ওই জয়ের অনুভূতিটা আসলে বলে বোঝানো যাবে না। এরপরে আমরা আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট জিতেছি, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছি; তবে সর্বপ্রথম শিরোপাটা আমরা প্রমীলা দলই এনেছি, তা-ও আবার এশিয়া কাপের মতো এত বড় একটা ট্রফি...এটা খুবই আনন্দ দেয় আমাকে। শুধু আমি বলাটা ঠিক হবে না, আমরা সবাই ওই জয়টা নিয়ে খুব গর্ব বোধ করি। সেদিন আবার ছিল (নাজমূল আবেদীন) ফাহিম স্যারের জন্মদিন। আমাদের দলের ম্যানেজার ছিলেন উনি। তাঁর জন্মদিনে আমরা তাঁকে একটা ট্রফি গিফট করতে পেরেছি, এটা ভাবলেও খুব ভালো লাগে।

সেদিনের ম্যাচের ভিডিওটা এখনো মাঝেমধ্যে বের করে দেখি। তখন ড্রেসিংরুমের কথা মনে পড়ে আমার। দু'দলের ড্রেসিংরুমেই খুব টেনশন কাজ করছিল। ম্যাচটা একবার ওদের পক্ষে যাচ্ছিল, একবার আমাদের পক্ষে--কী যে একটা অবস্থা! তবে আমার মনে সব সময়ই ছিল, রুমানা যদি শেষ পর্যন্ত খেলতে পারে, আমরাই তাহলে জিতব। ও যখন (শেষ ওভারের) দ্বিতীয় বলে চার মারল, তখন মনে হলো, 'এবার হবেই।' কিন্তু চতুর্থ বলেই আউট হয়ে গেল ও, ড্রেসিংরুমে তখন কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

ছবি: এসিসি

তবে আমি নরমালই ছিলাম। পরের বলে ময়নাও ফিরে আসলে আমি নামলাম। শেষ বলে নেমেছিলাম। জানতাম, ব্যাটিং পাব না, আমার কাজ শুধু দৌড়ানো। তখন ১ বলে ২ রান দরকার। এরকম মোমেন্ট এর আগে অনেকবারই আমাদের ভাইয়ারা ট্রফি আনতে পারেনি। আমি যখন নামছিলাম, আল্লাহর কাছে কেবল চাইছিলাম, ম্যাচটা যেন আমরা জিততে পারি। উইকেটে যাওয়ার পরে আমি জাহানারাকে বলেছিলাম, 'জাহানারা, সব কিছু আল্লাহ-পাকের ইচ্ছা। বল ব্যাটে লাগলে যেখানেই যাবে, আমরা দুই রানই নেব। এরপর যা হওয়ার হবে।'

জাহানারাও বলল, 'হ্যাঁ, আপা। আল্লাহ ভরসা, আমরা জিতব।' ওই রকম সময়েও আমরা মনোবল হারাইনি। আমাদের চিন্তাই ছিল, যেভাবেই হোক, দুবার দৌড়াতেই হবে। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, হারমানপ্রীত কৌর বল করার আগেই আমি নন-স্ট্রাইক এন্ডের ক্রিজ ছেড়ে অর্ধেক পথ এগিয়ে গিয়েছিলাম।

পরে তো জিতেই গেলাম। আর আমি তো তখন দলের ক্যাপ্টেনও। আমার নেতৃত্বে এত বড় একটা ট্রফি আসবে, এটা কখনো কল্পনাও করি নাই। দিনটার কথা এখনো যখন মনে পড়ে, অনেক বেশি গর্ব বোধ করি।

আমাদের শিরোপা জয়ের পেছনে ফাহিম স্যারকেও কৃতিত্ব দেব আমি। সাধারণত আমরা তাঁকে পাই না, তবে ওই টুর্নামেন্টে আমরা যে তাঁকে পেয়েছিলাম, এটা  আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি ছিল। উনি আমাদের নিজের মেয়ের মতো দেখতেন। আমাদের সবার সঙ্গে কথা বলে উনি বোঝাতে চাইতেন, আমরা সবাই যেন নিজেদের একটা পরিবারের মতো মনে করি।

আমাদের এশিয়া কাপটা কিন্তু ভালোভাবে শুরু হয়নি। তবে উনি কখনোই আমাদের ভেঙে পড়তে দেননি। কখনো নেগেটিভ কোনো কথা বলতেন না। উনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের পক্ষেও ভালো কিছু করা সম্ভব এবং সেই বিশ্বাসটা আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। বলতেন, 'আমার মধ্যে যেই বিশ্বাসটা আছে তোমাদের নিয়ে, তোমরাও সেই বিশ্বাসটা নিজেদের ভেতর জন্মানোর চেষ্টা করো। তাহলেই তোমরা পারবে।' স্যারের কাছ থেকে বারবার এইরকম মোটিভেশন পেয়ে আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম। প্রথম ম্যাচের পর থেকেই তাই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিলাম আমরা।

ছবি: এসিসি

তো এরই মধ্যে তো তিন বছর পার হয়ে গেল ওই অর্জনের। এরপর বলতে গেলে আমাদের খেলাই হয়নি তেমন। ওয়ার্ল্ড কাপ খেললাম, খুব একটা ভালো করতে পারিনি সেখানে। তারপর করোনা চলে এলো। আমাদের না খেলার পেছনে কারোরই তাই হাত নেই। তবে আমরা আবার খেলায় ফিরতে চেষ্টা করছি। এই বছরের জানুয়ারি থেকে তিন মাসের একটা ক্যাম্প করেছি। তবে আবারও করোনা বেড়ে যাওয়াতে ক্যাম্প বন্ধ আছে এখন। এখন তাই ঘরে বসেই নিয়মিত ফিটনেস ট্রেনিং করছি, মাঠে যাওয়ার সুযোগ পেলে ব্যাটিং-বোলিংও প্র‍্যাকটিস করছি। কোচ-ট্রেনারদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। আর সামনেই যেহেতু ওয়ার্ল্ড কাপ কোয়ালিফায়ার, আমরা সবাই তাই সবার জায়গা থেকে নিজেদের প্রস্তুত রাখার চেষ্টা করছি।

বিসিবিও বসে নেই। তারাও চেষ্টা করছে, আমাদের জন্য ঘরোয়া কিংবা আন্তর্জাতিক ম্যাচের আয়োজন করতে। আর কিছুদিন আগেই তো টেস্ট স্ট্যাটাস পেলাম আমরা। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই টেস্ট খেলার স্বপ্ন দেখে এসেছি। অন্তত একটা টেস্টে হলেও মাঠে নামব আমি, এরকমই একটা আশা ছিল। টেস্টের জার্সি-ক্যাপ-বল, সবকিছুই আমাকে খুব টানে। যদি সুস্থ থাকি, সুযোগ পাই, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটা টেস্ট খেলতে চাই। বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে ওদের বিপক্ষে একবার খেলার সুযোগ পেয়েছি, সেখানেই ওদেরকে খুব মনে ধরেছে। ওদের টিম, কালচার...সবকিছুই খুব ভালো লাগে আমার। যদি সুযোগ পাই, ওদের বিপক্ষেই প্রথম টেস্টটা খেলতে চাই।