ড্রেসিংরুমের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ে ডুবিয়ে বিস্কিট খেতে খেতে কথা বলছিলেন। পরদিন শুরু হতে যাওয়া টেস্টের শেষ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে একটু আগে। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের পরনে তখনো ট্র্যাকস্যুট। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, তার চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তার। ঠোটের ওপর মাত্র উঁকি দিতে শুরু করা গৌফজোড়া তখন একেবারেই সাম্প্রতিক সংযোজন। তার ফাঁক দিয়ে একবারের জন্যও হাসি-টাসি জাতীয় কিছু উঁকি দিতে দেখা গেল না। পরদিন থেকে শুরু হতে যাওয়া টেস্টটি যখন বলতে গেলে জীবন-মরণের প্রশ্ন, তখন হাসি মহাশয় দেখাই বা দেন কীভাবে?

বছর তিনেক আগে চণ্ডীগড়ে নিজেদের পছন্দমতো বানানো এক টার্নিং ট্র্যাকে বাঁহাতি স্পিনার ভেংকটপতি রাজুর বীরত্বে একটি টেস্ট জেতা গিয়েছিল। ওই একটিই। এর আগে-পরে যে ১৬টি টেস্টে টস করতে নেমেছেন আজহার, তার ৭টিতেই হেরেছে ভারত। নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলা দেশের বাইরে টানা চারটি সিরিজও হারা হয়ে গেছে এতে। প্রথম তিনটি সিরিজে দল হারলেও অধিনায়কের ব্যাটে যা হোক রানের ফুল ফুটেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’ এ রানের সঙ্গে আজহারের কোনো ফ্রেন্ডশিপই হলো না। ১৯৮৭ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে গ্রাহাম গুচের সুইপে ক্যাপ্টেনসি হারানো কপিল দেবকে ফিরিয়ে আনার পক্ষে বলতে গেলে তখন পুরো ভারতের জনমত। কেউ কেউ দিচ্ছেন রবি শাস্ত্রীর অব্যবহৃত ক্রিকেট মস্তিষ্কটা দেরিতে হলেও কাজে লাগানোর পরামর্শ। কিন্তু রাজ সিং দুঙ্গারপুরের ‘মিয়া, ক্যাপ্টেন বনোগে' জিজ্ঞাসায় সম্মতি দিয়ে '৯০-এর নিউজিল্যান্ড সফরে অবিশ্বাস্যভাবে যার ভারতীয় দলের অধিনায়ক হয়ে যাওয়া, সেই আজহারউদ্দিনকে অধিনায়ক রেখে দেওয়ার কথা কেউ বলছেন না।

একজন নাকি বলেছিলেন। যাঁর অধিনায়কত্বে ভারত একই বছরে (১৯৭১) ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডকে ওদের মাঠেই হারিয়েছিল, সেই অজিত ওয়াড়েকার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেই ভারতের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনিই নাকি বোর্ডের কর্তাব্যক্তিদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আজহারকে আর একটি সুযোগ দিতে রাজি করান। 'এত দিন তো দেশের বাইরে বাইরেই খেলা হলো। দেশে একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন না। আমার মাথায় কিছু প্ল্যানও আছে'–এ রকমই কিছু বলে থাকবেন অজিত ওয়াড়েকার।

খেলোয়াড়দের কড়া 'কোড অব কনডাক্ট'-এর নিগড়ে বাঁধাটা ছিল ওয়াড়েকারের প্ল্যানের একটা অংশ এবং খুবই ছোট একটা অংশ। পরিকল্পনার আসল অংশটা ছিল উইকেট নিয়ে এবং সেটিই ঠিক করে দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের পরের কয়েক বছরের গতিপথ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যেভাবে এসেছিল অধিনায়ক আজহারের একমাত্র জয়, সেই চণ্ডীগড় টাইপের উইকেট বানিয়ে তাতে তিন স্পিনার নামিয়ে দাও–ওয়াড়েকারের এই পরিকল্পনার প্রথম পরীক্ষা ছিল ওই কলকাতা টেস্ট।তবে আসল পরীক্ষাটা তো আর ওয়াড়েকারকে দিতে হয়নি, সেটি ছিল মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনেরই। পুরো সিরিজ নয়, নির্বাচকরা তাঁকে অধিনায়ক নির্বাচিত করেছিলেন শুধুই প্রথম টেস্টের জন্য। আজহারের জন্য কলকাতা টেস্ট তাই রূপ নিয়েছিল সত্যিকার এক ট্রায়াল ম্যাচের এবং তাতে যে শুধু ভালো করলে চলবে না, করতে হবে অসাধারণ কিছু, আজহারউদ্দিন তা ভালোই জানতেন।

জানতেন বলেই টেস্ট শুরুর আগের দিন তার মুখে অমন মেঘের আঁকিবুকি। সেই মেঘের মধ্যেও এক ঝলক আলোর দেখা মিলেছিল 'পরীক্ষার হল'টির প্রসঙ্গ ওঠায়। কলকাতার ইডেন গার্ডেনে খেলা, আট বছর আগে এই মাঠেই সেঞ্চুরি দিয়ে শুরু হয়েছিল টেস্ট ক্যারিয়ার। দুবছর পর পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা পরের টেস্টেও সেঞ্চুরি। পরের বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্যর্থ, ইডেনে সেঞ্চুরি না পাওয়াটাই তখন আজহারের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত, নইলে ৬০ রান করাটাকে কি ব্যর্থতা বলা যায়? এক সাংবাদিক এসব মনে করিয়ে দেওয়ায় প্রথমবারের মতো একটু উজ্জ্বল হতে দেখলাম আজহারের মুখটা। শুরু থেকেই এটা তার লাকি মাঠ। হায়দরাবাদের এক স্কুলের পক্ষে এই মাঠে তাঁর যে প্রথম ম্যাচ, তাতেও রান পেয়েছিলেন তিনি—এ কথা জানানোর সময় একটু যেন হাসির রেখাও দেখা গেল ঠোটে।

 'সেই সব ইনিংস' বইয়ের জন্য শিশির ভট্টাচার্য্যের আঁকা আজহারউদ্দিনের কার্টুন

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ওই পুরো সময়টায় এই একটা প্রসঙ্গেই অফ স্টাম্পের বাইরে তৃতীয় স্টাম্প থেকে ফ্লিক করে বল মিড উইকেট বাউন্ডারিতে পাঠানোর মতো স্বচ্ছন্দ মনে হলো আজহারকে। ইডেন গার্ডেনে তার অতীত রেকর্ড যেন নিকষ কালো সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে ক্ষীণ একটা আলোর রেখা। কল্পচোখে পরদিনের ইনিংসটিও যেন দেখে নিলেন তখনই। সত্যিই কি তা-ই? সন্দেহ হয়। পরদিন যে ইনিংসটি খেললেন আজহার, তার নাগাল পাওয়া কল্পনার জন্যও তো একটু কঠিনই।

লাঞ্চের পর ভারতের তৃতীয় উইকেট পতন মাঠে নামাল আজহারকে। অপরাজিত ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের নামের পাশে তখন ৯ রান। নতুন ব্যাটসম্যানের সঙ্গে ৯ রানের পার্থক্যটা ক্রমেই বাড়বে বলেই ধরে নিয়েছিলেন সবাই। ফর্মের জন্য সংগ্রামরত কারো সঙ্গে 'ভবিষ্যৎ বিশ্বসেরা' বলে মোটামুটি স্বীকৃত কোনো ব্যাটসম্যানের পার্টনারশিপে সেটি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটল অস্বাভাবিক ব্যাপারটিই। কে বলে আজহার ফর্মে নেই, শুরু থেকেই তো তাঁর ব্যাট থেকে বের হয়ে আসছে চোখ ধাঁধানো সব শট।

প্রথম দিনের শেষে ভারত ৪ উইকেটে ২৬৩, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন অপরাজিত ১১৪। খেলেছেন ১২৫ বল, ১১৪ রানের ৭৬-ই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। ৭৯ বলে করা ফিফটিতে ৮টি বাউন্ডারি, যার একটিও ব্যাটের কানায়-টানায় লেগে নয়, সবগুলোই অসাধারণ টাইমিং আর প্লেসমেন্টের ফসল--ফর্মের জন্য সংগ্রামরত একজন ব্যাটসম্যানের জন্য খুব খারাপ নয়! ব্যাটের ভাষা একটুও বুঝতে দেয়নি, তবে শুরুতে আজহারের আত্মবিশ্বাসের গ্রাফটা বেশ নিচুর দিকেই থাকার কথা। ফিফটি পেয়ে যাওয়ার পর তা আর থাকল না, তা ছাড়া এই দিনগুলো ব্যাটসম্যানরা কীভাবে যেন বুঝতে পারেন, আজহারও বুঝে ফেলেছেন এটি তাঁরই দিন! বুঝতে পেরেই যেন আরও উন্মাতাল হয়ে উঠল তার ব্যাট, দুর্বিনীত স্ট্রোক প্লেতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল চারপাশ।

সেই টেস্টে ইংল্যান্ডের বোলিং ডিপার্টমেন্টে ডেভন ম্যালকম, পল জার্ভিস, ক্রিস লুইস, ইয়ান সলসবুরি ও গ্রায়েম হিক এবং এদের সঙ্গে একেবারেই সংক্ষিপ্ত টেস্ট ক্যারিয়ারের সূচনা করা বাঁহাতি পেসার পল টেলর। এদের জন্য দর্শকদের মনে করুণা জাগিয়ে মাত্র ৩৫ বলে আজহার করে ফেললেন দ্বিতীয় ফিফটি, যাতে বাউন্ডারি ৯টি। ১১৪ বলে সেঞ্চুরি, ১৭টি বাউন্ডারি –এই ১৭টি বাউন্ডারির একটিই শুধু ব্যাটসম্যানের প্রত্যাশিত গতিপথে যায়নি। ব্যাটের নিচের দিকে লেগে উইকেটকিপারের পাশ দিয়ে ছুটে গেছে তা সীমানার দিকে। অন্তত একটি শট আজহার যেমন চেয়েছিলেন, তেমন মারতে পারেননি ইংলিশ বোলারদের জন্য সারা দিনে বলতে গেলে এটুকুই সান্ত্বনা!

আজহারের ব্যাটের দ্যুতিতে ইডেন যেদিন হেসেছিল। দেড় শ হয়ে যাওয়ার পর। ছবি: গেটি ইমেজেস

আজহার উইকেটে গিয়েই পেয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকারকে, এটা তো আগেই বলেছি। দর্শকদের প্রাপ্তিটা তাই প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে গেল প্রায়ই । মাত্র ৩১.২ ওভারে গড়া এ দুজনের ১২৩ রানের পার্টনারশিপটির সময় ব্যাটসম্যানশিপের প্রাচ্য ঘরানা উদ্ভাসিত হলো পরিপূর্ণ মহিমায়। একদিকে টেন্ডুলকারের ব্যাটে শুদ্ধ টেকনিকের জয়গান, নিয়মের মধ্যে থেকেও কত অসাধারণ হওয়া যায় তার প্রদর্শনী। অন্য প্রান্তে অন্য রকম আনন্দের পসরা সাজিয়ে বসেছে আজহারের ব্যাট, তা যেন কোনো নিয়ম না মানা খেয়ালী এক শিল্পীর তুলি, ইডেনের সবুজ প্রান্তর যার বিশাল ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসেই একের পর এক মনোমুগ্ধকর ছবি আঁকতে লাগল আজহারের ব্যাট।

ছবি আঁকাই তো, নইলে ১২৫ বলে ১১৪ রান শুনলে মনে হয় যে রকম মারমার কাটকাট মেজাজের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, কখনই সেই বন্য আক্রমণাত্মকতা ছিল না আজহারের ব্যাটে। পরে কখনো কখনো আজহারের ব্যাটে তা দেখা গেছে, কিন্তু তখন ব্যাপারটি অন্য রকম, বাউন্ডারিতে পাঠানো বলকেও আজহারের ব্যাট যেন আদর করে বলে, 'আবার এসো, কেমন!! পুরোটাই টাইমিং আর পেলব কব্জির মোচড়, যে গতিতে বল ছুটে যায় বাউন্ডারিতে, পাওয়ারটা বোঝা যায় তাতেই, কিন্তু শট খেলার সময় সেই পাওয়ারের ব্যাপারটি থাকে একেবারেই প্রচ্ছন্ন হয়ে। এতটাই মোহমুগ্ধ করে রাখার মতো সেই ব্যাটিং যে, নিজেদের দলের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে এ কথা ভুলে গিয়ে প্রেসবক্সে আমার পেছনে বসা দুই ইংরেজ সাংবাদিককে বলতে শুনলাম, রঞ্জিকে দেখতে না পারার দুঃখটা এত দিনে দূর হয়েছে তাঁদের।

প্রথম দিনের খেলা শেষেও সবার চোখে জড়িয়ে থাকল সেই মুগ্ধতার আবেশ। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মনে হলো বজ্রাহত। অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ টেস্ট শুরুর আগে থেকেই ভুগছিলেন জ্বরে। আজহারের ব্যাটিংয়ে সেই জ্বর আরও বেড়ে যাওয়ারই কথা। বেচারা গুচ! আজহারের অমন ব্যাটিংয়ের কারণেই স্মরণীয় একটি উপলক্ষকে একদমই উদযাপন করতে পারেননি এই এসেক্স ম্যান। এটি ছিল গুচের শততম টেস্ট!

গুচকে না পেয়ে ইংল্যান্ড শিবিরের প্রতিক্রিয়া জানতে ইংল্যান্ড কোচ কিথ ফ্লেচারেরই দ্বারস্থ হতে হলো সাংবাদিকদের। 'আজহারই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে দুদলের' – এ কথা বলার সময় ফ্লেচারের মুখটা কেমন করুণ দেখাচ্ছিল, তা চোখে ভাসে এখনো।

তবে যে মুখটি এর পুরো বিপরীত হবে বলে ভেবেছিলাম, সেটি দেখেও কিন্তু ছোটখাটো একটা ধাক্কাই খেতে হলো। ড্রেসিংরুমে ফিরে প্যাড-ট্যাড খুলেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন শাওয়ারের নিচে, সাংবাদিকদের তাই অপেক্ষা মানতে হলো কিছুক্ষণ। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ড্রেসিংরুমের দরজার ফাঁকে যে মুখটি উকি দিল, তা দেখেই ওই ধাক্কা, এই মুখে কোনো উচ্ছ্বাসের ছাপ নেই। দেখে বোঝা মুশকিল, অতল খাদে পড়ে যেতে যেতে প্রায় অলৌকিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার সবুজ প্রান্তরে ফিরেছে এই লোকটি। কথা বললেন টেস্টের আগের দিনের মতোই অনুচ্চ স্বরে। যদিও ১২৫ বলে ১১৪ রানের ফিরিয়ে দেওয়া আত্মবিশ্বাসটা তাতেও বোঝা যাচ্ছিল ঠিকই।

আনুষ্ঠানিক কোনো প্রেস কনফারেন্স নয়, ড্রেসিংরুমের অর্ধেক খোলা দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন আর জড়ানো উচ্চারণে বলা তাঁর কথাগুলো শোনার চেষ্টায় বাইরে প্রায় ধাক্কাধাক্কি করছে ১৫/২০ জন সাংবাদিক। সেই ধাক্কাধাক্কির মধ্যে দাঁড়িয়েও হঠাৎ কেন যেন আমার মনে দার্শনিক ভাবের উদয় হলো। এই যে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আজহার আর কালকের আজহার দুজন একই লোক, অথচ দুজনের মধ্যে কী যোজন যোজন ব্যবধান। মাত্র কয়েকটি ঘণ্টা একজন মানুষের জীবনকে কেমন বদলে দিতে পারে!

পরদিন 'আনন্দবাজার পত্রিকা'য় মতি নন্দীর ম্যাচ রিপোর্টের শুরুতেও দেখলাম প্রায় একই রকম চিন্তার প্রতিফলন। হুবহু মনে নেই, তবে প্রথম লাইনটি ছিল অনেকটা এরকম –‘আজহার টসে জিতেছেন, লুইসের বলে হেড দিয়েছেন, সেঞ্চুরি করেছেন–এরপর তার ক্যাপ্টেনসি কেড়ে নেওয়ার কথা কে বলবে?' টসে জেতা বা সেঞ্চুরি করাটা বুঝতে কারও সমস্যা হওয়ার কথা নয়, তবে লুইসের বলে হেড দেওয়ার ব্যাপারটি বোধ হয় ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। শর্ট বলে আজহারের চিরন্তন সমস্যা, বল থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বিসদৃশ এক লাফ দেওয়া, তা করতে গিয়েই লুইসের বাউন্সার লেগেছিল তাঁর হেলমেটে। সেটিই মতি নন্দীর অপূর্ব কল্পনাশক্তিতে 'লুইসের বলে আজহারের হেড'!

ইডেনে এই অগ্নিপরীক্ষার ছয় বছর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কানপুরে ১৯৯ রানে শেষ হয়েছিল আজহারের একটি টেস্ট ইনিংস। সুবাস পেতে পেতে হারিয়ে ফেললেন যে ডাবল সেঞ্চুরি, শেষ পর্যন্ত তা আর পাওয়াই হয়নি। ১১৪ রানে অপরাজিত আজহারকে নিয়ে কলকাতা সেই স্বপ্নের জালই বুনেছিল সারা রাত। পরদিন সকালে ইডেনমুখো জনস্রোতের মুখে আজহার ছাড়া আর কারও কথা নেই। আজহার ডাবল সেঞ্চুরি পাবেন কি না—এছাড়া আর কোনো ঔৎসুক্য নেই। আজহারের রাত কীভাবে কেটেছে কে জানে, তবে পরদিন শুরু থেকেই  দেখা দিলেন আরও বিধ্বংসী রূপে।

মাঝখানের ফর্মহীনতা, চারদিক থেকে ছুটে আসা সমালোচকদের তীর, রাতের পর রাত বিনিদ্র কাটানোর সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলোকে যেন ব্যাট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টায় নামলেন তিনি। ১১৪ থেকে ১৫০-এ পৌছুতে লাগল মাত্র ৩১ বল, আগের দিন মারা ১৯টির সঙ্গে যোগ হলো আরও ৬টি বাউন্ডারি। '৯০ সালে লর্ডসে  আজহারের ৮৭ বলে সেঞ্চুরিটির সময় রিচি বেনো নাকি টেলিভিশন কমেন্ট্রিতে বলেছিলেন, 'প্রিয় দর্শক, আপনাদের আর হাইলাইটস দেখার প্রয়োজন নেই। এখনই আপনারা হাইলাইটস দেখছেন।' কলকাতায় থাকলে রিচি বেনো হয়তো পুনরাবৃত্তি করতেন সে কথারই ।

এখানে আজহারের ব্যাট তোপ দেগেছে ইংলিশ লেগ স্পিনার ইয়ান সলসবুরিকে। লাফিয়ে বেঁচেছেন সিলি পয়েন্টে দাঁড়ানো রবিন স্মিথ। ইডেন, ১৯৯৩

ব্যাট হাতে যা ইচ্ছে তা-ই যেন করছেন আজহার। সেঞ্চুরি-ডাবল সেঞ্চুরির মতো না হোক, ১৫০ রানও তো একটা মাইলফলক, সেটিও তাই উদযাপন করা উচিত– এই সিদ্ধান্ত থেকেই কিনা ১৫০-এ পৌঁছার পর পরই ইয়ান সলসবুরিকে হাওয়ায় ভাসিয়ে আছড়ে ফেললেন সীমানার ওপারে। আজহারের মহাকাব্যিক ইনিংসের একমাত্র ছক্কা। ডাবল সেঞ্চুরি থেকে তাঁকে বঞ্চিত করার ক্ষমতা ইংল্যান্ডের বোলারদের নেই–এটা যখন মোটামুটি মেনে নিয়েছেন সবাই, তখনই আজহার আউট। ১৮ রান দূরত্বে, ১৮২ রানে তাকে থামালেন অকেশনাল অফ স্পিনার গ্রায়েম হিক। ড্রাইভ করতে গিয়ে গুচের হাতে ক্যাচ দিয়ে যখন ফিরে আসছেন, তখন উঠে দাঁড়িয়েছে পুরো ইডেন গার্ডেন, করতালির শব্দ শোনা যাচ্ছে যেন কলকাতাজুড়েই। ব্যাট তুলে ধরেই ড্রেসিংরুমে ঢুকলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন।

১৮২ রান, ১৯৮ বল, ২৬টি চার, ১টি ছয়। হায়, পরিসংখ্যানকে কখনো কখনো কত অসহায় মনে হয়। এই বল-চার-ছয়ের হিসাব সামান্যই বোঝাতে পারছে আজহারের ইনিংসটির মহিমা। তারপরও সেই ইনিংস স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়নি যাদের, তাদের জন্য তো পরিসংখ্যানই ভরসা। দুটো ছোট্ট তথ্য এক্ষেত্রে খুব উপকারে আসবে। ৩৭১ রানের ভারতীয় ইনিংসের প্রায় অর্ধেক একাই উপহার দেওয়ার সময় বলার মতো দুটি পার্টনারশিপই হয়েছিল আজহারউদ্দিনের সঙ্গে। সে দুটিতে যাঁরা পার্টনার, তাঁরা শুধু তাদের সময়েরই নন, ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসেই অন্যতম সেরা স্ট্রোক মেকারের মর্যাদা পাবেন। সেই দুজন, শচীন টেন্ডুলকার ও কপিল দেবকেও নিভু নিভু হয়ে জ্বলতে হয়েছে দেদীপ্যমান আজহারের ঔজ্জ্বল্যের পাশে। আজহারের সঙ্গে ১২৩ রানের পার্টনারশিপে টেন্ডুলকারের অবদান মাত্র ৪১। ষষ্ঠ উইকেটে ১৪.৫ ওভারে কপিল-আজহারের ৬৮ রানের যে পার্টনারশিপ, তাতে কপিল দেবের ব্যাট দিয়েছে ৫১ বলে ১৩।

রানসংখ্যার চেয়েও এসবেই বেশি প্রকাশিত আজহারের ইনিংসটির আসল মহিমা। শুধু ১৮২ করেছেন বলেই নয়, সেটি এত দ্রুত করেছেন বলেই ইংল্যান্ডকে দুবার অলআউট করার মতো পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে ভারতীয় স্পিনাররা। আজহারের ওই ইনিংসটির কল্যাণে পঞ্চম দিন সকালেই যখন ভারতের ৮ উইকেটে জেতা সারা, একটু আগে ম্যান অব দ্য ম্যাচের ট্রফিটিও নেওয়া হয়ে গেছে তাঁর, সেই মঞ্চ থেকেই বাকি সিরিজের জন্য অধিনায়ক ঘোষণা করা হয়েছে তাঁকে, ইডেনে পায়চারি করতে করতে এমএল জয়সীমা বললেন সে কথাটাই, 'আজহার যখন খেলে, তখন দেখার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো দৃশ্য হতে পারে না। এই এখানেই, শচীন টেন্ডুলকারের মতো ব্যাটসম্যানকেও ওর পাশে কেমন বিবর্ণ দেখাল!'

আজহারের এই সাফল্যে জয়সীমারও সামান্য অবদান ছিল। সেঞ্চুরি পাওয়ার পর আরেক হায়দরাবাদি জয়সীমাকে এজন্য কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছিলেন আজহার। সে কথা তোলায় ভারতীয় ক্রিকেটের 'আলটিমেট জেন্টলম্যান' মনে হলো একটু লজ্জাই পেলেন। বললেন, 'না, আমি তেমন কিছুই করিনি। ওকে শুধু বলেছিলাম বাঁ হাতটা বেশি ব্যবহার করতে আর পা নিয়ে গিয়ে নিজের শট খেলতে। একেবারেই বেসিক জিনিস, এর বেশি কিছু নয়।' কখনো কখনো একেবারেই বেসিক জিনিসও মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়। টেস্টের আগে ওয়ানডে সিরিজের সময় জয়সীমা আজহারকে তা মনে করিয়ে দেওয়াতেই হয়তো ম্যাজিকটা হয়েছিল। আজহারের ইনিংসটি কেন অসাধারণ, এর সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যাটাও শুনেছিলাম জয়সীমার কাছ থেকেই।

আরেক হায়দারাবাদি এম এল জয়সীমার কাছে ঋণ ছিল আজহারের এই ১৮২ রানের ক্ল্যাসিকেরসেই প্রথম টেস্ট ম্যাচ কাভার করতে যাওয়া, গাভাস্কার-পতৌদি-জয়সীমাদের দেখে তখন মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকার সময় । তারপরও জড়তা ভেঙে জয়সীমাকে আমিই করেছিলাম প্রশ্নটা। ভয় ছিল জয়সীমা না হেসে উঠে বলেন, 'এই ইনিংস কেন অসাধারণ, তা আবার বলতে হবে? নিজের চোখে দেখেও বুঝতে পারছ না!' না, তা করলেন না 'জাই", বরং বিশ্লেষণ করলেন চমৎকার, “দেখো, এটি ছিল খুব স্নো উইকেট। এই উইকেট ড্রাইভ খেলার জন্য কখনই আদর্শ নয়। অথচ এরপরও আজহার উইকেটের সামনে যেসব ড্রাইভ খেলেছে, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।' বছরখানেক হলো ক্যান্সারের কাছে হেরে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন এমএল জয়সীমা। আজ আজহার প্রসঙ্গে তার উচ্ছ্বাসের কথা যত মনে পড়ছে, ততই মনে হচ্ছে আজহারের পতনের চূড়ান্ত খবরটা জেনে যাওয়ার আগে তাঁর চলে যাওয়াটা ভালোই, হয়েছে। সেই ছোট্টটি থেকে বড় হতে দেখা আজহারের এই চেহারা দেখে জয়সীমা বড় কষ্ট পেতেন!

আজহার নিজে ১৮২ রানের এই ইনিংসটিকে তাঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে মানেন, তবে এটি খেলার বছর দেড়েক পর প্রথম যেবার তাঁকে ইন্টারভিউ করি, তখন সেরা ইনিংস হিসেবে এটির চেয়েও এগিয়ে রেখেছিলেন '৯০ সালে লর্ডসে করা সেঞ্চুরিটিকেই। আজহারের প্রায় সবগুলো সেঞ্চুরি দেখেছেন--এমন সাংবাদিক বন্ধুদেরও দেখেছি একই মত। সেদিন লর্ডসে স্ট্রোক প্লের যে প্রদর্শনী সাজিয়েছিল আজহারের ব্যাট, তার তুল্য কিছু জীবনেই আর দেখেননি বলেও উচ্ছ্বাস শুনেছি তাদের অনেকের মুখে। আজহারের লর্ডসের সেঞ্চুরি মাঠে বসে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, পরে তা দেখেছি ভিডিওতে। আমার জন্য তাই লর্ডস কোনো সমস্যা নয়, আমার কাছে আজহার মানেই ওই ১৮২ রানের ইনিংস। '৯৬-এর নভেম্বরে ইডেনেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার ৭৪ বলে করা সেঞ্চুরিটি দেখার পরও তা-ই। দেখেছি '৯৮-এর মার্চে কলকাতাতেই অস্ট্রেলিয়াকে পরাজয়ের গ্লানিতে ডুবিয়ে দেওয়া তার অপরাজিত ১৬৩ রানের ইনিংসটিও। ইডেন গার্ডেনে এখন পর্যন্ত যে ৩টি টেস্ট কভার করেছি, তার প্রতিটিতেই সেঞ্চুরি এসেছে আজহারের ব্যাট থেকে। না, এজন্য আমি কোনো কৃতিত্ব দাবি করছি না, কৃতিত্ব যদি কিছুর থেকে থাকে, সেটি এই মাঠের সঙ্গে আজহারের অদ্ভুত সুসম্পর্কের। তখন পর্যন্ত ইডেনে খেলা ৬ টেস্টের ৭ ইনিংসে মাত্র দুবারই ব্যর্থ হয়েছেন। বার্থ মানে সেঞ্চুরি পাননি। নইলে সে দুটি ইনিংসও ৫২ ও ৬০ রানের!

'৯৩-এর জানুয়ারিতে খেলা ১৮২ রানের ইনিংসটি ছিল ৫২তম টেস্টে আজহারের দ্বাদশ সেঞ্চুরি, তবে এর আগে তাঁর ১১ সেঞ্চুরির একটিও জেতাতে পারেনি দলকে। ক্যাপ্টেনসি যখন যায় যায়, দলে জায়গা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যাচ্ছে ফর্মের অবস্থা এমন–তখনই আজহারের ব্যাট থেকে এল প্রথম ম্যাচ উইনিং সেঞ্চুরিটি। ওই ১৮২ রানের ইনিংসটির কথা উঠলেই যে একটু বাড়তি আবেগের ছোঁয়া লাগে মনে, তার একটি কারণ হয়তো বিনোদ কাম্বলি, রাজেশ চৌহান ও পল টেলরের মতো সেটি ছিল আমারও অভিষেক টেস্ট। ওদের খেলোয়াড় হিসেবে আর সাংবাদিক হিসেবে আমার।

সে কারণেই আজহারের ব্যাটের অমন শিল্পিত তাণ্ডব চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেছে মনে। 'তাণ্ডব' শব্দটি অবশ্য আজহারের সে সময়ের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে যায় না। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৪ বলের সেঞ্চুরিটি ছিল সত্যিকার অর্থেই ব্যাটিং তাণ্ডব। টেস্টের দ্বিতীয় দিন বিকেলে ব্রায়ান ম্যাকমিলানের একটি লাফিয়ে ওঠা বল ছোবল দিয়েছিল ৮ বলে ৬ রান করা আজহারের আমগার্ডের ঠিক ওপরে। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে ড্রেসিংরুমে ফেরার পর কোচ মদনলাল নাকি মাঠ ছেড়ে আসার ব্যাপারটি যে তাঁর ভালো লাগেনি, আজহারকে ভালোমতোই বুঝিয়ে দেন তা। পরদিন সকালে খেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই সপ্তম উইকেট পতনের পর হয়তো সেই রাগ নিয়েই আবার ব্যাট করতে নেমেছিলেন আজহার। মদনলাল অবশ্য পরে বলতে পারতেন, 'আমি অমন রাগিয়ে দিয়েছিলাম বলেই তো...'।

সত্যিই যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের মদনলালকে ক্ষমা করার কথা নয়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওই ম্যাকমিলানের বলেই ১১ নম্বর বাউন্ডারিটি মেরে আজহার যখন হাফ সেঞ্চুরিতে পৌছালেন, মাত্র ৩৫ বল খেলেছেন তিনি। ৬ থেকে ৫২–সকালের ৪৬ রান মাত্র ২৭ বলে। ফিফটির পর আরো উন্মাতাল আজহারের ব্যাট। তার শর্ট বল অপছন্দ করার ব্যাপারটি দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের জানা না থাকার কোনো কারণ নেই। আজহারকে থামাতে বাউন্সার ছুটে এল তাই নিয়মিতই। নামার সময়ই এ রকম কিছু অনুমান করে থাকবেন, সিদ্ধান্তটাও নিয়ে ফেলেছিলেন তখনই। অনেক দিনের অব্যবহারে জমে যাওয়া ধুলো ঝেড়ে আবার বের করলেন হুক শটটিকে। আজহারের লম্ফঝম্ফ দেখার আশায় একের পর বাউন্সার দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকান বোলাররা, তাদের দেখতে হলো আজহারের হুক আর পুল। লাঞ্চের সময় আজহার অপরাজিত ৯৭। আবার খেলা শুরু হতেই বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার পল অ্যাডামসের বলে ১৮তম বাউন্ডারিটি মেরে আজহার পৌছে গেলেন তার পঞ্চদশ সেঞ্চুরিটিতে। মাত্র ৭৪ বলে। টেস্ট ক্রিকেটে ৭৪ বলে সেঞ্চুরি আছে আরও দুজনের–পাকিস্তানের মাজিদ খান (বনাম নিউজিল্যান্ড, করাচি, ১৯৭৬) ও ভারতের কপিল দেবের (বনাম শ্রীলঙ্কা, কানপুর, ১৯৮৬-৮৭, এই টেস্টেই ১৯৯ রান করে আউট হয়েছিলেন আজহার)। এর চেয়ে কম বলে টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন মাত্র তিনজন–ভিভ রিচার্ডস (৫৬), জ্যাক গ্রেগরি (৬৭) ও রয় ফ্রেডেরিকস (৭১ বলে)।*

সেঞ্চুরি পূর্ণ করার ঠিক পরের বলটিতেই মিড উইকেটের ওপর দিয়ে ছক্কা, পল অ্যাডামসকে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে আউটও সে ওভারেই। ১২৬ মিনিট, ৭৮ বল, ১০৯ রান, ১৯টি চার, ১টি ছয়–জাদুকর যখন ফিরে আসছেন, ইডেন তখন দাঁড়িয়ে। আজহার যেন তা দেখেও দেখলেন না। এতক্ষণ যে জাদুর কাঠিটি দিয়ে মাঠে ইন্দ্রজাল ছড়াচ্ছিলেন, এক হাতে সেই ব্যাটটির মাঝখানে ধরে শূন্য রানে আউট হলে যেমন হয়, তেমন মুখ করে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেলেন তিনি। ফেরার সময় যেমন, তেমনি ব্যাট তোলেননি হাফ সেঞ্চুরি বা সেঞ্চুরি করার পর দর্শকদের অভিনন্দনের জবাবেও। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইডেনের দর্শকেরা যে অন্যায় আচরণ করেছিল, এত তাড়াতাড়ি তা কীভাবে ভুলে যান আজহার? খেলা পণ্ড করে দেওয়ার পর পুরস্কার বিতরণীতে যাওয়ার সময় ওপর থেকে জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে তাঁর গায়ে, অনেকক্ষণ ড্রেসিংরুমে একরকম লুকিয়ে থাকার পর চুপিসারে ছেড়ে যেতে হয়েছে স্টেডিয়াম।

১৯৯৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আজহারের ৭৪ বলে সেঞ্চুরিটাও প্রেসবক্স থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই ইডেনেই

ইডেন তাঁকে যেমন অনেক দিয়েছে, তেমনি ইডেনের দর্শকদেরও তো তিনি কম দেননি। অথচ একটি ব্যর্থতাতেই এমন ভিলেন হয়ে যাবেন! তখন আজহারের ব্যাট না তোলার কারণ মনে হয়েছিল শুধু এটিকেই। মাস আটেক পর কলম্বোতে ১৯৯৭ এশিয়া কাপের সময় জানলাম, কারণ ছিল আরও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর ভারতের ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে প্রথমবারের মতো ভারতীয় দল থেকে বাদ পড়ায় সেই এশিয়া কাপ ছিল তাঁর কামব্যাক টুর্নামেন্ট। ভারতীয় মিডিয়ার সঙ্গে তখন তাঁর কথাবার্তা একদমই বন্ধ। তাঁদের ঈর্ষাকাতর দৃষ্টির সামনে আজহার ইন্টারভিউ দিলেন শুধু বাংলাদেশের দুই সাংবাদিককে। সেই ইন্টারভিউয়েই জানা গেল, ইডেনে ব্যাট না তোলার আসল কারণ। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের অপমানের চেয়েও বড় করে দেখালেন এর কিছুদিন আগের একটি ঘটনাকে। '৯৫-এর এপ্রিলে শারজায় এশিয়া কাপে অভিষেক হয়েছিল বাংলার বাঁহাতি স্পিনার উৎপল চ্যাটার্জির। ফাইনালে তাঁকে না খেলানোয় কদিন পরে ইডেনে এক প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার সময় তাঁর উদ্দেশে দর্শকরা যেসব মধুর সম্ভাষণ করেছিল, আজহার তা ভোলেননি। সেটি বুঝিয়ে দিতেই ব্যাট তোলেননি অমন একটা সেঞ্চুরির পরও।

৭৪ বলের ওই সেঞ্চুরিটির সময় আজহারকে অন্যরকম লেগেছিল। শিল্পের ছোঁয়া ছিল সে ইনিংসেও, তবে তুলির পরিবর্তে যেন ব্রাশ হয়ে উঠেছিল তাঁর ব্যাট এবং সেই ব্রাশ তিনি বেশ জোরেই চালিয়েছিলেন ক্যানভাসে। তাতে আজহারের ব্যাটিংয়ের নন্দনতাত্ত্বিক দিকটি কি একটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? হয়েছিল, তারপরও আজহার জেনেশুনেই তা করেছিলেন। কারণ? সেটিও কলম্বোতেই জানিয়েছিলেন আজহার, 'আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবাই সবার শক্তি আর দুর্বলতা সম্পর্কে এত বেশি জানে যে, মাঝে মাঝে একটু অপ্রত্যাশিত কিছু না করলে, একটু সারপ্রাইজ না দিতে পারলে সফল হওয়া খুব কঠিন।’ ৭৪ বলে ওই সেঞ্চুরির সময় দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের সেই সারপ্রাইজ ভালোই দিয়েছিলেন আজহার। সবচেয়ে বেশি দিয়েছিলেন ডেবুট্যান্ট ল্যান্স ক্লুজনারকে। এই ফাস্ট বোলারের এক ওভারের পর পর পাঁচটি বলকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কত কঠিন জায়গা। পাঁচটি চারই ছিল লং লেগ থেকে মিড উইকেট বৃত্তচাপের মধ্যে। দ্বিতীয় ইনিংসেও একই ভঙ্গিতে ব্যাট করে আজহার করেছিলেন ৫৬ বলে ৫২।

এই শৌর্যময় ব্যাটিং এতটাই অভিভূত করে ফেলেছিল যে, ফিসফিসানিটাকে তখন পাত্তা দেইনি। নইলে আজহারের ব্যাটিংয়ে মুগ্ধতার রেশ একটু কাটিয়ে ওঠার পর ম্যাচের পরিস্থিতির সঙ্গে তা কতটা মানানসই ছিল, এই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। তা আজহারের কানে যাওয়ার পর অনেকবারই অনুযোগের সুরে বলেছেন, 'ওরা (সমালোচকরা) বলে আমি নাকি আউট হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অমন সেঞ্চুরিটা পেয়েছি।'

আজহারের ক্ষোভটা নিজের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়ায় তখন তাঁর প্রতি সমবেদনা জেগেছে আর ওই সব সমালোচকের ওপর রাগ। কিন্তু কিছুদিন হলো অনুভূতিটা যে পাল্টে গেছে অনেকটাই! হানসি ক্রনিয়ের স্বীকারোক্তিতে আমরা জেনেছি, কলকাতায় ভারতের পরাজয়ের পর আহমেদাবাদে সিরিজ নির্ধারণী যে টেস্ট, তার আগের দিনই ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত (!) বাজিকর মুকেশ গুপ্তা ওরফে এমকে ওরফে জনের সঙ্গে আজহার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ক্রনিয়েকে। আজহারের সঙ্গে মুকেশ গুপ্তার পরিচয়টা নিশ্চয়ই আহমেদাবাদে গিয়ে হয়নি। অন্তত এটা তো নিশ্চিত যে, কলকাতা টেস্টের সময়ও দুজনের মধ্যে পরিচয় ছিল। এবার ক্রনিয়ের সঙ্গে এম. কের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি মনে রেখে ফিরে তাকান আজহারের ইনিংস দুটির দিকে। মনে খচখচ করার মতো অনেক কিছুই পাবেন। হয়তো সন্দেহ থেকেই এসব খচখচানি, আজহারের অমন উন্মাতাল ব্যাট চালানোয় অসৎ কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু তাঁর সব কিছুই যে এখন সন্দেহের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ব্যর্থতা তো বটেই, এমনকি তাঁর অনেক সাফল্যও। মোহাম্মদ আজিজউদ্দিন আজহারউদ্দিনের সবচেয়ে বড় শাস্তি তো এটাই।

* উৎপল শুভ্রর 'সেই সব ইনিংস' বই থেকে।

সংযোজন: ২০০৩ সালের এপ্রিলের আগে টেস্ট ক্রিকেটে ৭৪ বলের চেয়ে দ্রুততর তিন সেঞ্চুরির সেঞ্চুরির সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও সাতটি সেঞ্চুরি। এখন দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ব্রেন্ডন ম্যাককালামের (৫৪ বলে)।: