গিলেস্পিকে মারা আফতাব আহমেদের ছক্কাটা যেখানে পড়েছিল, তার গজ পনেরো দূরে দেয়ালের গায়ে বিশাল একটা হোর্ডিং। অধুনা এসএসই সোয়ালেক স্টেডিয়াম নাম নেওয়া কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বরণ। টুর্নামেন্টের আট দলের আট ক্রিকেটারের ছবি। নিচে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কীর্তির কথা লেখা। যেটিকে বলতে পারেন ক্রিকেটার বেছে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি।

এই টুর্নামেন্টের অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ড দল থেকে নেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, শহীদ আফ্রিদি, মুত্তিয়া মুরালিধরন ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরি তাই অতীত থেকে বর্তমানে। গিলক্রিস্ট এসেছেন ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছক্কার কারণে। মুরালি ওয়ানেডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন বলে। আফ্রিদিকে এনেছে ৩৭ বলে ওই সেঞ্চুরি। ভেট্টোরিকে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে ওয়ানেডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট।

বাকি চারটি দলের মধ্যে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন অ্যালেক্স হেলস (ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বোচ্চ ইনিংস), এবি ডি ভিলিয়ার্স (দ্রুততম সেঞ্চুরি) ও বিরাট কোহলি (দ্রুততম ২৫ সেঞ্চুরি)। বাংলাদেশের কে আছেন, অনুমান করুন তো!

প্রশ্নটা করার আসলে মানেই হয় না। সাকিব আল হাসান ছাড়া আর কে থাকবেন! সাকিব কেন, সেই জানা উত্তরটাও নিচে লেখা—তিন ধরনের ক্রিকেটেই এক নম্বর অলরাউন্ডার। নিচে আবার টীকা দিয়ে লেখা হয়েছে, ২০ মে ২০১৭ পর্যন্ত। এখন দেখা যাচ্ছে, ওটা না লিখলেও চলত। ত্রিমুকুট এখনো সাকিবেরই মাথায়। টীকা দেওয়া উচিত ছিল কোহলির কীর্তিতে। সবচেয়ে কম ইনিংসে ২৫ সেঞ্চুরির রেকর্ড যে এই টুর্নামেন্টেই কোহলির কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন হাশিম আমলা।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিটা একদমই ভালো যাচ্ছিল না সাকিবের। ছবি: গেটি ইমেজেস

সাকিব আল হাসানের চোখে ওই হোর্ডিংটা পড়েছে কি না জানা নেই। পড়ে থাকলে নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে, তবে নতুন কিছু তো আর জানেননি। অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানটা তো একরকম তাঁর নামের সমার্থকই হয়ে গেছে। এই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আলোচনায় টেস্ট আর টি-টোয়েন্টির র‍্যাঙ্কিং এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। এটি ওয়ানডে ক্রিকেটের বিশ্ব আসর। বিশ্বকাপের পর সবচেয়ে বড়। সেই টুর্নামেন্টটিকে বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার কোথায় আলোয় ভরিয়ে তুলবেন, উল্টো তিনি নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। ব্যাটিংয়ে ৫ ইনিংস আগেই টানা দুই ম্যাচে ফিফটি আছে (শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে), অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গত ম্যাচেও বিতর্কিত এলবিডব্লু সিদ্ধান্তে কাটা পড়ার আগে ভালো ব্যাটিং করছিলেন, কিন্তু বোলিংয়ে সেই চেনা সাকিবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অনেক দিন। দলে এ নিয়ে একটু দুশ্চিন্তাও আছে। একটু বলাটা ভুল হলো, ভালোই দুশ্চিন্তা আছে। অতীতে যখনই তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দারুণভাবে ফিরে এসে সেটির জবাব দিয়েছেন সাকিব। আজও আবার তেমন কিছু দেখা গেলে একদমই অবাক হবেন না। প্রিয় প্রতিপক্ষকে যে সামনে পাচ্ছেন আজ!

শুধু নির্দিষ্ট একটা দলের বিপক্ষে ভালো করলেই তো এক নম্বর হওয়া যায় না, সাকিবের পারফরম্যান্স আছে সব দলের বিপক্ষেই। তবে তার মধ্যেও নিউজিল্যান্ড বোধ হয় একটু আলাদা। শুধু ওয়ানডেকে আলাদা করে নিলে সেটিতে আবার স্পষ্ট দুটি ভাগ। ২০১০ সালে ‘বাংলাওয়াশ’-এর আগে ও পরে। প্রথম ম্যাচেই মাশরাফি চোট পেয়ে ছিটকে পড়ার পর অধিনায়কত্ব পেয়ে ওই সিরিজটাতে সাকিব ব্যাটে-বলে ছিলেন সমান উজ্জ্বল। সেই থেকে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের একজন কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে যদি সবচেয়ে বেশি ভাবে, সেই একজন সাকিব। 

বাংলাওয়াশের ওই সিরিজে। ছবি: এএফপি

বাংলাওয়াশের আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ ইনিংসে গড় মাত্র ১২.৮৮। এরপরও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ ইনিংসেই ব্যাটিং করেছেন। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে দুই ম্যাচে ৬ ও ১৯ রান করে আসার পরও গড় ৩৮.৩৩। বোলিংয়েও আগে-পরের হিসাবটা ঠিক থাকছে। ২০১০-এর আগে ২৭.৬১ গড়ে ১৩ উইকেট। পরে ২২.২৭ গড়ে ২২ উইকেট। ক্যারিয়ারে সাতবার ম্যাচে ৪ বা এর বেশি উইকেট নিয়েছেন। এর তিনবারই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। 
টেস্টেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সাকিবের। তাঁর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি কিউইদের বিপক্ষে। গত নিউজিল্যান্ড সফরে ডাবল সেঞ্চুরিও করে এলেন। আবারও সামনে নিউজিল্যান্ড, এটাই কি তাহলে আবার সাকিবের স্বরূপে দেখা দেওয়ার উপলক্ষ? প্রশ্নটা শুনে সাকিব হাসলেন, ‘আমার কাছে সব দলই সমান। এই ম্যাচটা একটা কারণেই আলাদা, কারণ এটিতে জিতলে আমাদের চান্স আছে।’

দেশে হোক, দেশের বাইরে হোক, অনেক বছর ধরে রান আটকে রাখার কাজ বলেন বা উইকেট নেওয়ার, ধারাবাহিকভাবে তা পালন করে এসেছেন সাকিব। ব্যাটসম্যান সাকিবের চেয়েও বোলার সাকিবকে তাই বেশি মিস করছে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ড কি আজ ফিরিয়ে দেবে সেই পুরোনো সাকিবকে?