শারীরিক ক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য সেই প্রাচীনকাল থেকে কুস্তির প্রচলন। আমাদের এই অঞ্চলেও এর রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। মোগল আমল থেকে এর চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার কমতি ছিল না। রাজা, বাদশা, জমিদার পর্যায়ের ব্যক্তিরা ক্ল্যাসিকাল সংগীতশিল্পীদের পাশাপাশি কুস্তিগীরদেরও পরিপালন করতেন। ব্রিটিশ আমলেও এর যথেষ্ট কদর ছিল। সেই সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে কুস্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয় কুস্তির আখড়া। সেই ঐতিহ্য অনুসারে কুস্তির চল অব্যাহত থাকে। উপমহাদেশের কোথাও কুস্তি আয়োজিত হলে দর্শকদের ভিড় লেগে যায়। টিভিতে সম্প্রচারিত রেসলিংয়ের রয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। এটাই অনেকের কাছে বিনোদনের খোরাক। যে কারণে হোক কুস্তির প্রতি একটা সহজাত আকর্ষণ বরাবরই রয়ে গেছে। একে অপরকে মারপ্যাঁচ দিয়ে ঘায়েল করার মধ্যে দৃষ্টিসুখের একটা ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে। সর্বোপরি মানুষের প্রবৃত্তির মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। বক্সিং-রেসলিংয়ের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণের এটাও হয়তো একটা কারণ। যে কারণে দুই কুস্তিগীরের একে অপরকে ধরাশায়ী করার বুনো কৌশলের মধ্যে দর্শকরা এক ধরনের একাত্মতা অনুভব করেন। খুঁজে পান আনন্দের উপাদান। আবদুল জলিল

বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক তো বটেই যে কোনো কুস্তি প্রতিযোগিতা আয়োজিত হলে দর্শকের অভাব হয় না। বিশেষ করে কুস্তির বড় বড় আসরকে কেন্দ্র করে রীতিমতো মানুষের ঢল নামে। চট্টগ্রামের জব্বারের বলী খেলা একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এ থেকে এ দেশের মানুষের কুস্তির প্রতি টান অনুধাবন করা যায়। এত সমাদর থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কুস্তিগীররা মোটেও সুবিধা করতে পারেননি। এমনকি এসএ গেমসেও পাওয়া যায়নি কোনো স্বর্ণপদক। তাতে করে অবশ্য এই খেলাটির প্রতি দর্শকদের আকর্ষণ কখনও থিতিয়ে যায়নি। 

কুস্তিগীর বললে এখনো অনেকের মানসপটে ভেসে ওঠে মোহাম্মদ আবদুল জলিল মোল্লার কথা। তিনি পরিচিত ‘টাইগার জলিল’ নামে। আন্তর্জাতিক কুস্তি প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তাঁর তেমনভাবে হয়নি। একবারই ১৯৭৮ সালের থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অষ্টম এশিয়ান গেমসে অংশ নেন। কুস্তির সুপার হেভিওয়েট ক্যাটাগরিতে পঞ্চম হন এবং গেমসের সাংগঠনিক কমিটির দেওয়া ডিপ্লোমা লাভ করেন। আন্তর্জাতিক কুস্তিতে কোনো পদক না পেলেও তিনি ব্যাপক ক্রেজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। 

১৯৮২ সালে ঢাকায় আয়োজিত ফ্রিস্টাইল কুস্তি প্রদর্শনীতে পাকিস্তান, ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের কুস্তিগীররা অংশ নেন। আর বাংলাদেশ থেকে একমাত্র আবদুল জলিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান। ভারতের সুপার হেভিওয়েট সত্যনারায়ণ খান্নার চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়ে তাঁর সঙ্গে সমান তালে লড়াই করে চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ লড়াইটি বেশ সাড়া জাগায়। তখন থেকেই তিনি টাইটেল পান ‘টাইগার অব বেঙ্গল’। সে বছর তিনি অংশ নেন দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক কুস্তি প্রতিযোগিতায়। ১৯৮৩ সালে দুবাই ও আবুধাবিতে আন্তর্জাতিক ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে অংশ নিয়ে ভারতের কুয়াল সিং, অজিত সিং, ডি এন নন্দকে হারিয়ে দেন। আর আনন্দ রায়ের সঙ্গে দু’দিন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করার পরও অমীমাংসিত থাকে। ১৯৮৪ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে জ্যামাইকার ‘টাইগার লুইস’ খ্যাত লিনড্যাল হেনল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের ‘বুলডগ’ খ্যাত ম্যাক আর্থারকে হারিয়ে দিয়ে কুস্তিগীর হিসেবে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন। আর্থার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলে তা গ্রহণ করেন জলিল। ২৫০ ওজনের আর্থারকে বোস্টন ক্রাব প্যাঁচ প্রয়োগ করে তিনি ধরাশায়ী করেন। 

জলিলের পারিবারিক ও গ্রামের পরিবেশ ছিল খেলাধুলার অনুকূলে। কুস্তি, হাডুডু, লাঠি খেলার জন্য তাঁদের গ্রামের বেশ সুখ্যাতি ছিল। এসব খেলায় যে প্রতিযোগিতা হতো, তাতে আধিপত্য ছিল তাঁদের পরিবারের। তাঁরা সাত ভাই হাডুডু ও কুস্তিতে অতুলনীয় ছিলেন। পারিবারিক রীতি মেনে জলিলকে কুস্তির দীক্ষা দেওয়া হয়। তবে তাঁর দীক্ষা হয় মন খারাপের অনুভূতি দিয়ে। অল্প বয়সে একজন সিনিয়র কুস্তিগীরের সঙ্গে লড়াই করার জন্য তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়। জীবনের প্রথম লড়াইয়ে তিনি হেরে যান। এই দুঃখ তিনি ভুলতে পারেননি। এই পরাজয় তাঁকে অসম্ভব জেদি ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে। তারপর একজন ওস্তাদের অধীনে চলে দিনের পর দিন কষ্টকর প্রশিক্ষণ, কঠিন অনুশীলন আর কঠোর সাধনা। 

নিজেকে একজন দক্ষ কুস্তিগীর হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর ছিল ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও গভীর আন্তরিকতা। তাঁর এই অধ্যবসায়, উদ্যম ও পরিশ্রম বৃথা যায়নি। খুব দ্রুতই কুস্তিগীর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তাঁর সুখ্যাতি। কুস্তিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু লড়াকু মেজাজই নয়, তাঁর শো অফ, তর্জন-গর্জন দর্শকদের সহজেই আকৃষ্ট করত। তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে বিভিন্ন স্থানে তাঁকে নেওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। 

গ্রামের স্কুলের ছাত্র অবস্থায় হাডুডু অর্থাৎ কাবাডি খেলায় তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন। অবশ্য তাঁদের পরিবারকেই বলা যায় কাবাডি পরিবার। তাঁদের সাত ভাইকে নিয়ে গড়া দলটি ছিল আশপাশের গ্রামে অনেকটা অপরাজেয়। সে সময়কার একটা পরিসংখ্যান দিলে কিছুটা হলেও জলিলের কীর্তি ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের গ্রামে কুস্তি ও হাডুডু খেলায় সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তিনি পুরস্কার পেয়েছেন ৭৫টি মেডেল, ৫৫টি গরু, ৭টি ছাগল, ৫৬টি পিতলের কলস, ২টি টেবিল ঘড়ি। এছাড়া গামছা ও রুমাল যে কত পেয়েছেন, তার কোনো হিসাব নেই। এই তথ্যও পূর্ণাঙ্গ নয়। এটি ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। 

তখনকার গ্রামীণ পটভূমিতে এই পুরস্কারের অর্থ মূল্যের চেয়ে সম্মান ও মর্যাদাই ছিল অনেক বেশি। তাঁর জীবনের সেরা খেলা খেলেন ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে কবি জসীম উদদীন স্মৃতি হাডুডু টুর্নামেন্টের ফাইনালে। প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে সোনার মেডেল জয় করে নেন।

তবে পুরস্কারগুলো তাঁর পক্ষে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। আর্থিক প্রয়োজনে তা বিক্রি করে দিতে হয়েছে। শরীর-স্বাস্থ্য ফিট রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ত পর্যাপ্ত খাদ্য। তাঁর তেমন কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। খাদ্যের ব্যবস্থা করতে গিয়েই প্রাপ্ত পুরস্কারগুলো তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। 

জলিল পুলিশে যোগ দেন ১৯৬৭ সালে। মুক্তিযুদ্ধে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দেন। স্বাধীনতার পর কুস্তিতে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। রপ্ত করেন আধুনিক কুস্তির কলাকৌশল। ১৯৭৫ সালে জাতীয় কুস্তি প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশ নিয়ে হেভিওয়েট ২২০ পাউন্ড ক্যাটাগরিতে জয় করেন স্বর্ণপদক। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তাঁর ক্যাটাগরিতে তিনি ছিলেন অপরাজেয়। ১৯৮১ সালে তিনি রৌপ্যপদক পাওয়ার পর বুঝতে পারেন, তাঁর সরে যাওয়ার সময় এসেছে। এরপর তিনি ঝুঁকে পড়েন প্রদর্শনী কুস্তিতে। তাতেই তাঁর নামডাক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। 

কুস্তিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করার পর জলিল ভারোত্তোলন আর জুডোতেও পারদর্শিতা দেখান। বরং ভারোত্তোলনেই তাঁর সাফল্যের পাল্লা ভারী। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ১১০ কেজি বিভাগ সুপার হেভিওয়েটে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭৮ সালে জাতীয় জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি প্লাস ১৬০ পাউন্ডে জয় করেন স্বর্ণপদক। কিন্তু কুস্তিগীর হিসেবেই তিনি ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। এর কারণ, গ্রামে-গঞ্জে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা আর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কুস্তি প্রতিযোগিতায় চমক জাগানো নৈপুণ্য। বিশেষ করে তাঁর শো-ম্যানশিপ দিয়ে সবার নজর কেড়ে নিতেন। এ কারণে কুস্তিগীর হিসেবে তাঁর আলাদা একটা গ্ল্যামার ছিল। এ ক্ষেত্রে তাঁর আগে-পরে এমন কেউ আর আসেনি বাংলাদেশের কুস্তিতে। 

তিনি বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনের সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কুস্তি রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক কুস্তি সংস্থার রেফারি ছিলেন। সংগঠক ও কোচ হিসেবেও তিনি ভূমিকা রাখেন। খেলার পাশাপাশি প্রশিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন খেলায় পুলিশ দলের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে কার্যকর অবদান। খেলার মাঠে তাঁর উপস্থিতি আলাদা একটা প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করত। পুলিশের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ১৯৯৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। 

বাংলাদেশের কুস্তিকে গ্ল্যামারাস করার ক্ষেত্রে আবদুল জলিলের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তিনি সরে যাওয়ার পর কুস্তি যেন অনেকটাই অনুজ্জ্বল হয়ে পড়ে। তাঁর সহজাত দক্ষতা, তাঁর শো-ম্যানশিপ, তাঁর বর্ণিল ব্যক্তিত্ব কুস্তিকে দিয়েছিল নতুন মাত্রা। কুস্তি খেলাকে নাগরিক বলয়ে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।