে। মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলেও আবার হেলমেট পরে ফিরে সেঞ্চুরি করেছিলেন মার্টিন ক্রো। স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ছাড়া শুধু মার্টিন ক্রোরই ২৯৯ রানে আউট হওয়ার দুর্ভাগ্য হয়েছে, সেটি এই বেসিন রিজার্ভেই। সেটির স্মারক আছে। ব্যাট-বুট এসব তো থাকবেই। হ্যাডলির অংশটাতে ব্যাট-বুটের সঙ্গে উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছানো টেস্টের স্টাম্পও।
টাক পড়ে যাওয়া মাথা ঢেকে রাখতেই নাকি সব সময় ক্যাপ পরে বল করতেন গ্রিমেট
যেকোনো ক্রিকেট জাদুঘর গর্ব করতে পারে, এমন দুটি ব্যাট আর বল আছে। ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পার্থ টেস্টে যে অ্যালুমিনিয়াম ব্যাটটি দিয়ে ব্যাটিং করতে শুরু করে হইচই বাধিয়ে দিয়েছিলেন লিলি, সেটি কীভাবে অস্ট্রেলিয়া থেকে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট জাদুঘরে চলে এল, এই ব্যাখ্যাটা কোথাও পেলাম না। আম্পায়াররা আপত্তি করার আগে মাত্র কিছুক্ষণই তা দিয়ে খেলতে পেরেছিলেন লিলি, ব্যাটটি তাই নতুনই আছে। তবে বলটির তা থাকা সম্ভব নয়। টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ওভার বোলিং হয়েছে যে এই বলটি দিয়েই! ১৯৮৭ সালে এই ওয়েলিংটনেই নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস ডিক্লেয়ার করার আগ পর্যন্ত ১৭৭ ওভার একই বলে বোলিং করে গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ! কাচঘেরা যে অংশটিতে সেলাই খুলে যাওয়া সেই বলটি, সেটির পাশের বিভাগটির শিরোনামটা খুব মজার—‘দ্য ওয়ান হু গট অ্যাওয়ে।’ একজন, যে ফসকে গেছে!
৩৭ টেস্টে ২৪.২১ গড়ে ২১৬ উইকেট, ইনিংসে ৫ উইকেট ২১ বার, সাতবার ম্যাচে ১০। কিন্তু গ্রিমেট তো টেস্ট খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে, নিউজিল্যান্ড ‘ফসকে যাওয়া’র আফসোস কেন করবে?
নিউজিল্যান্ডের হাত ফসকে যাওয়া সেই ক্রিকেটারের নাম ক্ল্যারি গ্রিমেট। শেন ওয়ার্ন স্বীকৃতিটি কেড়ে নেওয়ার আগে ক্রিকেট ইতিহাস যাঁকে সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনার বলে মানত। মাত্র ৩৭ টেস্টে ২৪.২১ গড়ে ২১৬ উইকেট, ইনিংসে ৫ উইকেট ২১ বার, সাতবার ম্যাচে ১০। কিন্তু গ্রিমেট তো টেস্ট খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে, নিউজিল্যান্ড তাঁকে নিয়ে ‘ফসকে যাওয়া’র আফসোস কেন করবে?
 
করছে, কারণ ক্ল্যারি গ্রিমেট জন্মেছিলেন নিউজিল্যান্ডেই। জন্ম ডানেডিনে, তবে কৈশোরেই গ্রিমেট পরিবার চলে আসে ওয়েলিংটনে। বেসিন রিজার্ভের একটু দূরেই ছিল বাস। ক্ল্যারি গ্রিমেটের মাউন্ট কুক স্কুলটিও মাঠ থেকে মিনিট পাঁচেকের পায়ে-হাঁটা দূরত্বে। এই বেসিন রিজার্ভে খেলে খেলেই গ্রিমেটের বেড়ে ওঠা। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে প্রথম তিন মৌসুমও ওয়েলিংটনের পক্ষেই। নিউজিল্যান্ড তখনো টেস্ট স্ট্যাটাস পায়নি। তার পরও ১৯১৩-১৪ সিরিজের অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে জায়গা পেলে গ্রিমেট নিউজিল্যান্ডেই থেকে যেতেন কি না কে জানে! সেই হতাশা থেকেই ১৯১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ছুটি কাটাতে গিয়ে থেকে যান সেখানে। বাকিটুকু যেমন বলা হয়... ইতিহাস! অভিষেক টেস্টেই ১১ উইকেট, প্রথম বোলার হিসেবে টেস্টে ২০০ উইকেট—গ্রিমেটের এসব কীর্তি দেখে নিউজিল্যান্ডের ‘কী বোলারটাই না ফসকে গেছে’ আফসোস তো হওয়ারই কথা।
কী বেরোবে হাত থেকে-লেগ ব্রেক, গুগলি না আততায়ী ফ্লিপার? জানতেন শুধু ক্ল্যারি গ্রিমেট
বাকিটুকু ইতিহাস লিখেছি, কিন্তু এটা লেখাও অত্যাবশ্যকীয় যে, ইতিহাস হওয়ার পথে পথে ছড়িয়ে ছিল কাঁটা। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েও অনেক লড়াই, প্রথম তিন বছর তো খেলেছেন সিডনির ক্লাব ক্রিকেটে। মেলবোর্নে পাড়ি জমানোর পর ‘প্রমোশন’ হয়েছে, তবে সেটি গ্রেড ক্রিকেটে। ভিক্টোরিয়া ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট হয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯২৫ সালে যখন টেস্ট অভিষেক, গ্রিমেটের বয়স তখন চৌত্রিশ! শেষ টেস্ট খেলেছেন ৪৫ বছর বয়সে, তার পরও শেষটা ‘অকালেই’ হয়েছে বলে আমৃত্যু আফসোস করে গেছেন। যৌক্তিক কারণও ছিল। শেষ টেস্টেও যে গ্রিমেটের ১৩ উইকেট (৭/১০০ ও ৬/৭৩, ১৯৩৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ডারবানে)!
মাথায় টাক পড়ে যাওয়ায় আরও বেশি বয়সী দেখাত। এ নিয়ে অনেক হাস্যরসিকতা হতো বলে একটু বিব্রতই থাকতেন। হয়তো টাক ঢেকে রাখতেই মাথায় ক্যাপ ছাড়া গ্রিমেটকে কেউ বোলিং করতে দেখেনি। বোলিংয়ের ওপর ছিল অসম্ভব নিয়ন্ত্রণ। রান দেওয়াটা দু চোখের বিষ। লেগ স্পিনার হয়েও ওভার প্রতি মাত্র ২.১৬ রান দেওয়ার অবিশ্বাস্য কীর্তিও এ কারণেই (ওয়ার্নের ইকোনমি রেট ২.৬৫)।
 
সেই নিয়ন্ত্রণ তো আর এমনি এমনি হয়নি। একদিন ব্যাগি গ্রিন মাথায় তোলার স্বপ্ন নিয়ে মেলবোর্নে বাড়ির পেছনের উঠোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরলস প্র্যাকটিস করে গেছেন। সঙ্গী কে ছিল জানেন? জো নামে একটা কুকুর! নেটে আটটি বল (তখন আট বলেই ওভার হতো) করতেন, আর জো পায়ের কাছে বসে থাকত। আট নম্বর বলটি হয়ে যেতেই নিজে থেকেই দৌড়ে গিয়ে একে একে আটটি বল এনে রেখে দিত গ্রিমেটের সামনে। জোকে এই ট্রেনিং দিতেও কম পরিশ্রম করতে হয়নি গ্রিমেটকে।
 
ওই ছোট্ট উঠোনে একাকী বোলিং করতে করতেই ফ্লিপার আবিষ্কার করে ফেলেন। সেটিকে নিখুঁত করতে ১২ বছর লেগেছে বলে জানিয়েছেন নিজেই। শুধু সেই ফ্লিপারই নয়, গ্রিমেটের হাতে
লেগ স্পিনারের তূণের অন্য সব তীর লেগ ব্রেক, গুগলি, টপ স্পিনারও এমন নিখুঁত রূপ পেয়েছিল যে, তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ব্র্যাডম্যান অব স্পিন’! নাকি ব্র্যাডম্যানকেও ছাড়িয়ে?
 
অস্ট্রেলিয়ারই আরেক স্পিনার অ্যাশলি ম্যালেট ‘ক্ল্যারি গ্রিমেট: দ্য ব্র্যাডম্যান অব স্পিন’ নামে গ্রিমেটের অসাধারণ যে জীবনীটি লিখেছেন, সেটিতে ‘ব্র্যাডম্যান বনাম গ্রিমেট’ নামে একটা অধ্যায় আছে। তাতে ম্যালেট প্রমাণ করে ছেড়েছেন, ব্যাটিংয়ের ব্র্যাডম্যানের চেয়েও এগিয়ে বোলিংয়ের গ্রিমেট! কীভাবে? ব্যাটসম্যানদের সেঞ্চুরি ও বোলারের ইনিংসে ৫ উইকেটকে সমান ধরে হিসাব করে। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের ২৩৪ ম্যাচে ১১৭ সেঞ্চুরি আর ২৪৮ ম্যাচে গ্রিমেটের ইনিংসে ৫ উইকেট ১২৭ বার। গ্রিমেটই একটু এগিয়ে! ৫২ টেস্টে ব্র্যাডম্যানের ২৯ সেঞ্চুরি আর গ্রিমেটের ৩৭ টেস্টে ২১ বার ইনিংসে ৫ উইকেট। গড়ে প্রতি ১.৭৯ টেস্টে ব্র্যাডম্যানের একটি সেঞ্চুরি। গ্রিমেটের ইনিংসের ৫ উইকেট প্রতি ১.৭৬ টেস্টে।
অথচ গ্রিমেটের লেগ স্পিনার হওয়ারই কথা ছিল না। বলে গতির ঝড় তোলাটাই ছিল স্বপ্ন। ফাস্ট বোলার হিসেবেই ঝড় তুলেছিলেন স্কুল ক্রিকেটে। একদিন স্কুলের ভীষণ কড়া গেম টিচার
 
হেম্পেলমানের ‘আরও একটি ওভার’ নির্দেশ অমান্য করার সাহস না পেয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত গ্রিমেট শখের বসে যা করতেন, সেই লেগ ব্রেক করতে শুরু করেন। এমনই লেগ ব্রেক যে, হেম্পেলমান সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিয়ে দেন—পেস বোলিং আর নয়। এখন থেকে তুমি লেগ ব্রেকই করবে। গ্রিমেট মানতে চাননি। কিন্তু স্কুল ক্রিকেটের পরের ম্যাচে হেম্পেলমানকে আম্পায়ার হিসেবে দাঁড়াতে দেখে মানতে হয়। সে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৫ রানে ৬ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১ রানে ৮ উইকেট পাওয়ার পর অবশ্য নিজেও বুঝে ফেলেন, লেগ স্পিনার হওয়ার জন্যই জন্ম হয়েছে তাঁর। সেই ম্যাচের স্কোরকার্ডটিও রাখা আছে জাদুঘরে। কিন্তু হেম্পেলমানের একটা ছবিও কি রাখা উচিত ছিল না?