দশ বছর ধরে আমেরিকায় স্থায়ী হয়ে থাকার পরও কেন ‘ইয়েস’ ‘নো’ ‘ভেরি গুড’ মার্কা ইংরেজির বাইরে কিছু বলতে পারেন না, তা একটা রহস্যই। কীভাবে এই ‘অসম্ভব’ সম্ভব হলো—এটা জিজ্ঞেস করা কেমন দেখায় বলে এই রহস্য আর ভেদ করা হলো না। তবে অন্য একটি রহস্যের মীমাংসা হলো। কার্লোস ভালদেরামার মাথায় কদমফুলের মতো হলদেটে চুলগুলো একেবারে আসল। ওগুলো পরচুলা নয়।

বিশ্বকাপে বর্তমান তারকাদের নিয়ে লিখতে গিয়েই পত্রিকার পাতায় জায়গা হচ্ছে না। এর মধ্যে ভালদেরামার মতো সাবেকের চুল নিয়ে পড়লাম কেন? ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ভালরেদামাকে যাঁরা দেখেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর তাঁদের জানা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত খেলোয়াড়ের মধ্যে অবশ্যই পড়েন না, তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিখ্যাত হেয়ার স্টাইলটি যে অবশ্যই তার। 

স্ত্রী এলভিরার সঙ্গে কার্লোস ভালদেরামা। চুলের বাহার কারোরই কম নয়!

খেলতেনও খুব খারাপ নয়, বাহারি চুলের জন্য তো আর ১৯৯৩ ও ২০০৩ সালে দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হননি। ২০০৪ সালে পেলের করা ১২৫ জন সেরা জীবিত ফুটবলারের যে তালিকা নিয়ে এত হইচই, সেই তালিকায়ও ছিলেন মাঝমাঠে একেবারেই শরীর-অনির্ভর তার সৃষ্টিশীল খেলার কারণেই। তবে সব কিছুর পরও ওই কদমফুলের মতো চুলই ভালদেরামার ট্রেডমার্ক, এটা দিয়েই তাকে চেনে ফুটবল বিশ্ব। সাবেক কলম্বিয়ান অধিনায়ককে আমিও এভাবেই চিনলাম।

মিউনিখ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ স্টেডিয়াম থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বিশাল ভবনটিকে বলতে পারেন এই বিশ্বকাপের প্রাণকেন্দ্র। সংক্ষেপে আইবিসি, পুরো নাম ইন্টারন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং সেন্টার। দু শ’রও বেশি দেশে বিশ্বকাপের টিভি সম্প্রচারের মূল কন্ট্রোলরুম এটি। বিশ্বের বিভিন্ন টিভি ও রেডিও স্টেশনের স্টুডিও এখানে। সাংবাদিকদের জন্যও কাজ করার বিশাল জায়গা। গত পরশু আইবিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুখেই ঢুকতে দেখলাম ভালদেরামাকে। এমনিতে আইবিসিতে সাবেক বিশ্বকাপ খেলোয়াড় একেবারেই ডালভাত। বেশির ভাগই কাজ করছেন টিভি ও রেডিওতে কমেন্টটর হিসেবে। তবে দুঙ্গা বা বোরা মিলুটিনোভিচের মতো সবার চেহারা তো পরিচিত নয়। তাঁদেরকে চিনতে হচ্ছে বুকে ঝোলানো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডে নাম দেখে। ভালদেরামার ক্ষেত্রে এ সমস্যা নেই। তাঁর মাথায় যে এখনো সেই ট্রেডমার্ক।

সর্বশেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ১৯৯৪ সালে। জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়েছেন এর পরই। অথচ এই কদিন আগেই প্রথম আলোর এক পাঠক ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, ভালদেরামার চুলগুলো আসল কি না। এক বন্ধু তাকে বলেছেন, ওটা নাকি পরচুলা। মজা করেই তাকে বলেছিলাম, ‘বিশ্বকাপে যাচ্ছি। ভালদেরামার সঙ্গে দেখা হলে জেনে আসব।’ তখন ভাবিওনি, কাকতালীয়ভাবে প্রথম দিনেই ভালদেরামার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে! 

ভালদেরামার চুল নিয়ে ওই সংশয়েরও একটা ইতিহাস আছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে কলকাতার একটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ভালদেরামার যে চুল নিয়ে এত কথা, সেটি আসলে পরচুলা। সেই পত্রিকাকে উত্স মেনে বাংলাদেশের কিছু পত্রপত্রিকায়ও তা ছাপা হয়ে যায়। তখন এটি বড় খবরই ছিল। ফুটবল-সৌন্দর্যের পূজারি ফ্রান্সিসকো মাতুরানার কোচিংয়ে কলম্বিয়া তখন নয়নজুড়ানো ফুটবল খেলছিল। বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনাকে বুয়েনস এইরেসে ৫-১ গোলে হারানোর পর ’৯৪ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিটও ধরা হচ্ছিল তাদের। আর ভালদেরামা তখন সেই কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা। 

মাথার চুলগুলো কি আসল—এটা জিজ্ঞেস করতেই ভালদেরামার স্প্যানিশ আর আমার ইংরেজির মধ্যে সেতু নির্মাণ করা হুয়ান র‍্যামন নামে বছর পঁয়ত্রিশের কলম্বিয়ান সাংবাদিক হেসে বললেন, ‘অবশ্যই আসল। আমি ওকে অনেক বছর ধরে চিনি।’ ভালদেরামাকে বলতেই হেসে কী যেন বললেন। র‍‍্যামন জানালেন, ‘ও বলছে, চাইলে তুমি চুল টেনে দেখতে পারো।’

এমন বাহারি চুল! এই চুলের পেছনে নিশ্চয়ই অনেক সময় দিতে হয়! দোভাষী মারফত প্রশ্নটা করলামও।

ভালদেরামা মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালেন, স্নান করার পর এমন করলেই হয়। বাড়তি আর কিছু করতে হয় না তাঁকে। 

যে দুটি বিশ্বকাপ খেলেছেন, পুরো বিপরীত অভিজ্ঞতা হয়ে আছে তা। ১৯৯০ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেই প্রচুর হাততালি পেয়েছিল কলম্বিয়া। গোলরক্ষক রেনে হিগুইতার পাগলামিতে (বক্সের বাইরে ড্রিবলিং করতে গিয়ে রজার মিলার পায়ে বল বিসর্জন দিয়ে গোল খেয়ে বসেন) ক্যামেরুনের কাছে হেরে না গেলে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাটাও খুবই সম্ভব ছিল। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ হয়ে আছে শোচনীয় ব্যর্থতা, অন্যতম ফেবারিট হয়েও প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে আত্মঘাতী গোল করার ‘অপরাধে’ আন্দ্রেস এস্কোবারকে প্রাণ দিতে হওয়ায় কলম্বিয়ার জন্য রীতিমতো দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে সেই বিশ্বকাপ। এরই জের হিসেবে কি না, পরের দুটি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বেই উঠতে পারেনি তারা।

ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে ভালদেরামা

ভালদেরামা অবশ্য বেশ কজন উদীয়মান কলম্বিয়ান তরুণ খেলোয়াড়ের নাম উল্লেখ করে মোটামুটি নিশ্চিত কণ্ঠে জানালেন, আগামী বিশ্বকাপে কলম্বিয়া থাকবেই। সেই দলের কোচের নাম কি কার্লোস ভালদেরামা হবে? এই স্বপ্নের কথা আগেই জানিয়েছেন। তবে আপাতত ভালদেরামা তা নিয়ে ভাবছেন না, ভাবছেন শুধুই এই বিশ্বকাপ নিয়ে। ভাবতে হচ্ছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের একটি টিভি কোম্পানিতে যে বিশেষজ্ঞ ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করছেন। তা তার বিশেষজ্ঞ মত কী বলে—কে জিতবে বিশ্বকাপ? ভালদেরামার ফেবারিট ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এবং প্রায় সবার মতো তাঁরও বিশ্বাস, এটি হবে রোনালদিনহোর বিশ্বকাপ।

দশ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর সকার লিগে খেলতে গিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে ২২ বছরের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানার পর স্থায়ী হয়ে গেছেন টাম্পাতে। সেখানে টুকটাক কোচিং করাচ্ছেন, তবে স্বপ্ন একটাই—কলম্বিয়া জাতীয় দলের কোচ হওয়া। একদিন যদি এই স্বপ্ন পূরণ হয়, খেলা যেমনই হোক, অন্তত হেয়ারস্টাইলের দিক থেকে দেখার মতো হবে সেই দল!