নিউজিল্যান্ড: ৫০ ওভারে ২৬৫/৮। বাংলাদেশ: ৪৭.২ ওভারে ২৬৮/৫। ফল: বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী

কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক রূপকথার নাম হয়ে ছিল এত দিন। এখন তাহলে কী?  

বারো বছর আগে এই মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই জয় এখনো যেন অবিশ্বাসের ঢেউ তোলে মনে। সে সময়কার ‘অপরাজেয়’ অস্ট্রেলিয়া বনাম পরাজয়ে পরাজয়ে জর্জরিত বাংলাদেশ! আসলেই কি অমন কিছু ঘটেছিল! 

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘোরতর বর্তমান তো এর চেয়ে একটুও কম অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে না! এই যে ব্যাট তুলে লাফাচ্ছেন মাহমুদউল্লাহ, ড্রেসিংরুম থেকে মাঠে ছুটে আসছেন এই ম্যাচে দলের বাইরে থাকা বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা, গ্যালারি থেকে ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ স্লোগান উঠছে, এসব সত্যি তো! নাকি কোনো মায়াবী বিভ্রম! কোনো সুখস্বপ্ন, ঘুম ভাঙলেই যা মিলিয়ে যাবে!

মাহমুদউল্লাহ উড়ছেন, অমন ইনিংস খেলে উড়তেই পারেন। ছবি: গেটি ইমেজেস

অবিশ্বাসের এমন ঘোর লাগিয়ে দিলেন সাকিব আর মাহমুদউল্লাহও। এই দুজনের ব্যাটে রচিত হলো যে অমর কাব্য, বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন কিছু এর আগে দেখেনি। ওয়ানডে ক্রিকেটও কি খুব বেশি দেখেছে! কবারই বা লেখা হয়েছে প্রত্যাবর্তনের এমন বীরত্বময় গল্প!

৪ উইকেটে ৩৩ রানের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দুজনের ২২৪ রানের জুটি। ওয়ানডেতে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো জুটির দুই শ ছোঁয়া। সেঞ্চুরি করলেন দুজনই। সাকিব ছক্কা মেরে। মাহমুদউল্লাহ বাউন্ডারিতে। কী ব্যাটিংটাই না করলেন দুজন! কে কার চেয়ে ভালো, এটির মীমাংসা করা বোধ হয় এই ম্যাচের কঠিনতম কাজ। তার দরকারই–বা কী!

সাকিব যখন আউট হলেন, জয় নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। মাত্র ৯ রান দূরে দাঁড়িয়ে তা হাসছে। মাহমুদউল্লাহ শেষ পর্যন্ত অপরাজিত। ২০১৫ বিশ্বকাপেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন। বোল্ট-সাউদি আতঙ্কের ঢেউ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সেদিনও। সেটিও ছিল দুর্দান্ত এক ইনিংস। তবে এগিয়ে থাকবে কালকেরটিই। হ্যামিল্টনের ওই সেঞ্চুরি যে জয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত নয়।

সাকিব আর মাহমুদউল্লাহর আলোর ছটায় এই ম্যাচের বাকি সব অদৃশ্য। তবে এই দুজনের মহিমা বোঝার জন্য হলেও একটু পেছনে তাকানো উচিত। যেখানে বড় হয়ে উঠছে দুটি পরিসংখ্যান।    

শেষ ১০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে নিউজিল্যান্ড তুলল ৬২ রান। 

প্রথম ১০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ২৪।

দুটিই এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির রেকর্ড। সবচেয়ে কম রানের আর কি! প্রথমটি বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। দ্বিতীয়টিতে মনে হয়েছিল, স্বপ্নভঙ্গের সব আয়োজন বুঝি সম্পন্ন হয়ে গেল।

প্রিয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সাকিবের ব্যাট স্বপ্ন দেখিয়েছিল আরও একবার। ছবি: গেটি ইমেজেস

একটা সময় ছিল, ইংল্যান্ড সফরে আসার আগে উপমহাদেশের ওপেনারদের রাতের পর রাত বিনিদ্র কাটত। মে-জুন মাসে ইংলিশ গ্রীষ্মের শুরুতে বল ইচ্ছামতো সুইং করবে, পিচে পড়ে সাঁইসাঁই ঘুরবে। বিখ্যাত সেই ইংলিশ কন্ডিশনও কেমন বদলে গেছে! এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বলতে গেলে কোনো বোলারই বল সেভাবে বল সুইং করাতে পারছেন না। কিন্তু কাল বোল্ট আর সাউদি যেন সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন যে, খেলাটা ইংল্যান্ডে হচ্ছে। বিশেষ করে সাউদি।

মাশরাফি বিন মুর্তজা আগেই এই ভয়টা করেছিলেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিনের জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিন গ্রুপ প্রতিপক্ষকে নিয়ে বলতে গিয়ে বোলারদের মধ্যে নাম করেছিলেন শুধু এই দুজনেরই। কেন, কাল বাংলাদেশের ইনিংসের প্রথম ১১ ওভার দেখে থাকলে ঠিকই তা বুঝতে পেরেছেন।

এই ম্যাচের আগে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ‘বাংলাদেশের মুখ’ তামিম ইকবাল। এমনই যে, কাল ম্যাচ শুরুর আগে নিউজিল্যান্ডের সাত-আট বছরের এক শিশুকে দেখা গেল ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ বলে চিৎকার করতে। ওই শিশুর বাবার কাছ থেকে জানা গেল, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি দেখে তাঁর ছেলে তামিমের ভক্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সমর্থকও।

সেই তামিমকে দ্বিতীয় বলেই ফিরিয়ে দিলেন সাউদি। পরের দুই ওভারে সাব্বির ও সৌম্যকেও। ১২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর কল্পনাও করা যায়নি, এই ম্যাচ এমন রোমাঞ্চ নিয়ে অপেক্ষা করছে! দলকে ৩৩ রানে রেখে মুশফিক আউট হওয়ার পর তো আরও না। সাউদি-বোল্টের ঝড় শেষ হওয়ার পর আক্রমণে এসে অ্যাডাম মিলনে ১৪৬ কিলোমিটার গতির এক বলে উপড়ে ফেললেন মুশফিকের মিডল স্টাম্প। ওই স্টাম্পের সঙ্গে  বাংলাদেশের স্বপ্নও যেন তখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

ধাক্কাটা কত বড় ছিল, তা বুঝতে একটা তথ্য খুব সাহায্যে আসবে। বাংলাদেশের প্রথম চার ব্যাটসম্যানের মোট রান ২৫। প্রথম চার মিলে এর চেয়ে কম রানের ইতিহাস খুঁজতে যেতে হবে সেই ২০১১ সালে (ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৮ রান)।

ইনিংসের শুরুতেই বাংলাদেশের ব্যাটিং অমন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর নিউজিল্যান্ডের ২৬৫ রানকেও মনে হচ্ছিল পাহাড়সম। অথচ এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বিচারে ২৬৫ এমন কোনো রানই নয়। নিউজিল্যান্ড এত কম রানে আটকে যাবে, ইনিংসের ৪০ ওভার পরও তা ভাবা যায়নি।

৪২তম ওভারে মোসাদ্দেককে আক্রমণে আনা প্রমাণিত হলো মাশরাফির মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে। ছবি: গেটি ইমেজেস

স্কোর তখন ২০৩। হাতে তখনো ৬ উইকেট। তিন শ তো তাহলে হচ্ছেই! উইকেটে ব্রুম আর নিশাম। এরপর নামবেন কোরি অ্যান্ডারসন। ওয়ানডেতে যাঁর ৩৬ বলে সেঞ্চুরি আছে। এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ব্যাটিংটা হচ্ছে অনেকটা পুরোনো ঢঙে। ত্রিশগজি বৃত্তের বাইরে মাত্র দুজন ফিল্ডার থাকার পরও ১০ ওভারের প্রথম পাওয়ার প্লেতে ঝড় উঠছে না। হাতে উইকেট নিয়ে অপেক্ষা করা হচ্ছে শেষ ১০ ওভারের জন্য। সেই হিসাবে নিউজিল্যান্ডের তিন শ তো অবধারিত মনে হচ্ছিলই, আরও বেশি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। 

জাতীয় পাখির নামে নিউজিল্যান্ডারদের ডাকা হয় ‘কিউই’ বলে। যদিও নিউজিল্যান্ডে কিউই পাখি দেখতে পাওয়াটা এখন ভাগ্যের ব্যাপার। নামেই পাখি, কারণ কিউই উড়তে পারে না। সোফিয়া গার্ডেনেও যে কিউইরা উড়তে পারল না, তার মূলে কে জানেন? মোসাদ্দেক হোসেন!

দলে নিয়মিত পাঁচজন বোলার থাকার পরও মাশরাফি যে তাঁকে ৪২তম ওভারে আক্রমণে নিয়ে এলেন, সেটি প্রমাণিত মাস্টার স্ট্রোক হিসেবে। ওই ওভারে দিলেন ৫ রান। পরের ওভারে তিন বলের মধ্যে দুই উইকেট! পরিস্থিতিটা অ্যান্ডারসনের ঝড় তোলার জন্য খুব অনুকূল ছিল। তাঁকে উপহার দিলেন ‘গোল্ডেন ডাক’। পরের ওভারে আরেকটা উইকেট নিয়ে মোসাদ্দেকের বোলিং ফিগার: ৩-০-১৩-৩!

জয়সূচক রানও এল মোসাদ্দেকের ব্যাট থেকেই। যাতে বেঁচে থাকল বাংলাদেশের সেমিফাইনালের আশাও। সে জন্য আজ ওভালে ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে। পুরো বাংলাদেশ যে আজ ইংল্যান্ডের সমর্থক, তা বোধ নয় না বললেও চলছে!