মেসি, এবার কি হবে!

উৎপল শুভ্র নির্বাচিত পাঠকের লেখা

মেসি, এবার কি হবে!

ছয়টি ব্যালন ডি`অর, ছয়টি গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপ আর কোপা আমেরিকার গোল্ডেন বল, চারটি সেরা প্লে-মেকারের পুরস্কার…অসংখ্য স্বীকৃতি পাওয়া লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের খামতি ঐ একটাই, ‘আন্তর্জাতিক ট্রফি’। সেই অপূর্ণতা ঘোচাতে আজ থেকে আবারও সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপাতে হবে মেসিকে। মেসির ক্যারিয়ারের সূর্যটাও ঢলে পড়ছে অস্তাচলে। মেসিকে এবার তাই আর হৃদয় নয়, ঐ রুপোলি শিরোপাটাই জিততে হবে।

ব্যক্তিগত অর্জনের ষোলকলা পূর্ণ করেছেন অনেক আগেই, বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন সম্ভাব্য সব শিরোপা। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে 'সব অর্জন তো ওই ক্লাবের হয়েই' বলে যে বদনাম ছিল, সেসব কাটিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতেও ব্যক্তিগত রেকর্ডগুলোর চূড়ায় নিজেকে নিয়ে গেছেন। তবুও আর্জেন্টিনার ঐ আকাশি-সাদা জার্সিটা লিওনেল মেসির জন্য থেকে গেছে অনন্ত আক্ষেপের এক গল্প হয়ে। এই অপেক্ষার শেষ কবে? এবারই?

তিনি আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা। জিতেছেন বিশ্বকাপ আর কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার, তবুও দেশের জার্সিতে পূর্ণতা পায়নি মেসির ক্যারিয়ার। খুব কাছে গিয়েও বিশ্বকাপের ঐ রুপোলি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরা হয়নি, হাতছোঁয়া দূরত্বে থেকেও ছুঁয়ে দেখা হয়নি মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা। ‘আর্জেন্টিনা’, ‘টুর্নামেন্ট’, ‘ফাইনাল’, ‘ট্রফি’--শব্দগুলোকে এক সুতোয় গাঁথা হয়নি, আর্জেন্টিনার পতাকার আকাশি-নীল রংটা তাই মেসির জন্য এক চিরস্থায়ী দুঃখবিলাস।

অথচ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শুরুটা খুবই আশাজাগানিয়া। ’০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন স্বর্ণপদক, এর আগেই জিতিয়েছেন অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। ছোটদের সেই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলটাও জিতে নিয়েছিলেন তিনি। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে গোল পেয়েছেন, কোপা আমেরিকার ফাইনালে উঠেছেন, অভিষেকেই লাল কার্ড দেখার দুঃসহ স্মৃতিটাকে একপাশে রাখলে দেশের জার্সিটাকে তখন মেসির কাছে পয়মন্ত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

জাতীয় দলের জার্সিতে শুরুটা হয়েছিল রঙিন, এখানে যেমন দেখা যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ের পর হাস্যোজ্জ্বল মেসিকে। ছবি: গেটি ইমেজেস

তবে এই সুন্দর সময়টা অতীত হতে খুব বেশিদিন লাগেনি। মেসি তখন বার্সেলোনার সর্বজয়ী দলের সদস্য, জিতেছেন নিজের প্রথম ব্যালন ডি'অরও। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ‘১০’ নম্বর জার্সিটাও তখন তাঁর অধিকারে। ‘মাঠে মেসি, ডাগআউটে ম্যারাডোনা’--এই জুটিকে ঘিরে ধুঁকতে ধুঁকতে বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠা আর্জেন্টিনা যেটুকু আশার জাল বুনেছিল, সেটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানদের আগ্রাসী ফুটবলের এক ফুঁৎকারে। পুরো বিশ্বকাপে গোলহীন থাকা মেসির স্বপ্নভঙ্গ হলো ম্যাচশেষে ড্রেসিংরুমে হাউমাউ করে কান্নার মাধ্যমে। পরের বছরের কোপা আমেরিকাতেও হতাশ করলেন মেসি, কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে টাইব্রেকারে পরাজয়ে আবারও স্বপ্নের ইতি। ‘বার্সার মেসি কতটা আর্জেন্টিনার?‘ প্রশ্নটাও তখন বাজার পেয়েছিল খুব।

প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার জন্য মেসি বেছে নিলেন চার বছর পরের ব্রাজিল বিশ্বকাপকে। সাতাশ বছর বয়সটা এমনিই একা হাতে বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য উপযুক্ত, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের দেশে ট্রফি জয়ের কল্পনাটাও হয়তো রোমাঞ্চিত করেছিল মেসিকে। তিন ম্যাচে মেসির চার গোলের ওপর ভর করেই গ্রুপ পর্ব পেরোল আর্জেন্টিনা, 'রাউন্ড অব সিক্সটিন'-এর ম্যাচকেও হিসেবে নিলে টানা চার ম্যাচেই ম্যাচসেরা তিনি। হিগুয়েইনের গোলে কোয়ার্টার আর টাইব্রেকারে রোমেরো-বীরত্বে সেমির বাধা পেরোনোর পর স্বপ্নের বিশ্বকাপ ট্রফি আর মেসির মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র এক ম্যাচের। ফাইনাল!

পাঠকমাত্রই জানেন, ঐ ফাইনালটা জেতা হয়নি মেসির আর্জেন্টিনার। ক্ষমার অযোগ্য ভুল করেছিলেন হিগুয়েইন-প্যালাসিও, গোলরক্ষককে একা পেয়েও বাইরে মেরেছিলেন মেসি নিজেই। অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের গোলের পরও সুযোগ এসেছিল, কিন্তু বক্সের বাইরে পাওয়া ফ্রি-কিকটা যখন পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে গ্যালারিতে আছড়ে পড়ছে, মেসি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন ‘সব শেষ’। শেষ বাঁশি বাজার পর ম্লান হাসিতে তাই যতই আড়াল করার চেষ্টা করুন না কেন, হৃদয়ে কালো মেঘের উপস্থিতি মেসির চোখে-মুখে ছিল স্পষ্ট। আর সেই কালো মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরেছে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কোটি সমর্থকের চোখ বেয়ে।

 তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলেম আর পেলেম না। ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি না জেতার অঘোষিত অভিশাপ কাটানোর সুযোগ মেসি আরও পেয়েছিলেন, ফাইনালেও উঠেছিলেন পরপর দুটো কোপা আমেরিকার। '১৫-এর টাইব্রেকারে হেরেছেন সতীর্থদের ভুলে, আর পরের বছর তো নিজেই পোস্টের বাইরে মেরে নিজ হাতে (পড়ুন পায়ে) স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। টানা তিন বছরের স্বপ্নভঙ্গের পর মেসির দুঃখগুলো বের হলো কান্নারূপে, যে কান্না প্রবলভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল ফুটবলবিশ্বকে। হতাশ আবেগী মেসি ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতীয় দলের জার্সিটাকে চিরদিনের জন্য তুলে রাখার।

কিন্তু মেসিকে ফিরতেই হলো। সমর্থক আর ফেডারেশন ছাড়াও দেশের প্রেসিডেন্টের ফোনের পর মেসি অবসরের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ দিয়ে আবার ফেরেন মেসি, যে বাছাইপর্ব তাঁকে ছুঁড়ে দিয়েছিল সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। চার বছর আগের ফাইনালে খেলা দলটা যে তখন বাছাইপর্বে ধুঁকছে, শেষ ম্যাচের আগ পর্যন্ত তাদের বিশ্বকাপ-ভাগ্যই তখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে শেষ ম্যাচে তো নিজেদের জিততেই হবে, পক্ষে আসা লাগবে অন্য ম্যাচের ফলাফলগুলোও। ‘কী করিলে কী হইবে’-এর তালিকা নিয়ে যখন দুশ্চিন্তায় আর্জেন্টাইনদের গলদঘর্ম অবস্থা, তখনই ঘটল বিপদ। ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম মিনিটেই আর্জেন্টিনার জালে জড়াল বল!

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ইকুয়েডরের কিটো স্টেডিয়ামের উচ্চতা সাড়ে নয় হাজার ফুট, আর্জেন্টিনা আর বিশ্বকাপের মধ্যবর্তী অদৃশ্য দেয়ালের উচ্চতা আরও কয়েকগুণ বেশি। এই বাধা পেরোতে আর্জেন্টিনা একজনের ওপরই ভরসা করতে পারত। মেসি সেদিন হতাশ করেননি। প্রথমার্ধেই জোড়া গোল, দ্বিতীয়ার্ধে আরও একটা, মেসির মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিল বিশ্বকাপে।

মেসি, আরেকটাবার প্লিজ! ছবি: স্কাই স্পোর্টস

পরের বিশ্বকাপ-কোপাতেও সেই একই গল্প, না পাওয়ার গল্প। প্রায় ভাঙাচোরা দলটার অবশ্য ট্রফি জেতার কোন সম্ভাবনাও ছিল না, মেসিকেও তাই মাথা নিচু করেই ঘরে ফিরতে হয়েছে। দীর্ঘায়িত হয়েছে সমর্থকদের অপেক্ষা, নিজের পর আর কোন আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে না দেখার দুঃখ নিয়েই পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন দিয়েগো ম্যারাডোনা।

আবারও সময় এসেছে কোপা আমেরিকার, আবারও সময় এসেছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আশায় বুক বাঁধার। আটাশ বছর ধরে চলছে ট্রফিখরা, বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে সেটা পঁয়ত্রিশ। যে মেসিকে ঘিরে ট্রফির স্বপ্ন দেখেছেন আর্জেন্টাইনরা, তিনি এখনও পারেননি কোন ট্রফি এনে দিতে। মেসি নিজেও জানেন, জাতীয় দলে তাঁর সময় ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। পাঁচটি ব্যালন ডি'অরের বিনিময়ে যিনি চেয়েছিলেন একটি বিশ্বকাপ ট্রফি, অন্তত নিজের নামের পাশে একটা আন্তর্জাতিক শিরোপা রাখার জন্য হলেও এবারের কোপায় তাঁর জ্বলে ওঠা চাই-ই চাই।

ছয়টি ব্যালন ডি'অর, ছয়টি গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপ আর কোপা আমেরিকার গোল্ডেন বল, চারটি সেরা প্লে-মেকারের পুরস্কার…অসংখ্য স্বীকৃতি পাওয়া লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের খামতি ঐ একটাই, ‘আন্তর্জাতিক ট্রফি’। সেই অপূর্ণতা ঘোচাতে আবারও সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপাতে হবে মেসিকে। তবে, এবার আর হৃদয় নয়, জিততে হবে ঐ রুপোলি শিরোপাটাই।

মেসি, এবার না জিতলে আর কবে?

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×