এশিয়া কাপ জয়ের গল্পটা বলতে গেলে আমাকে একটু পেছন থেকে শুরু করতে হবে। টুর্নামেন্টের বছর দেড়েক আগে থেকেই কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। মেয়েরা যে ডোমেস্টিক টুর্নামেন্ট খেলে, সেখানে খেলার ধরনে একটু পরিবর্তন আনা, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব আনা, যারা জাতীয় দলের আশেপাশে আছে, তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করা, উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করা; মোট কথা, একটা ভালো দল গড়ে তোলার জন্য যা যা করা দরকার, তেমনটাই করতে শুরু করেছিলাম আমরা। একটা ভালো দল কিন্তু শুধু ভালো ব্যাটার কিংবা ভালো বোলার দিয়েই গড়ে ওঠে না। ইনডিভিজুয়ালি ভালো খেলা আর চাপের মুখে দল হয়ে ভালো খেলা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ওদেরকে তাই দল হিসেবে কীভাবে ভালো বানানো যায়, প্রথম থেকেই সেটা লক্ষ্য ছিল আমাদের।

২০১৮ এশিয়া কাপের অল্প কিছুদিন আগেই ওয়ানডে আর টি-২০ সিরিজ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিল আমাদের জাতীয় দল। সফরের শুরুর ম্যাচগুলো খুব বাজেভাবে হেরেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারছিলাম না। তবে সিরিজ যত সামনে এগোল, আমরা বুঝতে পারছিলাম, মেয়েরা একটু একটু করে কনফিডেন্স ফেরত পাচ্ছে। সিরিজের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কিন্তু খুব বেশি ছিল না। দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পেরেছিলাম, একটু ভালো ফিল্ডিং করলে দুয়েকটা ম্যাচ আমরা জিততেও পারতাম। প্রত্যেকে ইনডিভিজুয়ালি নিজেদের উন্নতি করছিল, সঙ্গে দল হিসেবেও আমরা আরও বেশি পরিণত হচ্ছিলাম।

এশিয়া কাপে খুব সম্ভবত এটারই একটা প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিলাম। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে হারার পরও আমরা কিন্তু মনোবল হারাইনি। আমরা জানতাম, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমাদের হারা উচিত হয়নি, তবে ওই হারটা আমাদের টলাতে পারেনি। আমাদের মাথা থেকে ওই ম্যাচের স্মৃতি সরিয়ে রাখতে পেরেছিলাম, যে কারণে পরের ম্যাচগুলোতে ওই বোঝাটা আমাদের আর বয়ে বেড়াতে হয়নি। আর তখন এমন একটা ব্যাপার হলো যে, সবাই অবদান রাখতে চাইছিল। যারা ব্যাটার, তারা ভাবছিল একটা  পঞ্চাশ করবে, বোলাররা এমন একটা স্পেল করতে চাইছিল, যেন দল জেতে, খারাপ সময়েও পারফর্ম করতে উদ্দীপনা বোধ করছিল। আর আগে অল্পতে খুশি হওয়ার একটা ব্যাপার ছিল ওদের মধ্যে, তখন সেটাও চলে গেল। আউটস্ট্যান্ডিং কিছু করার, নিজের কন্ট্রিবিউশনে দলকে জেতানোর মানসিকতা গড়ে ওঠেছিল সবার মধ্যে।

যে কারণে ওই টুর্নামেন্টের স্কোরবোর্ডে তাকালে আমরা কিন্তু আউটস্ট্যান্ডিং কিছু পারফরম্যান্স দেখতে পাব। নিগার সুলতানা, ছোটখাটো একটা মেয়ে, ফাইনালে ও একটা ওভারে তিনটা বাউন্ডারি মেরেছিল। তখন যদি এটা ও না করত, তাহলে কিন্তু আমাদের প্রয়োজনীয় রান রেট অনেক বেশি হয়ে যেত। এই যে এক ওভারে তিনটা চার মারার সাহস দেখাল, এই জিনিসটা এর আগে ভাবতেই পারত না ওরা। একটা ২৫-৩০ রানের ইনিংস খেললে তাতে হয়তো ১/২টা চার থাকত। কিন্তু সেদিন এই মেয়েটা একটা ওভারেই ৩টা চার মেরে সবার সাহস বাড়িয়ে দিল।

ফাইনালে জয়সূচক রানের পর মাঠের দিকে আনন্দ-দৌড়। ছবি: এসিসি

তারপর ধরুন রুমানার কথা। শেষ ওভারে আমাদের ৯ রান দরকার ছিল, যেটা কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটে অনেক রান। ওভারের দ্বিতীয় বলেই ও ডাউন দ্য উইকেটে এসে এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে যে শটটা খেলার সাহস করেছিল, এটা ছিল দারুণ।

বলতে হবে শামীমা আর আয়েশার ওপেনিং জুটির কথাও। সব সময় ওরা হয়তো ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি, তবে প্রত্যেক ম্যাচেই একটা পজিটিভ স্টার্ট এসেছিল ওদের ব্যাটে। ভারতের সঙ্গে ১৪২ রান তাড়া করলাম আমরা যে ম্যাচটায়, সেখানেও ওরা কিন্তু দ্রুতগতির একটা শুরু এনে দিয়েছিল। এখনো ১৪২ রান করতে আমাদের ব্যাটারদের বেগ পেতে হয়। কিন্তু সেদিন আমাদের খেলার ধরন দেখে ভারতীয় খেলোয়াড়েরাই চাপে পড়ে গিয়েছিল। এমনিতে কী হয়, আমাদের মতো একটা দলের বিপক্ষে ওরা যদি ১০০ রানও করে, জয়টা নিশ্চিত বলে ধরে নেয়। আমরা ৭০-৮০ রানের মধ্যে অলআউট হয়ে যাব, এমন মানসিকতা নিয়ে প্রতিপক্ষ ফিল্ডিং করতে নামে। কিন্তু সেদিন যখন আমরা পাল্টা আক্রমণ করলাম, মাঠের বাইরে থেকে আমরা বুঝতে পারছিলাম, আমাদের খেলার ধরনে ওরা চাপে পড়ে যাচ্ছে। আমাদের কাছ থেকে এটা ওরা আশা করে নাই।

পুরো টুর্নামেন্টেই আমরা এমন সাহসী মনোভাব দেখিয়েছিলাম। ব্যাটিংয়ে, বোলিংয়ে, ফিল্ডিংয়ে, কথাবার্তায়…. একটা ইতিবাচক মানসিকতা প্রদর্শন করেছিলাম। ফাইনালে শেষ ওভারে যখন পরপর ২ উইকেট পড়ে গেল, তখনও আমরা খেই হারাইনি কিন্তু। এমনকি বলে যখন ২ রান লাগবে, জাহানারার ব্যাটিং দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওর ভেতরে বাড়তি কোনো চাপ নেই। ওকে কাজটা করতে হবে, এই ভাবনাতেই ও বদ্ধপরিকর। নইলে কী হতো, ব্যাট সুইংটা ঠিকঠাক হতো না, বল মাটিতে না রেখে হাওয়ায় ভাসিয়ে খেলত। কিন্তু জাহানারা খুব সুন্দর করে বলটা মিড উইকেটে পাঠিয়ে দিল, দৌড়ে দুই রান নিয়ে আমাদের জয় এনে দিল।

 জয়ের আনন্দ! এশিয়া-সেরা বাংলাদেশ দল : এসিসিএমনিতে ভারতের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য অনেক বেশি। ফাইনালে ভারতও ১০০ রানের বেশি করে ফেলেছিল, মেয়েদের ক্রিকেটে যেটা অনেক রান। আর আমাদের ব্যাটিংটাও খুব বেশি ভালো ছিল না কখনোই। কিন্তু আমরা সেদিন সাহস করেছিলাম, ফিয়ারলেস ক্রিকেট খেলেছিলাম। পুরো খেলার মধ্যেই আমরা জেতার কথা ভাবছিলাম, এটাই বোধ হয় আমাদের সাফল্য এনে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে এটা ছিল অসাধারণ একটা টিম এফোর্ট। মেয়েরা এমন একটা ইতিহাস গড়ল, যেখানে এর আগে ছেলেরাও পা রাখতে পারেনি। তবে ওই সাফল্যটা আমরা বোধ হয় পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। কেন পারিনি, আরও কী কী করতে পারতাম আমরা--সেই আলোচনা অনেক বিস্তৃত পরিসর দাবি করে।  তা বরং আরেকটা লেখার জন্যই তোলা থাকুক।