খেলার জগতে নিজেকে মূর্খ প্রমাণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় কী, বলুন তো?

যে কোনো বড় প্রতিযোগিতার আগে কোনও একটি বিশেষ দলকে সেই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে ফেলা, প্রতিযোগিতার আগেই!

এ-ও এক মজার খেলা। আমরা সবাই খেলতে ভালবাসি। মনে মনে ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করি। বিচরণ করি আকাশে। আমার বেছে নেওয়া দলটাই সেরা, আহা, শ্রেষ্ঠত্বের সে কী অনুভূতি! যেন আমি বললাম বা বেছে নিলাম বলেই তারা সেরা হলো!

ইউরো শুরু হচ্ছে ইউরোপ কাঁপিয়ে। তার আগে এমন এক চেষ্টায় ব্রতী তো হতেই হবে। রাখঢাক না করে প্রথমেই জানিয়ে রাখি শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে পছন্দের দুই ঘোড়ার, থুড়ি, দেশের নাম। ফ্রান্স আর পর্তুগাল!

ফ্রান্স ২০১৮-র বিশ্বজয়ী। পর্তুগাল ২০১৬ সালে জিতেছিল ইউরো, তা-ও ফ্রান্সের মাটিতে, ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে এবং সেই ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মাঠে ছিলেন মিনিট ২৫, খেলেছিলেন খুব বেশি হলে ১৭ মিনিট। ইউরোজয়ী পর্তুগাল তারপর প্রথম নেশনস কাপও জিতেছিল। যদিও সেই প্রতিযোগিতার খটমট নিয়ম আর পদ্ধতি ঠিক মহাদেশীয় নয়, কিন্তু ট্রফি তো ট্রফিই, অস্বীকার করবেন কী করে?

পর্তুগালের স্কোয়াড গতবারের চেয়েও শক্তিশালী। ছবি: পিএ

গত পাঁচ বছরের সেরা দুই ইউরোপীয় দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হবে এবার গ্রুপ পর্বেই। ইউরোর একমাত্র গ্রুপ, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেয়ানে সেয়ানে। একই গ্রুপে গতবারের ইউরোর ফাইনালিস্ট দুই দেশের সঙ্গে জার্মানিও। অঘটন গ্রুপ পর্বেই হয়ে যেতে পারে, জার্মানি ছিটকে দিতেই পারে ফেবারিট ধরে নেওয়া দুই দেশের যে কোনো একটিকে। ইউরোয় যারা সবচেয়ে বেশি তিনবারের চ্যাম্পিয়ন (এই রেকর্ড অবশ্য স্পেনেরও রয়েছে) এবং গত বিশ্বকাপে যারা চ্যাম্পিয়ন হিসাবে শুরু করে প্রথম পর্বেই বিদায় নিয়েছিল, নিজেদের মহাদেশে তারা দক্ষতা প্রমাণে উদগ্রীব হবে না-ই বা কেন?

জার্মানিকে তো কোনোকালেই হিসাবের বাইরর রাখা যাবে না। ছবি: গেটি ইমেজেস

আসলে, ফুটবলের যে কোনো বড় প্রতিযোগিতায় জার্মানি এবং ইতালিকে চ্যাম্পিয়নের দৌড়ে না রাখাটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, মেনে নেওয়াই মঙ্গল। জার্মানি যদি বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগেই বিদায় নিয়ে থাকে রাশিয়ায়, ইতালি সেই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি! জিয়ানলুইজি বুফন তো অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন হতাশায় আর তাঁর সামনে যাঁরা অভেদ্য হয়ে দাঁড়াতেন জুভেন্টাসের রক্ষণে, সেই বোনুচ্চি-কিয়েলিনির মনে হয়েছিল, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে ইতালির ফুটবলের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বিদায়।

কিন্তু ইতালি আছে এবার, উদ্বোধনী ম্যাচ খেলবে তুরস্কের বিরুদ্ধে আর ওয়েলস, সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ভালো ফল করেই নকআউটে যাবে, সম্ভবত গ্রুপ শীর্ষে থেকেই। তারপর নকআউট তো সেই দিনের ৯০ বা ১২০ মিনিট, কখনো আবার তারপরের পাঁচ বা সাত শটের পেনাল্টি লটারি। কী করে বাদ রাখবেন রবার্তো মানচিনির ইতালিকে? কিংবা কোচ জোয়াকিম লোকে শেষ প্রতিযোগিতায় ট্রফিটা হাতে তুলে দিতে চাইবেন না ম্যানুয়েল নয়ারদের জার্মানি? টমাস মুলার আর ম্যাটস হামেলসকে ফিরিয়ে এনে লো বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলের প্রয়োজন সবার ওপরে। স্পেনের কাছে ছ'গোল খাওয়ার অপমান ভুলে শেষ প্রতিযোগিতায় তিনিও চাইছেন মাথা তুলেই বিদায় নিতে।

স্কোয়াড ঘোষণার দিন ইতালির পুরো বহরই চলে এসেছিল অনুষ্ঠানে। ছবি: গেটি ইমেজেস

ফুটবলের বড় প্রতিযোগিতা আসলে বড় দলের, বিশ্বাস দৃঢ়। এক-আধবার গ্রিস হয়ে যায় বা ডেনমার্ক পাগল করা ফুটবল খেলে ফেলে। সাধারণত, বড় দলগুলো ডোবায় কম। স্পেন অনেক দিন আটকে ছিল মধ্যচিত্ততার বৃত্তে। পেপ গার্দিওলাকে আন্তরিক ধন্যবাদ, স্পেনের নিউক্লিয়াস যে পাঁচ-ছয় ফুটবলার ছিল, তাঁদের বেশির ভাগকেই বিশ্বসেরা হওয়ার সুযোগটা করে দিয়েছিলেন ক্লাবে। সেই আত্মবিশ্বাস পরবর্তী সময়ে কাজে লেগেছিল স্পেনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরো–চার বছরে টানা দুটি মহাদেশীয় এবং একটি বিশ্বস্তরের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন জাভি-ইনিয়েস্তারা। ওই চার বছরই ক্লাবস্তরে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনা দুবার জয়ী, বাকি দুবারও ফিরে এসেছিল সেমিফাইনাল থেকে। পুয়োল-পিকে-জাভি-ইনিয়েস্তা-ভিয়া এবং প্রয়োজনে বুসকেটস-ফ্যাব্রিগাস স্পেনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল লা মাসিয়ার বকলমে বার্সেলোনাই। অবশ্যই পাশে রিয়াল মাদ্রিদের কাসিয়াস-রামোস-জাবি আলোনসোকে পেয়ে।

মুশকিল হলো, এমন সোনালি প্রজন্ম মাঝেমাঝে এলেও চিরদিন থাকে না। স্পেনও তাই নিয়ম মেনে শীর্ষ থেকে নেমেছে। নতুন যারা এসেছেন, স্বপ্ন দেখানোর মতো নন, বলা যাচ্ছে না। কিন্তু যাঁরা সেই অতুলনীয় সাফল্য এনে দিয়েছিলেন, তাঁদের ধারেকাছে যাওয়ার মতো মুখ ভাবতে গেলেই আর কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। নতুনরা মানিয়ে নিতে সময় নেবেন, স্বাভাবিক। সেই সময়ের ফাঁক গলে ইউরোজয় হাতছাড়া হয়ে যেতেই পারে স্পেনের। যতই লুইস এনরিকের মতো বাস্তববাদী অথচ ট্যাকটিক্যালি দক্ষ কোচ দায়িত্বে থাকুন না কেন। তার ওপর, প্রতিযোগিতার আগেই বুসকেটসের করোনা আত্মবিশ্বাসের ভিতটাই নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে দলের। সুইডেন-পোল্যান্ড-স্লোভাকিয়ার গ্রুপ থেকে নকআউটে চলে যাবে স্পেন হয়তো ঠিকই। তারপর কত দূর?

২৪ সদস্যের স্পেন দল। ছবি: এএস

যে দেশগুলি আগে কখনও চ্যাম্পিয়ন হয়নি ইউরোয়, তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বেলজিয়াম এবং ইংল্যান্ড। বেলজিয়াম এই মুহূর্তে ফিফা র‍্যাঙ্কিং অনুসারে বিশ্বে প্রথম। রাশিয়া, ডেনমার্ক আর ফিনল্যান্ড আছে গ্রুপে। হাসতে হাসতেই দ্বিতীয় পর্বে যাওয়া উচিত। বেলজিয়ামও একটা সোনালি প্রজন্ম পেয়েছে। কিন্তু সাফল্য ধরা দেয়নি কেভিন ডি ব্রুইনাদের হাতে। এডেন হ্যাজার্ড ইংল্যান্ডে বিরাট সাফল্য পেয়ে রিয়ালে গিয়েছিলেন। চোট বড় কারণ হলেও ব্যর্থতা প্রকট হয়েছে স্পেনের মাঠে নামলেই। তবু, হ্যাজার্ডও বড় নাম। বলসহ তীব্র গতির দৌড়ে তাঁকে ধরা কঠিন মাঝেমাঝেই। রোমেলু লুকাকু সিরি 'এ'-তে দুরন্ত ছন্দে ছিলেন এবার। ডি ব্রুইনার পাস থেকে লুকাকুর গোল দেখা যাবে, আশায় বেলজিয়াম। একমাত্র চিন্তা রক্ষণ। শেষ বিচারে বড় আসরে নিজেদের চ্যাম্পিয়ন ভেবে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকাটাও ফ্যাক্টর হয়ে উঠতেই পারে।

ইংল্যান্ডের আবার উল্টোটা! ওঁরা চিরকালই নিজেদের চ্যাম্পিয়ন ভেবে এসেছে সব দিকে, ফুটবল মাঠে তো বটেই! প্রচারমাধ্যমও বরাবরই নিজেদের আকাশে তুলে রাখত, তাই ওই বিরাট উচ্চতা থেকে মাটিতে হঠাৎ পতনে শরীর ও মনে যে চোট লাগত, সারানো কঠিন হতো। গত বিশ্বকাপ থেকে এই ধারা খানিকটা পাল্টেছে। ‘আমরাই চ্যাম্পিয়ন’ ঘোষণায় সোচ্চার হচ্ছে না ইংরেজ প্রচারমাধ্যম যেমন, গ্যারেথ সাউথগেটও শক্ত হাতে হাল ধরেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, ইংল্যান্ডে জাতীয় দলের ফুটবল খেলার ধরন সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে।

ভারতে এসে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ জিতে ফিরেছিল ইংল্যান্ড। স্পেনের কাছে ফাইনালে দু'গোল খেয়ে পাঁচ গোল দিয়েছিল ফিল ফোডেনরা। সেই বিশ্বজয়ের রাতেই ইংরেজ কোচ জানিয়ে গিয়েছিলেন, সাউথগেটের পরামর্শে কী করে বয়সভিত্তিক যুব দল থেকে সিনিয়র দল পর্যন্ত একই ধাঁচে ফুটবল খেলা রপ্ত করানোর চেষ্টা চলছে ইংল্যান্ডের সব একাডেমিতে। উত্তেজক এক ঝাঁক প্রতিভা--রহিম স্টার্লিং, মার্কাস রাশফোর্ড, ম্যাসন মাউন্ট, জ্যাডন স্যাঞ্চো। অভিজ্ঞ গোলশিকারী হ্যারি কেন তো বটেই। এবার ইংল্যান্ডকে সম্ভাব্য ফেবারিটের তালিকা থেকে দূরে রাখা মানে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা!

ইংল্যান্ড এবার সত্যিকার অর্থেই শিরোপার দাবিদার। ছবি: গেটি ইমেজেস

নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে বেশি দূর যাওয়া কঠিন। ভার্জিল ফন ডাইক নেই মানেই লিভারপুলের মতো অবস্থা নেদারল্যান্ডসের। ঠিক যেমন ইভান রাকিতিচের অভাবে জাতীয় দলের মাঝমাঠে লুকা মদরিচও অনেকটা অসহায়। মদরিচ-রাকিতিচ জুটির ২০১৮ বিশ্বকাপ মনে থেকে যাবে আজীবন। কিন্তু তিন বছর পর এই ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে গেলে তা হবে চরম অঘটন।

অর্থাৎ ঘুরেফিরে সেই আগে যারা জিতেছে, এমন দলগুলোর মধ্যে ফেলে-দেওয়া-অসম্ভব বলে জার্মানি-ইতালি আর ফেবারিট ধরতেই হবে পর্তুগাল-ফ্রান্স।

রোনালদোর পর্তুগালের এবার একটাই সমস্যা–দলটা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি ভালো এবং ফুটবলে সব সময় সেরা দল জেতে না!

গতবার যিনি পরিবর্ত হিসাবে ফাইনালে একমাত্র গোল করেছিলেন সেই এডার এখন কোথায়, কেউ জানেন? রক্ষণে একা পেপে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন গতবার, এবার সঙ্গে রুবেন দিয়াজ। একা ম্যানচেস্টার সিটির রক্ষণে অটল পাহাড় হয়ে প্রিমিয়ার লিগ আনতে বিরাট ভূমিকায় ছিলেন। ওই দলের মাঝমাঠেই আবার বার্নার্দো সিলভা। সৃজনশীল মিডফিল্ডার, পলকে গতি তুলতে পারেন, গোলও চেনেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ। দু'পায়ে চমৎকার ফুটবল, সেট পিসে তাঁর মুন্সিয়ানা কাজে লাগবে যখন রোনালদো এগিয়ে দেবেন তাঁকে। পেনাল্টি নিতে সিদ্ধহস্ত, টাইব্রেকারে পর্তুগালের বাড়তি অস্ত্র। দিওগো জোটা আর জোয়াও ফেলিক্স যোগ করুন। এমনকি লুইস ফিগো-রুই কস্তাদের পর্তুগালও আক্রমণে এত সৃজনশীল ছিল না। সঙ্গে রক্ষণে পেপে-দিয়াজ। এত তারকায় না গাজন নষ্ট হয়, এই একটাই ভয় এবার পর্তুগাল নিয়ে। সবচেয়ে বেশি ভারসাম্য দলে, কোচ-ক্যাপ্টেন হিসাবে রোনালদো-ফার্নান্দো সান্তোসের যুগলবন্দিও কাজে লেগেছে। পরপর দুবার ইউরো জিতে তাদের চিরশত্রু স্পেনের রেকর্ড ধরে না ফেলার কারণ খাতা-কলমে অন্তত নেই রোনালদোদের। তাঁরাই এবার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ফেবারিট।

চাইলেই তো দুটি একাদশ মাঠে নামাতে পারেন দেশম! ছবি: টুইটার

আর ফ্রান্স? তাঁদের ভয় কোচ দিদিয়ের দেশমের নিজ আরোপিত শৃঙ্খলা ভেঙে করিম বেনজেমাকে দলে নেওয়া। রিয়াল মাদ্রিদে দুরন্ত খেলে গেলেও কর্ণপাত করেননি দেশম। যে জিরু গোল পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিযোগিতায় প্রায় ‘জিরো’, ভরসা রেখেছিলেন তাঁর ওপরেই। উঠে এসেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে আর আঁতোয়ান গ্রিজমান ফ্রান্সের হয়ে যেন দাবাড়ু! ব্লেইজি মাতুইদি নেই কিন্তু এনগোলো কান্তে আছেন স্বমহিমায়, পাশে পল পগবা। ডিপ ডিফেন্সে যেটুকু ঘাটতি পুষিয়ে দিতে কান্তে-পগবা থাকছেন যেমন, তিনকাঠির তলায় চিরবিশ্বস্ত হুগো লরিস। বিশ্বকাপের মতো আবার তাঁর হাতে ট্রফি না ওঠার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

কোচ দেশমের সামনে এবার অদ্ভুত রেকর্ডের হাতছানি। ফুটবলার-অধিনায়ক হিসাবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ এবং ২০০০ ইউরো জিতেছিলেন। কোচ হিসাবে ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের পর যদি ২০২১ ইউরো জেতেন, ফুটবল-ইতিহাসে অনন্য নজির হয়ে থাকবে এমন ‘ডবল ডাবল’!

খাতাপত্র তুলে রেখে আপাতত টেলিভিশন বা মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখুন। পরে যখন কিছুই মিলবে না, কষে গালাগাল দেওয়ার জন্য এই কলমচির লেখা তো থাকলই ওয়েবসাইটে!